মায়াবিদ্যায় কি না হয়! মায়াবী অসুর বাতাপি মন্ত্রশক্তিতে ভেড়ার রূপ নিত। তার শাগরেদ ইল্বল তাকে কেটেকুটে তেলেঝালে কষিয়ে রান্না করত। সে মাংস মুনিঋষিদের পরম আদরে নেমন্তন্ন করে খাওয়ানো হত। সাধুরা খেয়েদেয়ে ঢেকুর তোলার আগেই ইল্বল ডাক দিত, “বাতাপি বেরিয়ে আয়”। বাতাপি ঋষিদের পেট ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসত। এমনি করেই চলছিল মহানন্দে দুই বন্ধুর ঋষিনিধন যজ্ঞ। মহাতপা অগস্ত্যের কাছে এসব জারিজুরি চলল না। তিনি নেমন্তন্নে এলেন, বাতাপিরূপী ভেড়ার মাংস খেলেন, হজম করে ফেললেন।

বাতাপি কিন্তু বিখ্যাত হয়ে রইল কর্ণাটকের বাগালকোট জেলায়। অসুরের নামে একটা গোটা শহরের নাম হল বাতাপি, বাতাপিপুরা। পরে লোকমুখে বাদামি। সে বাদামির বেলেপাথরের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে কত রঙ। কত গল্প, ইতিহাস।
সেই রঙ আর গল্পের খোঁজে আমরা গোয়া থেকে চলেছিলাম বাদামি। সারিসারি নারকেল গাছ পেরিয়ে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে যীশু ঠাকুরের থান, রঙবেরঙের বাগান ঘেরা ভিলা, চার্চ দেখতে দেখতে। গোয়া পেরোতেই যীশুর প্রভাব কম হল।

শিবাজী মহারাজের রাজ্যে এবার বিঠোবা, ভবানী, মোরেশ্বর, খান্ডোবা দেবদেবীদের জয়পতাকা। ঘন সবুজ, কালচে সবুজ, পাতা ঝরা গাছের মাঝে এক আধটা পলাশ গাছ। আগুন রঙে ঝলসাচ্ছে তার উদ্ধত অহঙ্কার। রুদ্রপলাশের গেলাস থেকে মধু চুষে নিচ্ছে মৌটুসিপাখি। পশ্চিমঘাটের জঙ্গলে মাঝে মাঝে সাবধান বাণী। হাতি, ভাল্লুক, হরিণ এমনকি বাঘেরাও সেখানে নাকি হামলা করতে পারে। আমরা চোখব্যথা করে ফেললেও বাঁদরবাহিনী আর নেউল ছাড়া কিচ্ছু চোখে পড়েনি।

সহ্যাদ্রির বাঁক পেরিয়ে নিচে নামতেই শস্যশ্যামলা দেশ। পাহাড় দূরে সরে গিয়ে সেখানে আখের ফুলে কাশের হাসি। রাশি রাশি ভারা ভারা, আখ কাটা হল সারা। বাজরার খেত সেজে উঠেছে। খর রোদে কাজ করতে করতে গামছা পেতে বিশ্রাম নিচ্ছে চাষি। চাষিবৌ হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে স্বামীর সঙ্গে। তার পরনে ঘনরঙের সুতীর মোটা ইল্কল শাড়ি, খন ব্লাউজ, ওপর কানে বুগড়ি। (সে বেচারি জানেই না তার এই সাজ আধুনিকাদেরও অঙ্গে উঠেছে। বাগালকোটের তাঁতিরা নতুনভাবে বুনছে ইল্কল শাড়ি) গান্ধী টুপি পরা গাঁওবুড়োরা গল্প করছে গাছের তলায়। চায়ের দোকানে। মন্দিরচত্বরে। সব মিলিয়ে নিটোল গ্রামের এক ভরপুর ছবি। আমরা চোখ ভ’রে দেখছি।

মহারাষ্ট্রের লাগোয়া কর্ণাটকের বেলগাঁও। সেখানকার নারীপুরুষের সাজপোশাকে, খাওয়াদাওয়ায় মহারাষ্ট্রের প্রভাব বেশি। তবুও সেখানে গৃহলক্ষ্মীরা ভোর ভোর ঘুম থেকে ওঠে। স্নান সেরে কপালে তিন লাইনের বিভূতি আর কুঙ্কুমের ফোঁটা পরে। ঘরের সামনে আঁকে জ্যামিতিক নক্সার রঙ্গোলী।
বেলগাঁওয়ের রেস্টুরেন্টের ক্যাশকাউন্টারেও কপালে বিভূতি লেপার আয়োজন। মেনুকার্ডে ইডলি, ধোসা, বড়ার সঙ্গে লেখা সেঙ্গাপল্লী, রোট্টী মুটিগে, হুড়কি হুলিগে, তালিপাট্টু! কর্ণাটকের মানুষ আমাদের ছ্যাঁচড়া, চচ্চড়ি, ঘন্ট, লাবড়া, ডালনা শুনে নিশ্চিত এমনটাই চোখ কপালে তোলেন!

আমাদের খাওয়া হল বিভিন্ন শস্য দিয়ে বানানো মারাঠি পদ থালিপীঠ, পানিয়ারম (ইডলি, মেদুবড়ার মাঝামাঝি পদ) আর আনারসী সিরা (সুজির হালুয়ায় আনারসের কুচি)। ফেরার পথেও এখানে ব্রেকফাস্ট সারতে হবে তাই মনে রাখলাম।

আরো বেশ খানিকটা রাস্তা চলার পর বাদামি। এই নাকি চালুক্যদের পছন্দের রাজধানী? ছবির মত সাজানো গোয়ার পর বাদামি প্রথমে মোটেই আকর্ষণ করেনি। রাস্তায় ঠেলা, অটো, টেম্পোর গাদাগাদি। ছোটো শহরে যত্রতত্র বাজার। হাঁকডাঁক, চেঁচামেচির বিস্তৃত আয়োজন। সরু গলিতে গাড়ি ঢোকে না। বারোঘরের এক উঠোনে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে হিন্দু-মুসলমান। খাটিয়ায় বসে তাদের গল্পগুজব, চুলবাঁধা, চা খাওয়া চলছে। মন্দিরের ঘন্টার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে আজানের ধ্বনি। ঝগড়াঝাঁটি, কেনাবেচা, প্রেমপ্রীতি, জন্মমৃত্যু সবনিয়েই এরা বেঁধে বেঁধে রয়েছে। এদের পেরিয়েই পৌঁছতে হবে ইতিহাসের দোরগোড়ায়। (আগামীকাল শেষ)