থিম হোক বা সাবেকি প্রতিমা-ই হোক না কেন, দুর্গা ও তাঁর পরিবারের সদস্যের হাতে নকল অস্ত্র থাকবেই। নানা আকারের ও রঙের বিভিন্ন অস্ত্র প্রতিমার রূপ বাড়িতে তোলে সময় ও বৈচিত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। হাওড়ার উলুবেড়িয়া গ্রামের অনেক শিল্পীই এই নকল অস্ত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ঘুরে দেখা গেল প্রাক্-দুর্গাপুজোয় গ্রামের ব্যস্ততার ছবি।

পুরনো দোতলা বাড়ির ভিতর থেকে ভেসে আসছে অচেনা এক তীঘ্ন শব্দ! পরে বুঝলাম ‘খচখচ’ এই শব্দটি আসলে টিন কাটার। এলাকাবাসীর কাছে যদিও এটি খুব চেনা আওয়াজ। একেবারে পুজো-পুজো শব্দ। অশ্চর্য লাগছে তো খচখচ শব্দের সঙ্গে দুর্গার যোগসূত্র নির্মাণ করতে? আশ্বস্ত করছি, আশ্চর্য হবেন না। দেবী প্রতিমার অস্ত্র তৈরি হচ্ছে যে! এই অস্ত্র দিয়েই হবে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। কলকাতার বেশিরভাগ মণ্ডপে এই অস্ত্র যাবে। দুর্গা প্রতিমার দশ হাত দশ অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত হবে। কোনও হাতে চক্র, কোনও হাতে শঙ্খ। শুধু একটা বাড়িতেই নয়, উলুবেড়িয়া থানার বাড়বেড়িয়া এলাকার অনেক বাড়িতেই তৈরি হয় দুর্গা ও তাঁর সন্তানদের অস্ত্র। নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ বা কাশ ফুল নয়, টিন কাটার শব্দ, হাতুড়ি দিয়ে টিনকে সোজা করার আওয়াজ এখানে মনে করিয়ে দেন দুর্গাপুজো আসছে। শত্রুকে বিনাশ করতে দশ হাতে দশ অস্ত্র, ঢাল, খাঁড়া, ফলা, ত্রিশূল, অঙ্কুশ, ঘন্টা, চক্র, শঙ্খ, গদা, বজ্র নিয়ে দেবী দুর্গার আসার ক্ষণ উপস্থিত।

কলকাতার মেছুয়া বাজার থেকে পাতলা টিন আনা হয়। সেই টিন কাটিং করা হয় প্রথমে। তারপর তাকে হাতুড়ি পিটিয়ে সোজা করতে হয়। কাটিং করা সোজা অস্ত্রগুলিতে নিপুন হাতে রং করে তা শোকাতে হয়। তারপর প্যাকিং করে তা পাঠানো হয় কলকাতা সহ দেশ-বিদেশে। কুমোরটুলির ট্রাম রাস্তার উপরে একমাত্র প্রতাপচন্দ্র দাশ-এর নিজস্ব নকল অস্ত্র তৈরির কারখানা আছে। এছাড়া অধিকাংশ কুমোরটুলির শিল্পীরাই হাওড়ার উলুবেড়িয়া অঞ্চল থেকে প্রতিমার অস্ত্র নিয়ে আসেন। উলুবেড়িয়ার নকল অস্ত্র তৈরির কাজের সঙ্গে প্রায় ২০ বছর যুক্ত এক শিল্পী জানালেন, ‘কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের তৈরি প্রতিমা বিদেশে যায়। আর তার সঙ্গে আমাদের তৈরি অস্ত্রও বিদেশে পাড়ি দেয়। ভেবেও ভালো লাগে। দুর্গাপুজোর কয়েক দিন পরেই কালীপুজো। তাতেও অস্ত্রের প্রয়োজন হয়। যদিও করোনা মহামারির কারণে বিগত দু’ বছর ব্যবসা তেমন হয়নি। তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্গাপুজো পালনের জন্য সার্ব্বিক ভাবে উদ্যক্তাদের পাশে দাঁড়াবার কারণে আমাদের অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটাতে হয়নি।’

অস্ত্রগুলির দাম কেমন? সাধারণ মানের অস্ত্রের সেটের দাম করোনার আগে ছিল একশো থেকে দেড়শো টাকা। অপেক্ষাকৃত ভালো অস্ত্রের সেটের দাম তিনশো থেকে চারশো টাকা ছিল। তবে প্রতিনিয়ত কাঁচা মালের দাম বাড়ার ফলে লাভের পরিমান শিল্পীরা খুব কমই পান।

দুর্গা প্রতিমার আর একটি অপরিহার্য জিনিস চাঁদমালা। আমতায় গড়ভবানীপুর অঞ্চলে বেশ কিছু বাড়িত উঠোনে প্রতিদিন সকালে দেখতে পাওয়া যায় শোলা কেটে, আলতার জলে ডুবিয়ে তা শুকনো করার ছবি। আলাপ হলো শিল্পী রূপালী শাসমলের সঙ্গে। তিনি জানালেন, বছরের শ্রাবণ মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত কাঁচা অবস্থায় শোলা পাওয়া যায়। মূলত জলা জমিতে শোলা গাছ জন্মায়। ডালপালা বিশিষ্ট এই গাছগুলি ৩ থেকে ৫ পুট লম্বা হয়। শোলার কাজের জন্য এই গাছের কাণ্ড ব্যবহার করা হয়। হাওড়ার মাজু, জালালশি, মুন্সিরহাটের বিস্তীর্ণ জমা জমিতে এই গাছ দেখতে পাওয়া যায়। পার্শ্ববর্তী অঞ্চল মুন্সিরহাট থেকে আঁটি হিসেবে কাঁচা শোলা আনা হয়। তারপর রোদে শুকোতে হয়। শুকোতে সময় লাগে ৬ দিন। আবহাওয়া খারাপ থাকলে সময় আরও বেশি লাগে। তারপর শোলার আঁশ ছাড়াতে হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আঁশ সমেত শোলার ব্যবহার করা হয়। যেমন মনসা পুজোয় ব্যবহার হওয়া ‘একপাতা চাঁদমালা’। শুকনো হয়ে যাওয়ার পর ছুরির সাহায্যে পাতলা করে শোলাগুলি কাটা হয়। এরপর চুমকি, ভেলভেট ও নানা রকম রঙের পাথর বসিয়ে তিন ধাপ বিশিষ্ট চাঁদমালা প্রস্তুত করা হয়।

এগুলির দাম পড়ে ডজন প্রতি ১৮০ থেকে ৬০০ টাকা। হাওড়ার বিভিন্ন এলাকায় ও কলকাতার বাজারেও এই চাঁদমালা আসে। দুর্গাপুজো বা কালীপুজোর সময় কাজের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এই শিল্পের প্রধান সমস্যা হলো, যে সময় কাজ বেশি হয় অর্থাৎ দুর্গাপুজোর সময়, ঠিক সেই সময়েই কাঁচা শোলা পাওয়া যায়। যার ফলে শোলা ভালোকরে শুকোবার সময় পাওয়া যায় না। তারউপর পুজোর কয়েক দিন আগে বৃষ্টি হলেও শোলা শুকতে দেরী হয়। অনেক শিল্পী এই সমস্যা কাটাবার জন্য আগের বছর থেকে শোলা মজুত করে রাখেন। কিন্তু তাতে আবার অন্য সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘ দিন থাকার দরুন বিভিন্ন পোকা ও ইঁদুরের কারণে অনেক শোলা নষ্ট হয়ে যায়। বর্ষা বেশি হলে শোলা নরম হয়ে যায়। এর ফলে কাটতে অসুবিধা হয়। মজুত করে রাখার মতো জায়গা না থাকার ফলে অনেক তৈরি জিনিসও নষ্ট হয়ে যায়। তবু শিল্পীরা নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে শিল্পকর্ম করে চলেন। অভাব তাঁদের পরাজিত করতে পারে না।