ধরা যাক দূরে জার্নিতে যাচ্ছেন কোথাও, হাওড়া থেকে ভোরের ট্রেন ধরেছেন, সিগন্যালের সবুজ জ্বলে গেছে অনেকক্ষণ, হর্ন পড়বে এক্ষুনি, আর প্লাস্টিকের কাপে চা নিয়ে বসার জায়গায় হুড়মুড় করে পৌঁছে দেখলেন, ঠিক উলটোদিকের সিটে একটি মেয়ে— আর যদি সে সুন্দরী হয়ে থাকে, অন্তত আপনার চোখে— আপনি কি এটা অপছন্দ করবেন? বেশ একটা গল্প তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কি এখানে থাকে না? অন্তত যে গল্পের কথা আপনি প্রায়ই ভাবেন। এর পর ট্রেনের হর্ন, জানালা দিয়ে ঢুকে পড়তে থাকা হু হু বাতাস, দুরের পিছিয়ে পড়তে থাকা বাড়িঘর, মাঠ, রেললাইনের পাশ বরাবার চলতে থাকে ট্রাক। হতে পরে, আপনি হয়তো শুরুই করতে পারলেন না গল্প। লেখকের যেমন হতে পারে কখনও— প্রথম লাইন কী ভাবে শুরু করব। কী হতে পারে শুরুর কথাগুলি? হতে পারে, স্টেশনের পর স্টেশন পার হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, সেই সুড়ঙ্গপথের অন্ধকার আর রেলব্রিজের গুমগুম ধ্বনি আপনার ইন্দ্রিয়কে অবশ করা সত্ত্বেও আপনার সঙ্গে মেয়েটির কোনও পরিচয় তৈরি হল না। টিলার পর টিলা, আর ঝোপজঙ্গল— এমনকী ‘দলমা পাহাড়’ কথাটা কারও মুখে শুনে মেয়েটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েও কোনও সাড়া পেলেন না আপনি। এর পর মেয়েটির সঙ্গে একই প্লাটফর্মে নেমে যদি ওকে চলে যেতে দেখেন— যদি জানেন আর কোনওদিন ওকে আপনার দেখার কোনও সম্ভাবনাই থাকছে না তবে এটা তো ঠিকই যে, প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে সিগারেট ধরানোমাত্র মেয়েটির মুখোমুখি বসে এই দীর্ঘ ভ্রমণ শেষ পর্যন্ত এক সাধারণ ঘটনা হয়েই থেকে যায়। আর যদি আপনার বয়স এর পর বাড়তেই থাকে, যদি কুড়ি-একুশ থেকে বেয়াল্লিশ-তেতাল্লিশে পৌঁছয় তবে এটা কিন্তু আর শেষ পর্যন্ত মনে রাখার মতো কোনও ঘটনাই থাকে না।
আমি রাজনীতি করি। দিনভর যথেষ্টই ব্যস্ততা। অজস্র টানাপোড়েন। পাঁচ রকম লোকের সঙ্গেই মিশতে হয় আমাকে, কথা শুনতে হয়, আবার বলতেও হয়। আশ্বস্ত করতে হয় কাউকে কাউকে বা খোলাখুলি ধমকাতেও হয়— আসলে কত বিচিত্র রকমের পেশা দেখুন মানুষের, আমার চারপাশেই। শিল্পাঞ্চল, পরের পর কলোনি। সেখানে স্মাগলার থেকে কী বলব বলুন, বেশ্যা শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যকে অস্বীকার না করলে কথাটা সে ভাবেই বলতে হয়, অর্থাৎ বেশ্যা পর্যন্ত। আমাকে তো সমাজেই থাকতে হয়— কী বলুন? আর, বিপ্লব ছাড়া আমূল পরিবর্তন কী ভাবেই বা সম্ভব! আমার বলা কথাগুলি তাই কিছু খোলাখুলি, কিছু গোপন। কিছু চিৎকার, কিছু ফিসফিসানি। তবু, বিশ্বাস করুন, এর মধ্যেই বুদ্বুদের মতো কিছু স্মৃতি হঠাৎ করে শব্দ করতে শুরু করবে, জলের তলা থেকে উঠে আসার মতো করে এক সময় সত্যিই ভেসে উঠবে। হয়তো সাধারণ কোনও কথাই, একেবারে অবাক হওয়ার মতোই মনে হবে, এটা কি আমার মানে আমার নিজের জীবনের, নাকি অনেক আগে অন্য কারও বলা কোনও গল্প? হ্যাঁ, হয়তো মনে পড়ার মুহূর্তে সেই জেগে ওঠা স্মৃতির প্রাসঙ্গিকতাই নেই কোনও— তবু। সেই বুদ্বুদ শেষ পর্যন্ত বাইরে এসে ভাঙেই। আর শব্দও হয় যেন কোথাও।
যে মেয়েটির কথা বলছিলাম, ওর নাম তো দূরের কথা, চেহারাটাও কিন্তু আমি এখন মনে করতে পারি না। কেবল একটা আকাশজোড়া উজ্জ্বল হলুদের কথা মনে পড়ে। শিপ্রা মানে আমার বোনের বাড়ির ছাদ থেকে দেখতে পাওয়া। অনেক রাতেই। সেই বাইশ-তেইশ বছর আগেকার কথা। রাউরকেল্লার। জানতে চেয়েছিলাম, কী রে ওটা? ও বলছিল, ফার্টিলাইজার, ফার্টিলাইজারের টাউনশিপ।।
অর্থহীন, একেবারেই অর্থহীন— তবু, আকাশের সেই উজ্জ্বল হলুদের কথা মনে পড়লেই পাহাড়ের আড়ালে না-দেখা টাউনশিপের একটা ছবি যেন গড়ে ওঠে। না-দেখা রাস্তাঘাট। রাত। রাস্তার দিককার খোলা জানালাগুলি। ঘর। ঘরের দেওয়াল। নীল মশারি। আর একটি মেয়েও। মশারির নীলের সেই স্বচ্ছতাও স্পষ্ট টের পাই যেন। কী অবাকের ব্যাপার। দেখুন, মেয়েটিকে শেষ মুহূর্তের জন্য যখন দেখি, বাইশ বছর আগেকার সেই বিকেলে, মেয়েটি যখন ওর বাবার সঙ্গে অটোতে বসছে, অল্প বাতাস নাড়িয়ে দিচ্ছে ওর চুল– মেয়েটি এর পর কোথায় যাবে, সেই অটো ওকে কোথায় নিয়ে গেল, তা কিন্তু আমার জানার কথা নয়, তবু, বোন যখন সেই উজ্জ্বল হলুদ দেখিয়ে বলল, টাউনশিপ, আমি যেন নিশ্চিত হয়ে গেলাম, ওখানেই।
মেয়েরা কী করে বলতে পারব না, তবে ছেলেরা একটা বয়সে এসে বাবা-মার হাতের বাইরে, হ্যাঁ, একেবারে ঘরের গণ্ডি কেটে চলেই যেতে চায় কোথাও। ছেলেদের জীবনে তখন বাবা-মা নয়, অন্য কেউ, তৃতীয় কোনও একজন। একজন কোনও পুরুষই— যার মধ্যে সে তার আবেগ বা আকাঙ্ক্ষার মাপমতো হয়তো কোনও হিরোকেই খোঁজে।
আমার ক্ষেত্রে এই হিরো ছিলেন সুনীলদা। আর্টিস্ট। কলকাতায় কোনও এক আর্ট কলেজের ছাত্র। পরনে পাঞ্জাবি-পাজামা। এলোমেলো চুল। যেন সত্যিই ঝোড়ো হাওয়া। সব কিছু দুদ্দাড় করে ভেঙে উপড়ে ফেলাতেই যেন আনন্দ। আমার পার্টি করার শুরু এই সুনীলদার হাত ধরেই। সে সব অবশ্য ঊনসত্তর-সত্তরের কথা।
বোনের বিয়ে হয়েছিল একাত্তরে। রাউরকেল্লায়। ছেলে ওখানকার স্টিল প্ল্যান্টের। রিমি— মানে ওদের মেয়ের জন্ম অবশ্য অনেক পরে– অনেক তুকতাক, অনেক ডাক্তার-হসপিটাল পার করে। সম্ভবত আটাত্তর-ঊনআশিতে। বাহাত্তরের ইলেকশনের পর বাড়ি ছেড়ে যখন পালাতে হল আমাকে— এটা ঠিকই, ওর বর— মানে সুজিত, ব্যাপারটাকে কী ভাবে নেবে মনে করেই ওখানে যাওয়ার কথা ভাবতে পারিনি আর। ওদের ওখানে প্রথম যাই পঁচাত্তরে। অর্থাৎ পঁচাত্তরের নভেম্বর মাসের এক ভোরের ট্রেনেই মেয়েটিকে প্রথম দেখি আমি।
কতগুলি বছর তাই না? সেই পঁচাত্তর থেকে সাতানব্বই। বাইশটা বছর। গত তিন বছর ধরেই আমি জেলা কমিটিতে। সামনের ইলেকশনে ক্যাণ্ডিডেট হিসেবে আমার নাম কিন্তু অনেকের মাথাতেই নড়াচড়া করছে এখন। বলা যেতে পারে, আমি এখন একটা হিসেবের মধ্যেই।
বিপ্লবের কথাটা আমাকে প্রথম শুনিয়েছিলেন সুনীলদাই। বিপ্লব মানে একটা পরিবর্তন। আমূল। রাশিয়া, চিন হয়ে এই ভারত। ভারতবর্ষ দ্যাট ইজ ইণ্ডিয়া। বিপ্লবের মানচিত্রে পরপর তিনটে বিন্দু। মস্কো, পিকিং হয়ে কলকাতা। হ্যাঁ, বেজিং-এর নাম তখন পিকিং-ই।
সুনীলদা ভিয়েতনামের কথা শোনাত। আমেরিকান সৈন্যদের বিরুদ্ধে ওখানকার লোকজন বছরের পর বছর কী ভাবে লড়ে যাচ্ছে, কী ভাবে আধুনিক অস্ত্র নিয়েও এত বড় একটা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নাজেহাল হচ্ছে— সুনীলদার কাছ থেকে শুনে অবাক হতাম খুব। এ ছাড়া লেনিনের জীবন। লং মার্চ। মাও সে তুঙ-এর তিনটি লেখার মধ্যে যে বুড়োটা পাহাড় সরিয়েছিল বলে একটা লেখা আমার ভাল লেগেছিল খুব। বোনের ওখানে যাওয়া হয়নি অন্তত বছর দশেক। ওরও অবশ্য আসা হয় না আর। মা খুব পীড়াপীড়ি করলে ফোন করি, জানতে চাই, ভাল আছিস তো? ওর মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করি। ও জানায়, ওর নাকি আসতে ইচ্ছে করে খুব। এক রিমির, মানে ওর মেয়ের জন্যই আসা হয়ে উঠছে না কিছুতেই। রিমি এখন কলেজে। সেকেণ্ড ইয়ার। ফোনে আমার বোন মায়ের কথা জিজ্ঞেস করবে, মায়ের খাওয়াদাওয়া, হাঁটাচলা নিয়ে ওর নাকি চিন্তা খুব। এক সময় অবশ্য আমাকে নিয়েও বলত অনেক কিছু, আমার জীবন, রাজনীতির ঝামেলা, বিয়ে– । বলত, অন্তত মায়ের কথা ভেবে তোর—। এ বার পুজোর পরপরই মায়ের কী খেয়াল হল, বলল, যে ভাবেই হোক ও যেন আসে একবার। মাকে বললাম, বললেই হয় নাকি? ওর মেয়ে বড় হয়েছে, সেকেণ্ড ইয়ার- তা ছাড়া ওর বরের ছুটি কোথায় ? ফোন অবশ্য করতেই হল শেষ পর্যন্ত, আর যা ভেবেছি তাই। শিপ্রা বলল, ওরা ব্যস্ত খুব। বলল, সপ্তাহে তিনটি দিন মেয়েকে ওর প্রফেসরের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতে হচ্ছে— রিমি নাকি অনার্স নিয়েছে বটানিতে। আমি জানতে চাইনি, ও নিজের থেকেই বলল, এক প্রফেসর নাকি থাকে সেই ফার্টিলাইজারের টাউনশিপে। আমি কিন্তু সত্যিই শুনতে পাইনি ভাল করে সম্ভবত লাইনের গণ্ডগোলের জন্যই জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়? শিপ্রা বলল, পাহাড়ের ওপাশে সেই ফার্টিলাইজারের টাউনশিপে– ।
হাজার চেষ্টা করেও আমি কিন্তু মেয়েটির কোনও চেহারা তৈরি করতে পারি না। চেহারা মানে শরীর। ওর নাক, চোখ, মুখ। ওর চুল, চুলের কায়দা। ওর পোশাক। বড়জোর ওর চলে যাওয়ার ছবিটাই। স্টেশনে নেমে একবার পিছনে ফিরে তাকানোর কথা মনে পড়ে। এর পর ওর বাবার সঙ্গে হেঁটে রেলব্রিজের দিকে এগিয়ে যাওয়া, ব্রিজ থেকে নামা, এর পর প্ল্যাটফর্ম, চেকার, চেকারকে টিকিট দেখানো। শেষ বার— শেষ মুহূর্তের জন্য যখন ওকে দেখি, তখন ও যেন বাতাসের ধাক্কায় বেসামাল। ওর চুল আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় ঠিক করে নিচ্ছে।
বোনের কাছে ভাইফোঁটার কথা তোলায়, ও বলল, আয় না একবার। ওর কথায়, বাবা মারা যাওয়ার পর নাকি ওকে সবাই মিলে ভুলেই গেছি আমরা। বলল, নতুন বাড়িটা দেখে যা অন্তত।
একটা কথা আমার ইদানীং মনে হচ্ছে খুব— আর সত্যিই, এটা যেন অনুভবও করছি পুরোপুরি, তা হল মানুষ শেষ পর্যন্ত কিন্তু একা। হ্যাঁ, রাজনীতির কারণে, পার্টির কারণে এটা আমি যদিও বলতে পারব না কাউকে, তবু— বলতে পারেন, আপনার একটা কথা রাখার কত লোকই তো ব্যস্ত এখন। জানি। পার্টিতে আমার জনপ্রিয়তা টের পাই আমি। এমনকী আমার বিরোধী গ্রুপও ভয় পায় আমার জনপ্রিয়তাকে। কিন্তু তবু— কোথায় যেন একটা শূন্যতা— ফাঁকা জায়গা। আপনি আমার ব্যক্তিজীবনের কথা তুলবেন। বলবেন, সময় মতো একটা বিয়ে— না না— হয়তো বুঝিয়ে বলতে পারব না, হয়তো নিজেও বুঝে উঠতে পারছি না, তবে সত্যি বলছি, ব্যাপার ঠিক তা নয়, মানে আপনারা যেমন— । আসলে বিয়ের কথা আমার আর মনে পড়ল কোথায়? আপনি যাকে প্রেম বা ভালবাসা বলবেন, তার একটু আধটু আঁচ আমি যে পোয়াইনি তা নয়, কিন্তু কাউকে পাশে রাখার কথা বা আপনারা যাকে চিরদিনের মতো করে সঙ্গে নেওয়ার কথা বলবেন, কোনও মেয়েকেই তেমন করে পেতে ইচ্ছে করল কোথায় ? আর জীবনটাও কেমন হু হু করে ছোটে দেখুন, সকাল থেকে সন্ধে, এর পর রাত। রাত শেষ হলেই ফের একটি দিন। জীবনের প্রথম দিককার সেই সুনীলদার পিছন পিছন ঘোরা, এর পর মিটিং-মিছিল করে বড় নেতাদের চোখে পড়া, সমর্থক থেকে এ জি— এ জি থেকে পার্টি মেম্বার। এ সবও তো দৌড় একটা। আর আমাদের পার্টির মতো পার্টিতে জেলা কমিটির মেম্বার হওয়াটা আপনি খাটো করে দেখতে পারবেন না নিশ্চয়ই।
বোন এ বার জিজ্ঞেস করল, তোর বিপ্লবের কত দূর? কী আশ্চর্য দেখুন, এত অদ্ভুত মনে হল কথাটা! কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। ও কি আঘাত করতে চাইল আমাকে? আমার বোন– শিপ্রা। ওকে লক্ষ করলাম ভাল করে। ওর চোখ, মুখ, প্ল্যাক করা ভুরু। পৃথিবীতে দেখুন, হৃদয়ের কিছু দুর্বলতা তো ওর জন্যই, একমাত্র বোনের জন্যই কিছু অন্তত ভালবাসা।
ওর ওখানে পালিয়ে যাওয়ার দিনগুলিতে, মানে সেই পঁচাত্তরে, ও কাঁদত খুব। বেশি নয়, মাত্র সপ্তাহখানেক ছিলাম সেবার। যখন চলে আসি ওর সেই কান্নার কথা মনে পড়ে। যেন এক বীর, যেন মৃত্যুর জন্যই কেউ ঘর ছাড়ে— কোনও উপন্যাস বা সিনেমার গল্পই যেন। ওর বর সুজিতও সেবার বুঝিয়েছে অনেক— পাঁচটা সাধারণ লোক বোঝায় যেমন, অর্থাৎ এসবে হবে না কিছু শেষ পর্যন্ত— । ক’দিন আগে সুবোধকে বোনের বলা সেই কথা তুললাম। ওর কথা সেই প্রশ্নটাই, ‘তোর বিপ্লবের কী হল?’ ও হাসল শব্দ না করে। পার্টি অফিসেই। ওর নিজের ঘরে। মানে এল.সি.এস বা লোকাল কমিটির সেক্রেটারি হিসেবে ছোট যে-ঘরটি ওর অফিসিয়াল কাজের জন্য— সেই ঘরেই। কিন্তু ওই পর্যন্তই। বলল না কিছু। আমি সত্যিই কিছু শুনব বলে অনেকক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে। ওর মাথার ওপর দেওয়ালে টাঙানো লেনিনের ছবি। টেবিলে কাচের নীচে মার্ক্স আর এঙ্গেলস। কী একটা খোঁজার জন্য যেন আলমারি খুলবে বলে উঠে দাঁড়াল। খুললও। যদিও বের করল না কিছুই, ও বোনের মেয়ের কথা জানতে চাইল। রিমির বয়স, পড়াশোনা। বোনের বরের অফিসিয়াল স্ট্যাটাস বলতে হল। ও যেন খুশি হল খুব। আর রাউরকেল্লা শহরের কথাও জানতে চাইল। ওখানকার বাঙালিদের কথা। জিনিসপত্রের দাম, রাস্তাঘাট। সুবোধ হঠাৎ করে হাসতে হাসতেই বলে উঠল, শিপ্রা কাউকে গছিয়ে দিতে পারল না তোর সঙ্গে?
সুবোধ অবশ্য বলতে পারে এ কথা। ও আর আমি সেই কবে থেকে একসঙ্গে। আমরা এক গ্রুপেরই। আমার ওঠার পিছনে ওর অবদান অস্বীকার করতে পারব না আমি। এমনকী সামনের ইলেকশনে আমার নমিনেশনের ব্যাপারটা ওর মাথা থেকেই বেরিয়েছে প্রথম। ওর কথায় রাজনীতি মানে ক্ষমতা। ক্ষমতা পাওয়ার জন্যই লড়ছি আমরা। সরকারে পার্টির জন্য, পার্টিতে গ্রুপের জন্য হ্যাঁ, ক্ষমতা দখলের জন্যই।
মেয়েটিকে কেউ গছিয়ে দেয়নি। বোন শুধুমাত্র সেই হলুদ আকাশের কথা শুনে জায়গাটার নামই বলেছিল। টাউনশিপ। ফার্টিলাইজার টাউনশিপ। সেই পঁচাত্তরে। আমার তখন বড়জোর কুড়ি। হাতে খবরের কাগজ। সম্ভবত বইও। কাঁধে সাইড ব্যাগ, চুলও যেমন থাকত তখন— প্রায় না আঁচড়ানো, আর ট্রেন ছাড়ামাত্র জানালা দিয়ে হু হু ঢুকে-পড়া হাওয়াও। মেয়েটি যেন ফ্রক পরেছিল একটা। ওপরে কার্ডিগান। ওর হাতে যেন কী একটা ম্যাগাজিন। পাশে বসে থাকা ওর বাবা বা যেই হোক, ভদ্রলোক তখন গম্ভীর খুব। কথা হয়নি একটাও। অথচ হতে কি পারত না! আমার হাত থেকে ভদ্রলোক বা সেই মেয়েটি ‘দেখি তো একটু’— বলে চাইতে পারত কাগজটা, বা ভদ্রলোক একবার অন্তত কোথায় যাচ্ছি জানতে চাইতে পারতেন। বা আমি? আমিও তো বলতে পারতাম কিছু। ওরা হয়তো সেই টাউনশিপের কথাই তুলত, হলুদ আকাশের নীচে সেই রাস্তাঘাট, জানালা, ঘর, ঘরের দেওয়াল।
আজ থেকে বাইশ-তেইশ বছর আগেকার একটি ট্রেনযাত্রা হঠাৎ করেই কেমন ঢুকে পড়ে আমার জীবনে। এ বার তাই ভাইফোঁটার জন্য বোন যখন যেতে বলল, বললাম, ঠিক আছে। ও যদিও বিশ্বাস করতে চাইছিল না কিছুতেই। বারবার বলছিল, মিথ্যে বলছিস না তো?
ফ্রান্সের বিপ্লব হয়েছিল সতেরোশো ঊননব্বইয়ে। রাশিয়ায় উনিশশো সতেরোতে। চিনে উনিশশো ঊনপঞ্চাশে। আমাদের পার্টি ক্লাসে সত্যবাবু বলতেন ইকুয়ালিটি, ফ্রেটারনিটি অ্যাণ্ড লিবার্টি, ফরাসি বিপ্লবের এই তিন বাণী হল সমাজতন্ত্রের ভিত্তি। চৌষট্টি সালের কমিউনিস্ট পার্টি ভাগের মূল বিতর্ক নাকি ছিল বিপ্লবের প্রকৃতি নিয়ে। অর্থাৎ কী রকম বিপ্লব? ন্যাশনাল রেভলুশন নাকি পিপলস ডেমোক্রেটিক রেভলুশন? গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার চিনা কৌশলের প্রতিই সমর্থন ছিল আমাদের। আমাদের তখনকার পার্টির। সেই হিসেবে নাকি চিনপন্থী পরিচয়টা ছিল আমাদেরই। সত্যবাবুর কথায়, নকশালদের প্রতি চিনের সাপোর্ট আসলে লিন-পিয়াওয়ের ভুল বোঝাবুঝি। নকশালদের সঙ্গে আমাদের বিররোধটা ছিল বিপ্লবের সময় নিয়ে। আমরা পার্লামেন্ট ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম। বিরাশির নির্বাচনের পরেও আমরা নিশ্চিত ছিলাম, ওরা থাকতে দেবে না, সরকার ফেলবেই। একটু খেয়াল করলেই মনে করতে পারবেন এক ধরনের অনিশ্চয়তা। পাবলিকের জন্য চমক। ওদের চটপট সন্তুষ্টির জন্য আর্থিক সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও বেকার ভাতা, বিনে পয়সার শিক্ষা— সরকারি ভাঁড়ার শূন্য হওয়া সত্ত্বেও উন্নয়নমূলক কাজে ফাঁকি দিয়ে এত সব ঘোষণা আসলে সেই অনিশ্চয়তার জন্যই। পার্টি ক্লাস অবশ্য তখনই বন্ধের পথে, তবু ‘বিপ্লব’ কথাটার গুরুত্ব ছিল খুব। ভূমিসংস্কারের সরকারি চেষ্টার ফলে শ্রমিকদের মতো গ্রামের লোক তখন আমাদের পতাকাতেই।
আমি কিন্তু তখনও সত্যিই স্বপ্ন দেখি। সুনীলদার বলা সেই কথাগুলির মতো গ্রাম থেকে গ্রামে। কাজ করব কৃষকদের মধ্যে, ওদের জীবনযাপন, ফাঁটা পা কাঁধে কাঁধ রেখে অস্ত্র ধরব। শিপ্রাকে কী ভাবে বোঝাই, কী করে বোঝাব, আমি কিন্তু সত্যিই তৈরি ছিলাম। বিপ্লবের জন্য। সেই আগুনের জন্য। কিন্তু না, সরকার ভাঙল না কেউ। আমরা কিন্তু তৈরি ছিলাম, সরকার ফেলে দেওয়ামাত্র মানুষের কাছে যাব। গিয়ে বলব, মাও সে তুঙ ঠিকই বলেছিলেন, পার্লামেন্ট আসলে— ।
শিপ্রাকে বলতে পারতাম, বিপ্লবের জন্য তৈরি ছিলাম বিশ্বাস কর। স্কুলে পড়ার সেই দিনগুলির কথা মনে করে ওকে বলতে পারতাম এই এখনও, আজও এক একদিন রাতে কখনও ছবির মতো করে ভেসে ওঠে সব কিছু। চে গুয়েভারার সেই যিশুখ্রিস্টসুলভ হাসি, সেই হো চি মিন, ভিয়েতনাম, চিন— মাও সে তুঙের লঙ মার্চ।
গেল নির্বাচনে আমাদের বিধানসভা কেন্দ্র প্রথমবারের মতো পার্টির হাতছাড়া হল। প্রথমবারের মতোই, কেননা বাহাত্তরের নির্বাচনকে আমরা কেউই নিশ্চিত নির্বাচন বলে মানব না। পার্টি থেকে কমিশন বলল, আর কমিশন কারও চোখে সন্দেহজনক মনে হওয়া আমাকে আর সুবোধকে নির্দোষ বলেই রায় দিল। এমনিতে আমার বিরুদ্ধে এলাকার লোকের বলতে গেলে কিছুই বলার নেই, বরং আমাকে নমিনেশন না দেওয়ায় এখানকার পার্টিকর্মীরাও ক্ষুব্ধ ছিল খুব আর হবে না-ই বা কেন? পার্টি প্রার্থী করল বাইরে থেকে আসা এক যুবনেত্রীকে। কানাঘুষা হয়েছে অনেক কিছু নিয়েই। এমনকী আমাদের এক রাজ্যনেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়েও।
ভাইফোঁটার দু’দিন পর রাউরকেল্লা থেকে ফেরার সময় মেয়েটির কথা মনে পড়ল ফের। আর তক্ষুনি খেয়াল হল, আরে, ফার্টিলাইজারের আকাশটা দেখা হল না তো, পাহাড়ের ওপাশে সেই উজ্জ্বল হলুদ।
ইলেকশান রেজাল্ট নিয়ে সে সব বিতর্ক অবশ্য আজ আর নেই। সামনের ইলেকশনে পার্টি রিস্ক নেবে না আর– অর্থাৎ প্রার্থী হচ্ছে আমাদের কেউই– এই এলাকার, সম্ভবত আমিই। আমার দিক থেকেও অবশ্য সেই যুবনেত্রী অর্থাৎ তন্দ্রা বাগচির বিরুদ্ধে আর ক্ষোভ নেই কোনও। আসলে, একটা সময় কোথাও থামতেই হয় সবাইকে, যে কোনও ঝামেলাই কোনও ভাবে থিতিয়ে আসে এক সময়, মাথা তোলে নতুন ঝামেলা, নতুন কর্মসূচি– দেশের, বিদেশের। পৃথিবী সত্যিই অনেক ছোট এখন। আমাদের স্মৃতিকে তাই এক সময় বলতে হয়, ভাগো।
সুবোধকে সেদিন বললাম, আমার কথা যদি সামনের ইলেকশানের ব্যাপারে সত্যিই ভেবে থাকো তবে কাজ শুরু করো এক্ষুনি। শেষ মুহুর্তে একে ধরা, তাকে ধরা করে এ বারের মতোই যদি—। বারবার হারতে ভাল লাগে না আমার। একবারও না। রাজনীতি মানে, যে যাই বলুক, ক্ষমতা– গান্ধীজিও কি অন্য কিছু ভাবতেন? চার আনার মেম্বার হলেও তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের সব, নতুবা বড়লাট এসে কেন কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা না বলে গান্ধীজিকেই খুঁজতেন?
লাস্ট মিউনিসিপ্যাল ইলেকশানে তিনটে ওয়ার্ড হাতছাড়া হয়েছে আমাদের। কেন? কেন হবে? কেন মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নেবে?
সুবোধকে বললাম, ওদের সমঝে দিতে হবে এখন থেকেই, তন্দ্রা বাগচিকে হারাবার জন্য যতই নরম মনোভাব দেখানো হয়ে থাকুক লাস্ট ইলেকশানে, পরের বার কিন্তু ছাড় নেই কোনও, ওদের হয়ে যে বাবু, সেন্টু, লালুরা এলাকা দাপিয়ে বেড়িয়েছে— কথা বলতে হবে ওদের সঙ্গে। বোঝাতে হবে। বলতে হবে, সামনের ইলেকশানটা আমাদের, আর সরকারও।
সুবোধ বলল, ও নাকি ওদের মধ্যে সব চেয়ে ঝামেলার অর্থাৎ বাবুকে ইলেকশানের আগেই আউট করার ব্যবস্থা করে রেখেছে। থানার ও সি-র সঙ্গে এই নিয়ে নাকি কথাও হয়ে গেছে ওর।
সব খেলারই কিছু ছক থাকে। ফুটবল ক্রিকেটের মতো– জীবনেও। জীবনের নানা ক্ষেত্রেই। পড়াশুনা থেকে রাজনীতি। আপনি ভাবলেন ছেলেকে ডাক্তার করবেন, অমুক স্কুলে ভর্তি করবেন, ওর কাছে পড়তে দেবেন। কিন্তু ছক কি মেলে সব সময়? দর্শনের কথা নয়, বাস্তবেরই। মাঝখান থেকে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাই শেষ পর্যন্ত গণ্ডগোল পাকিয়ে দেয়। হয়তো দেখলেন আপনার ছেলে শেষ পর্যন্ত সকালের স্কুলের এক মেয়ের জন্য পাগল। হাসবেন না, হতেই পারে এবং হয়ও। সাতাত্তরে নির্বাচনে জিতে আমাদের কি ক্ষমতায় আসার কথা ছিল? ছিল না। ওখানে দেখুন দু’দিক থেকে দুটো ছক কেমন লড়ল একজন আর এক জনের বিরুদ্ধে। আমরা বুর্জোয়াদের হাত ধরেই নামলাম লোকসভা নির্বাচনে। ওদের মধ্যে বিরোধটা কাজে লাগালাম। আর জিতলাম— অন্তত যতটুকু দরকার। এর পর বিধানসভা। আমরা তখন জাস্ট পা রাখতে চাইছি মাটিতে। এলাকায় ফিরে থিতু হতে চাইছি। আর ওরা আমাদের ঘরে ফেরার তাড়া দেখে ভুল করল। মানে, বুর্জোয়ারা। নিজেরা বেশি সবল ভেবে, আমাদের বেশি দুর্বল ভেবে নিল। একটু বেশি সিটই চেয়ে বসল নিজেদের জন্য— আর এখানেই দেখুন দূরদর্শিতা আমাদের নেতাদের, ছক পাল্টে যেতে কী ভাবে নতুন ছক তৈরি করে নিল ওরা— দলের জন্য, বলা যায় বিপ্লবের জন্যও। একাই লড়লাম আমরা। কিছু সমভাবাপন্ন দলের সঙ্গে জোট বেঁধে জিতলাম আমরাই। বিশ্বাস করুন, পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি নিয়ে তখন তুমুল আলোচনা আমাদের মধ্যে। তর্ক-বিতর্ক। পার্লামেন্টকে শুয়োরের খোঁয়াড় বলা মাও সে তুঙের এক উদ্ধৃতি। বুর্জোয়ারা সরকার চালাতে দেবে না আমাদের— নিশ্চিত ছিলাম একেবারে। আর যেন এই একটি মাত্র সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলাম আমরা, বিধানসভা বরখাস্ত করা মাত্রই মানুষের কাছে যাব। এই গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ, তার হাড়মাংস-সহ, পুঁজরক্ত-সহ তখন দেখাব সবাইকে। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার স্বপ্ন তখন ছিল সত্যিই।
কোনও কোনও কথা দেখুন উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই বাতাসে ভেসে যায়। কোনও কথা আবার লেগেই থাকে কোথাও। হয়তো তুচ্ছ খুব, তবু। আমি তখন বড় স্কুলে ভর্তি হয়েছি মাত্র। সম্ভবত ফাইভ। হাফপ্যান্ট। পুজোর সপ্তমী কি অষ্টমী— আকাশে মাইকের গান। দূরে ঢাকের শব্দ। কেন কে জানে, সন্ধের পর হঠাৎ ঘরে ফিরে মাকে ডেকে উঠি, মা— । দূরে ঢাকের আওয়াজ অনেক দূরেই তখন। আমি তখন আমাদের এই এখনকার ঘরের বাইরেই– সাদা দেওয়ালওয়ালা। মাকে ডেকেই যাচ্ছি— এক বার, দু’বার, তিন বার– কড়া নাড়ছি দরজার, দু’হাতে চাপ দিয়ে দরজার ফাঁকে কান দিয়ে পায়ের আওয়াজ শুনতে চাইছি মায়ের। আমার গা ছুঁয়ে তখন রাত্রির অন্ধকার, সেই দূরে লেবুগাছ, ডালপাতায় জোনাকি। আলোর সেই জ্বলে ওঠা আর নিভে যাওয়া। ঘরের ভেতর তখন মানুষের অস্তিত্ব যেন ধরা পড়ে, অন্ধকার— তবু মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস, মানুষের অস্তিত্ব-উত্তাপ তখন টের পাই যেন। এই এত বছর পর আজও হঠাৎ বুদ্বুদের মতো পুকুরতল থেকে জেগে ওঠার মতো করে সেই অন্ধকার। ঢাকের আওয়াজ ছাপিয়ে আমার সেই ডাক যেন নিজের কানেই ধরা পড়ে। যেন এখনও জানতে ইচ্ছে করে, কেন, কেন— ?
বাইশ বছর আগেকার দেখা একটি মেয়ের কথাই বা কী ভাবে ভেসে ওঠে দেখুন। বা ঠিক মেয়েটিও নয়, সেই হলুদ হয়ে ওঠা আকাশ— আকাশের নীচে যেন এক টাউনশিপের কোনও ঘরে সত্যিই সে শুয়ে আছে এখনও আর মশারির নীল স্বচ্ছতাও— পাহাড় ছাড়িয়ে সেই টাউনশিপ, আর খোঁজ করলে সত্যিই ওকে পেয়ে যাব যেন।
সুনীলদা পার্টি ছেড়েছে অনেক দিন। চাকরি পেয়েছিল স্কুলমাস্টারির। সেই আটাত্তর-ঊনআশিতেই– পার্টির করে দেওয়া। ছবির একজিবিশনও করেছিল শুনেছি। এখন সম্ভবত আঁকেন না আর। ছেলে আছে একটি। স্ত্রীও স্কুলটিচার। যে ভাবে হয় আর কী— । ওর স্ত্রীর চাকরির ব্যাপারে অবশ্য ভূমিকা ছিল আমার। পার্টির বেশ জোরালো ক্যাণ্ডিডেটকে বাদ দিয়ে নিতে হল ওকে। রাসমণি গার্লসে। বহু দিন পর সেই নব্বইয়ের এক জানুয়ারিতে লোকটা এসে হাজির। বাড়িতেই। খুব কাছ থেকে বসে বা দাঁড়িয়ে সেই অনেক দিন পর দেখলাম লোকটাকে। সেই সুনীলদা। ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারার কথা যার কাছে প্রথম শুনি আমি, সেই গেরিলা যুদ্ধ, গ্রাম থেকে গ্রামে, দেশ থেকে দেশে, জল আর জঙ্গলে, চে-র ওই নিস্পাপ যিশুমুখের ছবি প্রথম যার কাছ থেকে উপহার পাই আমি। লেনিন। মাও সে তুঙ। সেই আমূল পরিবর্তনের কথা। বিপ্লব।
লোকটার ওপর ঘৃণা হচ্ছিল খুব। জানতে চেয়েছিলাম, কেন এলেন, নিজে না এসে— । কথাটার অর্থ লোকটা নিশ্চয়ই ধরতে পারেনি সেদিন বা শুধু সেদিনই বা কেন, হয়তো কোনও দিনই পারবে না। ওর স্ত্রীর চাকরির জন্য বলতে এসে লোকটা সেদিন আঘাত করল আমার কৈশোর, আমার যৌবনকে, আমার সুন্দর স্মৃতিকে। আর ভোরবেলাকার সেই বাতাসকেও।
মা সেদিন কী মনে করে একটা কথা বলে ফেলল। বলল, মনে পড়ে গেল হঠাৎ। মায়ের কথায়, সুনীলদা নাকি ভালবাসত শিপ্রাকে। কী আশ্চর্য দেখুন, এই এতদিন পর হঠাৎ— শিপ্রার বিয়ের ছাব্বিশ-সাতাশ বছর পর জানতে হল কথাটা। কথাটা বলে মা যেন হাসলও একবার। তখন রাত অনেক। আমার কিন্তু হাসি পেল না কিছুতেই। আর পাঁচটা দিনের মতোই সেদিন দেরি করে ফেরা, মায়ের সেই দরজা খুলে দেওয়া, ভাত-বাড়া, এর পর এ কথা-সে কথা— অভ্যাসবশতই। আর মা কথা বলে চলেছে তখনও। বলছে, ভাগ্যিস তোর বাবা— । জানার বাইরে কত কিছুই থেকে যায় দেখুন। আর্ধেক খাওয়ার পরই সেদিন উঠে পড়তে ইচ্ছে হল আমার। ভাবুন, এই কথাটাই মা কেন সেই তখন বলল না। কেন বলতে পারল না? কেন? কেন এতদিন ধরে একটা বুদ্বুদ লুকিয়ে থাকল, আর কেনই বা এতদিন পর— ।
কেদারনাথ স্কুল ইলেকশানে এ বার হেরে গেলাম আমরা। কেন? সুবোধ বলল, স্যাবোটেজ হয়েছে। তন্দ্রা বাগচির গ্রুপ নাকি তলে তলে হাত মিলিয়েছে ওদের সঙ্গে। ওপরে উঠার ঝামেলাগুলি দেখুন— কেতাব আলির ইটভাঁটা থেকে পার্টি ফাণ্ডে চাঁদা নেওয়ার রসিদের ছবি ছাপা হয়েছে এক কাগজে। সেখানে আদায়কারীর সই নেই কোনও। অথচ বিলে অ্যামাউন্ট দেখানো আছে দশ হাজার এক। ভাবুন একবার, দশ হাজার এক টাকা। বিল নম্বর মিলিয়ে ধরা হল পঞ্চাননতলার রঞ্জিতকে। ডেকে পাঠানো হল ওকে। ওর নামে অ্যালট করা বিলের কাউন্টারপার্ট খুলে দেখা গেল পাঁচ হাজার। বাকি টাকা কোথায় গেল, কোথায়? বলতে, রঞ্জিত কার নাম বলল বলুন তো? সুবোধ— সুবোধ মজুমদারের। বলল, এ তো অনেকদিন ধরেই। সুবোধের কথায় পার্টি করতে গেলে কিছু কমপ্রোমাইজ করতেই হবে তোমাকে। ওর কথায়, রঞ্জিত বা দিপুরা নেবে কিছু, ওদের ইনকাম কী? আর ওদের ছাড়া পার্টি টিকবেই বা কী ভাবে?
রাজনীতিতে নতুন নই আমি। দেখতে দেখতে মেম্বারশিপের বয়সই বছর পনেরোর হয়ে গেল। জানি, ইচ্ছার বিরুদ্ধে, এমনকী অন্যায় জেনেও কিছু কাজ মেনে নিতেই হয় অনেক সময়। পার্টির স্বার্থেই, এই ইলেকশান জেতা নিয়েই জানেন তো সব। ভোটার লিস্ট তৈরি করে কাউন্টিং পর্যন্ত কিছু অন্যায়, কিছু মিথ্যাচার শেষ পর্যন্ত থাকেই। তবু, তাই বলে সুবোধের মতো লোককে বিশ্বাস করা যাবে না? টাকাটা ও নিজে নিয়ে রঞ্জিত বা দিপুর নাম করলে তা প্রমাণের সুযোগ কোথায়? একটা হোলটাইমার হয়ে এত বড় বাড়ি? ছেলের স্কুটার, ফ্রিজ, কালার টিভি?
আমাদের কাজের জন্য পার্টির সুনাম-বদনাম হওয়ার মতো জায়গায় পৌঁছে গেছি আমরা। আমি, সুবোধ। লোকে দেখবে আমাদের। আমাদের হাঁটাচলা, ঘর-সংসার, বাড়ি, ছেলের স্কুটার। আমাদের দেখেই পার্টি সম্বন্ধে ধারণা তৈরি করবে মানুষ। নীতি দেখে, ইতিহাস জেনে পার্টি করতে আসে না কেউ, আসে লোক দেখে, যে ভাবে সেই স্কুলে পড়ার দিনগুলিতে সুনীলদাকে দেখে পার্টিতে আসা আমার।
মাঝপথে খাওয়া বন্ধ করতে পারিনি সেদিন। সেই রাতে। মায়ের সামনে বেশ একটু নাটকীয়তাই হত যেন। তবু—, খাওয়ার পর সিগারেট ধরিয়ে জানালায় চোখ রেখে বললাম, সুনীলদা শিপ্রাকে— এমনকী বিয়ে করতে চেয়েছিল শিপ্রাকে— এ কথাটা এতদিন বলোনি কেন?’ স্বাভাবিক গলাতেই। যেন এই প্রশ্নের উত্তর না দিলেও কিছু মনে করার থাকে না।
বাড়ি ফেরার পথে এক একদিন অরূপ আর সোমেনকে না করে দিই। সত্যিই ভাল লাগে না। ফোলিও ব্যাগটা ওদের হাত থেকে নিয়ে বলি, একাই পারব— যা তোরা। ওরা ইতস্তত করতে ধমকাই। এর পর বড় রাস্তা থেকে ছোট রাস্তা। আকাশে তখন হয়তো চাঁদ। চারপাশের বাড়িগুলির কোনওটার জানালা বন্ধই, কোনওটা থেকে টুকরো-টুকরো আলো। টিভি-র বেরিয়ে আসা শব্দ কেমন অদ্ভুত লাগে তখন। হিন্দি বা বাংলার কোনও ডায়লগ বা গান।
সুবোধ নাকি রাজ্য কমিটির প্রতুল সান্যালদের কাছে আমার নামে নালিশ করেছে। ও নাকি রমেন হালদারের গ্রুপের সঙ্গে আমার গোপন যোগাযোগের প্রমাণ দিয়েছে। প্রতুল সান্যাল এখনও খোলাখুলি কিছু বলেননি আমাকে। কিন্তু তাই বলে সুবোধ? সুবোধ মজুমদার? এতগুলি বছর— এতগুলি বছরের যাবতীয় গল্প, স্মৃতি তা হলে অর্থহীন? সুদীপ বলল, প্রতুল সান্যাল নাকি চটে আছেন খুব। বিশেষ করে সুবোধ বলাতেই নাকি ওর কথা কেউ উড়িয়ে দিতে পারছে না। পার্টির লাইন নিয়ে নাকি আমি সন্দেহ প্রকাশ করছি। পাল্টা প্রচার করছি নাকি ভেতরে ভেতরে।
দুরের লাইটপোস্টের আলো একাই জ্বলে যাচ্ছে। নিজের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি স্পষ্ট। দু’পাশের ছিটকে আসা আলোতে মাঝে মধ্যে ছায়া তৈরি হচ্ছে আমার। কেতাব আলির ইটভাঁটার চাঁদার গণ্ডগোল নিয়ে আমার অসন্তোষ ও তা হলে মাথায় রেখেছে। আর সম্ভবত, বিপ্লব নিয়ে আমার বলা কথাটাও। ঠিক আমারও নয়। শিপ্রার। সিরিয়াস কোনও ব্যাপারই ছিল না ওটা। স্রেফ শিপ্রার আমাকে বলা কথাটাই হয়তো একটু মাজার জন্যই বলা ওকে। শিপ্রা জানতে চেয়েছিল, তোর বিপ্লবের কী হল রে দাদা?
আমার ঘরটাকে এক এক দিন ভারী একটা পাথরের মতোই মনে হয়। যেন পড়ে আছে ঠায়। চুপচাপ। কত কাল চুনকাম করা হয়নি। দেওয়ালের এখানে ওখানে ফাটা। বের হয়ে থাকা ইট। ঘরের সামনে এসে কোনওদিন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। ঘরের ভেতর সত্যিই কি আছে কেউ? বাইরে থেকে বোঝার চেষ্টা করি। সেই ছোটবেলার পুজোর দিনটির কথা মনে পড়ে। ঠাকুর না দেখেই বাড়ি ফেরা। কোথাও কোনও শব্দ নেই তবু সেই টের পাওয়া। নিশ্বাস আর উত্তাপ। মা ও বাবা। ডেকে উঠি, মা।।
কোনওদিন একবার ডেকে সাড়া পাই। দরজা খোলার শব্দ হয়। সুইচ। এর পর আলো। মাকে বিছানায় পাঠিয়ে এক সময় আমি খাওয়া শেষ করি। আলো নিভিয়ে সিগারেট ধরাই। এক সময় মনে হয়, সত্যি পুজোই। যেন, অনেক দূরে ঢাক বেজে উঠছে কোথাও। কাঁসর। একা কোনও বালকই বাজাচ্ছে কোথাও। সত্যিই কি ঢাক? কত দূরে? সুনীলদার কথা মনে পড়ে। সুনীলদা, শিপ্রা, আমার মা। মায়ের জরাজীর্ণ শরীর অন্ধকারে মিশে। শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে বাতাস। বুক কোথাও উঠছে আর নামছে। মা কি সত্যিই বেঁচে এখনও? ডাকব? ডেকে উঠব?
মায়ের কথা শুনে শিপ্রাকে ফোন করতে হল আজ। বাড়ি ঢোকার আগেই। বড় রাস্তার এস.টি.ডি বুথে। শিপ্রা আজ একটি অদ্ভুত কথা বলল। অদ্ভুত স্মৃতির। এক মেয়ের কথা। মেয়েটির বাপের বাড়ি নাকি সেই ফার্টিলাইজারে। বিয়ের পর এখন শিপ্রাদের সেক্টরেই। প্ল্যান্টের কোন অফিসারের স্ত্রী। আমাকে যখন ভাইফোঁটর দুদিন পর শিপ্রা আর ওর বর বাসে তুলে দিচ্ছে, মেয়েটি নাকি তখন দেখেছে আমাকে।
শিপ্রা বলল, তোকে বাসে তুলে দেওয়ার দিনের কথা তুলে, তুই আমার দাদা কি না জানতে চাইল।
শিপ্রা নাকি অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, কেন? মেয়েটি নাকি হেসেই বলেছে, তোমার দাদাকে আমি ঠিকই চিনেছি। বছর দশ আগে শিপ্রাদের সেক্টরের বাড়িতে দেখেও নাকি চিনতে পেরেছিল আমাকে।
—কেন, কী হয়েছে?
—ও নাকি কবে সেই ছোটবেলায় তোর সঙ্গে ট্রেনে পাশাপাশি—।
শিপ্রা তখনও বলেই চলেছে। বলল, কী বলল বল তো, বলল তোর। দাদা কি কমুনিস্ট? উনি কি বিপ্লবী ? তোকে দেখলে নাকি— ।
বাইরে এখন আর শব্দ নেই কোনও। নতুন ছক করতে হবে ফের। সুবোধকে ছাড়া নেই আর। একেবারে নোহোয়ার করতে হবে। ওর কথাটাই ঠিক, সরকারে পার্টি, পার্টিতে গ্রুপ, গ্রুপে ব্যক্তি। মানে আমি। আমি, আমি, আমি– ছাড়াছাড়ি নেই।
হাতের সিগারেট শেষ হয় এক সময়। বাইরে দূরে কোথাও সত্যিই কোনও উৎসব। সত্যিই ঢাক বাজে কোথাও। অনেক দূরে যেন কোনও বালক। বালকের ক্লান্ত চোখ, যেন শূন্য মণ্ডপ, যেন প্রতিমাও নেই আর। হর্ন পড়ল কোথাও। ভারী কোনও একটা শরীর যেন সত্যিই নড়তে শুরু করল। না-দেখা সিগনাল পোস্ট। অন্ধকার ঘরে একটা শরীরকে অনুভব করতে চাই আমি। একটা কোনও অস্তিত্ব। অন্ধকারে কান পাতি। কোনও নিশ্বাস-প্রশ্বাস, উত্তাপ বা নড়ে-ওঠা কোনও কিছু।
পুকুরের হিম গভীরতায় আটকে থাকা কোনও বুদ্বুদের কথা মনে পড়ে।
বাংলা কথা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘ও কমরেড’। পশ্চিমবঙ্গের বাম আমলের মফস্বল রাজনীতির ক্ষয়াটে দলিল।
ভেসে আসে স্মৃতিপটে অনেক অনেক কথা। আদর্শ আর মূল্যবোধ হারিয়ে যায়নি তখনও। কতোই বা বয়স তখন, আট বা নয়। হারবে জেনেও লড়াইয়ের ময়দান নেহি ছোড়েঙ্গে মানসিকতা। মুষ্টি ভিক্ষা করে বুথ খরচ চালানো। কৌটা নেড়ে অর্থ সংগ্রহ। মনে পড়ে সব মনে পড়ে আজও। ক্রমে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া। অবক্ষয়ের শুরু। মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া। মাসম্যান থেকে ম্যাসলম্যান নির্ভরতা। আর শেষে আজ শূন্য। আত্মসমালোচনা হয়েছে কি সেভাবে?