আমরা রোজ বিষ খাচ্ছি। আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। তাতেও বিষ। যা খাবার খাচ্ছি সবেতেই বিষ। এমনকি সাধারণ খাদ্যেবস্তু দিয়ে তৈরি হলেও স্বাস্থ্যবর্ধক হরলিকস কিম্বা কমপ্লান তাতেও বিষ। এমনটা তো হবার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে এই চিত্রটাই উঠে আসছে। চিন্তায় ফেলেছে কৃষি বিশেষজ্ঞদের। তাই বাঁচার পথ দেখাতে সরাসরি মাঠে নেমেছেন। আর এই বাঁচার পথ একমাত্র আমাদের দেশের মহিলারাই দেখাতে পারেন। কি সেই পথ?
কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. অনুপম পালের কথায় সমাজের কৃষক-সহ সমস্ত মানুষ দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। এখনও সময় আছে সুস্থভাবে বাঁচার। চিকিৎসা ব্যয় এখনো কমানো যায়। এই কমানো ব্যয়ের কাজটা একমাত্র চাষিরাই পারেন। তা কীভাবে? খুব সহজ। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ওষুধে চাষ না করে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করে বিষমুক্ত ফসল ঘরে তুলতে হবে। কীভাবে হবে? তার উত্তরও সহজ করে দিয়েছেন অনুপমবাবু।

গত ৬ জুন হুগলির পুরশুড়া ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের একটি সভাঘরে, হুগলি জেলাপরিষদের সভাধিপতি মহাশয়, হুগলীর পথপ্রদর্শক আলহাজ সেখ মেহেবুব রহমানের হুগলী জেলাকে পাল্টে দেওয়ার একান্ত ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে কারিগরদের বাংলা জোড়া সংগঠন কলাবতী মুদ্রার পক্ষে থেকে হুগলি ডিআরডিসির যৌথ উদ্যোগে অনুপমবাবুরা মিলিত হন এখানকার ‘কৃষি সখিদের সঙ্গে। এখানে মিলিত হন জৈব চাষের গুরুত্ব বোঝাতে। আলোচনাচক্রে কৃষি — বিষ নিয়ে প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, দিনের পর দিন কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ওষুধের ব্যবহার বাড়ছে। বর্ধিত ফলনের আশায় চাষিরা এই বিষ প্রয়োগে মাতোয়ারা। এর পিছনে অবশ্য মুনাফালোভী বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর হাত কাজ করছে। চাষিরা জানে না যে রাসায়নিক সার ও ওষুধ প্রয়োগ করে ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে দু-তিন ফসলি জমিগুলো নষ্ট হচ্ছে। আরও ভালো করে বললে জমিগুলো বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে এ রাজ্যের ইতিমধ্যে অসংখ্য জমি বন্ধ্যা হয়ে কোনও ফসল হচ্ছে না। আরও ভয়ংকর হল ধান, আলু, গম ও বিভিন্ন ধরনের যে সমস্ত সবজি খাচ্ছি তাতে সবেতেই ভয়ংকর বিষ ঢুকে পড়েছে। চাষিরা জানে না যে প্রয়োগ করা বিষ কৃষকের জমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই বিষের ভয়ংকর প্রভাব পড়ছে অকৃষকদের উপর। এর দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে ১০০ কি.মি দূর পযর্ন্ত। কৃষকের একটা ভুল গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। এক কথায় সমাজকে অবক্ষয়ের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, চাষিদের বোঝা দরকার আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। আর তাতেই বিষ। এটা বোঝা দরকার যে রাসায়নিক সার ও ওষুধ ছাড়াও জৈব প্রযুক্তিতে চাষ করেও ব্যায় কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। বিষমুক্ত ফসল ঘরে তুলে চিকিৎসা ব্যায় খুব সহজেই কমানো যায়।

প্রসঙ্গত, এদিন আলোচনাচক্রে উঠে আসে কৃষিকাজ কেন গর্বের পেশা হবে না? কৃষক উৎপাদন না করলে সমাজ এক পা এগোবে না। চাষিরা জৈব পদ্ধতিতে চাষে বাইরে থেকে উপকরণ না কিনে সেই সমস্ত উপকরণ নিজেরাই তৈরি করে ব্যববহার করতে পারেন। যৌথভাবে কাজ করা দরকার। এখন চাষিরা অনায়াসে আধুনিক ধানের চাষ না করে দেশি ধানের চাষ জৈব পদ্ধতিতে করতে পারেন। এতেও কোনও অংশে লাভ কম নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হল বিষমুক্ত ধান। খেলে কোনও ভয়ংকর অসুখ হবে না। যেটা ইতিমধ্যে সবুজ বিপ্লবের জায়গা পঞ্জাবে কীটনাশকের ভয়ংকর প্রভাব পড়েছে। সেখানে অসুস্থ শিশুর জন্ম হচ্ছে। ক্যান্সার দেখা দিচ্ছে। এটা থেকে রক্ষা পেতে একটাই পথ বেছে নিতে হবে তা হল জৈব পদ্ধতিতে চাষ। এটা মনে রাখা দরকার এ রাজ্যেয় সাড়ে পাঁচ হাজার জাতের ধান আছে। আমরা এর থেকে দেশি ধান চাষ করতেই পারি। ধান চাষের পাশাপাশি প্রায় পঞ্চাশ রকমের মাছ চাষ করাও সম্ভব নিচু জলাজমিগুলোতে। আর বাইরের কৃষিউপকরণ ক্রয় নয়।
এদিনের আলোচনাচক্রে উপস্থিত ছিলেন, সাংবাদিক জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাশিস শেঠ। সামগ্রিকভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে কলাবতী মুদ্রা ট্রাস্টের সভাপতি বিশ্বেন্দু নন্দ বলেন, মহিলা চাষিরাই পারেন আমূল পরিবর্তন আনতে। খাবারের বিষ এঁরাই তাড়াতে পারেন। তিনি মহিলাদের উৎপন্ন কৃষি এবং অকৃষি পণ্য বাজারজাত করতে স্বেচ্ছাব্রতী দলকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন।

সারা দিনের আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা সভাধিপতি আলহাজ সেখ মেহেবুব রহমান, পুরশুড়া ব্লকের ডিআরডিসির আধিকারিক কপিলকৃষ্ণ ঘোষ, সন্দীপা ম্যাডাম প্রমুখ। উল্লেখ্য, আলহাজ সেখ মেহেবুব রহমানের সক্রিয় পরিকল্পনা, হুগলির আটটি ব্লককে জৈব চাষ ব্লকে পরিণত করার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে এগিয়ে এসেছেন কারিগরদের সংগঠন কলাবতী মুদ্রা, আর হুগলি জেলার আনন্দধারা প্রকল্পের অধিকর্তা শাশ্বতী দাস, উপ-অধিকর্তা অমৃতা ম্যাডাম এবং আরও অনেক আধিকারিক।