বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক কর্মোদ্যোগ আর জনসচেতনতার মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতার লক্ষ্যে পালিত হচ্ছে আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এই দিনটিতেই জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সম্মেলন শুরু হয়েছিল। দিনটা ছিল ১৯৭২ সালের ৫ জুন। এদিন থেকে ১৬ জুন পযর্ন্ত চলেছিল সম্মেলন। তার আগে ১৯৬৮ সালের ২০ মে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কাছে একটি চিঠি পাঠায় সুইডেন সরকার। চিঠির বিষয়বস্তু ছিল প্রকৃতি ও পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা। এরপর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আজকের দিনে জাতিসংঘের মানব পরিবেশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বারো দিন ধরে চলে এই সম্মেলন। এরপর ১৯৭৩ সালের ৫ জুন দিনটিকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে জাতিসংঘ ঘোষণা করে। বিশ্বে সবুজায়ন ও প্রকৃতির গুরুত্ব বোঝাতেই এই দিনটি পালন। মূলত প্রকৃতিকে সম্মান জানাতেই বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রতিটি মানুষ নিজের দায়িত্ব পালন করলে তাহলে এই সুন্দর ধরণী থাকবে সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা। তাই আজকের দিনে পরিবেশ পুনরুদ্ধার হোক সবার অঙ্গীকার।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর পরিবেশ রক্ষায় একটি থিম উল্লেখ থাকে। ২০১৮ সালে প্ল্যাস্টিক দূষণ বন্ধের আহ্বানে ‘বিট প্ল্যাস্টিক পলিউশন’ থিম নিয়ে সারা বিশ্বে দিনটি পালিত হয়। বিশ্বব্যাপী এর দূষণের ভয়াবহ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতেই এই দিবস পালিত হয়। আবার ২০২০ সালে থিম ছিল ‘সেলিব্রিটি বায়োডারভারসিটি’।আর গত বছর পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার করা’। এবার ২০২২ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে থিম ঠিক হয়েছে ‘ওনলি ওয়ান আর্থ’। পৃথিবীকে সবুজায়ন করতে হবে। আজ এই অঙ্গীকারের দিন। অর্থাৎ বিশ্বে সবুজায়ন ও প্রকৃতির গুরুত্ব বোঝাতেই আজকে শপথের দিন।

প্রসঙ্গত, মহামারী করোনা ছড়িয়ে পড়ায় উপকৃত হয়েছে প্রকৃতি মা। লকডাউনের ফলে মানুষের কর্মকাণ্ড ছিল কম। ফলে নিজেকে পরিষ্কার করার সময় পেয়েছে ‘মাদার নেচার’।
পরিবেশবিদদের কাছে উদ্বেগের বিষয় হল সারা বিশ্বে সামুদ্রিক দূষণ, জনসংখ্যা দূষণ, বায়ু দূষণের ফলে যেভাবে বিশ্ব উষ্ণায়ণ ঘটছে তাতে এই গ্রহে মানব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন আর প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ নিষ্কাশনের ফলে দিন দিন পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেইসঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ওজনবায়ু। যার ফলাফল স্বরূপ সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে তলিয়ে যেতে পারে ভারতের পৃর্বাঞ্চলের বেশ কিছুটা জায়গা। এরমধ্যে কলকাতা বাদ যাবে না। বায়ু দূষণের ফলে বিশ্বে প্রতি বছর ৭০ লক্ষ মানুষ অপরিণত বয়সে মারা যান। ৬ হাজার ৪৭৫ টি শহরে দূষণের পরিস্থিতি সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রায় কোনো দেশই ২০২১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুমানের শর্ত পূরণ করেনি।
এবার ভারতের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে ৯৩ শতাংশ দূষণের কবলে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনের চেয়ে অনেক বেশি। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক জানান, বিশ্বে দূষণের র্যাঙ্কে ভারতের শহরগুলো উপরের দিকে। ভারতের ৪৮ কোটির বেশি মানুষ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ের বায়ু দূষণের মুখোমুখি। গবেষণায় আরও দেখা যাচ্ছে দূষণ মানচিত্রে শীর্ষে ভারত। ২০০৯ সালেই মৃত্যু হয়েছে ২৩ লক্ষ। এরমধ্যে বায়ুদূষণে ১৬ লক্ষ। ৫ লক্ষ জলদূষণে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে বিশ্বে প্রতি ৬ জন মৃত্যুর একটির জন্য দূষণকে দায়ী করা হয়েছে। এই মুহূর্তে বেশি উদ্বেগ দিল্লিকে নিয়ে। ইতিমধ্যে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের মুখে জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে।দূষিত বাতাস ছেয়ে গেছে। দিল্লির বাতাস হচ্ছে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত। এখন দিল্লিকে বর্ণনা করা হয় ‘ গ্যাস চেম্বার ‘ বলে। প্রসঙ্গত, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ৬টি নগরের মধ্যে ৫টি উত্তর ভারতে।

দেশে যেভাবে গাড়ির ক্ষতিকর ধোঁয়া, কারখানার বর্জ্য, পাহাড় কাটা, নির্বিচারে গাছকাটা, যত্রতত্র প্ল্যাস্টিক ফেলা বন্ধ করতে হবে। সেইসঙ্গে ধানের নাড়া পোড়ানো রদ করতে হবে। তবেই বাঁচবে এই গ্রহ।
প্রসঙ্গত, আধুনিক সভ্যতা বিশেষ করে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের জীবন আবর্তিত হতে শুরু করল বস্তুকেন্দ্রিক ভোগবিলাসকে কেন্দ্র করে। সেই ভোগের বাসনা মেটাতে ব্যাপক যথেচ্চার শুরু হল পরিবেশের উপর। আধুনিক যুগের প্রথম পর্যায়ে মানুষ তথাকথিত উন্নয়নের উদ্দেশ্যে বিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত বনভূমি নির্বিচারে ধ্বংস করতে শুরু করল। অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবের অমোঘ ফল হিসেবে দূষিত হতে থাকল ভূমি, জলবায়ু ইত্যাদি। একদিকে যেমন সমুদ্রের জলে মিশতে থাকল বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। অন্যদিকে বাতাসে নির্গত হল নানা বিষাক্ত গ্যাসের বাষ্প। এভাবেই বিশ্ব থেকে একে একে নির্মূল হয়ে যেতে লাগল নানা গুরুত্বপূর্ণ মিত্র পোকামাকড়, পশুপাখি। এমনকী অমূল্য সম্পদ গাছপালাও। আর নয়। বিশ্বকে সকলের জন্য বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। আরও বেশি সচেতন হতে হবে। আগামী প্রজন্মের কাছে দূষণমুক্ত পৃথিবী তুলে দিতে চাই। নিশ্বাসে বিষ নয়। কেবলই অক্সিজেন। আজকের দিনে অঙ্গীকার করে সকলে এগিয়ে আসুন। আর সকলের জন্য চাই ‘ওনলি ওয়ান আর্থ’।