১৯৫৩ সালের ৮ই মে তাঁকে রাষ্ট্রবিরোধী মুক্তমত প্রচার এবং প্রকাশের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে থাকতে হয়েছিল ছাব্বিশ দিন। অবশ্য কোন কোন মহল থেকে আক্রান্ত যেমন হয়েছেন, তেমনি প্রশংসাও পেয়েছেন অফুরন্ত। যেমন, স্প্যানিশ সাহিত্যের কিংবদন্তী লেখক হর্হে লুইস বর্হেস ওকাম্পো সম্বন্ধে বলেছিলেন, —
‘সারা পৃথিবী এবং তার অমিতসম্পদ যে আমাদের উত্তরাধিকার তা ওকাম্পো জানতেন। এই স্বনামধন্য আর্জেন্টিনীয় লেখক কোন ধরণের কূপমন্ডুকবৃত্তিতে বিশ্বাস করেন না, সারা পৃথিবীর সংস্কৃতিকেই তাঁর আপন উত্তরাধিকার বলে গণ্য করেন’।
আরেক সাহিত্যিক ওয়ালদো ফ্রাঙ্ক বলেন, —
‘ভিক্টোরিয়ার জীবনে রূপ, বিত্ত এবং ধীশক্তি — তিনটিই যেন ছিল অভিশাপতুল্য। কিন্তু তিনটি অভিশাপকেই তিনি অতিক্রম করতে পেরেছেন। … ভিক্টোরিয়া কোন পরিস্থিতিতেই বাইরে থেকে সহজবোধ্য নন। তাঁরা নিটোল, সুন্দর দীর্ঘদেহ আড়াল করে রাখে তাঁর স্বভাবের সংবেদনশীলতা আর লাজুকতা। তাঁর নারীসুলভ বেদিত্ব ঢেকে রাখে তাঁর সাহসকে, যা প্রায়শই দুঃসাহস। তাঁর নাগরিক বৈদগ্ধের নীচে ঢাকা থাকে আসল মানুষটা — যিনি সহজিয়া হৃদয়াবেগে কৃষাণীর মতো, দাক্ষিণ্য আর প্রতিক্রিয়ার তীব্রতায় শিশুর মতো। আর তাঁর আর্থিক ক্ষমতাকে নিবেদিত করেছেন তাঁর তাঁর মূল্যবোধের সেবায় : শিল্পীর মূল্যের ও স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠায়’।
এ সবের পাশাপাশি ওকাম্পো ছিলেন আধুনিকা, আর ফ্যাশন সচেতন। সে সময়কার ফ্যাশন সম্রাজ্ঞী কোকো শ্যানালের সাথে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ছিল তাঁর। বন্ধুত্ব এবং পরিচয় ছিল ভার্জিনিয়া উলফ, কঁতেস দ্য নোয়াই, সিলভিয়া বিচ, ন্যান্সি এস্টর, ইন্দিরা গান্ধী এবং সুসান সোনট্যাগের মতো নারীদের সাথে। অবশ্য কার সাথে যে বন্ধুত্ব ছিল না সেটাই প্রশ্ন। ইগোর স্ত্রাভিন্সকি, মরিস রাভেল, এরনেস্ট আনসার্মে, পল ভ্যালোরি, ল করবুসিয়ের, আলবেয়র কামু, আদ্রিয়েন মোনিয়ের, আলডাস হাক্সলি,ভিটা স্যাকভিল ওয়েস্ট, গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল সহ সেসময়কার খ্যাতিমান লোকজনের সাথে পরিচয় ছিল তাঁর। এমনকি সাক্ষাৎ হয়েছিল প্রিন্স অব ওয়েলস এডওয়ার্ড-৮, য়ুং এবং মুসোলিনির সাথেও। তাঁর এই বিশ্বব্যাপী দীর্ঘ পরিচয়ের সূত্র কাজে এসেছিল পেরন সরকারের আমলে কারাগারে থাকা সময়গুলোতে। পেরনের এই স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছিলেন ওয়ালদো ফ্রাঙ্ক, গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল সহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ওকাম্পোর বন্ধুবান্ধবেরা। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু পর্যন্ত ওকাম্পোর মুক্তিতে কূটনৈতিক ভূমিকা পালনে নেমে পড়েছিলেন। তাঁদের সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে পেরন সরকার ওকাম্পোকে খুব তাড়াতাড়ি মুক্তি দিতে বাধ্য হন, যদিও তাঁর পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে রাখা হয়েছিল ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত, আটকে দেয়া হয়েছিল তাঁর বিদেশে ভ্রমণ।
তাঁর এই জীবন-সংগ্রামের ফসল তিনি সার্থকভাবেই ঘরে তুলেছিলেন। ১৯৭৯ সালে মারা যাবার আগ পর্যন্ত সারা জীবনে বহু পুরস্কারই পেয়েছেন তিনি। তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৭ সালে বিশ্বভারতী থেকে তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি দেয়া হয়েছিল। একই বছর তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রী লাভ করেন, যা বিগত ৩৩০ বছরে মাত্র দশজন নারীকে দেয়া হয়েছে। ১৯৭৭ সালে আর্জেন্টাইন একাডেমি অব লেটার্স’ এর সভানেত্রী (Alberdi Chair) নির্বাচিত হয়েছিলেন যা কেবল এতোদিন পুরুষদেরই করায়ত্ত থাকতো (৭০)। আমি এবার আর্জেন্টিনা ভ্রমণের সময় লাইব্রেরি এবং রাস্তাঘাটের দোকানের বইপত্তর দেখে নিশ্চিত হয়েছি যে আর্জেন্টিনার প্রথম দশজন প্রথিতযশা সাহিত্যিকের একজন হিসেবে তাঁকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ভ্রমণের সময় যে ট্র্যাভেল গাইডটি নিত্যসঙ্গী হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে আমার সাথে ছিল সেটা আজ খুলে দেখলাম তাতে হর্হে লুইস বর্হেস, আদোলফো বিয়য় ক্যসেরাসের পরেই ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর নাম উল্লিখিত হয়েছে (৭১)।
আমার সাম্প্রতিক আর্জেন্টিনা ভ্রমণ, ভিলা-ওকাম্পো দর্শন এবং আনুষঙ্গিক ইতিহাস পাঠ থেকে যতটুকু ওকাম্পোকে বুঝেছি, তাতে মনে হয় — তিনি খুব জটিল চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একরোখা, জেদি। ভীষণ আবেগী। কিন্তু পাশাপাশি আবার মানবতা এবং নারী স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোষহীন এবং যৌক্তিক। আবার কোন কোন দিকে মানসিকতায় ছিলেন শিশুর মতোই সরল। আর্জেন্টিনায় থাকাকালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথের লেখালিখিতে যাতে কোন বিঘ্ন না ঘটে তার জন্য ‘অখণ্ড অবসরের’ ব্যবস্থা করেছিলেন ওকাম্পো, কিনে দিয়েছিলেন একটি আরাম কেদারাও। আর্জেন্টিনা থেকে চলে আসার সময় ভিক্টোরিয়া সেটিকে জোর করে জাহাজে তুলে দেন। এ নিয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে তাঁর মহা বাকবিতণ্ডা হয়। কারণ চেয়ারটি কবিগুরুর জন্য বরাদ্দকৃত কেবিনে ঢুকছিল না। কিন্তু ওকাম্পো বরাবরই নাছোড়বান্দা। মিস্ত্রী ডাকিয়ে জাহাজের কেবিনের দরজা খুলে চেয়ারটিকে ভিতরে ঢুকানোর ব্যবস্থা করলেন তিনি (৭২)। এই আরাম কেদারাটিকে শান্তিনিকেতনে এনে নিজের শয্যাপাশে স্থান দিয়েছিলেন রবিঠাকুর। তিনি সেই চেয়ারটিতে বসতেন, আর ওকাম্পোকে স্মরণ করতেন। ১৯২৫ সালের ৫ই জানুয়ারিতে লেখা একটি চিঠিতে রবিঠাকুর ওকাম্পোকে লিখেছিলেন, ‘আমার দিন আর রাতগুলোর একটা বড় অংশ কাটে তোমার চেয়ারে ডোবা অবস্থায়, যে চেয়ারটি আমাকে অবশেষে বুঝিয়ে দিয়েছে তোমার পড়ে শোনানো বোদলেয়রের সেই কবিতাটির লিরিক তাৎপর্য’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, মৃত্যুর আগে পুত্রবধূকে প্রায়ই বলতেন ভিক্টোরিয়ার গল্প (৭৩)। আরাম কেদারায় বসে ভাবতেন, লিখতেন ভালবাসার কবিতা। মৃত্যুর ঠিক চারমাস আগে, ১৯৪১ সালের এপ্রিল মাসে কবিগুরু ‘বিদেশের ভালবাসা দিয়ে, যে প্রেয়সী পেতেছে আসন’ এর কথা স্মরণ করে লিখলেন (৭৪) :
আরো একবার যদি পারি
খুঁজে দেব সে আসনখানি
যার কোলে রয়েছে বিছানো
বিদেশের আদরের বাণী।
…
বিদেশের ভালোবাসা দিয়ে
যে প্রেয়সী পেতেছে আসন
চিরদিন রাখিবে বাঁধিয়া
কানে কানে তাহারি ভাষণ।
…
ভাষা যার জানা ছিল নাকো,
আঁখি যার কয়েছিল কথা,
জাগায়ে রাখিবে চিরদিন
সকরুণ তাহারি বারতা।
আজ ওকাম্পো ভিলা থেকে নিয়ে আসা ওকাম্পোর স্প্যানিশ বইটি উল্টে পাল্টে দেখতে গিয়ে নজরে এল, বইটির শেষ অধ্যায়টির নাম ‘ভালবাসা’। না, স্প্যানিশ অনুবাদে নয়; রোমান হরফে, খাঁটি বাংলায়!
তথ্যসূত্র
১.স্প্যানিশ থেকে বাংলায় প্রতিবর্নীকরণে নানা ধরণের সমস্যা আছে। স্প্যানিশে বাংলার ‘ট’ এবং ‘ভ’ নেই। এ বর্ণগুলোর উচ্চারণ অনেকটা ‘ত’ এবং ‘ব’ এর কাছাকাছি। সে হিসেবে ভদ্রমহিলার নামের প্রকৃত উচ্চারণ ‘বিক্তোরিয়া’ কিংবা এর কাছাকাছি কিছু। অনেকে আবার ল্যাতিনো ‘ব’ এর প্রতিবর্নীকরণে ‘হ্ব’ লেখেন (অনেকটা জার্মান w এর উচ্চারণে হ্বাইমার, হ্বাগনার ইত্যাদি লেখার অনুকরণে)। কেতকী কুশারী ডাইসন তার বইয়ে তার কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র অনামিকার মুখ দিয়ে ‘হ্বিক্তোরিয়া’ ধরণের কিছু প্রস্তাব করলেও বাঙালি পাঠকদের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত ‘ভিক্তোরিয়া’ তে আপোষ করেছেন। আমি অবশ্য এই প্রবন্ধে ইংরেজি উচ্চারণের আদলে সর্বাধিক প্রচলিত ‘ভিক্টোরিয়া’ই ব্যবহার করেছি। এই বানানটি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করে গেছেন। শঙ্খ ঘোষের ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ বইয়েও এই বানান ব্যবহৃত হয়েছে।
২. তবে কবিগুরুর পেরুর-যাত্রাভঙ্গ নিয়ে কিছু পরস্পরবিরোধী তথ্য আছে। প্রকাশিত কিছু বইয়ে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ যখন পেরুর স্বাধীনতার শতবার্ষিক উৎসবে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন, তখন ‘সেনিওরা ওকাম্পোর নির্বন্ধাতিশয্যে পেরু ভ্রমণ বাতিল করে দিতে হয়… পেরুর আমন্ত্রণ রক্ষা না করার দরুণ আর্জেন্টিনা-পেরুতে দস্তুর মতোন রাজনৈতিক মন কষাকষি ঘটেছিল’ (রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পিতৃস্মৃতি, ১৯৭১, পৃঃ ১৯২ -৯৩)। তবে অন্য কিছু তথ্যে (যেমন কাইজারলিং এর স্মৃতিকথায়) দেখা যায় আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠিকমতো পেরুতে আপ্যায়িতই হননি। ‘কবি ভবেছিলেন ঐ শহর লিমারই নগরপ্রান্তে। পৌঁছে দেখেন কেউ তাঁকে নিতে আসেনি। বিমূঢ়, বাক্যাহত, অসহায় কবি সবকিছুতেই তখন বিরক্ত। বন্দরের কোলে একটি ছোট্ট নিবাসে নিজেকে লুকিয়ে ফেললেন। সেখানে তাঁকে আবিষ্কার করেন এই মহিলা [ভিক্টোরিয়া], তৎক্ষণাৎ নিসর্গ পরিবেশে একটি ছোট্ট বাসায় নিয়ে এলেন’ (Reise durch dieit, অনুবাদ, শ্রীঅলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত)। নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক এবং ইতিহাসবিদ রোমা রঁল্যার জবানী থেকে জানা যায়, ‘রবীন্দ্রনাথ পেরুর জাতীয় উৎসবের দর্শক হবার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। তিনি সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন এবং ভালো করে জানাশোনার সময় না দিয়েই আর্জেন্টিনা যাত্রা করেছিলেন। বুয়েনোস অ্যায়ারেস পৌঁছিয়েই তিনি অসুখে পড়লেন। অসুখ আরো খারাপ হতে পারতো। কারণ এলমহার্স্ট আবিষ্কার করলেন যে, আর্জেন্টিনস্থ পেরুর রাষ্ট্রদূত রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানানোর ব্যাপারে কিছুই জানেন না। পেরুর সরকারও কোন নির্দেশ পাঠায়নি। টেলিগ্রাম চালাচালি হল, এবং অবশেষে সরকারী আমন্ত্রণ এল। কিন্তু তা আসতে দেরী হল এবং এর মাঝে কিছু অপ্রীতিকর ব্যাপার দেখা দিল… (রোমা রঁল্যা, ‘ভারতবর্ষ দিনপঞ্জি’, অনুবাদ: অবন্তীকুমার স্যানাল)। এর মধ্যে কিছু রাজনৈতিক ব্যাপারও জড়িয়ে গিয়েছিল। রোমা রঁল্যা, দেলিয়া তোরেস সহ অনেক বুদ্ধিজীবি পেরুতে রবীন্দ্রনাথের সফরের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছিলেন। তাদের মতে ‘পেরুর ছদ্ম-প্রজাতন্ত্রী স্বৈরাচারী সরকার যারা শ্রমিকদের গুলি করে মারছে, তারা রবীন্দ্রনাথের ইমেজ কাজে লাগাতে পারেন, আর কবিগুরু তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বৈরাচারের সহযোগী হয়ে যেতে পারেন’ (রোমা রঁল্যা, ‘ভারতবর্ষ দিনপঞ্জি’)। এ ছাড়া ‘কবিকে বুঝানো হইল যে, ‘শতবার্ষিকী উৎসব আসলে একটি যুদ্ধের দিনের স্মরণ, এর মধ্যে কোন আদর্শবাদ নেই ইত্যাদি…’ (প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনী, তৃতীয় খণ্ড, ১৯৫২)। ঠিক এসময়ই পরামর্শক চিকিৎসকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে পেরু সফর নিষিদ্ধ করে দেন। আর কবিগুরু সে সময়টা আর্জেন্টিনাতেই থেকে যান। (ক্রমশ)