আষাঢ় মাসে রথযাত্রা উপলক্ষে বঙ্গে আয়োজনের শেষ নেই। ‘রথ দেখা ও কলা বেচা’ অর্থাৎ এক সুযোগে দুটি কাজ করে ফেলার উদ্দেশ্যে ঘুরে আসতে পারেন গোপভূম গড়জঙ্গলে। উত্তরে অজয় দক্ষিণে ল্যাটেরাইট মাটির আউশগ্রাম আর পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসা থানার অন্তর্ভুক্ত নিস্তব্ধ শাল-পিয়ালের ঘন জঙ্গল — দুই বর্ধমানের গড়-জঙ্গলমহল।
কলকাতা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে বরাবর গাড়ি বা বাসে পৌঁছে যান পানগড় মোরগ্রাম হাইওয়ের উপর এগারো মাইল বাসস্ট্যান্ডে। এখান থেকে পশ্চিমে পাকা রাস্তা ধরে এগোলেই পৌঁছে যাবেন অযোধ্যা-বনকাটির মন্দিরময় যমজ গ্রাম দুটিতে। গ্রামের পাশেই গড়জঙ্গল থেকে নেমে আসা লালমাটি ধোয়া ‘রক্তনালা’, যা গিয়ে পড়েছে অজয়ে। কোন একসময় এই জলপথেই চলতো লাক্ষা, কাঠকয়লা, নানা বনজ দ্রব্যের ব্যবসা।

গাঁয়ের মাঝে রয়েছে বাবাজী বটতলা। রয়েছে বয়স না জানা বটবৃক্ষ, কালো তমাল, কদমগাছ। এখানেই দেখতে পাবেন বনকাটির বিখ্যাত পিতলের রথ। আমাদের বঙ্গে যে ৪২-৪৩টি পিতলের রথ আছে, তাদের মধ্যে প্রাচীনতম রথ এটি। কী অসাধারণ শিল্পকর্ম! ১২৪২ বঙ্গাব্দে পঞ্চরত্ন মন্দিরের আদলে নির্মিত হয় রথ।
লোহার ফ্রেম, আটটি লোহার চাকা। উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। পিতলের পাত দিয়ে মোড়া। রথের গায়ে অসামান্য এনগ্রেভিং। রথের গায়ে নিপুণ হাতে শিল্পীরা খোদাই করেছেন রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনীর চিত্ররূপ থেকে শুরু করে যুদ্ধযাত্রার ছবি, সৈনিকদের অবয়ব, দুটি মিথুন দৃশ্য, মেয়েদের জিমন্যাস্টিক, সামাজিক নরনারীর নানান চিত্রন।
রথের সম্মুখভাগে রয়েছে রামসীতার রাজ্যাভিষেক, অন্যদিকে আছে ভীষ্মের শরশয্যা, শর নিক্ষেপ করে পাতালগঙ্গা থেকে ভীষ্মকে জলপানের দৃশ্য বা অর্জুনের লক্ষ্যভেদ।
রথের মাথায় রয়েছে বিষ্ণুচক্র। পিতলের দুই ঘোড়া, সারথী রয়েছে এই রথে। রথের দুই দিকেই মহাবীর গরুড়ের দুটি মূর্তি। বিখ্যাত লাক্ষা ব্যবসায়ী জমিদার রামপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই রথ নির্মাণ করেন।

মুখোপাধ্যায় পরিবারের প্রতিষ্ঠিত কাঁকসার এই প্রাচীণ ঐতিহ্যবাহী রথ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন বহু গুনীজন। এসেছেন শিল্পী মুকুল দে, অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহজ পাঠের অলংকরণে ও রয়েছে এই রথের প্রভাব।
বিচিত্র এই শিল্পের কথা শুনে শিল্পী আচার্য নন্দলাল বসু তাঁর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এসেছিলেন বনকাটির মুখোপাধ্যায় বাড়ীর পিতলের রথ দেখতে। ছাত্ররা কিছু চিত্র রাবিং করে নিয়ে যায়। শান্তিনিকেতনের কলাভবনে কালো বাড়ীর গায়ে কৌতুককর চিত্রের প্রতিলিপি এখনো আছে।
রথের পাশেই রয়েছে টেরাকোটার পঞ্চরত্ন গোপালেশ্বর শিব মন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে কালো পাথরের বড়ো শিবলিঙ্গ। শিবের সঙ্গে কুলদেবতা গোপাল ও অবস্থান করেছে। সেই হিসাবে মন্দিরটির নাম গোপালেশ্বর মন্দির।
রয়েছে জমিদার মুখোপাধ্যায় পরিবারের ভগ্নপ্রাসাদ, রায় পরিবারের কালি মন্দির, একই প্রাঙ্গণে পাঁচটি দেউল রীতির শিবমন্দির। ১৭৫৪-৫৭ সালের মধ্যে নির্মিত মন্দিরগুচ্ছ, প্রাসাদ। বর্গী আক্রমণ, ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ ইত্যাদির ইতিহাস নীরবে সাক্ষী বহন করছে টেরাকোটার বিভিন্ন ফলকগুলি।

পশ্চিমের এই রাস্তাই চলে গেছে ইছাই ঘোষের দেউলের পাশ দিয়ে। এটিই সেই ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্যের বিখ্যাত বীর ইছাই ঘোষের রাজত্বভূমি। প্রচলিত কাহিনি বলে, গৌড়ের রাজা তখন দেবপাল। আর কাঁকসার জঙ্গলে ঘেরা ত্রিষষ্টিগড়ের সামন্তরাজা কর্নসেন। তার আশ্রিত সোম ঘোষের পুত্র ইছাই ঘোষ ত্রিষষ্টিগড়ের মধ্যেই আলাদা করে ঢেঁকুরগড় স্থাপন করে নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। যুদ্ধ বাধে কর্ণসেনের সঙ্গে। কর্ণসেন হেরে যান। জয়ের নিশান হিসেবেই ইছাই ঘোষ গড়ে তোলেন টালির মতো পাতলা ছোট আকৃতির পোড়া ইটের তৈরি সুউচ্চ এই দেউল। শোনা যায়, পরবর্তীকলে কর্নসেনের পুত্র লাউসেন ইছাই ঘোষকে পরাজিত ও নিহত করে দখল করেন এই গড়।
দেউল থেকেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ চলে গেছে ইছাই ঘোষের আরাধ্য দেবী শ্যামারূপার মন্দিরে। দেবী এখানে নিত্য পূজিতা।
কিছুটা পথ এগোলেই পৌঁছে যাবেন আরেকটি গ্রাম — সাতকাহনিয়া। তালগাছে ভরা সাতকাহন কড়ি দিয়ে কে কবে এ গ্রাম কিনেছিলো তা জানা নেই।সাতকাহনিয়া গ্রামে খোলা আকাশের নীচে থিয়েটার চর্চা চলে। অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটার। তেপান্তর নাট্যগ্রাম তৈরি হয় ১৯৯৯ সালে। এখানে এসেছেন কে এন পানিক্কর, এস রামানুজম, রতন থিয়াম আরো অনেকে।

এখান থেকে এগিয়ে যেতে পারেন অজয়ের পাড় বরাবর। ওপারেই জয়দেবের কেঁদুলি , যেখানে বাউল যেন গেয়ে ওঠে “বাড়ি আমার ভাঙ্গন ধরা অজয় নদীর বাঁকে, জল যেখানে সোহাগ ভরে স্থলকে ঘিরে রাখে।” বর্ধমান জেলার অতীত স্মৃতি বহন করছে প্রাচীণ গোপভূম। কথিত আছে এখানেই রাজা লক্ষণ সেনের সঙ্গে কবি জয়দেবের সাক্ষাৎকার হয়েছিলো। রাজার অনুরোধেই কবি রচনা করেন ‘গীত গোবিন্দ’। রথ উপলক্ষ্যে এই ছোট্ট ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন ইতিহাসের ছোঁয়া লাগা গোপভূম গড়জঙ্গলে।
তথ্যঋণ: সম্পর্কিত বিভিন্ন বই এবং পত্র পত্রিকা।
একটি সুন্দর পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে মনোমুগ্ধকর লেখনী,,,, অজানা তথ্য জেনে খুব ভালো লাগলো ????????????
অসাধারণ
তথ্যসম্মৃদ্ধ উপস্থাপনা। খুব ভাল।
অসাধারণ উপস্থাপনা, ঐতিহাসিক অজনা তথ্যে সমৃদ্ধ হলাম, গৌরবান্বিত বাঙালী ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে? ভীষণ ভালো লাগলো।
থ্যাংক ইউ গো ????
থ্যাংক ইউ গো ????
চমৎকার প্রতিবেদন।