দক্ষিণ কলকাতার থেকে উত্তর কলকাতা এখনো আমার কাছে যথেষ্ট প্রাণবন্ত মনে হয়—কেন জানিনা। হয়তো কলেজ লাইফটা ছাড়াও অনেকটা সময় উত্তর কলকাতায় কাটিয়েছি। এমনও হয়েছে মন খারাপ হলে উত্তর কলকতার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়িয়েছি। পুরনো বাড়িগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে স্মরণ করার চেষ্টা করেছি। মন ভালো হয়ে গেছে। এই উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে এখনও বেশ বড়ো বড়ো রকের দেখা পাওয়া যায়। সান্ধ্যকালীন আড্ডাটাও বেশ জমে। কাগজে কলমেও উত্তর কলকাতার আড্ডা নিয়ে ভুরিভুরি লেখা হয়েছে। তৃণমূল-বিজেপি, মোহনবাগান-ইষ্টবেঙ্গল, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, মেসি-রোনাল্ডো কিছুই বাদ যায় না। র-চায়ের সাথে মুড়ি-বাদাম। ধুন্ধুমার আড্ডা, তর্ক-বিতর্ক, যুক্তি-তর্ক এরকম কিছু কথা আজ এখানে লিখলাম। কুশীলব এলাকারই সব ছেলে-ছোকরা, মাঝবয়সী থেকে পক্ককেশ বৃদ্ধ। মধ্যমনি একজন। সবাই তাঁকে টকাদা টকাদা বলেই সম্বোধন করছিল। মাঝবয়সী, বয়স্করা তাঁকে টকা নাম ধরেই সম্বোধন করছিল। টকাদার বয়স ৪৫/৪৬ কিন্তু বেশ ধোপদুরস্ত। শরীরে একটা বনেদী বাড়ির ছাপ রয়েছে। চকচকে ঝকঝকে। কথাবার্তায় ধার, ভাড় যথেষ্ট। আড্ডায় স্রেফ শ্রোতা হিসেবেই যোগ দিলাম। তখন আড্ডাটা অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। চলছে র-চায়ের সঙ্গে তুমুল রাজনীতি। যেখান থেকে আমি দাঁড়িয়ে পরেছিলাম সেখান থেকেই শুরু করি।
যাই বলো টকাদা তৃণমূল কিন্তু ভাঙতে আরম্ভ করেছে। ফেব্রুয়ারিতে কিন্তু পুরো সাফাচাট—
টকাদা মুচকি হাসলো, কার কথা বলছিস সুমন—
কতো নাম বলবো বলো—
এক এক করে বলে যা, আমি উত্তর দিয়ে যাচ্ছি।
দেখলেতো লক্ষ্মীরতন শুক্লা কেমন ইয়র্কারটা দিল ক্লিন বোল্ড?
ওটা আবার কবে রাজনীতি করলো। খেলতো তো ক্রিকেট। নিজের খেলার জোড়ে কোনওদিন ইন্ডিয়া খেলেছে? শোন লক্ষ্মী ৩টে ওয়ানডে খেলেছে। ৯৪ রান দিয়ে ১ উইকেট। বেস্ট ২৫ রান দিয়ে ১ উইকেট। আইপিএল ৪২টা ম্যাচ খেলেছে। ৩৬৪ রান দিয়ে ১৪ উইকেট পেয়েছে। ব্যাটিংয়ের কথা বললাম না। ইন্টারনেট থেকে দেখে নিস। দাদা ছিল তাই ওয়ানডে খেলেছে। কেকেআরেও দাদা ছিল বলে চান্স পেয়েছিল। দেখ যেই দাদা নেই ও গাইপ। শোন দিদি ছিল বলে লক্ষ্মী বিধায়ক। অন্য পার্টি থেকে একা লড়ে জিতে দেখাক। কলজে শুকিয়ে অমসত্ব হয়ে যাবে।
বেশ তোমার কতা মেনে নিলাম—বৈশালী ডালমিয়া?
বালির মতো জায়গায় ২০১৬ সালে ভোটে জিতেছে! ওর করিশ্মায়? ভেবে দেখ একবার। ওই জায়গাটা কিন্তু ছিল বামফ্রন্টের দুর্গ। ২০১১ সালে সুলতান সিং তৃণমূলের টিকিটে প্রথমে ওখানে জেতে পরের বার বৈশালী। বাবা জগমোহন ডালমিয়া। দিদি ভালোবাসতো জগ্গুদাকে। তাই কৃতজ্ঞতায় মেয়েকে চান্স দিয়েছিল। জিতিয়েওছিল। কে চিনতো ওকে? জগ্গুদার ছেলেটাও সিএবিতে ভালো পোস্টে আছে। ফল কি—লকডাউনের সময় মদী বললো শঙ্খ আর ঘন্টা বাজাও, বৈশালী ছাদে উঠে ছেলেকে নিয়ে শঙ্খ আর ঘন্টা বাজালো। তখনই বুঝেছিলাম আর যাই হোক বেটি তৃণমূলে থাকবে না। বালিতে গিয়ে ওর করিশ্মাটা একবার দেখে আয়, পাবলিক নাম শুনলেই নাক সিঁটকোয়। বিজেপি থেকে দাঁড়ালেও গো-হারা হারবে। ভাবছিস ওখানে অনেক অবাঙালি আছে, ওকে ঢেলে ভোট দেবে। সে গুড়ে বালি। প্রত্যেকেই নিজের ধান্দাটা বোঝে। দিনে ব্যাবসা করতে হবে, রাতে ঘরে ফিরতে হবে। বাল-বাচ্চা নিয়ে সংসার।
তুমি দেখছি আজ সপাটে ব্যাট চালাচ্ছ—
না-রে ঠিক তা নয়, স্ট্রাগল ফর এক্সিটেন্স। তোরা দেখেছিস মোহানবাগানের ঝান্ডা ছাড়া আমি এখনও কারুর ঝান্ডা নিয়ে রাস্তায় বেরুই নি। কিন্তু ভদ্রমহিলার প্রতি আমার একটা সফ্ট কর্ণার আছে। ২০১১ সালের আগের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর ২০২১-এর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক। সবচেয়ে বড়ো কথা কি জানিস— উনি মাটির গন্ধটা সবার আগে বুঝতে পারেন। এটা কিন্তু আমার কথা নয়—একজন ব্যারিস্টার কাম পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদের কথা। তিনি কিন্তু আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোর সমালোচক। পান থেকে চুন খসলেই দিদিকে একেবারে ধুঁয়ে মুছে সাফ করে দেন। আমি তো কখনও দিদিমনির সম্বন্ধে মন্দ ছাড়া ভালো কথা কখনও বলতে শুনি নি। তিনিও কিন্তু বলে ফেলেছেন—বাতিল ঘোড়া দিয়ে রেসের মাঠে দৌড়নো যায় না। রেসও জেতা যায় না। চাই টগবগে টাট্টু ঘোড়া।
সবাই মুচকি মুচকি হাসছে। বেশ জমে উঠেছে আড্ডা। গুটি গুটি পায়ে অনেকেই টকাদার ডায়লগ শোনার জন্য দাঁড়িয়ে পরেছে। টকাদার কোনও হেলদোল নেই। প্রশ্ন করলেই জিভের ডগায় যেন উত্তর তৈরি। টকাটক উত্তর দিয়ে চলেছেন।
টকাদা এবার থার্ড উইকেট প্রবীর ঘোষাল?
ভাবছিস সাধু পুরুষ? শোন যখন উনি বর্তমানের সাংবাদিক ছিলেন, তখন বরুনদা ওনাকে বলেই দিয়েছিলেন আপনার ডিউটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। আপনি মমতার পেছনে ছায়ার মতো সেঁটে যান। খোঁজ খবর নিয়ে দেখবি আমি একটা কথাও মিথ্যে বলছি না। এটাই ছিল ওনার প্রতিদিনের এ্যাসাইনমেন্ট। উনি অফিসে এসেই সোজা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়ে বসে থাকতেন। দিদি যেখানে প্রবীরবাবুও সেখানে। বরুনদা কিন্তু দিদিকে সাপোর্ট করতেন। সিপিআইএম-এর ওই ভড়া সময় একমাত্র কাগজ বর্তমান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তেড়ে লিখতো। জ্যোতিবাবুকেও বরুনদা ছাড়তেন না। পারলে পুরনো পোস্ট এডিটোরিয়াল গুলো পড়ে নিবি। জ্যোতিবাবু কিন্তু কোনওদিন মুখে রা-টি করেননি। কারণ জানতেন ভদ্রলোকের নাম বরুন সেনগুপ্ত। কলমে দম ছিল, ‘ইন্দিরা একাদশী’ করে ছেড়ে দিয়েছিল। এসমার সময় ইন্দিরা গান্ধী ওনাকে জেলেও ভড়ে দিয়েছিলেন। তা সে যাক। প্রবীর ঘোষ দীর্ঘদিন দিদির পেছন পেছন ঘুরলো। দিদিও প্রবীরদা প্রবীরদা করতেন। ২০১১ সালে দিদি জেতার পর প্রথম যে টিভিতে বসে একঘন্টার সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন সেটার নাম কলকাতা টিভি। দিদি ছাড়া ইন্টারভিউ নিতে যাঁরা বসেছিলেন তাঁরা ছিলেন বিখ্যাত সব সাংবাদিক। প্রবীর ঘোষালও ছিলেন। সেই সব সাংবাদিকদের চোখাচোখা প্রশ্নের উত্তরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিয়েছিলেন। এবং এ-ও বলেছিলেন, বাংলায় অনেক কাজ করার আছে। একটু অপেক্ষা করুন দেখতে পাবেন। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী কিন্তু সেই সময়ের ফসল। সে যাক প্রবীর ঘোষাল কিন্তু দিদির পিছু ছাড়েন নি। দিদিকে নিয়ে গোটা একটা বইও লিখে ফেললেন। কলেজস্ট্রীট পাড়ায় ওঁর লেখা বই বেস্ট সেলারও হয়ে গেল। দিদি কিন্তু ঋণ স্বীকার করতে জানেন— ২০১৬ সালে উত্তরপাড়ার টিকিটটা দিলেন। ঘরে বসে রাজনীতি আর মাঠে নেমে রাজনীতির মধ্যে অনেক পার্থক্য। উনি কি নিজের জোড়ে জিতেছেন—সেই দিদি। দিদি পেছনে না থাকলে সব ভোকাট্টা। তবে হ্যাঁ, প্রবীর ঘোষ সেই সময় দিদিকে নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন। এদিক ওদিক দিদির সঙ্গে গেছেনও। ভাবছিস কি এবার ভোটে দাঁড়ালে জিতবে? মাইনাস দিদি সব জিরো।
রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়?
আজ আর হবে না। তবে একটা কথা বলে রাখি। জঞ্জাল ফাঁকা না হওয়া পর্যন্ত কৌশলী সাফাই অভিযান চলতে থাকবে। আর রাজীব—ওকে কে চিনতো? ২০০৬ সালে ডোমজুর থেকে টিকিট পেয়ে রাজীব ব্যানার্জী ৩০,৯০৯ ভোটে হেরেছিল মহন্ত চ্যাটার্জীর কাছে, সেই মহন্ত চ্যাটার্জীকে ২০১১ তে হারাল ২৪,৯৮৬ ভোটে আর ২০১৬ তে প্রতিমা দত্ত নির্দলকে হারাল ১,০৭,৭০১ ভোটে। (চলবে)