এর একটা বড় কারণ নিহিত রয়েছে জীববিজ্ঞানে। জৈবিকভাবে একটি মেয়ের প্রজনন ক্ষমতা বিশ বছর বয়সের পর দ্রুত কমতে শুরু করে। চল্লিশের পর সেটা নিম্নমুখী হয়ে যায়, আর পঞ্চাশের পর সেটা চলে যায় শূন্যের কোঠায়। অন্য দিকে পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা নারীদের মত এত দ্রুত হারে কমে না। একজন পঞ্চাশ / ষাট বছরের ব্যক্তি খুব সফলভাবেই প্রজননক্ষম থাকেন। এই কারণেই পুরুষদের সারা পৃথিবীতেই প্রবণতা হচ্ছে নিজেদের বয়সের চেয়ে ছোট বয়সী মেয়েকে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে চয়ন করা। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে দেখেছেন, নিজেদের পৃথিবীতে সঙ্গী নির্বাচনের সময় ছেলেরা গড়পড়তা দয়া, বুদ্ধিমত্তা আশা করে, কিন্তু পাশাপাশি প্রত্যাশা করে তারুণ্য এবং সৌন্দর্য। স্ত্রীর কাছ থেকে যথাসম্ভব তারুণ্য আদায় এবং তা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখার অভিপ্রায়েই গড়পড়তা ছেলেরা তাদের চেয়ে কম বয়সী মেয়ে বিয়ে করার জন্য উদগ্রীব হয়, সেটা যতই অস্বস্তিকর লাগুক না কেন শোনাতে।
পুরুষেরা যেমন তাদের মেটিং পার্টনার হিসেবে তাদের চেয়ে একটু কম বয়সী নারীকে বিয়ের জন্য নির্বাচন করে, ঠিক তেমনি, নারীরাও তাদের চেয়ে একটু বেশি বয়সী পুরুষকে পাত্র হিসেবে অধিকতর যোগ্য মনে করে। এর কারণ হিসেবে দেখা গেছে, সঙ্গী নির্বাচনের সময় মেয়েরাও গড়পড়তা ছেলেদের কাছ থেকে দয়া আর বুদ্ধিমত্তা আশা করে ঠিকই, পাশাপাশি সঙ্গীর কাছ থেকে আশা করে ধন সম্পদ কিংবা স্ট্যাটাস। সাধারণত যে কোন সমাজেই দেখা যায়, বয়সের সাথে সাথে পুরুষের আয় রোজগার ক্রমশ বাড়তে থাকে। আমি আমেরিকার যেখানে থাকি, সেখানে একজন ত্রিশ বছরের যুবক একজন বিশ বছরের যুবকের চেয়ে গড়পড়তা চোদ্দ হাজার ডলার বেশি রোজগার করে। কেবল আমেরিকা নয়, অধ্যাপক বাস ছয়টি মহাদেশ এবং পাঁচটি দ্বীপপুঞ্জের ৩৭ টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা ১০,০৪৭ জনের উপাত্ত সংগ্রহ করে উপর সমীক্ষা চালিয়েছেন — একেবারে আলাস্কা থেকে শুরু করে সেই জুলুল্যান্ড পর্যন্ত। প্রতিটি সংস্কৃতিতেই দেখা গেছে, মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে আর্থিক প্রতিপত্তিকে অনেক বেশী গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করে। জাপানে এই ‘চাহিদা’ সবচেয়ে বেশী দেখতে পাওয়া যায় আর হল্যান্ডে সবচেয়ে কম — কিন্তু তারপরেও সংস্কৃতি নির্বিশেষে নারী-পুরুষের চাহিদার স্বরূপের প্যাটার্নটি একই রকমই থাকে। বিবর্তনীয় পথের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় পুরুষেরা সংসারের দায়িত্ব নিয়েছে আর বাইরে কাজ করে রুটি রোজগারের ব্যবস্থা করেছে, সে কারণেই হয়তো একটি নারীর কাছে একটি পুরুষের সম্পদ, ভাল চাকরী, খ্যাতি, সামাজিক প্রতিপত্তি প্রভৃতি সচরাচর ‘আকর্ষণীয়’ বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিভাত হয়। সে কারণে এখনো মেয়েরা বিয়ের সময় তাদের চেয়ে বয়সে বড় একটি ছেলের ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হয়।
একটি জায়গায় একটু ব্যতিক্রম পাওয়া গেছে অবশ্য। ‘ছেলেরা তাদের চেয়ে কম বয়সী মেয়ে পছন্দ করে’ — এ ব্যাপারটা পাথরে খোদাই করা কোন নিয়ম নয়। বরং গবেষক কেনরিক এবং তাঁর দলবলের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশব এবং যৌবনের মধ্যবর্তী সময়ে অর্থাৎ বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে ছেলেরা তার বয়সের চেয়ে বেশি বয়সের মেয়েদের প্রতি আগ্রহী হয় (৬১)। এখানেও খুঁজলে দেখা যাবে রাজত্ব করে সেই জৈববিবর্তনের নিয়মই। একটি ১৫ – ১৬ বছরের ছেলের কাছে নারীর উর্বরাশক্তির নিরিখে ১২-১৪ বছরের নারীর চেয়ে ১৬/১৭ বছরের নারী অধিকতর আকর্ষণীয় বলে প্রতীয়মান হওয়ার কথা। তাই হয়। তাই এই বয়সে ছেলেদের ঝোঁক থাকে তার চেয়ে একটু বেশি বয়সের নারীকে পছন্দ করার, কিন্তু বিশ বছরের পর থেকেই এটা ক্রমশ ঘুরে যেতে শুরু করে, এবং একজন পরিণত বয়সের পুরুষ সঙ্গিনী হিসেবে তার চেয়ে কম বয়সী নারীকেই প্রেয়সী হিসেবে সনাক্ত করেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রণয়-জীবন যেন বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের এই ‘ক্লাসিক ট্রেন্ডের’ সফল মঞ্চায়ন। রবীন্দ্রনাথের বয়সন্ধিকালীন বা এর আগেকার সময়ে কাদম্বরী দেবী, এবং আনা তড়খড় সহ তাঁর পছন্দের নারীদের বয়স ছিল তাঁর চেয়ে বেশি। অথচ বিশ-বাইশ বছর বয়স অতিক্রম করার পরে যে সমস্ত নারীদের নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন, গান লিখেছেন, যে সমস্ত নারীরা হয়েছেন সাময়িক সময়ের জন্য হলেও তাঁর চিত্তচাঞ্চল্যের কারণ – তারা সবাই কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বয়সে ছিলেন নবীন। বোঝাই যায় ‘প্রেমপিয়াসী’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নারী সৌন্দর্য অনুধাবন এবং অবগাহনের ক্ষেত্রে চিরন্তন বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের ট্রেন্ডকে অতিক্রম করতে পারেননি। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা পুরুষদের সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরো কিছু চাঞ্চল্যকর প্যাটার্নের হদিস দিয়েছেন। দেখা গেছে, গড়পড়তা পুরুষেরা ত্রিশ বছর বয়সের দিকে কোন নারীকে সঙ্গী হিসেবে চয়ন করলে, তার সাথে সঙ্গিনীর বয়সের ব্যবধান থাকে পাঁচ বছর। কিন্তু পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিরা পাত্রী নির্বাচনকালে সময় পাত্রীর সাথে তার বয়সের ব্যবধান হয়ে দাঁড়ায় বিশ বছর (৬২)।
বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে পুরুষদের অপেক্ষাকৃত বয়ঃকনিষ্ঠ নারীকে সঙ্গী হিসেবে পাবার ব্যাপারটি পুরুষদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিয়ে করার সময় অপেক্ষাকৃত সহজভাবে দৃষ্ট হয়। প্রাপ্ত একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, আমেরিকায় পুরুষদের প্রথম বিয়ের সময় পাত্রীর সাথে গড়পড়তা বয়সের ব্যবধান থাকে তিন বছর, দ্বিতীয় বিয়ের সময় পাঁচ বছর, আর তৃতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে তা গিয়ে দাঁড়ায় অন্ততঃ আট থেকে দশ বছর63 । মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে স্ত্রী মৃণালিনীকে হারানোর পর রবীন্দ্রনাথ অবশ্য বিয়ে থা করেননি, কিন্তু স্ত্রী বিয়োগের পর যে সমস্ত নারীদের প্রতি তিনি দুর্বল হয়েছিলেন তাঁদের বয়স এবং সৌন্দর্য বিচারে বলা যায় যে, তিনি পুনর্বার বিয়ে করলে হয়তো সেই ধারাতেই সমাপতিত হতেন। বিশেষত তাঁর শেষ জীবনে অর্থাৎ ষাটোর্ধ রবীন্দ্রনাথের মানসপ্রতিমারা — রাণু অধিকারী, রানী মহলানবিশ কিংবা ওকাম্পোর সাথে তাঁর বয়সের ব্যবধান গোনায় ধরলে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতা অনিবার্যভাবে আমাদের মনের আঙ্গিনায় হানা দিতে বাধ্য।
রবীন্দ্রনাথকে এমন জৈবিকভাবে উপস্থাপনের ফলে রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞরা হয়তো গোস্যা করতে পারেন। তারা হয়তো বলবেন, সে সমস্ত নারীদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রেম ঠিক সেভাবে শরীর-নির্ভর ছিলো না। ছিলো অনেকটা আধ্যাত্মিক, প্লেটোনিক। এটা ঠিক, রবীন্দ্রনাথের বহু গান ও কবিতাতেই এ ধরণের ‘নিষ্কাম’ প্রেমের সন্ধান মেলে, কিন্তু আবার অনেক জায়গাতেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দেয় শরীরী আবেদন। তাঁর ‘চুম্বন’, ‘স্তন’, ‘বিজয়িনী’, ‘বিবসনা’, ‘বলাকা-১৪’, ‘মানস সুন্দরী’, ‘হৃদয়-আসন’, ‘শেষ চুম্বন’ কিংবা ‘দেহের মিলন’-এর মতো কবিতায় নারীদেহের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বলিষ্ঠ ভাবেই প্রকাশ পেয়েছে। আসলে ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যে যৌনতার আনয়নে, শরীরের উপস্থাপনায় কুণ্ঠিত এবং সম্ভোগ-বিমুখ’ — এমন একটি মিথ যে জনমানসে প্রচলিত, তার ব্যবচ্ছেদ করেছেন ইমন ভট্টাচার্য তাঁর সাম্প্রতিক ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে যৌনতা : একটি কিংবদন্তীর পুনর্বিচার’ শীর্ষক প্রবন্ধে (৬৪)। রবীন্দ্র-সাহিত্য সিঞ্চন করে বিশেষতঃ গল্প, কবিতা এবং নাটক থেকে অজস্র উপকরণ তুলে এনে লেখক দেখিয়েছেন,’রবীন্দ্রনাথ যৌনতার বর্ণনায় কুণ্ঠিত ছিলেন না আদৌ। বরং রবীন্দ্রসাহিত্যই সেই ক্ষেত্র যেখানে যৌনতা এতো বিচিত্র রঙে, বিচিত্র মাত্রায় বর্ণিত হয়েছে’। এমন নয় যে, যৌনতার এই ‘বিচিত্র রঙ’ কেবল সাহিত্য কীর্তিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯২৪ সালে লেখা রবীন্দ্রনাথকে লেখা রাণু অধিকারীর অন্ততঃ একটি চিঠিতে উল্লেখ আছে যে, একদিন ‘ভানুদাদার সমস্ত আদর’ তিনি পেয়েছিলেন, এবং সে আদর রাণুর ‘মনকে ভরে দিয়েছিল’। সেই চিঠিতে রাণু এমনও ইঙ্গিত করেছিলেন যে তিনি আর কখনো কাউকেই বিয়ে করবেন না, কারণ ‘রবীন্দ্রনাথের সাথে তো তাঁর বিয়ে হয়েই গেছে’। ব্যাপারটা ‘ভানুদাদা হয়তো মানবেন না’, কিন্তু রাণু সেটা মানেন (৬৫) । এ ধরণের কিছু ঘটনা কেবল রাণুর ক্ষেত্রেই নয়, আর্জেন্টিনায় ওকাম্পোর গৃহে থাকাকালীন সময়েও ঘটেছিল। এমন একটি ঘটনার উল্লেখ ওকাম্পোর স্মৃতিকথার ফরাসী ভাষ্য (আত্মজীবনীর অপ্রকাশিত ফরাসি খসড়া) থেকে সরাসরি ইংরেজি অনুবাদ কেতকী কুশারী ডাইসন করেছেন ‘ইন ইয়র ব্লসমিং ফ্লাওয়ার গার্ডেন’ বইয়ে (৬৬) :
শেষ পর্বে সমস্ত ফুট নোট দেওয়া রয়েছে।
(ক্রমশ)