যদি অনন্তের অনুসন্ধান থাকে, তাহলে কেবল জগতাতীত কেন — জগতও থাকে, বিষয়ও থাকে। একের পেছনে বসিয়ে দেওয়া সব কটি শূন্য অর্থবহ হয়, ‘এক’কে সরিয়ে নিলে সব কটি চিহ্নই অর্থহীন শূন্যমাত্র, জীবন তার কোনো ফলভোগ করে না। একটা সুন্দর গল্প মনে পড়ে এ প্রসঙ্গে।
রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্যে প্রজারা ভালো থাকে। রাজার শাসন নিয়ে কারো মনে কোনো খেদ নেই। প্রশাসনের অনাবিলতা রাজ্যবাসীর মনকে প্রসন্ন রেখেছে। রাজ্যে প্রতিবছর একটা মেলা হয়। এত জাঁকজমকের অথচ সার্বজনীন মেলা খুব কম দেখেছে বাকি রাজ্যেরা। কারণ এখানে যেমন বড় ব্যবসায়ীর হিরের গয়নার বাহার থাকে, যেমন সুগন্ধ ছড়ায় কোনো আতর ব্যবসায়ী, যেমন রঙদার রোশনাই এ ভরপুর থাকে মেলার আনাচ কানাচ, তেমনই ছোট্ট পুঁজির হাতা খুন্তি, মাটির খেলনা, ভেঁপু-চরকি – সব স … ব থাকে। আর থাকে এক আশ্চর্য প্রথা। রাজা সেই কবে ঘোষনা করেছিলেন, মেলা শেষে যা কিছু থেকে যাবে, তিনি সেগুলো কিনে নেবেন। কোনো ব্যবসায়ীকে ফেরৎ নিয়ে যেতে হবে না তার না বিকোনো কোনো পসরা।
সেবারেও নিয়মমত মেলা বসেছে। মেলা জমে উঠেছে। দূর দূরান্তরের রাজ্য থেকেও ছুটে আসছে কত বিদেশীরা। রাজা প্রতিবারে আসেন মেলায়। ঘোরেন, দেখেন,উৎসাহ দেন সকলকে। তারপর অপেক্ষা করেন নিজের তাঁবুতে। ভাঙা মেলায় অর্ধেক দামের খদ্দেররাও যখন চলে যায়, প্রহরী খবর দেয়, তখন রাজা বেরিয়ে আসেন, একে একে কিনতে থাকেন সব পড়ে থাকা অনাদরের জিনিষগুলি।
সেদিনও মেলা শেষে রাজা বার হলেন। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থমকে গেলেন। সারা অঙ্গে দারিদ্র্য মাখামাখি, করুণ মুখের একটি লোক বসে আছে মাটিতে। সামনে পাতা কাপড়টিতে অদ্ভুত কুদর্শন একটি মাটির প্রতিমা। রাজার চোখ আটকে গেল। ‘এটা কার মূর্তি?’ ‘অলক্ষ্মী’-উত্তর দিল লোকটি। ‘তুমি অলক্ষ্মী নিয়ে এসেছো কেন?’ — রাজা জিজ্ঞাসা করলেন। আমায় আজ সকালে একজন কারিগর এই মূর্তিটি এসে দিয়ে গেছে। বলেছে, ‘রাজার মেলায় তো সকলের স্থান, তুমি এই মূর্তিটিও নিয়ে যাও। আমি লক্ষ্মী মূর্তি গড়তে চেয়েছি কাল সারাদিন ধরে, কিন্তু কিভাবে যে অলক্ষ্মী হয়ে গেল। কে জানে কেউ কিনতেও পারে, পূজো করে অলক্ষ্মী বিদায় করার জন্য।’
রাজা বাহকদের নির্দেশ দিলেন, ‘মূর্তিটি নিয়ে চল’, কোষাধ্যক্ষকে মূল্য মিটিয়ে দিতে বললেন। পাশে দাঁড়িয়ে চিন্তিত মন্ত্রী বলে উঠলেন, ‘রাজপ্রাসাদে অলক্ষ্মী নিয়ে যাবেন মহারাজ?’ রাজা কোনো উত্তর করলেন না। মেলা শেষ হল, সকলে ফিরে চললো নিজগৃহে, রাজাও নিজের ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন।
সেদিন রাতে এক করুণ কান্নায় রাজার ঘুম ভেঙে যায়। বেরিয়ে আসেন বাইরে। প্রশস্ত বারান্দা, বাইরে আধোঘুমে দেহরক্ষী, রাজা বুঝতে পারলেন কান্নার আওয়াজ সে পাচ্ছে না, তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বললেন। সে সরে যাওয়া মাত্র দেখা গেল দূর থেকে একটি সালঙ্কারা নারী এগিয়ে আসছে, অত্যন্ত সুন্দরী। মেয়েটি রাজার ঘরের সামনে এলো, চোখে জল! ‘একে তো কখনো দেখি নি?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন রাজা, ‘আপনি কে? এই অন্দরমহলে কিভাবে প্রবেশ করলেন? আর এতরাতে কোথায় চলেছেন?’ সেই নারী উত্তর করলেন ধীরে, ‘আমি এ রাজ্যের রাজলক্ষ্মী। রাজা, তুমি প্রাসাদে অলক্ষ্মী নিয়ে এসেছো, আমি কিভাবে থাকি? আমি যে অলক্ষ্মীর সাথে একত্রে বাস করতে পারি না। তাই তোমার রাজ্য ছেড়ে আমায় আজ চলে যেতে হচ্ছে।’ রাজা কিছু বললেন না। রাজ্যশ্রী কাঁদতে কাঁদতে কিছুদূর গিয়ে মিলিয়ে গেলেন। পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন রাজা। আর তখনই দেখলেন, দূর থেকে আসছেন এক সুবেশ রাজপুরুষ। রাজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন। রাজার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘মহারাজ, আমি ঐশ্বর্য। রাজ্যলক্ষ্মী না থাকলে আমিও সেখানে থাকি না।’ রাজা এবারেও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এভাবে একে একে রাজার সামনে দিয়ে চলে গেলেন, ‘শক্তি, সাহস, উন্নতি’ — কারণ একজন না থাকলে তাদের অন্যজন থাকে না।
আবার পায়ের আওয়াজ। এবারে কে ছেড়ে চলে যাবেন? শুভ্র পোশাক, এক দিব্যদর্শন পুরুষ এগিয়ে আসছেন, প্রশান্ত, কমনীয় মুখ। রাজা হাতজোড় করলেন, ‘আপনি কে?’ ‘আমি ধর্ম’। রাজা এগিয়ে এসে ধর্মের সামনে দাঁড়ালেন। ‘আপনি কোথায় চলেছেন দেবতা?’ ধর্ম রাজার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। রাজা নতজানু হলেন ধর্মের পায়ের কাছে। ‘আমি তো ধর্ম ত্যাগ করি নি। আমি সত্যধর্ম , রাজধর্ম, করুণার ধর্ম থেকে একচুলও সরে আসি নি। আপনি আমায় ছেড়ে যেতে পারেন না।’ প্রসন্ন দৃষ্টিতে রাজার দিকে তাকিয়ে ধর্ম ফিরে চললেন আবার রাজবাড়ির অন্দরমহলের দিকে, অন্তরমহলের দিকে। রাজার মনের ভেতর থেকে একটা বড় ভার নেমে গেল। ধর্ম তাঁর ওপর সুপ্রসন্ন, তিনি আর কারো প্রসন্নতার অপেক্ষা করেন না।
হঠাৎ শুনলেন ‘ঝুম ঝুম’ আওয়াজ। তাকিয়ে দেখলেন, ফিরে আসছেন রাজলক্ষ্মী। রাজার সামনে দাঁড়িয়ে রাজ্যশ্রী বললেন, ‘ধর্মকে ছেড়ে কোনোদিন লক্ষ্মী থাকে না মহারাজ। আপনার জয় হোক।’ একে একে ফিরে এলেন ‘শক্তি’, ‘সাহস’, ‘উন্নতি’। রাজা নিজের শয়নঘরে ঢুকে দেখলেন অলিন্দে রেখে দেওয়া অলক্ষ্মীর মূর্তি চুরমার হয়ে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে আছে মাটিতে।
গঙ্গাতীরে বাস করে যে, তার ক্ষুদ্র সরোবরের জলের প্রয়োজন হয় না। যদি কেউ ধর্মসাধনা করে, তাহলে লক্ষ্মী তার ভৃত্য হয়, সে সম্পদকে জয় করার মন্ত্র জেনে যায়। তুচ্ছ সম্পদে আর তার মন ভরে না।
কবি লিখেছেন, ‘বুকের মধ্যে একটু আধটু দুঃখ পোষা/ কিন্তু খুবই ভালো আছি।/ এই তো বেশ ঘুরছি ফিরছি/ লম্ফেঝম্পে দিন পেরুচ্ছি/ একটু খোঁচা, একটু ব্যথার টনটনানি/ তবু বলবো দিব্যি আছি।’ কিন্তু বুকের ভেতরে দুঃখ পুষে রেখে আদপে দিব্যি থাকা যায় কি? যখন মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়ায় তখন কতজন বলতে পারে, ‘দিব্যি আছি?’ স্বামীজী বলছেন, যতদিন জগতে মৃত্যু থাকবে ততদিন জগতাতীতের চিন্তা মানুষকে ছুঁয়ে থাকবেই। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে ‘দিব্যি আছি’ বলার বুকের পাটা থাকে মুষ্টিমেয় জনের, আর সেজন্য অন্তর্জগতের যথেষ্ট অনুশীলনচাই। অথচ বারে বারে শুনলেও তো আমাদের মনে থাকে না উত্তরণের শব্দগুলি — ‘আত্মানং বিদ্ধি — নিজেকে জানো’, ‘ঈশ্বরলাভই মানব জীবনের উদ্দেশ্য’। এই কথাগুলো ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় যুগে যুগে আমরা শুনে এসেছি। শুনেছি যে পায়ের তলার শক্ত জমি একমাত্র তৈরি করে দেয় নিজের অনন্তস্বরূপকে জানার চেষ্টা, কিন্তু ভুলে যাই বার বার। পথ হারিয়ে ফেলি।
স্বামী ওঁকারানন্দ মহারাজ একবার কালচার ইনস্টিটিউটে বক্তৃতার সময় বলেছিলেন, ‘উপনিষদ প্রদীপের আলোয় ঘড়ি ছাড়া শিখতে হয়।’ অর্থাৎ সময়ের হিসেব মেপে আরামে আয়েসে আত্মচর্চা হয় না। তার জন্য স্থান কাল ভুলে অনুশীলন চাই।
আমরা যাঁরা শ্রীরামকৃষ্ণের পদতলে সমবেত হয়েছি, কেমন হতে পারে তাদের অনন্তের অনুশীলন? পূজনীয় স্বামী ভূতেশানন্দ মহারাজ বলছেন — ‘শ্রীরামকৃষ্ণ তোমার আত্মা। তুমি তাঁকে না ভালবেসে থাকতে পারবে না। তুমি কি নিজেকে ভালবাস না?’ আমাদের সব প্রিয় কামনার মূলে আছেন আত্মস্বরূপ শ্রীরামকৃষ্ণ। তাঁর স্বরূপে আমার ‘আমি’কে বিলীন করে দেওয়ার সাধনাই আমাদের অনন্তের অভিমুখে যাত্রাপথ। তাই শ্রীরামকৃষ্ণ মনন, চিন্তন আমাদের অন্তহীন আনন্দের লক্ষ্যে নিয়ে চলুক।