করোনা-উত্তর পরিসরে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে যেভাবে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ ও দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে আন্দোলন, অবস্থান, ঘেরাও প্রভৃতি খবরের শিরোনামে উঠে আসছে এবং তা নিয়ে সারা রাজ্য জুড়ে চর্চার পরিসর শুরু হয়েছে, তা একেবারেই অভিনব হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। এমনিতে অনলাইন-অফলাইনের পরীক্ষা নিয়ে চারিদিকে শোরগোল পড়ে গেছে। তার ওপরে কীভাবে তার সমাধান হবে, তা নিয়েও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি রঙিন গণমাধ্যমে কৌতূহলী জনতার সতৃষ্ণ দৃষ্টি। অথচ এই অনলাইন পরীক্ষা আদতে অনলাইনও নয়। তা আসলে প্রশ্ন দেখে বাড়িতে বসে নিজের ইচ্ছে মতো উত্তর লিখে আবার তা অনলাইনে জমা দেওয়া। সেখানে না-দেখে না-শুনে পরীক্ষা নয়, নিজের মতো দেখেশুনে ও জেনেবুঝে নেওয়ার দেদার অবকাশ।
স্বাভাবিক ভাবেই পরীক্ষার অনিশ্চয়তা থেকে তার নিশ্চয়তার পরীক্ষার্থীর প্রতি তীব্র আগ্রহ জেগে উঠবে। সেখানে ক্লাস না হওয়ার যুক্তি,সিলেবাস শেষ না হওয়ার কারণকে ঢাল করে যেভাবে অনলাইনের দাবি রীতিমতো আন্দোলনের রূপ লাভ করেছে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। অবশ্য ইতিমধ্যে এই অবস্থাতেও মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সময় বাড়িয়ে বা সিলেবাস কমিয়ে দিয়ে অফলাইন পরীক্ষার দাবিও জোরদার হচ্ছে না। উল্টে সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের জন্য তার প্রতি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নীরব সমর্থন ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনকে অক্সিজেন জুগিয়েছে। শুধু তাই নয়, অমুক অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে পরীক্ষা হচ্ছে, তাদের অফলাইনে হলে বৈষম্যের শিকার হতে হবে বলেও আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা যুক্তির ঢাল শক্ত করছে।

আসলে অভ্যাস যখন রোগে পরিণত হয়, তখন তা ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। করোনাকালের অনলাইনের অভ্যাস এখন আত্মঘাতী মহামারী। যা ছিল ওষুধ, মেয়াদ শেষে তাই আজ বিষ। করোনার দুর্যোগ এখন তলানিতে, কিন্তু তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কৌশলে আজ আমরা ফেঁসে গেছি। এ যে পরবর্তীতে অন্য কোনো রূপে সমস্যার জন্ম দেবে না, তাও জোর দিয়ে বলা যায় না। কেননা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অফলাইনে, বাকি সব অনলাইনে পরীক্ষার ফলে বৈষম্যবোধ অস্বাভাবিক নয়। সেইসব ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতে কোনো ভাবে অবজ্ঞা বা উপেক্ষার শিকার হতে হবে কিনা, তা এখনও বলা যাচ্ছে না। কম বা বেশি নম্বরপ্রাপ্তির দুটো ক্ষেত্রেই তার আশঙ্কা বর্তমান। অন্যদিকে ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষায় ভর্তিতে বা কর্মক্ষেত্রের পরীক্ষায় তাদের কীভাবে দেখা হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা থেকে যায়। শুধু তাই নয়, উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থার মান ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এই সংকট কীরূপ আকার ধারণ করবে, তা নিয়েও আশঙ্কা বর্তমান। কেননা করোনাকালে অনলাইন পরীক্ষাই ছিল সমাধান, আজ তাই ভয়ঙ্কর সমস্যা। সেদিক দ্রুত সমাধান করতে গিয়ে বৈষম্যমূলক পরীক্ষা পদ্ধতির প্রভাব নিয়েও অজানা আশঙ্কা জেগে ওঠে। কেননা ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাও যে তার সঙ্গে নিবিড় ভাবে জড়িত।
লেখক প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া ৭২৩১০৪