আজ থেকে ঠিক ১০২ বছর আগে বাঙালি পেয়েছিল এমন এক সংগীতশিল্পীকে যিনি ছিলেন স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল, নিজস্বতায় ভরপুর, যাঁর সুর সংযোজনায় ছিল অভিনবত্ব, গায়কি ছিল অনন্য। জন্ম ২০ অক্টোবর ১৯২০।
অখিলবন্ধু ঘোষ। নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মনের আকাশে ভেসে আসে না কোনও নির্দিষ্ট মানুষের অবয়ব। ভিড় করে আসে এমন সব গান, যে গান শুনতে চেয়েছে মন বারবার। বাংলা সংগীত পিয়াসী মন যে মধুর সুরের আকাশে পাড়ি দিতে উৎসুক হয়েছে সারাক্ষণ। ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা’, ‘কেন তুমি বদলে গেছ’, ‘এমনি দিনে মা যে আমার হারিয়ে গেছে’ — যেন কোনও এক উদাসী বাউল গেয়ে চলেছে যুগের পর যুগ ধরে। সে গানে কোনও উদ্দামতার অবকাশ নেই, নেই কোনও গর্জনতর তরঙ্গের সম্ভাবনা। যেন কোন সুপ্রাচীন যুগে তাঁর মাধুর্যমণ্ডিত কণ্ঠধ্বনি মাটির বুকে আশ্রয় নিয়েছিল, আজও যার সঞ্চরণ কান পাতলে শোনা যায়। তাঁর কণ্ঠের সহজ সরল অনাড়ম্বর সৌন্দর্য শ্রোতার মনকে চিরকাল আবিষ্ট করেছে। তাঁর কণ্ঠের নিবিড় আর্তি মুক্ত করেছে সংগীতের গভীর ভাবসম্পদকে, কী রোমান্টিক প্রেমের উজ্জ্বল দীপ্তিতে, কী বিরহের অশ্রুসিক্ত আঁখিপাতে, কী মাতৃহারা বেদনার অচিন সরণিতে।
“সময়টা মনে নেই, হুগলি জেলায় একটা কলেজে অনুষ্ঠানে গিয়েছি গান গাইতে। অখিলদাও গেছেন, আর ছিলেন হাস্যকৌতুক শিল্পী শীতল বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক দূরের পথ, সকালে রওনা হয়ে দুপুরে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া করে সবাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। সন্ধেবেলায় আমাদের জলসা। হঠাৎ কান্নার শব্দ, দেখি অখিলদা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। আমরা দুজন একেবারে অবাক। তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানলাম — টার্ফ রোডের বাড়িতে দোতলায় ময়না পাখিটাকে খেতে দিয়ে আসেননি, কী করে যে ভুলে গেছেন, বৌদিও আজকে বাড়ি নেই, পাখিটা বোধহয় মারা যাবে…। এমন মানসিকতা না থাকলে কেউ মরমী শিল্পী হতে পারে?”
ঠিকই চিনেছিলেন অনুজ সংগীতশিল্পী মৃণাল চক্রবর্তী। মরমী শিল্পী বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা-ই ছিলেন অখিলবন্ধু ঘোষ। ‘শিপ্রা নদীর তীরে’, ‘কবে আছি কবে নেই’, ‘এমনি দিনে মা যে আমার’, ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, আমি কাঁদি সাহারায়’, ‘ও বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজায়ো না’ — প্রতিটি গানে এক বিরহী মনের হাহাকার আর অভিমান ছুঁয়ে যায় শ্রোতার মন।
১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর জন্ম অখিলবন্ধু ঘোষের। এক সাক্ষাৎকারে শিল্পীর পত্নী দীপালি ঘোষ জানিয়েছিলেন, অখিলবন্ধুর আদি বাড়ি নদিয়ার রানাঘাটের কাছে হলেও আসলে তাঁরা বালির বিখ্যাত ঘোষ পরিবারের বংশধর, যে বংশের উজ্জ্বল নক্ষত্র ঋষি অরবিন্দ। অখিলবন্ধুর বড় হওয়া চাকদার মামাবাড়িতে। মামা কালিদাস গুহ-র জন্যেই সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক। কয়েক বছর পর, কলকাতার ভবানীপুরে চলে আসা। সেখান থেকেই শিল্পী অখিলবন্ধুর গড়ে ওঠার সূচনা।
সম্পূর্ণ প্রচারবিমুখ এক শিল্পী সারাটি জীবন গানকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলেন। ‘কী পাব আর কী পাব না’ সে হিসেব ছিল না কোনও দিন। গান ছিল তাঁর চলার পথের আনন্দ। গান তাঁর জীবনের সাধনার ধন, পূজার মূল উপকরণ। বাবা বামনদাস ঘোষ যখন রানাঘাটে থাকতেন তখন অখিলবন্ধু নিতান্তই বালক। বেশির ভাগ সময় কাটতো তাঁর মামার বাড়ি চাকদায়। মামা কালিদাস গুহ ছিলেন সংগীত অনুরাগী ও সংগীতের পৃষ্ঠপোষক। কিশোর বয়সে অখিলবন্ধুর গানের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় অনুকূল পারিবারিক সংগীত আবহে। গান শুনে শুনে নিখুঁত ভাবে কণ্ঠে তুলে নিতেন অখিল। ভাগ্নের এমন সংগীত প্রীতি দেখে কালিদাস গুহ প্রথমে নিজেই গান শেখাতে শুরু করেন। একটা সময় বামনদাস চলে আসেন কলকাতার ভবানীপুরের ২৫বি, টার্ফ রোডের ভাড়া বাড়িতে। সেখানে অখিলকে পড়াশোনার জন্য ভর্তি করেন ভবানীপুরের নাসিরুদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুলে। কিন্তু ম্যাট্রিক পাশ করার পরে আর পড়াশোনা করার কোনও চেষ্টা না করে সম্পূর্ণ ভাবে ঢুকে পড়েন সংগীত জগতে। কলকাতায় এসে তালিম পেলেন একে একে নিরাপদ মুখোপাধ্যায়, সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর মতো গুণিজনদের কাছে। সম্ভবত কিছু দিনের জন্য পণ্ডিত কে জি ঢেকনের কাছেও তালিম নিয়েছিলেন অখিলবন্ধু। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে গভীর দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, কিন্তু পরিবেশনায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তাঁর ছায়াসঙ্গীই হয়ে রইল, আলোয় প্রকাশ পেল না। নিজস্ব ধরনের আধুনিক বাংলা গানে তিনি হয়ে উঠলেন অনন্য।
১৯৪০-এর দশকে তখন কলকাতা টালমাটাল আন্দোলন-দুর্ভিক্ষ-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব-দাঙ্গা-দেশভাগ ইত্যাদি নানা কারণে। অন্য দিকে বাংলা গানের জগতে প্রতিভার ছড়াছড়ি। ১৯৪৪-৪৫ সাল থেকে কলকাতা বেতারে গান গাওয়ার মাধ্যমে শুরু হল অখিলবন্ধু ঘোষের যাত্রা। ১৯৪৭ সালে প্রথম রেকর্ড। সন্তোষ মুখোপাধ্যায়ের সুরে গানদু’টি ছিল — ‘একটি কুসুম যবে’ এবং ‘আমার কাননে ফুটেছিল ফুল’। প্রথমটির গীতিকার অখিলবন্ধু নিজেই, দ্বিতীয়টি ব্যোমকেশ লাহিড়ীর লেখা। এর পর কয়েকটি রেকর্ড পেরিয়ে ছ’নম্বর রেকর্ডে (১৯৫৩) ঝলসে উঠলেন অখিলবন্ধু। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় গাইলেন, ‘মায়ামৃগ সম’ এবং ‘কেন প্রহর না যেতে’। সুরকার যথাক্রমে দুর্গা সেন ও দিলীপ সরকার। প্রথম গানটি যে শুদ্ধ ও কোমল ধৈবত-এর এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে শুরু হয়, তা অখিলবন্ধুর কণ্ঠে অপূর্ব মায়া তৈরি করে। কী অনায়াস গায়ন-ভঙ্গি! অথচ অসম্ভব জটিল পথে সুরের চলন, আবার বাণীর মর্যাদাও অক্ষুণ্ণ। এই রেকর্ড থেকেই প্রতিভার জাত চেনালেন শিল্পী অখিলবন্ধু ঘোষ।
‘শিপ্রা নদীর তীরে’, ‘কবে আছি কবে নেই’, ‘এমনি দিনে মা যে আমার’, ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, আমি কাঁদি সাহারায়’ — প্রতিটি জনপ্রিয় গানই তাঁর নিজের সুর করা। ‘তোমার ভুবনে…’ গানটি মাঝ-খাম্বাজ রাগিণী নির্ভর। গানের মাঝে টুকরো তানকারিও করেছিলেন, কিন্তু সমস্ত কসরত ছাপিয়ে শ্রোতাকে ছুঁয়ে গেছে বিরহী মনের হাহাকার। খানদানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে যিনি শিক্ষিত, ঠুংরি, কাজরী বা চৈতি-র সূক্ষ্ম কাজ যাঁর গলায় অনায়াস, সেই তিনি কয়েকটি গানের সুরনির্মাণ ও গায়কিতে এমন এক অভিনবত্ব এনেছিলেনন, যা তাঁর আধুনিকমনস্কতা ও নিজস্বতার পরিচায়ক। যেমন – ‘পিয়ালশাখার ফাঁকে ওঠে’, ‘ওই যে আকাশের গায়’, ‘যেন কিছু মনে কোরো না’ (সুর: সহধর্মিণী দীপালি ঘোষ), ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ ইত্যাদি গান অদ্ভুত সংলাপধর্মী কাটা কাটা ভঙ্গিতে গেয়েছেন অখিলবন্ধু। শেষের গানটিতে শচীন দেব বর্মণের প্রভাব কানে বাজে। গানের শুরুতে সুরহীন ভাবে ‘ঐ যাঃ’ কথাটা বলে গানটি শুরু হয়, ঠিক যেমন শচীনকর্তা ‘ডাকাতিয়া বাঁশি’ গানটা গাইবার আগে ‘আঃ’ কথাটা বলে উঠতেন। লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকে সন্তোষ মুখোপাধ্যায়ের সুরে অখিলবন্ধুর গাওয়া ‘কোয়েলিয়া জানে’ গানটিও শচীন দেব বর্মণকে মনে করায়।
তবে শুধু বিরহই কি তাঁর গানের একমাত্র সম্পদ ছিল? যখন শুনি ‘পিয়ালশাখার ফাঁকে ওঠে’, ‘ওই যে আকাশের গায়’, ‘যেন কিছু মনে কোরো না’, ‘সেদিন চাঁদের আলো’, ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ ইত্যাদি গান, তখন আমরা অন্য অখিলবন্ধুকে পাই। আসলে তাঁর গান ছিল স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল, নিজস্বতায় ভরপুর, সুর সংযোজনায় অভিনব, গায়কিতে অনন্য।
বাংলা রাগপ্রধান গানের জগতে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্রও ছিলেন তিনি। ‘আজি চাঁদিনি রাতি গো’ (কেদার), ‘জাগো জাগো প্রিয়’ (ভাটিয়ার), ‘বরষার মেঘ ভেসে যায়’ (সুরদাসী মল্লার), ‘আমার সহেলী ঘুমায়’ (মারু বেহাগ) – এ রকম আরও অনেক রাগপ্রধান গান অপরূপ হয়েছে শিল্পীর কণ্ঠে। রাগরাগিণীর প্রকাশ যে কতখানি ভাবের পথে হতে পারে, অখিলবন্ধুর গাওয়া রাগপ্রধান গান তার অন্যতম দৃষ্টান্ত! বেশ কিছু নজরুলগীতিতেও তিনি নিজস্ব ভাবমাধুর্যে ভাস্বর, এ প্রসঙ্গে তাঁর গাওয়া শ্যামকল্যাণ রাগে কাজিসাহেবের ‘রসঘন শ্যাম’ গানটির উল্লেখই যথেষ্ট। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রশ্নাতীত দক্ষতা থাকলেও, রেকর্ডে খেয়াল-ঠুংরি বা গীত-ভজন তেমন শোনা যায়নি তাঁর কণ্ঠে। তবে বেতারে গেয়েছিলেন। যেমন, ১৯৪৯ সালে বেতারে সম্প্রচারিত অখিলবন্ধু ঘোষের গাওয়া দু’টি অসাধারণ ভজন – ‘ফরিয়াদ মেরি সুনলে ও ভগওয়ান’ (কথা : মুন্সী জাকির হোসেন, সুর: দুর্গা সেন) এবং ‘তুম মুরলী শ্যাম বাজাও’ (কথা : সুরদাস, সুর : অখিলবন্ধু ঘোষ)।
মূলত আধুনিক গানের শিল্পী হলেও পেশাগত সংগীত জীবনের প্রথম দিকে অখিলবন্ধু বেতারে খেয়াল, ঠুংরি ও রাগপ্রধান গাইতেন। ১৯৭৭ সালে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে এলপি রেকর্ডে প্রকাশিত ‘জাগো জাগো প্রিয়’(ভাটিয়ার), ‘বরষার মেঘ ভেসে যায়’ (সুরদাসী মল্লার), ‘সে কুহুযামিনী চমকে দামিনী’ (জয়জয়ন্তী) গানগুলো শুনলে বোঝা যায় তিনি বাংলা রাগসংগীতে কত নিপুণ আর গভীর ছিলেন। এই রেকর্ডের প্রতিটি গানের আদ্যপান্ত তরঙ্গের পর তরঙ্গ তুলে শ্রোতার মনকে মধুর সুরসুষমায় সিক্ত করে।
অখিলবন্ধু ঘোষের প্রথম রেকর্ড (জেএনজি ৫৮৪০) প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে। রেকর্ডের একপিঠে ছিল ‘একটি কুসুম যবে ফুটেছিল’ (কথা — অখিলবন্ধু ঘোষ) এবং উলটো পিঠে ‘আমার কাননে ফুটেছিল ফুল ’(কথা — ব্যোমকেশ লাহিড়ী)। দু-টি গানেরই সুরকার সন্তোষ মুখোপাধ্যায়। এখানে লক্ষণীয়, প্রথম রেকর্ডের প্রথম গানে তিনি গীতিকার রূপে আবির্ভূত। শুধু তাই নয়, ১৯৪৮ সালে হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে প্রকাশিত দ্বিতীয় রেকর্ডে (এইচ ১৩০১) গাওয়া ‘ফাগুনের চাঁদ ডুবে গেল গানটির গীতিকার-সুরকার ছিলেন তিনি নিজেই।
নিজের বেশির ভাগ গানে বৈচিত্রময় সুরারোপ করলেও, অন্যের কণ্ঠে অখিলবন্ধুর সুর দেওয়া গান পাওয়া যায় মাত্র দু’টি রেকর্ডে। একটি রেকর্ডে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় দু’টি গান, ‘যমুনা কিনারে’ ও ‘মনে নেই মন’ এবং আর একটি লং প্লেয়িং রেকর্ডের সঙ্কলনে কয়েকটি গানের মধ্যে একটি ভজন ‘গুরু মোহে দে গ্যায়ে’ (গীতিকার : কবীর দাস) অখিলবন্ধু ঘোষের সুরে গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েক জন শিল্পীর গানে তিনি সুর দিয়েছিলেন যে গানের কথা এবং শিল্পী আজ একেবারেই বিস্মৃত। যেমন – ‘আধেক ফাগুনে রাতের শিশিরের’ (১৯৪৮), শিল্পী — অতুল মুখোপাধ্যায়, গীতিকার — তড়িৎকুমার ঘোষ, ‘তোমার ভুবনে আমার আঙিনা তলে’ (১৯৪৯), শিল্পী – শ্যামল দাশগুপ্ত, গীতিকার — শরদিন্দু ভট্টাচার্য, ‘যমুনা কেন উঠে ছলকি’ ( ১৯৫০), শিল্পী – গীতশ্রী আরতি সরকার, গীতিকার – কানাই ঘোষাল — এই গানগুলি বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
ছায়াছবির জগতেও সুরকার হিসেবে কাজ করেননি তিনি। শুধুমাত্র ‘শ্রীতুলসীদাস’ (১৯৫০), ‘মেঘমুক্তি’ (১৯৫২) ও ‘বৃন্দাবনলীলা’ (১৯৫৮) ছবিতে অখিলবন্ধু ঘোষের নেপথ্য কণ্ঠ শোনা গেছে, যে ছবিগুলির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন যথাক্রমে অনুপম ঘটক, উমাপতি শীল ও রথীন ঘোষ।

হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে অনুপম ঘটকের সুরে ‘শ্রাবণ রজনী শেষে’, ‘স্বপন পারাবারের তীরে’, ‘বল কেমনে জাগাই’, ‘চৈতী গোধূলী যায়’ এবং সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে ‘আমার সমাধি পরে’, ‘মরমিয়া বাঁশি’ প্রকাশের পর এইচ.এম.ভি. থেকে গান রেকর্ড করার আমন্ত্রণ পান তিনি। এইচ.এম.ভি. থেকে শিল্পীর প্রথম রেকর্ড প্রকাশ পায় ১৯৫৩ সালে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় ও দিলীপ সরকারের সুরে। গান দু’টি ছিল ‘কেন প্রহর না যেতে’ এবং ‘মায়ামৃগ সম তুমি কি গো দূরে রবে’। এর পর ‘পিয়াল শাখার ফাঁকে ওঠে’ এবং ‘শিপ্রা নদীর তীরে’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে।
গান গেয়ে এইচ.এম.ভি.-তে তিনি ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু এমন এক স্বনামধন্য কোম্পানিতে তিনি কেন মাত্র দুটো রেকর্ড (চারটি গান) করে ফিরে আসেন তার সঠিক কারণ জানা যায়নি। তবে অনুমান করা যায় হয়তো তাঁর খোলা মেজাজ এবং সরল, আত্মভোলা, আবেগপ্রবণ মানবিক স্বভাবের জন্য। নিজের লাভ-লোকসান নিয়ে বিস্মৃত হয়ে থেকেছেন চিরকালই। ১৯৫৮ সালে মেগাফোন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ প্রয়াত হন এবং কোম্পানি তারপর কিছুদিন মন্দার মধ্যে চলে। সে সময় কমল ঘোষের আহ্বানে অখিলবন্ধু কোম্পানির দুর্দিনে আবার ফিরে আসেন। ১৯৫৯ সাল থেকে মেগাফোন থেকে তিনি একের পর এক গান রেকর্ড করেন, যা মেগাফোনকে বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দেয়। মেগাফোনে শিল্পীর কণ্ঠে ‘কবে আছি কবে নেই’ (১৯৫৯), ‘বাঁশরীয়া বাঁশি বাজায়ো না’ (১৯৬০), ‘ও দয়াল বিচার করো’ (১৯৬১), ‘না হয় মন দিতে তুমি’ (১৯৬২), ‘অভিমানী চেয়ে দেখ’ (১৯৬৫) গানগুলি বাংলা সংগীত ভুবন মুখরিত করে তোলে।
এ প্রসঙ্গে ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ গানটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গানটিতে নিজে সুর বসিয়ে অখিলবন্ধু রেকর্ড করেন ১৯৭১ সালে। গানের শুরুতেই ‘ঐ যাঃ!’ অংশটি অখিলবন্ধু এমন ভাবে বলেন যে গানের পরবর্তী অংশটি অর্থাৎ ‘আমি বলতে ভুলে গেছি’র সঙ্গে ঠিক ভাবে খাপ খেয়ে যায়। অর্থাৎ কিছু বলতে ভুলে গেলে ‘ঐ যাঃ!’ অংশটুকু আমাদের মুখ থেকে যে ভাবে বেরিয়ে আসা স্বাভাবিক, ঠিক সে ভাবেই বলেন অখিলবন্ধু। ঠিক এখানেই মিল খুঁজে পাওয়া যায় শচীন দেববর্মণের ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’র গায়নে। এই গানটি শুরু করার আগে শচীনকর্তা ‘আঃ’ কথাটি বলে উঠতেন। অখিলবন্ধুর ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ গানে শচীনকর্তার ‘ডাকাতিয়া বাঁশি’র যে প্রভাব আছে তা অস্বীকার করা যায় না। আর সেটা থাকাই তো স্বাভাবিক। অখিলবন্ধু মনে মনে শচীন দেববর্মণকেও গুরু বলে মানতেন। মৃণাল চক্রবর্তীও বলেছেন, “উনি চিরকাল শচীন দেব বর্মণের ভক্ত।”
শাস্ত্রীয় সংগীতের সূক্ষ্ম কাজ অখিলবন্ধুর গলায় অনায়াসে খেলা করত, গানের মাঝে টুকরো তানকারিও করতেন। এক একটা মোড়, মুরকী, গোটা গানের পরিবেশনে এমন প্রভাব ফেলত যে শ্রোতারা এক অনাবিল মুগ্ধতায় আবিষ্ট হয়ে যেতেন।
সংগীতজীবনের প্রথম দিকে বৈঠকী অর্ধ-রাগসংগীত বা রাগপ্রধান ধাঁচের গানেই বেশি আগ্রহ ছিল অখিলবন্ধুর। কিন্তু পরবর্তী কালে আধুনিক বাংলা গানে নিজস্ব ঘরানা সৃষ্টি করেন। রাগপ্রধান গানের জগতে তাঁর অবিস্মরণীয় কিছু সৃষ্টি হল ‘আজি চাঁদিনী রাতি গো’, ‘জাগো জাগো প্রিয়’, ‘বরষার মেঘ ভেসে যায়’, ‘আমার সহেলী ঘুমায়’ ইত্যাদি। বেশ কিছু নজরুলগীতিও তাঁর কণ্ঠে অন্য মাত্রা পেয়েছে। ১৯৬১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দু’টি রবীন্দ্রসংগীতও রেকর্ড করেন তিনি — ‘তুমি মোর পাও নাই পরিচয়’ এবং ‘যার মিলন চাও বিরহী”।
সাংগীতিক ভাববিস্তারে অখিলবন্ধু ছিলেন সম্রাট। গানের কথার মধ্যে ঢুকে যেতেন তিনি। প্রতিটি শব্দের অর্থ ও ভাব বুঝে, তার অন্দরে প্রবেশ করে, তার পর তা উপহার দিতেন শ্রোতাদের। এ ব্যাপারে দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গান গাওয়ার সময় তাঁর চোখদু’টি বন্ধ থাকত। একটা তদগত ভাব। সেই মুহূর্তে তিনি গানের মধ্যে ডুবে যেতেন। তাই শ্রোতাদের কাছে তাঁর সংগীত পরিবেশনা এক অনন্য মাধুর্য সৃষ্টি করত।
তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় গান ‘ও দয়াল বিচার করো’-এর পাশাপাশি শোনা যাক ‘ও বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজায়ো না’। দু’টিই প্রেমের গান। কিন্তু দু’টি গানের আকুতি ভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে। একটিতে দয়ালের কাছে বিচার চাওয়া হচ্ছে, আর অন্যটিতে বাঁশিকে থামতে বলা হচ্ছে। কী অনায়াস দক্ষতায় ভিন্ন মাত্রার এই আকুতি শ্রোতাদের কাছে সাবলীল ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন অখিলবন্ধু তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
চিরকাল প্রচারের আড়ালে থেকে যাওয়া এই মানুষটি যোগ্য সঙ্গিনী পেয়েছিলেন দীপালি ঘোষকে। তাঁর সহধর্মিণী দীপালি ছিলেন তাঁর এক সময়ের ছাত্রী, তিনিও এক গুণবতী রত্ন, সুরকার। অখিলবন্ধুর বেশির ভাগ গান নিজের সুর দেওয়া হলেও, বেশ কয়েকটা গানে সুর দেন দীপালি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘যেন কিছু মনে কোরো না’, ‘সারাটি জীবন কী যে পেলাম’, ‘শ্রাবণ রাতি বাদল নামে’, ‘শ্রাবণ নিশীথে এসো’, ‘কেন ডাকো বারে বারে’ ইত্যাদি।
চিরকাল ছিলেন প্রচারবিমুখ, আত্মমগ্ন। তাঁর স্ত্রী দীপালি ঘোষ ছিলেন শিল্পী অখিলবন্ধুর প্রকৃত সুরসঙ্গিনীও। সংগীতগুরুরা ছাড়া অভিন্নহৃদয় সহধর্মিনী দিপালী দেবী ছিলেন তাঁর গানের একমাত্র সহচরী ও ছায়াসঙ্গিনী। নিঃসন্তান দিপালী দেবী সারাজীবন পাশে থেকেছেন কী গানে, কী বাস্তব জীবনের ঘাত প্রতিকূলতায়। একাকী যে সাধনা, অবলম্বন বিহীন যে অবস্থিতি, সংগতবিহীন যে সংগীত, তা নিঃসন্তান দিপালী দেবীর সংস্পর্শে সার্থকতা পেয়েছিল অখিলবন্ধুর জীবনে।
সুরসাধকের প্রয়াণ ১৯৮৮ সালের ২০ মার্চ। ৬৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। জীবনে তিনি তাঁর যোগ্যতার উপযুক্ত সম্মান পাননি। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো বিশিষ্ট শিল্পীরাও বলেছেন এ কথা। মৃত্যুতেও তিনি অবহেলার শিকার হয়েছেন। অন্ডালে একটি অনুষ্ঠান করে ফিরে এসেছিলেন সে দিন সকালে। দুপুরে হঠাৎ তাঁর শরীরটা খারাপ লাগতে থাকে। তাঁকে পি.জি. হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ চিকিৎসাহীন অবস্থায় পড়ে থাকার পর তাঁকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
মৃণাল চক্রবর্তী তাঁর আত্মজীবনী ‘খোলা জানালার ধারে’-তে লিখেছেন, “লেখকদের জগতে যেমন একটা কথা আছে লেখকদের লেখক, অখিলদাকে আমি আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে গায়কদের গায়ক বলে মনে করি।”
একেবারে খাঁটি কথা। অখিলবন্ধুর গায়কি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, নিজস্ব। তাঁর গায়কি অনুসরণ করা একেবারেই সহজ ছিল না। মৃণাল চক্রবর্তীর অনুভবেরই প্রতিধ্বনি করে বলি, আধুনিক বাংলা গানে নিজের নির্জন স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন অখিলবন্ধু ঘোষ।
সে কারণেই হয়তো তাঁর ‘সারাটি জীবন কী যে পেলাম/ এই মায়াভরা পৃথিবীতে/ পেয়েছি যতই, তারও বেশি করে/ হয়তো হয়েছে দিতে’ গানটিতে এক অভিমানী শিল্পীর বেদনা এমন গভীর হয়ে ফুটে উঠেছে।
অনেক শিল্পীর মাঝে বাংলা গানের পুরোপুরি বদলে যাওয়া পৃথিবীতে তিনি আজ অনেকটাই ব্রাত্য। ‘সারাটি জীবন’ ধরে সংগীতরসিক বাঙালিকে তাঁর হৃদয় উৎসারিত গানে মাতিয়ে দিয়ে তিনি কী যে পেলেন, তা খুঁজতে গিয়ে শুধুই আজ যেন মেলে একরাশ বেদনামথিত দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার।
তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার : ‘খোলা জানালার ধারে’ — মৃণাল চক্রবর্তী, ‘শতবর্ষে অখিলবন্ধু’ — অভীক চট্টোপাধ্যায়, আনন্দবাজার পত্রিকা, আ মরি বাংলা ডট কম — রেকর্ড সংগ্রাহক শ্রীকানাইলাল, খবর অনলাইন।