সমাজ বিজ্ঞানীরা অন্য আর পাঁচটা বিষয়ের মতো দুর্গা পুজো নিয়েও তাদের অভিমত দিয়েছেন। যদিও তাঁদের মতের ভিত্তিতে পুজোর রীতি-নীতি কিংবা নিয়ম কানুনে কোনও হেরফের ঘটেনি। রাজবাড়ি থেকে বারোয়ারি পুজোগুলি তাদের নিজস্ব প্রথা ও ঐতিহ্য মেনেই পুজো করে। কালের স্রোতে বহু জায়গায় যে নিয়ম রীতির রদবদল ঘটেছে তার কোনওটাই কোনও বিশেষঙ্গের মতানুযায়ী নয়। পরিবর্তনের পিছনে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতিই প্রধান কারণ। বাংলার নানা প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা নানা ধরণের দুর্গা পুজোগুলির ইতিহাস অনুসন্ধান করে সমাজতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদরা বহু কথাই বলেছেন কিন্তু তার মধ্যে সবথেকে উৎসাহজনক হল পুজোগুলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মিথ বা লোকগল্প। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুজো শুরু হওয়ার পিছনে রয়েছে দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ। যুগযুগান্ত ধরে সেই আদেশ অনুযায়ী চলছে পুজোর রীতি নীতি।
সমগ্র বাংলা জুড়ে যখন দুর্গোৎসবের ঢাক বাজছে। আপামর মানুষ যখন সেই উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা। তখন দামোদর নদের তীরের ধেনুয়া গ্রামে নেই দুর্গা পুজোর উৎসব মুখর আমেজ। অথচ ভোরবেলার শিশিরে ভেজা শিউলির গন্ধ রয়েছে। শরতের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা তুলো মেঘের দল। মাঠে কাশ ফুলের গুচ্ছ দোল খাচ্ছে। সন্ধ্যায় হিমেল হাওয়া বইছে। কিন্তু এখানে পুজো শেষ হয়ে বিসর্জনের বাজনাও মিলিয়ে গিয়েছে দেবী পক্ষের সুচনাতে। বিগত আট দশকের বেশি সময়কাল ধরে এমনটাই হয়ে আসছে নিয়ম করে। কারণ সেটাই ধেনুয়ার কালীকৃষ্ণ আশ্রমের রীতি। কেবল আশ্রম নয়, সেইসঙ্গে আশ্রমের আশপাশে বসবাসকারী মানুষদের কাছে দুর্গা পুজোর এটাই রেওয়াজ।
মহালয়ার দিনই সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পুজো এবং সেদিন বিকেলেই বিসর্জন-আসানসোল থেকে ২০ কিলমিটার দূরে হীরাপুরের ধেনুয়া গ্রামের ছোট্ট কালীকৃষ্ণ আশ্রমে এই পুজো শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালে। আশ্রমের অন্যতম সাধক জ্যোতি মহারাজের কথা থেকে জানা যায়, তাঁর গুরুদেব দয়ানন্দ মহারাজ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন। তবে তখন যে দেবিমূর্তি পুজো হত তা ছিল অগ্নিবর্ণা। পরে সেই মূর্তি হয় শ্বেতশুভ্র। পরবর্তীতে রং বদলে হয়ে যায় বাসন্তী। সেই থেকে বাসন্তী রংয়ের দেবী প্রতিমাই কালীকৃষ্ণ আশ্রমে পুজো হচ্ছে। তবে একদিনেই পুজো শুরু এবং শেষ। পিতৃপক্ষের শেষে সূচনা আর দেবীপক্ষের শুরুতেই শেষ। মহালয়ার দিনই বেজে ওঠে বিসর্জনের বাজনা। এই দেবীমূর্তির পুজো করতে বংশপরম্পরায় বাঁকুড়া থেকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পুরোহিত আসেন।

কালীকৃষ্ণ আশ্রমের সেবাইত সুবল চন্দ্র খাঁর থেকে জানা যায় ১৯৮০ সাল থেকে পুজো হয়ে আসছে আগমনী দুর্গার তথা কুমারী মা দুর্গার। দশভুজা দেবী এখানে সিংহ বাহিনী হলেও অসুর থাকেন না। মায়ের পরিবারে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ সঙ্গে কেউ থাকেন না। দুর্গার সঙ্গে থাকেন তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়া। গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি বাংলাদেশ থেকে তেজানন্দ মহারাজ এসে এই পুজো শুরু করেন। তিনি মারা যাওয়ার পর থেকেই এই পরম্পরা চালিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের বাসিন্দারা। ধেনুয়া গ্রামের বাসিন্দাদের আক্ষেপ বাতাসে পুজো পুজো গন্ধে চারদিক যখন ভরে যায় কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্গোৎসবে শেষ হয়ে যাওয়ায় মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।
দামোদরের তীরে ধেনুয়ার কালীকৃষ্ণ আশ্রমে এবারও মহালয়ার আগের দিন থেকেই সাজো সাজো রব। অমাবস্যা পড়তেই মন্দিরে শুরু হয় কালী পুজো। সারারাত কালী পুজো চলার পর মহালয়ার সকালে শুরু হয় দুর্গা রূপের পুজো। দুর্গাপুজোর সমস্ত আচার-প্রথাই পালিত হয় একদিনের এই উত্সবে৷ চার রকমের ভোগ রান্না করা হয়। ভোরবেলা কলাবউ প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু হয়। বিগত তের-চোদ্দ বছর ধরে এই পুজোর পৌরোহিত্য করছেন বাঁকুড়ার আনন্দপুরের বাসিন্দা লোকনাথ চট্টোপাধ্যায়। একদিনের এই অভিনব দুর্গা পুজো দেখতে বহু মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসেন আসানসোলের ধেনুয়া গ্রামে। করোনানালেও ভিড় কম হয়নি। শুধু আসানসোল-বর্ধমান নয়, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, এমনকী ঝাড়খণ্ড থেকেও মানুষ এসেছেন এবারের পুজোয়। আসানসোলের বাইরের মানুষরা বলেন, যতদিন পারবো, ততদিন এই পুজোয় আসা কখনও বন্ধ হবে না। একসঙ্গে কালী ও দুর্গাপুজোর প্রসাদ পাওয়াও তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। কালীর অবশ্য স্থায়ী মূর্তি। সারা বছর মন্দিরে পুজো হয়। কিন্তু কেন এমন ভিন্ন প্রথা? কোনও ঐতিহাসিক কারণে নাকি নিছক ওই স্বপ্নাদেশের গল্প; সঠিকভাবে আজও জানা যায়নি৷ তবে মহালয়ার দিন থেকেই দামদর নদের ধারের ধেনুয়া থেকে শারদোৎসবের বাজনা ছড়িয়ে যায় বর্ধমান হয়ে লাল মাটির দেশ বাকুড়া-পুরুলিয়ার আকাশে বাতাসে।