রাজ্যে প্রথম দফার ভোট হয়েছে ২৭ মার্চ। ২৮ মার্চ নির্বাচন কমিশন মতদানের হার নিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে। সেটা দেখে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মন্তব্য করেছেন, এবার বেশি ভোটদানই না-কি তাঁদের জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে। সত্যিই কি তাই?
গত মাস দেড়েক ধরেই ঘুরছি রাজ্যের নানা এলাকা। রাজনীতির পর্দা যতই চড়ায় উঠেছে, চোখের ওপর দেখেছি মানুষের চোখ-মুখের বদলে যাওয়া ভঙ্গি। প্রায় সব মানুষই যে এবার ভোট দিতে যাবেন, সেটা তখন থেকেই বুঝে গিয়েছিলাম। তেমন সংখ্যায় ভোট হলেই শতকরা অঙ্কটা ৮৫ শতাংশের আশেপাশে হয়। বাকি ১৫ শতাংশের অনেকে ভোটের দিন এলাকায় আসতে পারেন না, কেউ হয়তো খুবই অসুস্থ, অসুস্থের সেবা কাজে নিযুক্ত। আবার অনেকে কাজের জায়গাতেই থাকতে পছন্দ করে বা থেকে যায় (যেমন ড্রাইভার বা ব্যবসায়ী)। এঁদের যে ভোট দেবার সম্ভাবনা খুবই কম, সেটা এলাকার অভিজ্ঞ রাজনৈতিক কর্মীরা জানেন। এসব ভোটারদের বাদ দিলে আমাদের রাজ্যে দীর্ঘ দশকের পর দশক ধরে প্রায় সব মানুষের ভোট দেবার ঐতিহ্যই রয়েছে। ভোট তেমনই হয়েছে। অভিযোগও খুব একটা নেই। তাহলে হঠাৎ অমিত শাহ বলতে গেলেন কেন, ভোট অনেক বেশি পড়েছে, তাই এই আসনগুলির প্রায় সবগুলিতে বিজেপি জিতবে? অমিত শাহ যে-কেউ ব্যক্তি নন্, তিনি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন, বর্তমানে এ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শাসক দল ও সরকারে সম্ভবত নরেন্দ্র মোদির পরে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ নেতা। গতকাল, ২৮ মার্চ তিনি এ রাজ্যের ভোট নিয়ে মন্তব্য করেন, অধিকাংশ আসনে জেতার দাবি পেশ করে দু’টি কারণের উল্লেখ করেছেন। একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের ভাষায়, অমিত বলেছেন, ক) ৮৪ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে, খ) রাজ্যে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। শান্তিপূর্ণ হলে সবার মনেই নির্বাচন সম্পর্কে একটা বিশ্বাস তৈরি হয়, বিশেষ করে রাজ্যের শাসক দলের প্রতি আস্থা আসে। কিন্তু বেশি মতদান? গতকাল, ২৮ মার্চ নির্বাচন কমিশন এবারে ভোটদানের হার সম্পর্কিত তথ্য সামনে এনেছে। অমিত শাহ কী তথ্য না দেখেই কথা বলে দিলেন? আসুন একবার দেখে নেওয়া যাক, সত্যিই এবার ভোট বেশি পড়েছে কি-না।
ঝাড়গ্রাম জেলায় প্রদত্ত ভোট (মোট ভোটের শতাংশ)
| কেন্দ্র | ২০১৬ | ২০১৯ | ২০২১ |
| নয়াগ্রাম তপ-উপ | ৮৫.১৭ | ৮১.৬২ | ৮৩.৮৮ |
| গোপীবল্লভপুর | ৮৭.৬৭ | ৮৪.৬৩ | ৮৬.৭৪ |
| ঝাড়গ্রাম | ৮৪.৪১ | ৭১.১২ | ৮৪.৪৩ |
| বিনপুর তপ-উপ | ৮৪.১৬ | ৮৩.০৬ | ৮৩.৮৯ |
দু’টি বিধানসভা ভোটের তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, কেবলমাত্র ঝাড়গ্রাম কেন্দ্রটি বাদে অন্য তিন কেন্দ্রে এবার ২০১৬-র তুলনায় কম ভোট পড়েছে। ঝাড়গ্রামে বিধানসভা আসনে ভোটদান প্রায় সমান-সমান। আর গোটা জেলায়? গত বিধানসভা ভোটে ওই চার কেন্দ্রে মিলিতভাবে মতদানের হার ছিল ৮৫.৩৫ শতাংশ। এবার বিধানসভা নির্বাচনে সেটা ৮৪.৭৩ শতাংশ। একই ভাবে দেখে নেওয়া যেতে পারে বাঁকুড়া জেলার চার কেন্দ্রের সমীকরণও।
বাঁকুড়া জেলার ৪ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে (মোট ভোটের শতাংশ)
| কেন্দ্র | ২০১৬ | ২০১৯ | ২০২১ |
| শালতোড়া তপ | ৮৬.৪৭ | ৮৫.৮৭ | ৮৬.৫৭ |
| ছাতনা | ৮০.৯৪ | ৮০.৫৪ | ৮০.৯০ |
| রানিবাঁধ তপ-উপ | ৮৩.৩৯ | ৮৩.৫৮ | ৮৩.৮১ |
| রায়পুর | ৮৬.৭৭ | ৮৬.২৮ | ৮৬.০৪ |
এই জেলাতেও পরপর দু’টি বিধানসভা ভোটে প্রদত্ত ভোটের হার তুল্যমূল্য। এমনকী লোকসভা নির্বাচনেও প্রায় এমনটাই ভোট পড়েছিল। এই তথ্যের বিবরণ আর না বাড়িয়ে বলাই যেতে পারে, এবারের নির্বাচনে অতিরিক্ত মতদান হয়নি। আর একটি কথা। আমরা আগে উল্লেখ করেছি, এ রাজ্যে বরাবরই প্রায় সবাই ভোট দেন। ১৯৯৬ সালে বাঁকুড়া জেলায় ভোট পড়েছিল ৮২.৪৬ শতাংশ। তখন ঝাড়গ্রাম জেলা হয়নি, হয়নি পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর ভাগ। যুক্ত মেদিনীপুরে সে-বছর বিধানসভা নির্বাচনে মতদান হয়েছিল ৮৮.২১ শতাংশ।
যদি মতদানের হারের উপর কিছু নির্ভর করে, তবে তো বলতে হয়, ২০১৬ সালের মতোই ফলাফল হতে চলেছে। সেটা ওভাবে আমরা এখনই বলছি না। আরও সাত দফা ভোট বাকি, নিবিড় পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কিন্তু দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরেকটু সঠিক তথ্য দিলে ভালো লাগত। হয়তো তিনি ভেবেছেন, কে আর অত খুঁটিয়ে দেখবে!
নেহাৎই অ্যকাডেমিক চর্চা হিসেবে বলা যায়, বেশি ভোট মানেই যে পরিবর্তন, তেমন দাবি ধোপে টেকে না। বড় পরিবর্তনের বছরগুলো, ১৯৬৭, ১৯৭৭, ২০১১ ইত্যাদির তথ্য দেখলেই সেটা বোঝা যায়। তবে কি আগাম অনুমানে বেশি বা কম ভোট পড়ার কোনো ভূমিকা নেই? মনে হয়, না। এমনকী খুব তীব্র আবেগের ভোটেও বেশি মতদানের তথ্য টিকবে না। যেমন, ২০১৯ সালে পুলওয়ামা-বালাকোটের প্রচার আবেগের ঝড় তুলেছিল, যার ওপর ভর করে বিজেপি বিপুল গরিষ্ঠতা পায়, এ রাজ্যেও তারা ৪০ শতাংশ সমর্থন আদায় করে। সেবার কি ২০১৬-র তুলনায় বেশি ভোট পড়েছিল? ওপরের তথ্য দেখিয়ে দিচ্ছে, না। এ রাজ্যের ভোটদানের মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, নিয়মিত যারা ভোট দেন, তাদেরই একটা অংশ মত পরিবর্তন করেন, আগের দলকে ছেড়ে নয়া দলকে ভোট দেন। ২০১৯ সালে সেই ভোটররাই দলে দলে বাম-কংগ্রেস শিবির ছেড়ে পদ্মফুলে ঝুঁকেছিলেন। তাই ফল কোন দিকে যাবে, সেটা বোঝা খুব একটা সহজ নয়। মনে পড়ছে, ২০১৯ সালে কলকাতা টিভি-র ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম ঝাড়খণ্ড, বিহার ও বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকায়। বিহারের বেগুসড়াই, ঝাড়খণ্ডের রাঁচি বা বাংলার নদিয়া, সাধারণ মানুষের মধ্যে একই ধরনের কথাবার্তা লক্ষ করেছিলাম। ভাগলপুরের এক যাদব কৃষক বলেছিলেন, হ্যা, বিজেপি সরকার বা তাদের কাজের উপর অনেকের রাগ আছে, কিন্তু ‘ইয়ে দেশ কি সওয়াল হ্যায়। দেশ রহেগা তো ঔর সব। দেশ গয়া তো নহি রহেগা বাঁশ, নহি বাজেগা বাঁশরি।’ গবেষককে ওই মানুষের মাঝে কান পাততে হবে।
Very logical analysis