“সকালে ফুলের বনে যে আলো আসে তাতে বিস্ময় নেই, কিন্তু পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে যে আলো আসে সে আর-এক কথা।”…. রক্তকরবী নাটকের অধ্যাপকের এইকথা যুগ কাল ছাপিয়ে সর্বকালীন এক ভাবনা।
উন্মুক্ত পৃথিবীর বুকে আলোর বিচ্ছুরণ নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু অবরুদ্ধ, নিকষ কালো অন্ধকারে এক চিলতে আলো যে আশার সঞ্চার করে তা শক্তিশেল হয়ে উঠে ভেঙে দিতে পারে কারাগারের শিকল, অসাম্যের বাঁধন। রক্তকরবী নাটকের সার্থকতা এখানেই।
আপনারা ভাবছেন তো ছবিওয়ালা হটাৎ করে ছবি বাদ দিয়ে নাটকের গল্প কেন বলছে! ঘটনা হচ্ছে, বছর সাতেক আগে রক্তকরবী নাটকের অধ্যাপকের চরিত্রের স্ক্রিপ্ট হাতে ধরিয়ে গৌতমদা অর্থাৎ বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নাট্য পরিচালক গৌতম হালদার বললো, “তোকে এটা করতে হবে।”
ছবিওয়ালা ছবির সাবজেক্টে কখনো কখনো ক্যামেরা হাতে বিমূঢ় হয়ে ভাবতাম ছবিটা কিভাবে তুলবো !! গৌতমদার কথায় আমার তখন সেরকমই অবস্থা। আমি হলাম ক্লাস ফোর ফেল করা এক মূর্খ ছবিওয়ালা। তাকে কিনা গৌতম হালদার রবীন্দ্রনাথের সমস্ত রচনার মধ্যে একদম অন্যধারার কালজয়ী নাটক রক্তকরবীর অধ্যাপক করবার ফরমান জারি করছে। আমি তো কিছুতেই করবো না।

সেটা ছিলো ষোলো সাল….একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে কাজের চূড়ান্ত ব্যস্ততা অপরদিকে ইলেকশন নাকের ডগায় প্রায় এসে গেছে। এখন রক্তকরবী করার অর্থই যেচে দর্শকের গাল খাওয়া। আর সবথেকে বড়ো কথা রক্তকরবী নাটক বোঝার মত জ্ঞান আমার মত মূর্খের নেই।
এখানে বলি, নাটক আমি পছন্দ করি না বা অতীতে করিনি এমন কিন্তু মোটেও নয়। আমি স্কুল জীবনেই হাওড়ার বামুনগাছি রেল কোয়ার্টারে থাকার সময় সালকিয়ায় চন্ডীমাতা নাট্য সংসদ নামের একটি যাত্রা দলে ভিড়েছিলাম। কোকিল ভট্টাচার্য গ্রুপটি পরিচালনা করতেন। ওই দল একবার গিরিশচন্দ্র ঘোষ এর লেখা ‘প্রফুল্ল’ নাটকের প্রধান চরিত্র তিন ভাই যোগেশ, রমেশ, সুরেশ। আমি সুরেশ চরিত্রটি করেছিলাম। ১৯৭৫ কি ৭৬ হবে। মনে আছে শো-এর শেষে পনেরো টাকা আমায় দেওয়া হতো। গোলমোহর রেলওয়ে ইনস্টিটিউটের মঞ্চে শনি কি রবিবার প্রফুল্লর শো হতো।
যাত্রার কথা মা জানতো। কোনোদিন বারণ করেনি। কিন্তু বাবা জানতো না। কোথা থেকে জানতে পেরে আমার বড়ো চুল টেনে বলেছিল, “পড়াশোনা ছেড়ে তুমি যাত্রা করে বেড়াচ্ছো…. খুব ভালো!”
প্রফুল্ল নাটক কিন্তু সেইসময় বেশ নাম করেছিলো। এছাড়াও বিয়াল্লিশের বিপ্লব, মহেশ, সব্যসাচীর মত নাটক করেছি। কলেজ জীবনে রঞ্জন সেনের লেখা নাটক করে ইন্টার কলেজ কম্পিটিশনে দুর্গাপুর আর ই কলেজে পুরস্কার পেয়েছিলাম আমরা। তারপর সব হারিয়ে অসম্পূর্ণ জীবনের শেষ ইনিংস চলছে।

সে যাই হোক, স্কুল কলেজ জীবনের নাটক করা আর রবীন্দ্র নাথের ‘রক্তকরবী’ নাটক করার মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। গৌতমদা সাধারণ নাটক থিয়েটার করা মানুষ নন। সাহিত্যে অসম্ভব রকমের দখল ওনার। গান, কবিতা যে কি সাবলীলতায় করেন না শুনলে বিশ্বাস হবে না। যে কোনো বিষয়ে অত্যন্ত গুণী একজন শিল্পী বলা যায়। বিদ্যা বালনের প্রথম বাংলা ছবি গৌতমদার হাত ধরেই। বহু নাটক সিনেমায় উনি জাতীয় পুরস্কার ও পেয়েছেন। বুঝতেই পারছেন সেই মানুষটা রক্তকরবী করলে উৎকর্ষতার কোন পর্যায়ে যাবে সেটা বলাই বাহুল্য। আমি ওইসব ভেবেই ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু গৌতমদা নাছোড়বান্দা।
একপ্রকার বাধ্য হয়ে বলা ভালো নিমরাজি হয়ে নেমে পড়লাম মহড়া দিতে। এখানে বলি, গৌতম হালদারের সন্দর্ভ গ্রুপের রক্তকরবীর মূল চরিত্র নন্দিনী অর্থাৎ বিশিষ্ট অভিনেত্রী চৈতি ঘোষাল সেই সময় আমাকে ভীষন সাহস জুগিয়েছিল। তাছাড়া সন্দর্ভ দলের সকল সদস্যরাও আমার সর্বতোভাবে পাশে ছিলেন। ওদের ভরসায় নেমে পড়লাম অধ্যাপক চরিত্রে। স্ক্রিপ্ট পড়ে বেশ কিছুদিন রিহার্সাল করতে করতে একটু যেন আয়ত্বে এলো, অধ্যাপকের চরিত্রে কিছুটা পৌঁছতে পারলাম।

এরপর মঞ্চে আমি জানিনা কেমন কি করেছি কিন্তু বহু মানুষ নাটক শেষে সাজঘরে অন্যান্যদের সঙ্গে আমারও প্রশংসা করেছে। খুব ভালো লাগতো। বিশেষভাবে মনে আছে আমার হাওড়া সালকিয়ার স্কুলের শিক্ষকের কথা। যিনি একবার শো শেষে দেখা করে বলেন, “আমি মঞ্চে তোমায় দেখেই মনে মনে ভাবছিলাম ‘এ অশোক না?’ খুব ভালো লাগলো তোমাকে দেখে।”
গিরিশ মঞ্চের বাইরে মাষ্টারমশাইকে প্রণাম করতে গিয়ে আমার চোখটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। সত্যি বলছি আপ্লুত হয়ে গেছিলাম। আমার ছেলেবেলা এক গন্ডগ্রামের। লেখাপড়া করতে ভালো লাগতো না। হয়ও নি। এই নাটক, গান, ছবি তোলা, বন্ধুবান্ধব, বেড়ানো, হইহুল্লোড় করে জীবনের প্রায় জার্নি শেষের পথে তখন যদি কৈশোরের শিক্ষক ছাত্রের প্রশংসা করে গর্ব হয় বৈকি?
তবে রক্তকরবীর সঙ্গে সেবারের যাত্রায় আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি যেদিন শান্তিনিকেতনের গৌড়প্রাঙ্গণে অভিনয় করেছিলাম …এটা আমার কাছে অসম্ভব গৌরবের দিন। বিখ্যাত সরোদিয়া আমজাদ আলী খান এবং তাঁর দুই সুযোগ্য পুত্র আমান ও আয়ানের বাদ্যের সাথে ওস্তাদ রাশিদ খান, কৌশিকী চক্রবর্তী, পণ্ডিত অজয়দার গানের সুর মূর্ছনায় গোটা গৌড়প্রাঙ্গনে সেদিন তিল ধারণের জায়গা ছিলোনা। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যে প্রাঙ্গণে পদচারণা করতেন সেখানে আমি তাঁর রচিত নাটকে অভিনয় করছি!! এ যে কি সৌভাগ্য তার ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারবো না।
এই বছর রক্তকরবীর ১০০ বছর। সাতবছর পর গৌতমদা আবার কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। এবারে আর কোনো সংশয়, ভয় নেই। আমি অধ্যাপকের চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। মনে মনে গৌতমদার কাছে কৃতজ্ঞ যা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। আসলে গৌতমদার প্রজ্ঞা অপরিসীম। সাহিত্য নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে থাকা আদ্যন্ত নাট্যপ্রেমী একজন মানুষ।

ওনার অনুভবে ….”রক্তকরবী আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের যেখানেই রাষ্ট্রনিষ্পেষণ, যন্ত্রের অমানবিক পীড়ন, সামাজিক শোষণ মানুষকে নিংড়ে নিচ্ছে সেখানেই এর থেকে মানুষ মুক্তির পথ খোঁজে….এই নাটক অব্যর্থ হয়ে ওঠে সেইখানেই। যুগে যুগে এ নাটক প্রাসঙ্গিকতা বহন করে চলেছে যেন পরম্পরার মত। এইযে কিছুদিন আগে আচমকা পূর্ববর্তী সতকর্তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা জারী হলো দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকাল যাবৎ বন্ধ থাকবে সকল কাজ। বাস্তবে কি দেখলাম পরিচয়হীন পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্বিষহ অবস্থা। এটা কি মনে করায় না রক্তকরবীর নামহীন নম্বর ৪৭.খ ৬৯ঊ-এর কথা! আজ সেই রক্তক্ষরণীয় রক্তকরবীর ১০০ বছর। কত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ যে যন্ত্রণার কথা বলেছেন তার প্রাসঙ্গিকতা আজও বর্তমান।”
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমির উপর দাঁড়িয়ে শিলংয়ে রচিত রক্তকরবী নাটকের পাণ্ডুলিপি রবীন্দ্রনাথ বারবার পরিবর্তন করেছেন। এ নাটকের খসড়া নাকি দশবার লেখা হয়েছে! এমনকি নাটকটির প্রথমে নাম দিয়েছিলেন ‘যক্ষপুরী’ তারপর ‘নন্দিনী’ এবং শেষে ‘রক্তকরবী’ নামেই প্রকাশিত হয়। নাটকে রবীন্দ্রনাথ কখনও নতুন চরিত্র তৈরি করেছেন আবার কখনও নতুন গানও তৈরি করেছেন এমনকি বাদও দিয়েছেন।
এ নাটকের মূল চরিত্র নন্দিনীকে কখনো ‘খঞ্জনা’ কখনো ‘খঞ্জন’ কখনো ‘সুনন্দা’ নাম দিয়েছেন। সাহিত্যে অতো দখল না থাকলেও আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনার সূক্ষ্মতা কত গভীর হলে এরকম একটি নাটক উনি লিখেছেন একশো বছর আগে। যে নাটকের প্রাসঙ্গিকতা একশো বছর আগেও যা ছিলো এখনও তাই আছে। আসলে কবিগুরুর রক্তকরবী এমন একটা নাটক পৃথিবীতে মানুষ যতদিন থাকবে এই নাটক ততদিন বেঁচে থাকবে।
আমি শুনেছি বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্রই রক্তকরবী প্রথম দুঃসাহসিকভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। আমি সেই নাটক দেখিনি কিন্তু গৌতমদার মুখে শম্ভুদা-তৃপ্তিদির অনেক গল্প শুনেছি। এখনো শুনি। সেই কারণেই গৌতমদার সাথে আমার রক্তকরবীর পথচলায় আমি সন্মানিত গর্বিত।

চলতি মে মাস থেকেই শো শুরু হচ্ছে। সল্টলেকের ইজেডসিসি (EZCC)-এ ২৭ মে প্রথম শো। এরপর রবীন্দ্রসদন-সহ অন্যান্য জায়গায় শো করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। রিহার্সাল চলছে নিয়মিত। বুড়ো বয়সে পড়াশোনা করছি যাতে অধ্যাপকের জ্ঞানপাপী চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলতে পারি আপনাদের মনের মত। আগেরবারের বেশ কয়েকটি অভিনেতা বদলে গেলেও আশা করি আপনাদের রক্তকরবী দেখে ভালো লাগবে। জানি আপনারা আমাকে বোকা বলবেন, তবুও নিজেকে নিয়ে গর্ব অনুভব করছি যে লেখাপড়ায় ঘোড়ার ডিম পাওয়া এক ছবিওয়ালা রক্তকরবীর মত নাটকে অভিনয় করছে! তাও আবার অধ্যাপক। এজন্য গৌতমদার কাছে আমি চিরঋণী থাকবো।
শেষ করছি স্ত্রী নিবেদিতার কথা দিয়ে, প্রথম বার রক্তকরবী নাটকে আমি অধ্যাপক করছি শুনে বন্ধুদের বলেছিল। “সারা জীবন লেখাপড়ার ধার দিয়ে গেল না। এখন উনি মঞ্চে অধ্যাপক সেজে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন।”….একথা আমায় শুনতে হতো খুব। কিন্তু নিবেদিতা নিজে রক্তকরবী দেখার পর এই চরিত্রে আমার প্রশংসা করেছে। এটাও যে পরম পাওয়া আমার কাছে।
যাইহোক, জীবনের নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ যখন রক্তকরবী হাতে পাঠ মুখস্থ করি….মনে হয় কবিরা কি যাদু জানেন ? কি করে মানুষের মনের দ্বন্ধ, দ্বিধাকে কলমের আঁচড় কেটে এমন নিপুনতায় লিখে ফেলেন !! আমি নিজেই কত অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে সামান্য আলোর দিশায় খুঁজেছি নিজেকে। এভাবেই সকলের জীবনের অন্ধকার ঘুঁচে যাক আলোর সরণী বেয়ে। অসহায়তার জাল ছিঁড়ে মানুষ জয়গান গেয়ে উঠুক প্রাণের মনের আনন্দের।
একটা অনুরোধ করছি….আপনারা নাটক দেখুন। নিজেদের পকেটের পয়সা দিয়ে নাটকের দলগুলো টিকে থাকার চেষ্টা করছে। আপনাদের সহযোগিতা ওদের উৎসাহিত করবে।
১৩.০৫.২০২৩
Bhalo laglo. Joy hok apnader proyaser.
গৌতমদার নির্দেশনায় রক্তকরবী দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।