রবীন্দ্রনাথের শেষ দিককার অমর প্রেমের উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’য় আগমন ঘটে জ্ঞানী, গুণী, বিদুষী এবং প্রথাভাঙা এক বলিষ্ঠ নারীর। লাবণ্য। অমিতের জীবনে ‘ঘড়ার জল’ হবার চাইতে ‘দীঘি’ হিসেবে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য ছিলো তাঁর। আমরা জানি রবিঠাকুরের শত আমন্ত্রণ সত্ত্বেও ভারতবর্ষে আসেননি ওকাম্পো। আসেননি শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর সাথে দিনযাপন করতে। হয়তো, রবি ঠাকুরের জীবনে ‘ঘড়ার জল’ হয়ে থাকার চাইতে প্লাতা নদীর মতোই বহমান থাকতে চেয়েছেন তিনি। লাবণ্য-অমিতের বিদায় বেলায় যে বিখ্যাত লাইনগুলো শেষের কবিতায় সন্নিবেশিত হয়েছে — ‘হে ঐশ্বর্যবান / তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান / গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়’ -এর সাথে মিল পাওয়া যায় ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথকে লেখা একটি চিঠির। ওকাম্পো সে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন (৫৬), ‘All I received from you has made me so rich in love that the more I spend, the more I have to give. And all I give comes from yourself …. So I feel I am giving nothing.’। স্বভাবতই, ১৯২৮ সালে বাঙ্গালোরে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের বাংলোয় বসে ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসটি সমাপ্তির প্রাক্কালে রানী মহলানবিশের এক প্রশ্নের উত্তরে কবিগুরু বলেছিলেন, লাবণ্য তাঁর খুব চেনা চরিত্র — ‘লাবণ্যর সঙ্গে যেন আমার চেনাশোনা আছে, খুব যেন কাছ থেকে তাঁকে দেখেছি’।
প্রায় জীবন-সায়াহ্নে এসে, ১৯৩৬ সালের অক্টোবরে রবীন্দ্রনাথ নিখিলবঙ্গ-মহিলা কর্মী সম্মেলনে পড়েছিলেন ঐতিহাসিক ‘নারী’ প্রবন্ধটি। নিখিলবঙ্গ-মহিলা কর্মীদের আমন্ত্রণে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, এবং পাঠ করেছিলেন তাঁদের সমাবেশে। সে প্রবন্ধটিতেও অবশ্য নারীকে গতানুগতিক ভাবে ‘পুরাতনী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, দেখানো করা হয় ‘আদ্যাশক্তি’ হিসেবে, নারীকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলা হয় যে নারী ‘জীবলোকে প্রাণকে বহন করে’, ‘প্রাণকে পোষণ’ করে ইত্যাদি, কিন্তু পাশাপাশি দেখা যায় এক নতুন রবীন্দ্রনাথকে যে রবীন্দ্রনাথ পিতৃতন্ত্রের ঊর্ধ্বে উঠে নারীমুক্তি, নারী স্বাধীনতাকে গ্রহণ করে নিতে পেরেছেন:
‘এ দিকে প্রায় পৃথিবীর সকল দেশেই মেয়েরা আপন ব্যক্তিগত সংসারের গণ্ডি পেরিয়ে আসছে। আধুনিক এসিয়াতেও তার লক্ষণ দেখতে পাই। তার প্রধান কারণ সর্বত্রই সীমানা-ভাঙার যুগ এসে পড়েছে। যে-সকল দেশ আপন আপন ভৌগোলিক ও রাষ্ট্রিক প্রাচীরের মধ্যে একান্ত বদ্ধ ছিল তাদের সেই বেড়া আজ আর তাদের তেমন করে ঘিরে রাখতে পারে না — তারা পরস্পর পরস্পরের কাছে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। স্বতঃই অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র প্রশস্ত হয়েছে, দৃষ্টিসীমা চিরাভ্যস্ত দিগন্ত পেরিয়ে গেছে। বাহিরের সঙ্গে সংঘাতে অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে, নূতন নূতন প্রয়োজনের সঙ্গে আচার-বিচারের পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছে’।
যে রবীন্দ্রনাথ এক সময় ভাবতেন, প্রকৃতিই নারীকে ‘বিশেষ কার্য্যভার ও তদনুরূপ প্রবৃত্তি দিয়া’ গৃহবন্দী করেছে, সে ধারণা নিজেই বাতিল করে ‘নারী’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আজ পৃথিবীর সর্বত্রই মেয়েরা ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বিশ্বের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন এই বৃহৎ সংসারের দায়িত্ব তাদের স্বীকার করতেই হবে…ঘরের মেয়েরা প্রতিদিন বিশ্বের মেয়ে হয়ে দেখা দিচ্ছে। এই উপলক্ষে মানুষের সৃষ্টিশীল চিত্তে এই-যে নূতন চিত্তের যোগ, সভ্যতায় এ আর-একটি তেজ এনে দিলে’ ।
হয়তো, তাঁর শেষ বয়সে লেডি রাণু, কিংবা ওকাম্পোর মতো মেধাবী নারীরা, আর নিখিলবঙ্গ-মহিলা কর্মীদের উদ্দীপনায় ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন নারীদের নিয়ে তাঁর সনাতন সংস্কার, হুমায়ুন আজাদের ভাষায়- তাঁর ‘আযৌবন প্রগতিবিরোধিতা’। হুমায়ুন আজাদ হয়তো যথার্থই বলেছেন, ‘সুখকর হচ্ছে যে পঁচাত্তর বছর বয়সে রূপান্তরিত হন রবীন্দ্রনাথ, এবং আরো সুখকর হচ্ছে যে নারীরাই রূপান্তরিত করেছিল তাঁকে’।
রবীন্দ্র জীবনে নারীদের ভূমিকার কথা যখন উঠছেই, তখন একই প্রসঙ্গের একটু ভিন্ন অঙ্গনে পা ফেলা যাক। রবীন্দ্রনাথের প্রণয়-জীবনের যে দীর্ঘ পথপরিক্রমার সন্ধান আমরা পাই তাতে দেখা যায় যে তাঁর প্রথম জীবনে অন্তত যে চারজন নারীর (দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী ‘কবি-মানসী’ কাদম্বরী দেবী, আত্মারাম পাণ্ডুরঙের মেয়ে আনা তড়খড়, আর বিলেতে সার্জন স্কটের দু কন্যা ফ্যানি এবং লুসি প্রমুখ) প্রতি তাঁর আসক্তি দেখা গিয়েছিল, তারা সবাই রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। কিন্তু মধ্যবয়সের পর থেকে (বিশেষত কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যার পর থেকে) তাঁর স্ত্রী সহ যে নারীরা রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ হয়েছেন তারা সবাই রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বয়সে ছোট ছিলেন। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী — যাকে আড়াইশোর উপরে চিঠিপত্র লিখেছিলেন কবিগুরু (৫৭), ছিলেন তাঁর স্ত্রীর বয়সীই (বারো বছরের কনিষ্ঠ), আর শেষ বয়সের নারীদের সাথে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল বিস্তর। ওকাম্পোর সাথে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল ২৯ বছরের, রাণু অধিকারীর সাথে বয়সের ব্যবধান ছিল বিয়াল্লিশ বছরের। এই প্যাটার্ন কি আমাদের কাছে কোন সত্য তুলে ধরে? বাংলাদেশ এবং ভারতের রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ এবং বুদ্ধিজীবীরা এর ব্যাখ্যা দেন ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথের মাতৃস্নেহের খিদে মেটেনি, সেই ঘাটতি পূরণের জন্য নাকি ছেলেবেলায় তার চেয়ে বেশি বয়সের নারীদের সান্নিধ্য তিনি কামনা করেছিলেন। পরে বয়সের সাথে সাথে এই প্রবণতা কমে আসে। যেমন, প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং গবেষক অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ ‘ভালবাসার কাঙাল রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে বলেছেন (৫৮) —
‘৬৫ বছরের তাঁর প্রণয়-জীবনের দীর্ঘ পথ [রবীন্দ্রনাথ] অতিক্রম করেছিলেন, তার মধ্যে এক ধরনের প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। প্রথম জীবনে যে চার নারীকে তিনি ভালবেসেছিলেন, তাঁদের সবার বয়সই, তার চেয়ে বেশি। ছেলেবেলায় তাঁর যে মাতৃস্নেহের খিদে মেটেনি, সেই ঘাটতি হয়তো পূরণ করতে চেয়েছিলেন এসব নারীর ভালোবাসায়।
কিন্তু কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করার পর থেকে তাঁর সেই প্রেমের চরিত্র পালটে যেতে আরম্ভ করে। বউদির মৃত্যুতে যে ভয়াবহ শূন্যতা দেখা দেয়, তা পূরণের চেষ্টা করেন অপ্রাপ্তবয়স্ক অশিক্ষিত গ্রাম্য স্ত্রী ভবতারিণী আর একই বয়সী সুন্দরী, বিদুষী, বহু ভাষাভাষী, বিলেত ফেরত স্মার্ট ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরার অপরিণত ভালোবাসার মধ্য দিয়ে…’।
ড. মুরশিদের কথায় কিছুটা সত্য থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু আধুনিক জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অসম্পূর্ণ এবং প্রায় অপাংক্তেয় তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। ২০১২ সালে আমি একটা বই লিখেছিলাম ‘ভালবাসা কারে কয়?’ নামে (৫৯)। অবশ্য কেবল ভালবাসা নয়, বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাগ অভিমান, ঈর্ষা, সংঘাত প্রভৃতি মানবীয় গুণাবলীর উদ্ভব এবং পরিস্ফুটনেরও বিশ্লেষণ হাজির করার প্রয়াস ছিল বইটিতে। সারা বিশ্ব জুড়ে জন টুবি, লিডা কসমাইডস, স্টিভেন পিঙ্কার, রিচার্ড ডকিন্স, ডেভিড বাস, ম্যাট রিডলী, জিওফ্রি মিলার, র্যাণ্ডি থর্নহিল, রবার্ট টিভার্স, মার্গো উইলসন, সারাহ ব্ল্যাফার হার্ডি, হেলেন ফিশার, রবিন বেকার সহ বহু গবেষকদের বিবর্তন মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত নানা গবেষণা আজ বিজ্ঞানের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং গবেষণার সজীব ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। তাঁদের সেই কষ্টার্জিত আধুনিক গবেষণাগুলোকেই সহজ ভাষায় বাঙালি পাঠাকদের কাছে তুলে ধরার ঐকান্তিক প্রয়াস নিয়েছিলাম আমার এই বইয়ের মাধ্যমে। উদাহরণ হিসেবে প্রখ্যাত বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী ডেভিড বাসের কিছু কাজের কথা বইটিতে উল্লেখ করেছিলাম। সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৩৭টি দেশের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে ছেলে এবং মেয়েদের পছন্দের উপর নানা ধরণের জরিপ চালিয়েছিলেন অধ্যাপক বাস (৬০)। সেই সমস্ত জরিপ থেকে মানব সমাজে নারী-পুরুষের পছন্দ অপছন্দের কিছু চিত্তাকর্ষক প্যাটার্নের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। দেখা গেছে পরিণত বয়সের পুরুষেরা তাদের সঙ্গী নির্বাচনে সচরাচর তার চেয়ে সামান্য কম বয়সী নারীকে ‘মেটিং পার্টনার’ হিসেবে চয়ন করে। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চালানো জরিপে দেখা গেছে পুরুষ এবং নারীর গড়পড়তা বয়সের পার্থক্য থাকে মোটামুটি ২.৫ বছর (অর্থাৎ পঁচিশ বছরের এক যুবক হয়তো বিয়ের সময় ২২.৫ বয়সী মেয়েকে বিয়ে করবেন)। এই বয়সের পার্থক্যের ব্যাপারটায় হেরফের থাকতে পারে, কিন্তু বিয়ের সময় পুরুষেরা তার চেয়ে কিছুটা কম বয়সী নারীকে যে পাত্রী হিসেবে চয়ন করে তা সংস্কৃতি নির্বিশেষে মানব সমাজের (গড়পড়তা) প্যাটার্ন। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় রক্ষণশীল দেশগুলোতে এবং যে সমাজে এখনো বহুগামিতা বিদ্যমান, সেখানে পাত্র-পাত্রীর বয়সের পার্থক্য বেশি থাকে। যেমন নাইজেরিয়ায় একজন ২৩ বছরের যুবক যখন পাত্রী সন্ধান করেন, তিনি তাঁর চেয়ে অন্তত ছয় বছরের ছোট, অর্থাৎ ১৭ বছর বয়সী পাত্রীর খোঁজ করেন। যুগোস্লাভিয়ায় একজন ২১.৫ বছরের যুবক পাত্রী হিসেবে চান ১৯ বছর বয়সী কন্যাকে। জাম্বিয়াতে বয়সের ব্যবধান ছয় বছর, আর ইরানে পাঁচ ইত্যাদি।
শেষ পর্বে সমস্ত ফুট নোট দেওয়া রয়েছে।
(ক্রমশ)