বঙ্গোপসাগরে বুক থেকে উঠে আসা এক ভূখণ্ডে নৌ-সভ্যতার চিহ্ণ যে পরতে পরতে জড়িয়ে থাকবে তা পুরাতন কলকাতাপ্রেমীদের বলে দিতে হয় না৷ বস্তুত কলকাতার ইতিহাস তিন-চারশো বছর ধরেই ইউরোপীয় ধর্মযাজক, ব্যবসায়ী ও জলদস্যুদের ‘কাপ্তেনি’র বৃত্তান্তে ভরপুর৷ আর্মেনিয়ান, ইংরেজ, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, দিনেমার বণিকরা কলকাতাকে তাদের ‘হ্যাপি হান্টিং গ্রাউন্ড’ বানিয়ে তুলেছিল৷ আর্মেনীয়রা ইংরেজের মতো যুদ্ধবাজ জাত নয়, তাদের কলকাতায় আগমন মোগল-বাঘের পিছু পিছু ফেউয়ের মতো৷ কলকাতায় আর্মেনীয় সমাধিই সর্বাধিক প্রাচীন।
জোব চার্নকের অনেক আগেই, ১৬৭৯ সালে ‘ফ্যাকন’ (Falcon) নামে একটি বড়ো জাহাজ গার্ডেনরিচে নোঙর করে৷ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্ট্যাফোর্ড সাহেব এই জাহাজের ক্যাপ্ঢেন ছিলেন৷ তিনিই প্রথম ইংরেজ সারেং, যিনি বড়ো জাহাজকে ভাগীরথীতে ঢোকাতে সাহস করেছিলেন৷ এর আগে ওড়িশার বালেশ্বরে সব বড়ো জাহাজ নোঙর করা হত৷ জোব চার্নক যেমন হুগলি, কাশিমবাজার, উলুবেড়িয়া প্রভৃতি অনেক ঘাটের জল খেয়ে বেনিয়াটোলার কাছে রথতলা ঘাটে পা রেখেছিলেন বলে ইতিহাস জানাচ্ছে, তেমনি আর্মেনীয় তথা আর্মানিদের জন্য ছিল আর্মেনিয়ান ঘাট৷ ব্যারেটো ঘাট যে পর্তুগিজদের স্মৃতি উসকে দেয়, তা বলাই বাহুল্য৷ ভাগীরথীর কতকগুলি শাখা কলকাতা-সুতানুটি- গোবিন্দপুরের মধ্যে বিস্তৃত ছিল৷ তার মধ্যে চিৎপুর ক্রিক (খাল), চাঁদপাল ঘাট থেকে ধাপা পর্যন্ত বিস্তৃত ‘ধাপা-ধারা’ (?) খাল ও আদিগঙ্গা উল্লেখযোগ্য৷ মোটামুটিভাবে এই খাল তিনটি ধরেই আদি কলকাতার ভেতরে প্রবেশ করত ডিঙি-নৌকা৷ কলকাতার ধীবরসম্প্রদায় ও নৌ-বাণিজ্যাভিলাষী বণিকের দল এই তিনটি খাল ব্যবহার করতেন৷
বৌবাজারের কাছ থেকে সারেং তথা ‘সরহংগ’রা এই ‘ধাপা-ধারা’ খাল ধরে ভাগীরথীর বুকে আসত ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যেত৷ অনেক বছর এই ট্রেন্ড বজায় ছিল৷ পরে শহর হয়ে উঠতে থাকা কলকাতার বর্জ্য-জঞ্জাল দিয়ে এই খালটি বুজিয়ে ফেলা হয়৷ হেস্টিংস রোড, ক্রিক রো এই খালের ভরাট করা অংশেই তৈরি হয়৷ ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে ‘ডিঙাভাঙা’ অঞ্চল ও ডিঙাভাঙা লেন এই খালে জাহাজডুবি ও নৌকো ভেঙে-যাওয়ার স্মৃতি বহন করছে৷ তার পাশেই আছে জাহাজডুবির মাঠ। খালটির অবলুপ্তির ঘটেছে প্রকৃতির নিয়মে। চিৎপুর ক্রিক বা খালটি উত্তর কলকাতার মধ্যে কাঁসারিপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল৷ বাসনকোসন বিক্রির জন্যে কংসবণিক সম্প্রদায়ের লোকজন এই খাল ধরেই বাণিজ্যে যেত৷ হাওড়ার সালকিয়া তথা শালিখা, বেতোড় তথা ব্যাঁটরা, হুগলির আদিসপ্তগ্রাম পর্যন্ত নৌ-ব্যবসা চালাত কাঁসারিপাড়ার কাঁসারিরা৷ ‘কাঁসারিপাড়ার সঙ’রাও কিন্তু ‘সরহংগ’ চিহ্ণ বহন করছে৷ চুঁচড়োর সঙদের মতো তাদের মুখেও কিছু কিছু ‘অজ্ঞাত’ বুলি শোনা যায়৷ বাচনভঙ্গির মধ্যে পাওয়া যায় পর্তুগিজ তথা ওলন্দাজ নাবিকদের দূরাগত চিহ্ণ৷ আদিগঙ্গা ধরে ঢুকত পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি নাবিক তথা বণিকরা৷

ওলন্দাজ নাবিকরা আদিগঙ্গার একটা দিকে খননকার্য চালিয়ে ‘টলি’স নালা’ বা টালিনালা তৈরি করে৷ যদিও মেজর টলির নামে এটি চলে আসছে।কাটিগঙ্গা বলেও একটি নালা পরিচিত। চিৎপুরের নাখোদা মসজিদও নাবিকচিহ্ণ বহন করছে৷ ‘নাখোদা’ শব্দটি ফার্সি৷ এর অর্থ জাহাজের কাপ্তেন বা নৌকার মাঝিমাল্লা৷ দেড়-দুশো বছর আগে সুরাট থেকে আসা কাচ্চি মেমন সম্প্রদায় এই মসজিদ তৈরি করেছিলেন৷ এঁরা যে নৌ-বাণিজ্যে এসে ধর্মোপাসনায় সুবিধের জন্যেই এই মসজিদ স্থাপন করেছিলেন, তা বলাই বাহুল্য৷
বড়োবাজার পোস্তার কাছে বাসনপট্টির মোড়ে ‘নঙ্গরেশ্বর শিব’-এর মন্দির এখনও আছে৷ অপভ্রংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘লাঙ্গলেশ্বর’৷ কয়েকজন ওড়িয়া পাণ্ডা এখনও এই শিবের পূজারী৷ ইতিহাসে জানা যাচ্ছে, যে সমস্ত হাটুরিয়া ও ব্যবসায়ী সুতানুটি তথা পানপোস্তার ঘাটে নৌকা লাগাত বা নোঙর করত তারা এই নঙ্গরেশ্বর শিবের পুজো দিত৷
‘আঠারো শতকের সিন্দাবাদ’ কাপ্তেন আলেকজান্দার হ্যামিলটন ১৬৮৮ থেকে ১৭১৭-র মধ্যে বেশ কয়েকবার ইংল্যন্ড থেকে ভারতে তথা কলকাতায় আসেন৷ তাঁর বিখ্যাত বই ‘Hamilton’s Account’ নামে সাধারণ্যে পরিচিত৷ প্রাচীন কলকাতার লিখিত বিবরণ বিজ্ঞানসম্মতভাবে হ্যামিলটনই আমাদের উপহার দেন৷
Apjohn নামক ইংরেজ কলকাতা তথা বাংলাকে কলকাতার প্রথম যুগের অন্যতম ছাপাখানা ও কলকাতার প্রথমযুগের প্রামাণ্য মানচিত্র উপহার দেন, পরে Calcutta Chronicle-এর সম্পাদক হন৷ তিনি ছিলেন জাহাজের ব্যান্ডবাদক৷ কলকাতার পরতে পরতে পুরনো নোঙরের গন্ধ পাওয়া যাবে।
তথ্যপূর্ণ লেখা।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। অনুপ্রাণিত হলাম।