‘তোমার কথা হেথা কেহ বলেনা, করে শুধু মিছে কোলাহল’। অনেকে তেড়ে মারতে আসবেন, তবুও শহর আর তার লাগোয়া এলাকার সিনেমা হলগুলির কথা মনে পড়লে আমার এই গানটার কথা মনে পড়ে যায়। সাহেব পাড়ার উচ্চকোটির হল নয়, নিম্নবিত্ত এলাকার সেইসব চিরমলিন অথচ ভিড়ভাট্টায় সরগরম সিনেমা হল আমার লায়েক হওয়ার আগের বয়সের অনেকটাই দখল করে রয়েছে। দূরের হলগুলির ওপর আমার একটা বিশেষ টান ছিল। ‘আয়া তুফান’ দেখেছিলাম রাজাবাজারের নিউ রয়্যাল এ। গ্রে স্ট্রিটের বিধুশ্রীতে দেখেছিলাম ‘সংগ্রাম’। আর কাশীপুরের সদাগর পট্টির রিজেন্ট হলে দেখেছিলাম ‘কাজল’। ফাটাফাটি গান ছিল তাতে, দিল যো না কহে…। এই ছবিগুলি সব পুরনো, মানে তখনই অনেকদিন আগে রিলিজ করা ছবি। নিম্নবিত্ত এলাকার এই হলগুলিতে বেশিরভাগই পুরনো ছবি আসতো। কোন রিলিজ চেন এর কৌলীন্য এরা পায়নি। কাজেই উচ্চকোটির আলোচনায় এই হলগুলির কথা আসা উচিৎ নয়, আসেওনি।

পূর্ণ সিনেমা হল
বাড়ির থেকে পাঠিয়েছিল ‘দ্য লঙ্গেস্ট ডে’ দেখতে। সঙ্গে ছিল আমাদের কাজের লোক দিলীপদা। তখন বেলগাছিয়াতে থাকতাম আমরা। গেলাম টকি শো হাউস। সেইসময় উত্তর কলকাতার একমাত্র ইংরেজি সিনেমা হল। ফাইটিং আছে এমন সিনেমা দেখবো, প্রবল উত্তেজনা। হলে পৌঁছে দিলীপদা বললো, দ্যাখ ফাইটিং দেখবি ভালোকথা কিন্তু তোরাও ইংরেজি বুঝিস না, আমিও না। কেন ফাইটিং বুঝতে পারবো না। তাই চল হিন্দি সিনেমা দেখি। এই বলে দিলীপদা আমাদের একটা গলির মধ্যে দিয়ে হাঁটিয়ে বিধুশ্রী হলের কমদামের টিকিটের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিল। এই সিনেমাটা দেখা নিয়ে আমার একটু দোনামোনা ছিল। কিন্তু হলে পৌঁছে পোস্টার দেখে যাকে বলে একদম ফিদা হয়ে গেলাম। দারা সিং তেড়ে যাচ্ছে, আরেকটা মুশকো জোয়ানের দিকে। পাশেই ঘাগরা পরে নাচছে হেলেন, আর তার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে একটা লোক। যার হাবভাব মোটেই সুবিধাজনক নয়। ‘সংগ্রাম’ দেখে খুব আনন্দ হলেও হিন্দি সিনেমা দেখেছি বলে বাড়িতে মার খেয়েছিলাম। যাকগে সেসব কথা। বিধুশ্রী হলের পাশে ছিল একটা কচুরির দোকান, দিলীপদা সেখানে খাইয়েছিল। এখন অরবিন্দ সরণি হয়ে যাওয়া গ্রে স্ট্রিটে বিধুশ্রী নেই, সেখানে এখন মল হয়েছে। তার কাছের হল খান্না টিঁকে আছে শুধুই বাস স্টপেজের নামে।

মিত্রা সিনেমা হল
বিধুশ্রীর কথা যখন মনে পড়লো, তখন বলি সুরশ্রী’র কথা। গৌরিবাড়ির কাছে খালের ধারে ছিল সুরশ্রী। কোনদিন এই হলে হাউসফুল বোর্ড দেখিনি। খুব নিরিবিলি জায়গা, এখানে আসতো পুরনো বাংলা আর হিন্দি ছবি। বেশীরভাগই বাংলা। এখানে দেখেছিলাম বহু পুরনো একটা ছবি, সাথীহারা। গল্প মনে নেই, গান মনে আছে – ময়না কথা কও, কেন চুপটি করে রও। সুরশ্রী, বিধুশ্রী’র কথা মনে পড়তেই মনে পড়ে গেল, গোয়াবাগানের বিশ্বরূপা থিয়েটারের কাছে পূর্ণশ্রী হলের কথা। হাতিবাগানের সিনেমা পাড়ার ভিড় এড়িয়ে গলির মধ্যের এ হলটা নিয়ে কোন কালে তেমন কোন হৈচৈ ছিলনা। কিন্তু ভিড় হত ব্যাপক। ছবি আসতো ফাটাফাটি। চালু হল, কারণ ব্ল্যাকারদের উৎপাত ছিল।

মেট্রো সিনেমা হল
মলিন ও নিম্নবিত্ত এলাকার এই হলগুলিতে টিকিটের দাম ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বৌবাজার মোড়ে ছিল রূপম, ছানাপট্টির পাশে এ হলটিতে সর্বনিম্ন টিকিটের দাম ছিল ৩৫ পয়সা। এসব ব্রিটিশ আমলের কথা নয়, এসব কথা আপনাদের কোন বাহাত্তুরে বুড়োও শোনাচ্ছে না, ৩৫, ৫০, ৬৫, ৭৫ পয়সা সর্বনিম্ন টিকিটের দাম এমন হল শহরে আশির গোড়াতেও ছিল। এসব হলের অনেকগুলিতেই কমদামের টিকিট ক্রেতাদের হাঙ্গামা মেটানোর জন্য ছিল সরু লোহার খাঁচা। শো শুরু হওয়ার প্রায় আধ ঘন্টা আগে থেকে পাড়ার মাস্তান ও ব্ল্যাকারদের উৎপাতে ঐ জায়গাটা সরগরম হয়ে উঠতো। প্রথমেই তারা জায়গা দখল করার জন্য লাইনে দাঁড়ানো স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতে আসা বালকদের লাইন থেকে বার করে দিত। তাদের জামা তুলে সার্চ করতো পেটে বই গোঁজা আছে কিনা। একেকটা এলাকা কন্ট্রোল করতো একেকজন ব্ল্যাকার। যেমন মিত্রা, দর্পণা, মিনার কন্ট্রোল করতো হিরুয়া, বিধুশ্রীতে ছিল মুচি, রিজেন্ট এর এক ব্ল্যাকারের নাম ছিল ফিটিং। তার সাজপোশাক অনেকটা ছিল জিতেন্দ্র’র মত। সাদা জাম, সাদা প্যান্ট, সাদা জুতো। হলের দাপট শেষ, শো’র আগে কড়া ইস্ত্রি করা জামাকাপড় পরা সেই ব্ল্যাকাররাও আজ আর নেই।

বসুশ্রী সিনেমা হল
যদি অভয় দেন তাহলে একটা কথা বলি, আগে সিনেমা হলগুলির নামের পিছনে শ্রী দেওয়ার একটা চল ছিল। যেমন, বসুশ্রী, বিধুশ্রী, পূর্ণশ্রী, সুরশ্রী, শ্যামশ্রী, রাধাশ্রী। শেষ হলটি অবশ্য ঠিক কলকাতায় নয়, এয়ারপোর্টের কাছে ইটলগাছা রোডে। এখানেও দেখেছি সিনেমা। এ হলটার একটা মজা ছিল, শো শুরু হওয়ার আগেই স্ক্রিনে ফুটে উঠতো— ব্ল্যাক করিলে শাস্তি পাইতে হইবে। যাকগে যেকথা বলছিলাম, এখন বসুশ্রী ছাড়া প্রায় সব হলই উধাও। শ্রী শুধু জেগে আছে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের নামে।

জ্যোতি সিনেমা হল