খবর পেয়েই চলে এলেন ওকাম্পো। রবিঠাকুরের সাথে তাঁর ২য় সাক্ষাৎ এটি (১৯৩০ সালের এপ্রিল)। এসেই খুব কম সময়ের মধ্যে পিগাল গ্যালারিতে রবিঠাকুরের ছবিগুলোর প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে ফেললেন তিনি। এমনকি তাঁর বন্ধু লেখিকা কঁতেস দ্য নোয়াইকে দিয়ে চিত্রসূচীর একটা ভূমিকাও লিখিয়ে নিলেন ওকাম্পো। এত দ্রুত এবং সুচারুভাবে তিনি কাজগুলো সমাধান করে ফেললেন যে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। ওকাম্পো যে কী অসাধারণ দ্রুততায় এবং দক্ষতায় প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন তার সাক্ষ্য সমসাময়িক অনেকের লেখাতেই ছড়িয়ে আছে। যেমন, রথীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পিতৃস্মৃতি’ তে উল্লেখ করেছেন (৩১) –
‘১৯৩০ সালে বাবা আবার যখন প্যারিস যান, সঙ্গে ছিল তাঁর আঁকা কিছু ছবি। ছবি দেখে কয়েকজন ফরাসি শিল্পী বাবাকে একটা চিত্রপ্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করলেন। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল, চট করে প্যারিস শহরে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা অসম্ভব বললেই হয়। মোটামুটি একটা পছন্দসই হল পেতে হলে বছর খানেক আগে থেকে চেষ্টাচরিত্র করতে হয়। বাবা সেনিওরা ওকাম্পোকে তারযোগে অনুরোধ জানালেন তিনি এসে যেন বাবার সহায় হন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চলে এলেন এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হল বিনা আয়াসেই প্রদর্শনীর সব রকম ব্যবস্থা তাঁর সাহায্যে হয়ে গেল’।
এ ধরণের অনেক সাক্ষ্যই পাওয়া যাবে রবীন্দ্রনাথের সেই সময়কার নতুন সেক্রেটারি আরিয়ম উইলিয়ামস কিংবা রথীন্দ্রনাথকে লেখা আঁদ্রে কার্পেলেসের চিঠিতে। এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত প্রতিমা দেবীকে ২ মে, ১৯৩০ তারিখে লেখা একটি চিঠিতে বলেছিলেন, —
‘ভিক্টোরিয়া যদি না থাকত, তাহলে ছবি ভালই হোক আর মন্দই হোক, কারো চোখে পড়ত না। একদিন রথী ভেবেছিল ঘর পেলেই ছবির প্রদর্শনী আপনিই ঘটে — অত্যন্ত ভুল। এর এত কাঠখড় আছে যে, সে আমাদের অসাধ্য- আঁন্দ্রের পক্ষেও। খরচ কম হয়নি — তিন চারশো পাউন্ড হবে। ভিক্টোরিয়া অবাধে টাকা ছড়াচ্চে। এখানকার সমস্ত বড় বড় গুণীজনদের ও জানে — ডাক দিলেই তারা আসে। কঁতেস দ্য নোয়াইও উৎসাহের সঙ্গে লেগেচে — এমনি করে দেখতে দেখতে চারিদিক সরগরম করে তুলেচে। আজ বিকেলে দ্বারোদঘাটন হবে — তারপরে কি হয় সেটাই দ্রষ্টব্য…’
পরে যেটা হল, সেটা সামান্য নয়। চিত্রকর আঁদ্রে কার্পেলেস কিংবা পল ভেলেরি এবং আঁদ্রে জিদের মতোন কলা-বিশেষজ্ঞ রা ছবিগুলোকে চিহ্নিত করলেন ‘আগামী যুগের আর্ট’ হিসেবে (৩২), দেশে অবনীন্দ্রনাথ কিংবা শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর মত চিত্রকররা সেগুলোকে ‘অনন্যসাধারণ’ বলে রায় দিলেন। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে কিছু সমালোচনা যে হয়নি তা নয়। রবীন্দ্রনাথের কাছের বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই মুখটিপে হেসেছিলেন (৩৩)। তা সত্ত্বেও প্রদর্শনী থেমে থাকেনি। প্যারিসে প্রদর্শনীর পর রবিঠাকুরের চিত্র-প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হল লন্ডনে এবং বার্লিনেও। কবিগুরু প্রায় শিশুর মতো উৎফুল্ল হয়ে সে সময়কার আরেক ‘গুণমুগ্ধা’ রানী মহলানবিশকে (ভারতের বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত মহলানবিশের স্ত্রী যিনি নির্মলকুমারী নামে সমধিক পরিচিত) লিখলেন (৩৪), —
‘আজ আমার জার্মানীর পালা সাঙ্গ হল, কাল যাব জেনিভায়। এ পত্র পাবার অনেক আগেই জানতে পেরেছ যে, জার্মানিতে আমার ছবির আদর যথেষ্ট হয়েছে। বার্লিন ন্যাশনাল গ্যালারি থেকে আমার পাঁচখানা ছবি নিয়েছে। এই খবরটার দৌড় কতকটা আশা করি তোমরা বোঝো। ইন্দ্রদেব যদি হঠাৎ তাঁর উচ্চৈঃশ্রবাঃ ঘোড়া পাঠিয়ে দিতেন আমাকে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য তা হলে আমার নিজের ছবির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারতুম’।
ওকাম্পোর থেকে বিদায় নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালের ১১ই মে। প্যারিসের গার্দ্যু নর্রেলস্টেশনে ধারণ করা আছে তাঁদের সেই শেষ বিদায়ের দৃশ্য। প্যাট্রিশিয়া স্টেইনারের ভাষ্য অনুযায়ী, রেলস্টেশনে তোলা বিখ্যাত সেই ছবিতে তাঁদের দেখাচ্ছিল ম্লান এবং বেদনার্ত (৩৫)।
কেতকী কুশারী ডাইসন তাঁর ‘ইন ইয়োর ব্লসমিং ফ্লাওয়ার গার্ডেন’ বইয়ে নানা চিঠিপত্র দলিল উদ্ধার করে দেখিয়েছেন, কবিগুরু আসলে চেয়েছিলেন ওকাম্পো তাঁর সঙ্গে ইংল্যান্ড যান, হিবার্ট বক্তৃতা শোনেন আর তারপর রবীন্দ্রনাথের সাথে ফিরেন ভারতবর্ষে (৩৬)। কিন্তু ওকাম্পোর মাথায় ছিল তাঁর সম্ভাব্য ‘সুর’ পত্রিকা নিয়ে নানা পরিকল্পনা, তাই ইচ্ছা সত্ত্বেও তিনি রবিঠাকুরের সাথে ভ্রমণে যেতে পারেননি। ইনফ্যাক্ট, আমরা আজ জানি, ওকাম্পো তাঁর সারা জীবনে কখনোই ভারতে গিয়ে উঠতে পারেননি। রবিঠাকুর অবশ্য জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আশা করে গিয়েছিলেন ওকাম্পো কোন না কোন দিন ভারতে আসবেন, ভারতবর্ষে এসে রবিঠাকুরের কাজকর্মের সাথে পরিচিত হবেন। যেমন, লন্ডনে চিত্রপ্রদর্শনীর পর পরই ওকাম্পোকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ … এ যেন সেই ডেড সী-র ভারি জলের মতো – সব কিছুই ভেসে থাকে যেখানে, তার ওজন যাই হোক না কেন। তুমি কোথায় আছ জানি না, শুধু চাই ভারতবর্ষে তোমার সঙ্গে দেখা হোক’। রবীন্দ্রনাথ যখনই তাঁর ‘বিজয়া’কে চিঠি লিখতেন, তখনই শান্তিনিকেতন ঘুরে যাবার কথা বলতেন। যেমন, ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসের একটি চিঠিতে লিখেছিলেন —
‘প্রিয় বিজয়া, … সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে চাই তুমি তোমার ভ্রমণসূচীতে ভারতবর্ষে রাখো একবার, আমার নিজের জায়গা শান্তিনিকেতনে এসে আমাকে দেখে যাও। অসম্ভব কেন হবে? নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বছরের শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া খুব ভাল এখানে, এবং তোমাকে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখবার চেষ্টায় আমার কোন ত্রুটি হবে না সে তুমি নিশ্চয় জানো।
সম্প্রতি সিলোনে তোলা আমার একটি ছবি তোমাকে পাঠাই, আশা করি তোমার হাতে পৌঁছুবে।
আমার ভালবাসা সহ,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এখানে উল্লেখ্য, এ চিঠির নীচে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ভালবাসা’ লিখেছিলেন এবং সাক্ষর করেছিলেন বাংলায়। ওকাম্পো-রবীন্দ্রনাথের মধ্যে পত্র আদান প্রদান হয়েছে অনেক — নথি থেকে ১৯২৪ সাল থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত ৩২টি, ১৯২৯ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৩০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৪টি, ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত ৬টি,আর ১৯৩৯ সাল থেকে রবিঠাকুর মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ৮টি চিঠির কথা জানা যায়। আর ওকাম্পোকে লেখা রবিঠাকুরের বহু চিঠিতেই এভাবে বাংলায় লেখা ‘ভালবাসা’ র হদিস মেলে। কখনো রোমান হরফেও ‘bhalobasha’ লিখে চিঠি শেষ করতেন রবিঠাকুর। এখানে একটি ব্যাপারও বলা দরকার, তাঁর দীর্ঘ রবি-জীবনে জীবনে ওকাম্পোই কেবল একমাত্র ‘অনুরাগী বিদেশিনী’ ছিলেন না। বিশ্বভ্রমণে তিনি বহু নারীর সংস্পর্শেই এসেছিলেন; কারো সাথে সখ্যতা হয়েছে, কারো সাথে বন্ধুত্ব, আঁদ্রে কার্পেলেসের মতো কারো সাথে জীবনভর চিঠি চালাচালি করে রঙ্গ-রসিকতা-নির্দোষ ফ্লার্টিংও করেছেন,কিন্তু ওকাম্পোর মতো কাউকেই ‘ভালবাসা’ সম্বোধন করে চিঠি শেষ করেননি তিনি।
রবীন্দ্র-জীবনের আরেকটি জায়গায় ওকাম্পোর অবদানের খোঁজ পাওয়া যায়। খুব প্রচ্ছন্ন ভাবে হলেও। সেটি হল রবীন্দ্রনাথের নারী ভাবনার ক্রমিক উন্নয়নে, অন্তত কেতকী কুশারী ডাইসন তাই মনে করেন। ওকাম্পোর সাথে রবীন্দ্রনাথের যে সময়টাতে দেখা হয়েছিল, তার আগেকার কিংবা সমসাময়িক প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনি, ডায়েরি কিংবা চিঠিপত্র পাঠ করলে অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয় নারী সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা হলেও সনাতন, ঐতিহ্যপন্থি এবং ক্ষেত্রবিশেষে উদগ্রভাবেই পুরুষতান্ত্রিক। নারী সম্পর্কে রবীন্দ্র ভাবনার চালচিত্র খুব সার্থকভাবে ধরা পড়ে তাঁর ‘রমাবাইয়ের বক্তৃতা উপলক্ষে’ (১৮৮৯) নামক প্রবন্ধে। সে সময় মহারাষ্ট্রের এক বিদুষী নারীবাদী রমাবাই পুনায় একটা বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন, কিন্তু পুরুষ শ্রোতাদের গণ্ডগোলের কারণে বক্তৃতাটি শেষ করতে পারেননি। কিন্তু যতটুকুই তিনি বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন (যেমন, “মেয়েরা সকল বিষয়ে পুরুষদের সমকক্ষ কেবল মদ্যপানে নয়”), সভাস্থলে উপস্থিত থাকা রবীন্দ্রনাথকে বিব্রত করার জন্য ছিল যথেষ্ট। ঘরে ফিরে তিনি দিলীপ কুমার রায়কে প্রেরিত নিবন্ধে উল্লেখ করেন (৩৭) –“মেয়েরা সকল বিষয়েই যদি পুরুষের সমকক্ষ, তা হলে পুরুষের প্রতি বিধাতার নিতান্ত অন্যায় অবিচার বলতে হয়”। সেই একই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ নারী স্বাধীনতা এবং নারী অধিকারকে ‘কোলাহল’ হিসেবে উল্লেখ করে লেখেন : —
‘আজকাল পুরুষাশ্রয়ের বিরুদ্ধে যে একটা কোলাহল উঠেছে, সেটা আমার অসংগত এবং অমঙ্গলজনক মনে হয়। পূর্বকালে মেয়েরা পুরুষের অধীনতাগ্রহণকে একটা ধর্ম মনে করত; তাতে এই হত যে, চরিত্রের উপরে অধীনতার কুফল ফলতে পারত না, অর্থাৎ হীনতা জন্মাত না, এমন-কি, অধীনতাতেই চরিত্রের মহত্ত্বসম্পাদন করত। প্রভুভক্তিকে যদি ধর্ম মনে করে তা হলে ভৃত্যের মনে মনুষ্যত্বের হানি হয় না। রাজভক্তি সম্বন্ধেও তাই বলা যায়’।
শেষ পর্বে সমস্ত ফুট নোট দেওয়া রয়েছে।
(ক্রমশ)