ফ্যাটি লিভারের মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কেবল এ রাজ্য নয়, সারা দেশ জুড়ে একই চিত্র। বিশেষ করে যারা অ্যালকোহলে আসক্ত। সাম্প্রতিক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা। একটু সচেতন হলে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৌলতে এই কঠিন রোগও পরাস্ত হয়েছে। এমনটাই মনে করছেন মাইক্রোবায়োলজিস্ট ডঃ তন্ময় ঘোষ। তন্ময়বাবু জানান, অ্যালকোহল থেকে যেমন দূরে সরে থাকতে হবে, সেইসঙ্গে আবার যাঁরা বদ খাদ্যাভাস কিম্বা অনিয়মিত দৈনন্দিন জীবনযাপন করেন, তা থেকে বিরত থাকতে হবে। তা নাহলে সমূহ বিপদ। এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ফ্যাটি লিভার কী ?
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলেই বিপদ। মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত চর্বি লিভারকে আক্রান্ত করে। রোগের প্রার্দুভাব ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে অ্যালকোহল সেবনকারীদের মধ্যে এটি বেশি। তবে গত কয়েক দশকে, নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার রোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রধান কারণ খারাপ খাদ্যাভ্যাস ও অনিয়মিত দৈনন্দিন জীবনযাপন। প্রসঙ্গত, এপিডেমিওলজিক্যাল সমীক্ষা বলছে, ভারতে সাধারণ জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশ নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার রোগে আক্রান্ত। ফলে এটি মোটেও হেলাফেলা করার মতো জিনিস নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ না মেনে চললে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কাদের?
যে সমস্ত মানুষের ওজন বেশি, ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস আছে, তাঁদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়াও নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার রোগ দুই প্রকার, প্রথমটি হল সাধারণ ফ্যাটি লিভারের রোগ। অর্থাৎ লিভারে চর্বি আছে কিন্তু লিভারের কোষের কোনও প্রদাহ বা ক্ষতি হয়নি। নন-অ্যালকোহলিক স্টিটোহেপাটাইটিস বা এনএএসএইচ। অর্থাৎ লিভারে চর্বি আছে এবং লিভারের কোষের প্রদাহ বা ক্ষতিও হয়েছে এবং এটি ফাইব্রোসিস এবং সিরোসিস। এমনকি লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে। শরীরে উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা, রক্তে শর্করার উচ্চ মাত্রা, ট্রাইগ্লিসারাইডের উচ্চ মাত্রা, মেটাবলিক সিন্ড্রোম, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম এবং স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো কারণে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের রোগ হতে পারে।
ফ্যাটি লিভার হলে কোন খাবারগুলি খাবেন ? বাদ দেবেন কোনটা ?
চিকিৎসকের মতে ফ্যাটি লিভার হলে খাওয়া দাওয়ায় একাধিক বদল আনা উচিত, না হলে সমস্যা আরও বাড়বে। মনে রাখতে হবে ঘুম কম হলেও শরীরের উপর প্রভাব ফেলে। হজমে প্রভাব পড়লে এই রোগে বেশ ক্ষতি। তাই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোনো উচিত। সব সময় বড়ো মাছ বাদ দিয়ে ছোট জ্যান্ত মাছ খাওয়া উচিত। সারাদিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ জল খাওয়া দরকার। তবে খাওয়ার পর জল না খাওয়াই উচিত, কিছুক্ষণ পরে খান। ফ্যাটি লিভারে রসুন খুবই উপকারি, যা আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে ও শরীর ঠিক রাখে।

ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হলে, সুগার না থাকলে আপেল-সহ অন্যান্য তাজা ফল খেতে পারেন। তাছাড়া ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হলে খাসির মাংস বা রেড মিট এবং এমনকি তেল এড়িয়ে চলাই ভাল। যেহেতু অলিভ অয়েলে ফ্যাট কম থাকে তাই এই তেল খাওয়া যেতেই পারে।
ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ:
ফ্যাটি লিভার হলে যে লক্ষণগুলি দেখা যায় সেগুলি হল — খাওয়ার ইচ্ছে কমে যায়, খাবারে অরুচি হয়, দ্রুত ওজন কমা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, খুব দুর্বল লাগা ও কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করে না। এছাড়াও ফ্যাটি লিভার হলে মাথাব্যথা, মন খারাপ ও ডিপ্রেশন, আচমকা কাঁপুনি-সহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়।
ফ্যাটি লিভারে সাবধানতা অবলম্বন
ফ্যাটি লিভার সাধারণত অ্যালকোহল পান করা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ, অতিরিক্ত চিনি, কার্বোহাইড্রেট, প্রসেসড ফুড, মুখরোচক খাবার বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার গ্রহণের ফলে হয়ে থাকে। এ ছাড়াও বিভিন্ন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করলেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
উল্লেখ্য, রসুনবাটা ফ্যাটি লিভার আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওজন এবং চর্বি কমাতে সহায়তা করতে পারে। পালং শাক এবং ব্রকোলির মতো সবুজ শাকসবজি লিভারে চর্বি জমে থাকা কমাতে পারে। সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার আছে। ফ্যাটি লিভার রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করতে শাকসবজি খাওয়া দরকার।