কোভিড কর্তৃপক্ষের কাছে কাজের জায়গার বিন্যাসের পরিবর্তনের এক বার্তা হাজির করেছে। প্রশ্ন উঠছে বিরাট খরচ করে ব্যয়বহুল ঝকঝকে অফিস করার কী সত্যিই কোন প্রয়োজন আছে? সবাই দেখছে বাড়িতে বসেই দিব্যি চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে অফিসের কাজ। এটাও বোঝা গেছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ লোকজন এবং সহায়ক কর্মী রাখলেই দিব্যি চলে যায় অফিসের কাজ। তাহলে এ অবস্থাটাই বহাল রাখলে ক্ষতি কি?
গত তিন দশকে সারা পৃথিবীতে অফিসগুলির বেশ পরিবর্তন ঘটেছে। হেড অফিসের বড়বাবু বা বাংলা উপন্যাসের ক্লান্ত কেরানি যে অফিসে বসে কাজ করতেন সেই অফিস কি এখন আমরা ততটা দেখি? মহাকরণ আর নবান্ন কী একইরকম? একটা যদি টেবিলে ফাইল ও দলিল দস্তাবেজ বোঝাই ধুলোয় ঢাকা জায়গা হয়, আরেকটি নতুন যুগের এক ঝকঝকে আধুনিকতা। ঢুকলেই মন ভালো হয়ে যায়, চোখ ও মনের ক্লান্তি দূর হয়। বিজেপি অবশ্য আবার মহাকরণে ফিরে যাওয়ার কথা বলছে। কারণটা অবশ্য মোটেই তেমন পরিস্কার নয়।
পুরোনো অফিসের কিউবিকল, পার্টিশান, কলিংবেল কিংবা বাজার এর আওয়াজে জেগে থাকতো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্বতন্ত্রতার চিহ্ন। নতুন অফিসের ওপেন প্ল্যান লে আউটে সেই বসিং এর চিহ্নগুলি অনুপস্থিত। বসিং নয়, টিম ওয়ার্ক, ধমক কিংবা হম্বিতম্বি নয়, সমাধানের মূল সূত্রটাকে বোঝাটাই আজকের কাজের জায়গার মন্ত্র। পুরোনো অফিসে সেই পরিসরটুকুই ছিলনা।
ইমেল, গুগুল ডকস, ভিডিও কনফারেন্সিং, ভার্চুয়াল হোয়াইট বোর্ডিং এবং চ্যাট চ্যানেলের জমানায় মানুষ পুরোনো অফিসের ধারণাটিকে প্রশ্ন করতে শিখেছে। অফিস কীসের জন্য এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হচ্ছে এটা অভিজ্ঞ কর্মীদের কাছ থেকে নতুনদের শেখার জায়গা। বসের সঙ্গে সহজ হয়ে ওঠার সুযোগ। এটা সহযোগিতার একটা মন্ত্র। সমাজ জীবন ও পরিবার থেকে একটু আলাদা হয়ে দরকারি কাজ সেরে নেওয়ার একটা পরিসর। এটাকে একটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করার দরকার নেই। দরকারে অফিসে এসো, নাহলে বাইরে থেকে কাজ কর। ২০২১ সালে আমেরিকার কর্মী বাহিনীর ২১ শতাংশ দূর থেকে কাজ করবে বলে সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই সে দেশের ২০ মিলিয়ন কর্মীর অনেকেই বড় শহরগুলির বাইরে থেকে কাজ করছেন বা কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
অতিমারির আগে থেকেই এই সমস্যাগুলি ছিল। কোভিড তাতে একটা গতি দিয়েছে। নতুন প্রযুক্তি অফিসের কাজের গতি যেমন বাড়িয়েছে ঠিক তেমনি কমিয়েছে অফিসের গুরুত্ব। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় কর্মীদের মুখোমুখি বা পারস্পরিক বিনিময়ের সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে অফিসের ওপেন প্ল্যান লে আউট।
তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি কখনোই মানবিক সংযোগের বিকল্প হতে পারেনা বলে জানিয়েছেন মাইক্রোসফটের সিইও সত্য নাডেলা। তার মতে, ওপেন প্ল্যান লে আউট অফিসের অনেক অসুবিধা আছে। আপনার পাশে বসে যদি কেউ কথা বলে তাহলে কাজ করতে অসুবিধা হবে। আবার অনেক সময় আলাদা কথা বলার মত একটু ব্যাক্তিগত পরিসর বা প্রাইভেসির জায়গাও দরকার। এ ধরণের অফিস তাতে অসুবিধার সৃষ্টি করে। ডিজিটাল প্রযুক্তিকে এই স্পেসটুকু দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, বাড়িতে বেশি কাজ করা যাচ্ছে। মাত্র ৭ শতাংশ বলেছেন, এতে অসুবিধা হচ্ছে। অতিমারির ২ মাসের মধ্যে লোকজন এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বলে সমীক্ষা জানাচ্ছে। এর পাশাপাশি আবার অনেকেই বলেছেন, সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হচ্ছেনা বলে খারাপ লাগছে। অফিস সম্পর্কে ধারণাটাই এগোচ্ছে নানা ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে। চূড়ান্ত কোন কথা বলার সময় এখনও আসেনি।
কিন্তু সপ্তাহে ৫ দিন অফিস অবশ্য কেউ করতে চাইছেন না। লোকে অফিসে আসতে চাইছেন খুব বেশি হলে সপ্তাহে ১ থেকে ৩ দিন। অনেক অফিসও রোজ কর্মীদের অফিসে না এনে তাদের কাজ ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে অফিসে আনতে চাইছেন। বিজ্ঞজনেদের মতে, এতে কর্মী বাহিনীর কার্যকারিতা বাড়বে, অফিস হয়ে উঠবে রোজ হাজিরা দেওয়ার বদলে প্রকৃত অর্থে কাজের জায়গা। অতিমারি মানুষের কাজ করার পরিসর সম্পর্কে একটা নতুন ভাবনার সূত্রপাত করেছে। মানুষ ছাড়া অফিস একটা বাতিল রোলসরয়েস। আবার সবকিছুই অনলাইনে হলে মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগটাই বন্ধ হয়ে যাবে। এই সরাসরি যোগাযোগেই কিন্তু আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আগুন, চাকা, ইন্টারনেট সবকিছুর সৃষ্টি। কাজেই শুধুই অনলাইন কখনও প্রকৃত বিকল্প হতে পারেনা।