বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন উত্তরপ্রদেশের ভোট মিটলেই দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তা আরও ত্বরান্বিত করলো। পেট্রোল, ডিজেলের দাম বাড়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। শুধু ভারত নয়, যুদ্ধের কারণেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে সারা পৃথিবী জুড়ে। এখনই তা ব্যারেল প্রতি ৭৫২৭ টাকার বেশি দরে বিকোচ্ছে। ২০১৪র পর জ্বালানি তেলের দাম এত বাড়েনি। যুদ্ধ মানে জ্বালানি তেলের দাম বাড়া আর সঞ্চিত ভান্ডারে হাত পড়া, এত আমরা সবাই জানি। নাহলে যুদ্ধ জাহাজ, যুদ্ধ বিমান, ট্রাক, ট্যাঙ্কার সাজিয়ে মানুষ মারার কারবার চলবে কি করে! ভোটের দায়ে এখন দেশে এই বৃদ্ধি সাময়িক স্থগিত রাখলেও সবাই জানে পেট্রোল এবং ডিজেলের দাম আর মোটেই লিটার প্রতি ৯৫.৪১ এবং ৮৬.৬৭ পয়সাতে আটকে থাকবে না। যুদ্ধে যারা মরলো, তারা তো গেলই দুনিয়া জুড়ে গরিব মানুষকে ভাতে মারার ব্যবস্থাটাও পাকা। কারণ কোন যুদ্ধই এখন আর লোকাল নয়, বরং তা আদতে গ্লোকাল।
বিশেষজ্ঞরা হিসেব কষে দেখিয়েছেন অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে দেশে পেট্রোল, ডিজেলের দাম লিটার পিছু ৮-৯ টাকা বেড়ে যাবে। এককথায় দেশের এনার্জি বিল যে বাড়ছে তা নিয়ে আর কোন সন্দেহ নেই। এমনিতে ভারত রাশিয়া থেকে তার প্রয়োজনের মাত্র ২ শতাংশ অপরিশোধিত তেল নেয়। তাতে এই মূল্য বৃদ্ধিতে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে যুদ্ধের ফলে সারা পৃথিবী জুড়েই যদি অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ে তবে পৃথিবীর সব দেশই চাপে পড়বে। অন্যদিকে আমেরিকা আর তার বন্ধুরা ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে ধাক্কা খাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থা। এর ফলে দ্রুত তেলের দাম বাড়বে।

এত গেল বাইরের সমস্যা, অভ্যন্তরীণ সমস্যাও আছে। দেশে তেলের দাম কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির করের ওপর নির্ভরশীল। স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি তেলের যোগান কমলে এবং সবরাহের সংকট দেখা দিলে রাজ্যগুলির কর বাড়াবে কেন্দ্রীয় সরকার। অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকেও কর বাড়াতে হবে। তেলের দাম বাড়ানো বা কমানোর ব্যাপারে মোটামুটিভাবে এদেশের কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সরকারের আর্থিক অবস্থা মোটেই ভালো নয়, তাই এক্ষেত্রে জনমুখী কোন নীতির আশা করা এখন কষ্টকল্পনা। এখনও আমাদের দেশ তার প্রয়োজনের ৮৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল সৌদি আরব আর আমেরিকা থেকে নেয়। তাদের মর্জিমাফিক চলতে হয় দেশকে। তাই অতীতে আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে হয়েছিল ভারতকে।
এই সংকটে একটাই আশা, এর ফলে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে মুখ ফেরাতে পারে গোটা বিশ্ব। বাড়তে পারে বিদ্যুৎচালিত পরিবহন এবং পরিবেশবান্ধব শক্তির ব্যবহার। কিন্তু সমস্যা হল, ডিজেলের ওপর মাত্র ৩৫/৪০ শতাংশ পণ্যের পরিবহণ নির্ভরশীল। মোট কথা যুদ্ধ না থামলে তেল সংকট কমবে না বরং বাড়বে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারা পৃথিবী জুড়ে তেল সংকটকে তীব্র করবে। যার পরিণতিতে আরও তীব্র হবে আপনার, আমার মত ছাপোষা মানুষের সংকট।