চতুষ্পদী কবিতার অমর সঙ্কলন ‘রুবাইয়াত’-এর জন্যই তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে খচিত। এই দুঃসময়েও ১৮মে তাঁর জন্মদিনটি স্মরণে থাকে তিনি প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও জরাজীর্ণ ইতিহাস বদলে দিয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করেছিলেন বলে। যদিও তিনি আমাদের কাছে অন্যতম সেরা কবি হিসেবেই পরিচিত, কিন্তু তিনি ছিলেন দার্শনিক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, হাকিম ও শিক্ষক। তিনি অত্যন্ত জটিল গণিত নিয়ে কাজ করেছেন। জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে প্রণয়ন করেছেন একটি পূর্ণাঙ্গ বর্ষপঞ্জিকা। সেই তিনিই আবার লিখেছেন আধ্যাত্মিক, প্রেম ও দ্রোহের কবিতা। আধুনিক বীজগণিতের ভিত্তি তৈরি হয়েছে তার হাতে, কাজ করেছেন ইউক্লিডিয় জ্যামিতি নিয়েও। তাঁর জ্ঞানপিপাসার তালিকা থেকে বাদ যায়নি ভূগোল, বলবিদ্যা, খনিজবিজ্ঞান, আইন, এমনকি সঙ্গীতও।
মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা কাজ, ‘ডেমনস্ট্রেশন অব প্রবলেমস অব অ্যালজেবরা অ্যান্ড ব্যালেন্সিং’ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বৃত্ত, প্যারাবোলার মতো কণিক ব্যবহার করা ছাড়াও ত্রিঘাত সমীকরণের একাধিক সমাধানের পদ্ধতির কথা বলেন। যদিও এই কীর্তিতেও তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না কারণ, বীজগাণিতিতের সমস্যার সমাধান বীজগাণিতিকের সূত্র বা পদ্ধতি ব্যবহার করেই করতে তিনি করতে চাইতেন। তাই জ্যামিতিক পদ্ধতিতে ত্রিঘাত সমাধান করে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এরপরই তিনি রচনা করলেন ‘ট্রিটিজ অন ডেমনস্ট্রেশন অব প্রবলেমস অব অ্যালজেবরা অ্যান্ড ব্যালেন্সিং’। এখানে তিনি সম্পূর্ণ বীজগাণিতিক উপায়ে ত্রিঘাত সমাধান করেন।
সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান মালিক শাহের আমন্ত্রণে তিনি সেলজুকের রাজধানী ইস্ফাহানে আরো কয়েকজন বিজ্ঞানীর সহযোগিতায় বর্ষপঞ্জিকা তৈরি করেন। উল্লেখ্য, তখন পঞ্জিকাগুলো স্থায়ী ছিল না এবং ঘন ঘন বছরের দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করা হত। ওমর খৈয়াম সুলতান মালিক শাহ ওমরকে প্রথমেই একটি অবজারভেটরি (মানমন্দির) তৈরি করে দেন। যেখান থেকে অন্তত ৩০ বছর আকাশ পর্যবেক্ষণ করা যায়। ৩০ বছরের লক্ষ্য এই জন্যই যে ওই সময়ে শনি গ্রহ তার কক্ষপথে একবার ঘূর্ণন শেষ করবে। পর্যবেক্ষণে খৈয়াম ১০২৯.৯৮ দিনে ২.৮২ বছর হিসাব করলেন। সেই হিসাবে এক বছরের দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৩৬৫.২৪২২ দিন। বর্তমানে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বছরের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করেছে ৩৬৫.২৪২১৮৯ দিন বা ৩৬৫.২৪২২ দিন। ওমর খৈয়াম যা বহু বছর আগে যা হিসাব করেছিলেন, তাই আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করল । ওমর তার বর্ষপঞ্জির কাজ শেষ করেছিলেন ১০৭৮ সালে।

আজ থেকে প্রায় নশো বছর আগে পারস্যের বিখ্যাত দার্শনিক, বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও কবি ওমর খৈয়ামকে তাঁর নিজের দেশের লোকেরাই নাস্তিক, মাতাল কবি ইত্যাদি বলো সম্বোধন করেছিলেন। একথাও ঠিক যে কবি ওমর খৈয়াম তাঁর ধর্মশাস্ত্রবিরোধী কবিতার জন্যও যথেষ্ট আলোচিত। তবে তাঁর কবিতা পাঠে, আস্তিকতা-নাস্তিকতা সবকিছুকে ছাপিয়ে আলোড়িত করে আধ্যাত্মিক মরমি কবির প্রেম। আবার তিনি সজ্ঞানে তাঁর সময়ের বাস্তবতাকে আঁকেন ব্যঙ্গাত্মক শ্লোকবাক্যে, যা নিতান্তই একঘেয়েমিতার ও চিরাচরিত প্রথার চূড়ান্ত বিরোধীতা। অনেক সময়েই রুবাইয়াত এর পাতা উলটে মনে হয় কোথাও কোথাও তিনি ঘোরতর নাস্তিক।
‘আমায় সৃজন করার দিনে জানত খোদা বেশ করেই/ ভাবীকালের কর্ম আমার, বলতে পারত মুহূর্তেই/ আমি যে সব পাপ করি- তা ললাট লেখা, তাঁর নির্দেশ, /সেই সে পাপের শাস্তি নরক- কে বলবে ন্যায়বিচার এই?’ আরও একটি কবিতা ‘দুঃখে আমি মগ্ন প্রভু, দুয়ার খোলো করুণার! /আমায় করো তোমার জ্যোতি অন্তর মোর অন্ধকার।/ স্বর্গ যদি অর্জিতে হয় এতই পরিশ্রম করে করে-/ সে তো আমার পারিশ্রমিক, নয় সে দয়ার দান তোমার।’
‘রুবাইয়াত’-এর অনেক জায়গাতেই কবি এইভাবে খোদার সমালোচনা করেছেন, আবার অনেক সময়ে মনে হয় তিনি খোদাকে মেনে নিয়েই যেন এই সমালোচনা করছেন। খোদার কাছে কবি যে কেবলই করুণা, ভালোবাসা, প্রেম প্রত্যাশা করেন তা নয়। আনুষ্ঠানিক ধর্ম পালনের প্রতিদান হিসাবে তিনি বেহেশত পাবার আশাও করেন না। অবশ্য এটা সুফিবাদী দর্শনের এক গভীর উপলব্ধি। তাই কবি ওমর খৈয়ামকে সরাসরি নাস্তিক ঘোষণা করে দেওয়া যায় না। কারণ তিনি নিজেই আবার কোনও জায়গায় বলেন যে, তিনি মসজিদে যেতেন- ‘মসজিদের ঐ পথে ছুটি প্রায়ই আমি ব্যাকুল প্রাণ/ নামাজ পড়তে নয় তা বলে, খোদার কসম! সত্যি মান।/ নামাজ পড়ার ভান করে যাই করতে চুরি জায়নামাজ/ যেই ছিঁড়ে যায় সেখানা, যাই করতে চুরি আরেকখান।’
কবি ওমর খৈয়াম একবার বলছেন, তিনি নামাজ পড়তে যান না; বরং নামাজের ভান করে জায়নামাজ চুরি করতে যান। আবার পরক্ষণেই দেখছি, সেই জায়নামাজ ছেঁড়ার কথা বলেছেন। তার মানে তিনি কি প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে নামাজ পড়তেন এটাই শেষ কথা? কবির রুবাইয়াতে শরাব, মদ একমাত্র আল্লাহ প্রেমের তৃষ্ণা কিংবা স্পৃহা, আবার কবির সাকি সে সর্বময় ক্ষমতাধর প্রভু এমন কথাও পাই। যেমন তিনি আল্লাকে অকপটে স্বীকার করেন, আবার ব্যঙ্গাত্মক ঢঙে বিদ্রুপও করেন- ‘তোমার দয়ার পেয়ালা প্রভু উপচে পড়ুক আমার পর/ নিত্য ক্ষুধার অন্ন পেতে যেন না হয় পাততে কর।/ তোমার মদে মস্ত করো আমার আমি’র পাই সীমা/ দুঃখে যেন শির না দুখায় অতঃপর, হে দুঃখহর।’ বোঝাই যাচ্ছে তাঁর কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে রহস্যজট আর বিস্ময়কর সব প্রশ্ন।
একটি মনোজ্ঞ সাহিত্য রচনা।
অপূর্ব লেখা।
ওমর খৈয়ামের ওপর বিস্তারিত আলোচনা খুব একটা চোখে পড়ে না। এই আলোচনাটি কবির প্রায় সব দিক স্পর্ষব করেছে
খুব সুন্দরভাবে, লেখাটি সত্যি খুব ভাল।
হ্যাঁ তাঁর ‘রুবাইয়াত’ মন দিয়ে পড়লে বোঝা যায় যে তাঁর কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে রহস্যজট আর
বিস্ময়কর সব প্রশ্ন- লেখক এই বিষয়টিখুব ভাল নজর করেছেন।
Onek kichu ojana tothho jante parlam.
শুধু ভাল লেখা নয়,লেখাটির যথেষ্ট সাহিত্য মূল্য আছে।