| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কালী করালী : নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

Reporter
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী / ১৯৯৪ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

সাধারণভাবে একটা কথা আগেই বলে নিই। কালীর নাম শুনলেই অথবা কালীমূর্তি দেখলেই আমাদের মনে যে প্রতিক্রিয়া হয়, সে প্রতিক্রিয়া যেহেতু রাধাকৃষ্ণের নাম, লক্ষ্মী-সরস্বতীর নাম শুনলেই অথবা তাঁদের মূর্তি দেখলেই হয় না, তাই কালীর সেই বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে আমরা পূর্বাহ্নেই একটু বেশি সচেতন হয়ে এই প্রবন্ধ আরম্ভ করছি। আমরা গাঁয়ে-গঞ্জে দেখতাম—রাধাকৃষ্ণ, লক্ষ্মী-সরস্বতী, শীতলা-ষষ্ঠী অথবা এমন কী দুর্গাপুজোর ব্যাপারেও যে পুরোহিত দৃপ্ত পদক্ষেপে দক্ষিণা-কামে এগিয়ে আসতেন, কালীপুজোর কথা বললে সেই পুরোহিতই পিছপা হতেন। তাঁর অস্তগামিনী দক্ষিণাকামিতার কথা ছেড়েই দিলাম, তিনি সভয়ে বলতেন—না ভাই, কালীপুজোর অনেক হ্যাপা! ব্ৰত-উপবাস, মন্ত্রোচ্চারণ, পুজোর আঙ্গিক—কোনটায় যদি ত্রুটি হয়ে যায়, তাহলে আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে, আমায় ছেড়ে দাও ভাই।

আবার যে গৃহস্থ দোল-দুর্গোৎসব করে পাড়া মাতিয়ে দিচ্ছেন, দরিদ্র-নারায়ণ সেবা করে সাধারণের আশীর্বাদ লাভ করছেন, সেই গৃহস্থও কিন্তু কালীপুজো করতে হলে দু-বার ছেড়ে পাঁচবার ভাববেন। তার মধ্যে আবার যদি কালীপুজোর অব্যবহিত কালের মধ্যে সে বাড়ির কারও কোন বিপদ হয়, মৃত্যু ঘটে, আগুনলাগে, তবে গৃহস্থ পরের বছর থেকেই আর কালীপুজো করেন না। তিনি ভাবেন—জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে হয়তো-বা পুজোর আঙ্গিকে কোনও ত্রুটি হয়েছে, কালীপুজো তাঁর সইছে না। এইরকম অনেক বছর পরেও অন্য কোনও গৃহস্থের কালীপুজোর উৎসবে রবাহূত কোনও অধস্তন বংশজের মুখে শোনা যাবে— আমাদের বাড়িতে তো আগে কালীপুজো হতো। তারপর অমুকের এই দুর্ঘটনা হলো, আর পুজো বন্ধ হয়ে গেল।

মনে রাখতে হবে—গৃহস্থের এই ভীতি, পুরোহিতের ভাবনা এবং সাধারণ জনেরও ভয়াবিল শ্রদ্ধা—এইরকম একটা পরিমণ্ডলের মধ্যে থেকে আমরা কালীমায়ের চৰ্বিত-কথা লিখতে যাচ্ছি। শাস্ত্র এবং তত্ত্বের অনুক্রমে কালীপুজোর মধ্যেই কেন শুধু এই ভীতি-ভাবনা এল অথবা সমস্ত দেবতার পরিসরে একমাত্র কালীই কেন এমন ভীতিসঞ্চারিণী দেবী হয়ে রইলেন, তার একটা বিবর্তন এবং বিবরণ এই লেখাটির মধ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

রামপ্রসাদ আর রামকৃষ্ণ—এই দুই ‘রাম’ সর্বসাধারণের মধ্যে কালীমায়ের যত প্রিয়ত্ব স্থাপন করেছেন অথবা প্রিয়ত্বের যে সম্বন্ধে তাঁরা কালীমায়ের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছেন—তা বড়ো সাধারণ নয়, ভিন্ন স্বাদের তো বটেই। কথায় বলে— মায়ের ঋণ সন্তান শোধ করতে পারে না। কিন্তু আমার ধারণা—মায়ের সাধনার আনন্দে, মায়ের বাৎসল্যরসে এই দুই সন্তান যত ঋণী, স্বয়ং মা-ও বোধহয় তাঁর এই দুই সন্তানের কাছে ততটাই ঋণী—তাঁর অসামান্যা মাতৃমূর্তি বাঙালির অন্তরে স্থাপন করার জন্য। নইলে, অন্তত কালী মা আমাদের অত কাছের জন ছিলেন না। তাঁর প্রতি যে ভাব ছিল, তার মধ্যে শ্রদ্ধা, ভক্তি যত ছিল, ভয় ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। এই ভয়ের মধ্যে নানা কারণে ভয়ানক রস এবং বীভৎস রস—দুইই এমনভাবে সংক্রমিত হয়েছিল যে, খুনে জমিদার, ডাকাত অথবা সমাজের সবচেয়ে ক্রুর-কঠিন ব্যক্তিটির উপাস্যা দেবী হিসেবে তিনি প্রায় চিহ্নিতই হয়ে গিয়েছিলেন।

কপালকুণ্ডলার অধিকারী সাগরের উপকূলে নির্জন অরণ্যের মধ্যে মা ভবানীর মন্দিরে পূজারি ছিলেন। তাঁর আচার-ব্যবহার, কপালকুণ্ডলার প্রতি তাঁর স্নেহ আমাদের আশ্বস্ত করে। তিনি যে ভবানীমূর্তির পূজার্চনা বাদ দিয়ে কন্যা-সমান কপালকুণ্ডলার সঙ্গে যেতে পারেন না, সেই মূর্তির চেহারা—মানবাকারপরিমিতা বটে, কিন্তু ‘করাল কালীমূর্তি’।

ওই মুর্তির পূজক অধিকারী স্নেহ, দয়া ইত্যাদি একান্ত মানবিক গুণের আধার; অন্যদিকে কাপালিকের কথা ভাবুন। ওই একই মূর্তির সাধক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর চরিত্রের ‘করাল’ স্বভাব আমাদের চিত্ত বিপন্ন করে। বিজন বনে আত্মীয়-বন্ধু পরিত্যক্ত নবকুমারকে, আশ্রয়প্রার্থী নবকুমারকে সে মায়ের কাছেই বলি দিতে চায়। একটি মানুষকেও সে বলির পশুর অতিরিক্ত মনে করে না। বড়োজোর সাধনার উপকরণ। নবকুমারকে হঠাৎ পেয়ে সে খুশি হয়। ভাবে—নরবলির সুযোগ হয়ে গেল। মায়ের ইচ্ছা—ভৈরবীপ্রেরিতোহসি।

বলির পশুকে যেমন খাইয়ে-দাইয়ে হৃষ্টপুষ্ট করা হয়, তেমনই নবকুমারকে সে তার মনের গোপন অভিলাষ একটুও জানতে না দিয়ে একটি কুটিরে থাকতে দিয়েছে এবং বলেছে— ফলমূল যাহা আছে, আত্মসাৎ করিতে পার। পর্ণপাত্র রচনা করিয়া কলসজল পান করিও। ব্যাঘ্রচর্ম আছে, অভিরুচি হইলে শয়ন করিও। নির্বিঘ্নে তিষ্ঠ— ব্যাঘ্রের ভয় করিও না।

প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে যে ব্যক্তি পরম বিশ্বাসে কল্পিতবলি ছাগশিশুর মত ফলমূল খেয়ে ভাবছে—এই একটু পরেই আমাকে ছেড়ে দেবে, সে পরের দিন রাত্রেই কাপালিকের ‘মানুষঘাতী’ হাতের স্পর্শ পায়। জিজ্ঞাসা করে—‘আমায় কোথায় লইয়া যাইতেছেন? ’কাপালিক বলে—পূজার স্থানে’, ‘বধার্থ’।

নবকুমার বাঁচবার জন্য কত শক্তি প্রকাশ করলেন, কত কৌশল করলেন। কিছুই হলো না। বরঞ্চ তাঁর বাঁচবার আয়াস দেখে কাপালিক বলল—‘মূর্খ কি জন্য বল প্রকাশ কর? তোমার জন্ম আজি সার্থক হইল। ভৈরবীর পূজায় তোমার এই মাংসপিণ্ড অর্পিত হইবেক, ইহার অধিক তোমার তুল্য লোকের আর কি সৌভাগ্য হইতে পারে?’

অথচ এই কাপালিকের উল্টো দিকে অধিকারীকে দেখুন। মন্দিরের দ্বারোদঘাটন মাত্রেই আমরা ‘মানবাকারপরিমিতা করাল কালীমূর্তির’ সামনে কপালকুণ্ডলার মঙ্গল-কামনায় তাঁকে ভক্তিতে আনম্র দেখেছি, মন্ত্রপূত বিল্বপত্রে তাঁকে পুজো করতে দেখেছি। অধিকারী কপালকুণ্ডলাকে পিত্রাধিক স্নেহ করেন। কাপালিকের উদ্দেশ্যও তিনি জানেন। ‘খ্ৰীষ্টিয়ান তস্কর’রা কপালকুণ্ডলাকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু নৌকো ভেঙে গেলে সমুদ্রতীরে তাকে তারা ফেলে গিয়েছিল। কাপালিক কপালকুণ্ডলাকে নিয়ে আসেন বটে কিন্তু তিনি তাকে পালন করেছিলেন আপন তান্ত্রিক সাধনার উপকরণ হিসেবে। অধিকারী নবকুমারকে জানিয়েছেন—কাপালিক ইহাকে প্রাপ্ত হইয়া যোগসিদ্ধিমানসে প্রতিপালন করিয়াছিলেন। অচিরাৎ আত্মপ্রয়োজন সিদ্ধ করিতেন।

কাপালিক নবকুমারকে যেমন ফলমূল খাইয়ে ব্যাঘ্রচর্মের শয্যায় ঘুম পাড়িয়ে নিজের শব-সাধনার পথ প্রস্তুত করেছিলেন, কপালকুণ্ডলাকেও তিনি প্রতিপালন করেছেন অনূঢ়া কন্যার সঙ্গম-সিদ্ধিতে উর্ধ্বরেতা হওয়ার ‘যোগসিদ্ধিমানসে’। অধিকারী এই সরলা বালিকার জীবনে এই অস্বাভাবিকতা বরদাস্ত করতে পারছেন না। বালিকার প্রতি অসীম মমতায় তাই তিনি নবকুমারের সঙ্গে তার বিয়ের ঘটকালি করছেন। বিয়ের কথা তিনি এখনও বলেননি শুধু শঙ্কা ব্যক্ত করে বলছেন—আর আমিও এই কন্যাকে মা বলিয়াছি, আমিই বা কি প্রকারে ইহাকে অঞ্জলিচরিত্র যুবার সহিত একাকী দূর দেশে পাঠাইয়া দিই?

নবকুমার কহিলেন, ‘আপনি সঙ্গে আসুন।’

অধিকারী। ‘আমি সঙ্গে যাইব? ভবানীর পূজা কে করিবে?’

‘ভবানীর পুজো কে করিবে? ’আসলে অধিকারী কপালকুণ্ডলাকে যতটা স্নেহ করেন, মা ভবানীর পুজোতেও তাঁর অনুরক্তি কম নয়। এই নির্জন অরণ্যস্থলীর মধ্যে সঙ্গীবিহীন অবস্থাতেও মায়ের সেবানুরক্তি ত্যাগ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর পুজোর উপাচার সামান্যই—চিরাচরিত মন্ত্র, বিল্বদল, বিশ্বাস এবং অনুরক্তি। অপরপক্ষে নবকুমার যখন কাপালিককে প্রথম দেখেছিলেন, তখন তাঁর উপাসনা পদ্ধতিও তার নজরে এসেছিল। বর্ণনাটা একটু শোনা যাক।

‘…আয়ত মুখমণ্ডল শ্মশ্রুজটাপরিবেষ্টিত। সম্মুখে কাষ্ঠে অগ্নি জ্বলিতেছিল। নবকুমার একটা বিরাট দুর্গন্ধ পাইতে লাগিলেন, ইহার আসন প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া তাহার কারণ অনুভূত করিতে পারিলেন। জটাধারী এক ছিন্নশীর্ষ শবের উপর বসিয়া আছেন। আরও সভয়ে দেখিলেন যে, সম্মুখে নরকপাল রহিয়াছে, তন্মধ্যে রক্তবর্ণ দ্ৰব পদার্থ রহিয়াছে। চতুর্দিকে স্থানে স্থানে অস্থি পড়িয়া রহিয়াছে—এমনকি, কণ্ঠস্থ রুদ্রাক্ষ মালা মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অস্থিখণ্ড গ্রথিত রহিয়াছে। নবকুমার মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া রহিলেন।

পরের দিন আমরা নবকুমারকে একই জায়গায় দেখেছি। কাপালিক তাকে গায়ের জোরে ‘পূজার স্থানে’ নিয়ে এসেছে। ‘সৈকতের মধ্যস্থানে নীত হইয়া নবকুমার দেখিলেন, পূর্বদিনের ন্যায় তথায় বৃহৎ কাষ্ঠে অগ্নি জ্বলিতেছে। চতুঃপার্শ্বে তান্ত্রিক পূজার আয়োজন রহিয়াছে, তন্মধ্যে নরকপালপূর্ণ আসন রহিয়াছে—কিন্তু শব নাই। অনুমান করিলেন, তাঁহাকেই শব হইতে হইবে।’

নির্জন বসতিতে কাপালিকের যে শক্তিপুজোর আয়োজন আমরা দেখলাম, তা আমাদের কাছে ভয়ংকর হলেও তান্ত্রিক শক্তিসাধনায় এটা অস্বাভাবিক নয়। শাক্তদের উপাসনা পদ্ধতি একরকম নয়। একেক সম্প্রদায় একেক নিয়ম, একেক রকম আচার। বামাচারী অথবা কুলাচারী শাক্তদের মধ্যে মদ, মাংস, শব-সাধন, নরকপালের পাত্রে খাওয়া-দাওয়া করা, মড়া-পোড়ানোর ছাই দিয়ে স্নান করা, সেগুলো খাওয়া—এই সব বীভৎস প্রথা চালু আছে—যা সাধারণে ভাবতেই পারেন না। কিন্তু এই বামাচারী, কুলাচারীরাও কালীপুজোই করেন, অথবা শিবপুজো।

আসলে তান্ত্রিক, অথবা আরও সাধারণভাবে বলতে গেলে, শাক্তদের উপাস্যাদেবী কিন্তু শুধুই কালী নন, উপাস্যা দশ মহাবিদ্যা। কালী, তারা অথবা বঙ্কিমের কাপালিক যাঁর কথা বলেছেন—সেই ভৈরবী, ছিন্নমস্তা বা ঘোড়শীদেবী—এঁরা সবাই দশ মহাবিদ্যার এক একটি রূপ। যাঁরা দুর্গাপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো বা অন্নপূর্ণা পুজো করেন, তাঁরা যেমন অনেক সময় কালীমূর্তির ওপরেই এই পুজো করেন, তেমনই যাঁরা একান্ত তান্ত্রিক পদ্ধতিতে তারা, যোড়শী বা ছিন্নমস্তার পুজো করেন, তাঁরাও কালীমায়ের মূর্তির সামনেই তাঁদের ইষ্টদেবতার পুজো সম্পন্ন করেন। সত্যি কথা বলতে কী—অনেক সময় মূর্তিরও দরকার হয় না, মায়ের নাম কালী না হয়ে অন্য কিছু হলেও বাধা নেই। এমনকী যে নামের মধ্যে কালীনামের স্বাদগন্ধ কিছুই নেই এমন একটা নামের পুজোতেও কালীপুজোর আরোপ ঘটতে পারে।

কালীকে ভয়ংকরী রূপে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আরও যেসব মহাবিদ্যা স্বরূপিণী শক্তিতত্ত্বগুলি কালীর সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন, পণ্ডিতদের মতে তাঁরা হলেন ধূমাবতী, বগলামুখী আর ছিন্নমস্তা। ধূমাবতীর চেহারাটা ভাবুন। ঘষ্টানো গায়ের রঙ, খ্যাপা স্বভাব, ময়লা কাপড় পরা, বিবর্ণ কেশ, দাঁত নেইই প্রায়—যা দু-চারটি আছে, তা চেহারাটাকে আরও ভীতিজনক করে তুলেছে। ধূমাবতীর রথের ওপরে বসে আছে অলক্ষুণে কাক। হাতে কুলো আর লম্বিতস্তনী এই দেবীকে দেখে আমাদের চেনা কালীমূর্তির সঙ্গে তাঁর মিল না-ও খুঁজে পেতে পারি, কিন্তু কোটরগত চক্ষু এবং ‘শুষ্কমাংসাতিভৈরবা’ চামুণ্ডার সঙ্গে এই ধূমাবতীর অমিল খুব নেই। যাঁরা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে অথবা ভাড়াটের উৎপাতে বিরক্ত হয়ে ‘প্রসিদ্ধ বগলামুখী কবচে’র খোঁজ করছেন, তাঁরা জানবেন ওই ধূমাবতীরই শরণ নিচ্ছেন। ধূমাবতীর বড়ো ক্ষিধে। ক্ষিধের মুখে তিনি প্রিয়জনকে খেয়ে ফেলতেও কসুর করেন না। তবে দশ মহাবিদ্যার মধ্যে যে মূর্তিটি কালীমায়ের ওপর আরোপিত হয়ে কালীকে সর্বনাশা করে তুলেছে, সেটি হলো ছিন্নমস্তা। ছিন্নমস্তু নিজেই নিজের মাথা কেটে বাঁ-হাতে ধরে আছেন। তার লোলজিহ্বার ওপর ছিন্নশির গলা থেকে গরম রক্ত এসে পড়ছে। মুণ্ডমালা গলায় পরে ছিন্নমস্তা দিগম্বয়ী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন—‘বিপরীত রতে রত রতিকামোপরি’। তাঁর দু-পাশে ডাকিনী আর বর্ণিনী—দুই সহচরী ছিন্নমস্তার গলা থেকে উচ্ছলিত রক্তধারা পান করছে—দেবীগলোচ্ছলদ্রক্তধারাপানং প্রকুর্বতীম্‌।

সাধে কী আর নজরুল লিখেছিলেন—আমি ছিন্নমস্তা চণ্ডী। বোঝা যায়—সর্বনাশা শক্তির মধ্যে ছিন্নমস্তার সঙ্গে উপমা দেবার মতো কেউ নেই এই তিন ভুবনে। যিনি আছেন—তিনি হলেন বৌদ্ধ তন্ত্রের বজ্রযোগিনী। পণ্ডিতেরা বলেছেন —রূপকল্পনার ক্ষেত্রে ছিন্নমস্তা চণ্ডী আর বজ্রযোগিনী—দুজনেই দুজনের কাছে ঋণী। আমাদের চিন্তা অবশ্য অন্য। আমরা ভাবি—এই ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, তারা, উগ্রতারা—সকলেই কালীমায়ের সঙ্গে মিশে গিয়ে শ্যামামায়ের ধারণাটাকেই এমন ভয়ংকরী করে তুলল যে, এঁদের সবারই প্রায় পুজো হয় কালীমূর্তির ওপরেই।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “কালী করালী : নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী”

  1. Rahul Das says:

    Sir
    Your depiction of kali Mata has reached an unprecedented faith in all other religions

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev