কোন এক রহস্যময় কারণে কেতকীর বাংলা বইটিতে (বইটির চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়ে গেছে) এর উল্লেখ নেই, তবে সম্প্রতি প্রকাশিত সমীর সেনগুপ্তের ‘রবীন্দ্রসূত্রে বিদেশিরা’ গ্রন্থে ওকাম্পোর ডায়েরির বাংলা অনুবাদ সংযুক্ত হয়েছে এভাবে (৬৭) :
‘…মাঝে মাঝে যখন আমি দেখতাম তিনি তাঁর রহস্যময় বাংলা হরফে লিখছেন, লিখছেন লিখেই যাচ্ছেন, কখনো কখনো আমি তাঁকে অনুরোধ করতাম কবিতাটির একটি অংশ আমার জন্য তরজমা করে শোনাতে। একদিন বিকেলে আমি ফুলদানিতে ফুল সাজাবার জন্য তাঁর ঘরে ঢুকেছি, তিনি বললেন যে তিনি তর্জমা করছেন। টেবিলে খোলা পৃষ্ঠাটির উপরে আমি ঝুঁকে পড়লাম। আমার দিকে মুখ না তুলে তিনি হাত বাড়ালেন, এবং যেভাবে লোকে গাছের ডালে একটি ফলকে ধরে, সেইভাবে আমার একটি স্তনের উপরে হাত রাখলেন। আমার মনে হল, আমার সমস্ত শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে গেল, আমি কুঁকড়ে গেলাম — একটা ঘোড়াকে যেন তাঁর মালিক আদর করছে এমন এক সময়ে যখন সে সেটা আশা করছে না। আমার ভিতরের জন্তুটা চিৎকার করে উঠল:‘না! না!’। কিন্তু আমারই ভেতর আরেকটা মানুষ যেন সাবধান করে দিল জন্তুটাকে: ‘শান্ত হয়ে দাঁড়াও, মূর্খ! বহুদেববাদী ধর্মের স্নেহপ্রকাশের শরীরী ভঙ্গি এটি, জরাগ্রস্তের লালসা নয়’। প্রায় বিদেহীভাবে আমাকে আদর জানিয়ে হাতটি সরে গেল, আমি কবিতাটি পড়লাম। … কিন্তু তিনি পরে আর কখনো এরকম করেননি। প্রতিদিন তিনি আমার কপালে অথবা গালে চুম্বন করতেন, আমার হাত ধরে বলতেন, ‘কী স্নিগ্ধ হাত তোমার’! ’
কেতকী কুশারী ডাইসন অবশ্য তার বইয়ে এই ঘটনার কিছু নিজস্ব বিশ্লেষণ হাজির করেছেন ওকাম্পোর জীবনের আগেকার কিছু ঘটনা উল্লেখ করে – তাঁর গোপন প্রেমিক জুলিয়েন মার্টিনেজ যখন প্রথমবার ওকাম্পোর হাত ধরতে চেয়েছিলেন, তখন রূঢ়ভাবে হাত সরিয়ে নিয়েছিলেন, এলমহার্স্টের মুখের ওপর গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, কাইজারলিঙের শরীরী ইঙ্গিতও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন- সেখানে ওকাম্পো রবীন্দ্রনাথকে বাধা দেননি, তাঁর হাত সরিয়ে দেননি। তবে কি তাঁর এতে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল? তাঁর বইয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেতকী। তবে কেতকীর অনুমান এবং প্রশ্ন যাই হোক না কেন উপরের অনুচ্ছেদ থেকে এটা স্পষ্ট যে তাঁর স্তনের ওপর ঋষিপ্রতিম রবীন্দ্রনাথের সহসা আগ্রাসনে ওকাম্পো হতচকিতই হয়েছিলেন, এবং সেটাকে ‘এক্সোটিক’ ভারতীয় সংস্কৃতির তথাকথিত ‘বহুদেববাদী ধর্মের স্নেহপ্রকাশের শরীরী ভঙ্গি’র উপমায় নিজেকে প্রবোধ দিতে চেয়েছেন। কিন্তু যে কেউ জানে, ভারতবর্ষ কেন, কোন সংস্কৃতিতেই নারীর স্তনের উপর পুরুষালী হাতের অযাচিত আগ্রাসনকে অন্তত ‘নিষ্কাম স্নেহ’ বলার অবকাশ নেই। রবীন্দ্রনাথ হয়তো ওকাম্পোর দিক থেকে কোন ‘সুস্পষ্ট’ সাড়া না পেয়ে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেননি, কিন্তু এটি নিঃসন্দেহ যে, রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় কীর্তি এবং কাজকর্মকে কেবল ‘স্পিরিচুয়াল’ আর ‘প্লেটোনিক’ আখ্যায় আখ্যায়িত করলে বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হবে না। আমার ‘ভালবাসা কারে কয়’ বইটি লেখার প্রাক্কালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের খোঁজ পেয়েছিলাম; রবার্ট রাইটসের লেখা ‘মরাল অ্যানিম্যাল’ (৬৮)। বইটিতে রাইটস বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে চার্লস ডারউইনের জীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহকে ব্যাখ্যা করেছেন। ডারউইনের শৈশব এবং কৈশোর জীবন, এমার সাথে তাঁর প্রণয়, বিয়ে, মধুচন্দ্রিমা, স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ততা, সন্তানের জন্ম, সন্তানের প্রতি ভালবাসা, তাদের মৃত্যুতে দুঃখ প্রভৃতি বহু কিছু বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের কাঠামোতে ফেলে বিশ্লেষণ করেছেন। আমি আশাবাদী হয়তো একদিন কোন সাহসী এবং বিজ্ঞানমনস্ক রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ কেবল ‘প্লেটোনিক প্রেম’ এবং ‘মাতৃস্নেহের খিদে’ দিয়ে বিশ্লেষণ সমাপ্ত করবেন না, বিশ্লেষণকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন আধুনিক বিজ্ঞানের বিবর্তনীয় যাত্রাপথে।
বিবর্তন মনোবিজ্ঞান কেবল নারীর পুরুষের বয়সের কথাই বলে তা নয়। বাকচাতুর্য, প্রতিভা, নাচ, গান, বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষা সবকিছুই মানুষ কাজে লাগায় বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণের কাজে। মানব সমাজের নারীপুরুষের বহু বৈশিষ্ট্য এবং অভিব্যক্তিই মোটাদাগে সম্ভবত যৌনতার নির্বাচনের ফল তা অনেক বিজ্ঞানীই আজ মনে করেন (৬৯)। প্রতিভার ব্যাপারটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ যে একজন প্রতিভাধর কবি ছিলেন তাতে কেউই সন্দেহ করবেন না। কেবল নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলেই নয়, কবিতা গল্প, নাটক, উপন্যাস, ছোট গল্প থেকে শুরু করে চিত্রকলা – সাহিত্য সংস্কৃতি কৃষ্টি কলার সর্বত্র তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ সত্যই অনন্য। তাঁর একক অবদানেই বলা যায়, তিনি বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছিয়ে গিয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। সত্তর বছরেরও বেশি হল তিনি তিরোহিত হয়েছেন, কিন্তু আজও তিনি প্রবল ভাবেই প্রাসঙ্গিক এবং ততোধিক উজ্জ্বলভাবে দীপ্যমান। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দেখতে শুনতে সুদর্শন এবং সেই সাথে অসম্ভব প্রতিভাধর। যৌবনে তো বহু নারীর হৃদয় হরণ করেছিলেনই, এমনকি শেষ বয়সেও তাঁর খ্যাতি, যশ এবং প্রতিভার জৌলুসে অনেক তরুণের চেয়ে ঢের বেশি পূর্ণযৌবনা নারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতেন, জাগাতে পারতেন অহর্নিশি তাঁদের হৃদয়ে দোলা -‘আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে,দোলাও দোলাও দোলাও আমার হৃদয়’। ‘লা নুই বেঙ্গলি’ পড়ে আমরা দেখেছি ষোল সতের বছরের মৈত্রেয়ী দেবী প্রায় সত্তর বছরের রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কেমন আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন, খাতা জুড়ে পাতার পর পাতা রবীন্দ্রনাথের নাম লিখতেন। মৈত্রেয়ীর প্রেমিক মির্চা এলিয়াদকে ব্যাপারটা এতোটাই পরশ্রীকাতর এবং উদভ্রান্ত করে তুলেছিল যে, উপন্যাসের নায়ক অ্যালেনের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, ‘[Tagore, that] … disgusting old charlatan! Corrupter of young girls’। এমনকি একটা সময় মৈত্রেয়ী কাউকে বিয়ে করবে না বলে ঠিক করেছিল। এমন একটা ফ্যান্টাসির জগত আরেক কিশোরী রাণু অধিকারীর মধ্যেও আমরা দেখতে পাই। কৈশোরে রাণু ভেবেছিলো ‘পাখি আমার নীড়ের পাখি’ বুঝি তাঁকে নিয়েই লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; একটা সময় রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার জ্যোতিতে বিভ্রান্ত হয়ে তাঁকে ‘নিভৃত প্রাণের দেবতা’ বানিয়ে বিয়ে থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন রাণু। এহেন প্রতিভার ধাক্কা কেবল মৈত্রেয়ী বা রাণু নয়, ওকাম্পোর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল, নির্দ্বিধায় বলা যায়। রবীন্দ্রনাথের অমর কীর্তি গীতাঞ্জলি পড়েই ওকাম্পো যে প্রাথমিকভাবে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তা আমরা জানি। কিন্তু বিপরীতটিও কি সত্য নয়? সেই শৈশব থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি কম নারী রবীন্দ্রনাথের জীবনে আসেনি। কিন্তু জ্ঞানে, গুণে, ব্যক্তিত্বে, সৌন্দর্যে এবং কর্মস্পৃহায় বোধ করি ওকাম্পো ছিলেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রম। একে তো সৌন্দর্যে তিনি ছিলেন অতুলনীয়, অর্তেগা তাঁকে ডাকতেন ‘La Gioconda del sur’ বা ‘দক্ষিণের মোনালিসা’ বলে; আর মননে এবং প্রজ্ঞাতেও ছিলেন সে অঞ্চলের নারীদের থেকে অগ্রগামী। সেই ১৯২০ সাল থেকেই ‘লা নেসিয়ন’-এর মতো পত্রিকায় লিখতে শুরু করেছিলেন তিনি। সারা জীবনে লিখেছেন ২৫টির মতো বই। তাঁর অনূদিত লেখকের তালিকায় আছেন কামু, টি ই লরেন্স, ফকনার, ডিলান টমাস, গ্রাহাম গ্রিন, জন অসবোর্ন সহ অনেকেই।
১৯৩১ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী ৪০ বছর ‘সুর’ (Sur) পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন তিনি, যে পত্রিকাটিতে ক্রমাগতভাবে লিখেছেন হর্হে লুইস বর্হেস, মার্সেল প্রুস্ত, টমাস মান, টি এস এলিয়ট, হেনরি মিলার, জ্যাক মারিত্যাঁ, পল ক্লোদেল, অল্ডাস হাক্সলি, সিমোন ওয়াইল, লিউইস মামফোর্ড, আঁদ্রে জিদ, মার্টিন হাইডেগার, এজরা পাউন্ড, ইভলিন ওয়, লরেন্স ডারেল, জাঁ পিয়াজে, আঁদ্রে ব্রেত, অক্টাভিয়ো পাজের মতো লেখক লেখিকারা। তিনি ছিলেন স্পষ্টবক্তা। নারী স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি কাউকে ছাড় দেননি। তাঁর কাছের মার্কসবাদী বন্ধুবান্ধবদের অনেকে তখন ভাবতেন নারীস্বাধীনতা আর নারীমুক্তি নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করার কিছু নেই। অর্থনৈতিক সাম্য এবং কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা হলে নারীমুক্তি এমনিতেই ঘটে যাবে। ওকাম্পো তা মেনে নেননি। তিনি এর প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘না … আগে দুনিয়ার মেয়েদের অবস্থা পাল্টাতে হবে, তারপর তা থেকেই অন্য পরিবর্তনগুলো আসবে; উল্টোটা নয়’। তাঁর এহেন কথাবার্তা আর কাজকর্মের জন্য ডান, বাম, ক্যাথলিক চার্চ সবার দ্বারাই আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিলির নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি পাবলো নেরুদা এক সময় ওকাম্পোকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন, অবশ্য সেই নেরুদাই আবার ষাটের দশকে মত বদলে ওকাম্পোর প্রশংসা করেছেন। একবার এক চার্চসংস্থা ওকাম্পোর আগমন এবং বক্তৃতা নিষিদ্ধ করেছিল, তাদের মূল অভিযোগ ছিল ওকাম্পোর বাসায় রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় প্রদান এবং কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন লেখক আঁদ্রে মালরোর লেখা তাঁর পত্রিকায় ছাপানোর। অঢেল ধনসম্পদের মধ্যে জন্মানোর কারণে ‘বিদেশভক্ত বুর্জোয়া’ খেতাব যেমন পেতে হয়েছে, ঠিক তেমনি পত্রিকায় ভিন্নধর্মী এবং ভিন্নমতের প্রবন্ধ ছাপানোর কারণে ‘কমিউনিস্ট’, ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘নাৎসি’ প্রভৃতি বলে গালমন্দও শুনতে হয়েছে এন্তার। আর্জেন্টিনার পেরন সরকারের (১৯৪৬-১৯৫৫) আমলে তাঁকে ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবচেয়ে বেশি।
শেষ পর্বে সমস্ত ফুট নোট দেওয়া রয়েছে।
(ক্রমশ)