সন্ধ্যেবেলা মেয়ে খেলাশেষে দৌড়তে দৌড়তে বাড়ি ফিরেছে। খুব উত্তেজিত। হাঁফাতে হাঁফাতে বললো,
— আন্টিরা বলেছে, দুটো পরান্দি লাগবে। মোজরী আর চমকিলা শালোয়ার স্যুট।
— এসব কি রে!? কেন লাগবে?
— বাহ আমরা গিদ্দা নাচব না লোহরীতে।
— চেনা অচেনা নানা শব্দ আমায় দ্বন্দ্বে ফেলল।
— কে নাচ শেখাচ্ছে তোদের?
— পরমজিত আন্টি।

অগত্যা পরমজিতকে ফোন। মোজরী, পরান্দি, চমকিলা-ভরকিলা শালোয়ার স্যুট যোগাড় হল। মেয়ে দুই বেণীতে পরান্দি লাগিয়ে তার সখিদের সঙ্গে ঢোলকের তালে তালে গিদ্দা নাচল,
“কুড়িয়া দী লোহরী আয়ী
কুড়িয়া দী লোহরী আয়ী
সারে জী দেন বধাঈ
সারে জী দেন বধাঈ”।
নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান ভারতের এক ক্ষুদ্র অংশ লোহরীর আগুনকে প্রদক্ষিণ করল। পবিত্র লোহরীর আগুনে নিক্ষিপ্ত হল চিনেবাদাম, রেউড়ি, পপকর্ণ। সেটিই লোহরীর প্রসাদ। মুলুক ছেড়ে আসা পাঞ্জাব, হরিয়ানার মানুষ মনে মনে ফিরে গেল তাদের গাঁঘরের আঙিনায়। সেখানে এখন রবি ফসল ঘরে তোলার ব্যস্ততা।

মাঘের সূর্য উত্তরায়ণ পার হয়ে এবার আমাদের কাছাকাছি চলে আসবে। দিনের অনেকটা সময় জুড়ে থাকবে তার আলোর রোশনী। উত্তর গোলার্ধে সূর্যের সেই কাছে আসার ঘটনায় গোটা ভারত জুড়ে উৎসব।

বিহারি বান্ধবীরা বরেদের হুকুম করছে, “এ জী আধা কিলো দহি মাঙ্গওয়া লিজীয়ে না”। মকর সংক্রান্তির সকালে তাদের দহিচূড়ার ব্রেকফাস্ট। দুপুরে খিচুড়ি। তার মাঝে দানধ্যানপুণ্যকর্ম। অঞ্জু দয়াল তার শ্বশুরবাড়ি ভাগলপুর থেকে সুগন্ধি কতরনী চিঁড়ে আনিয়েছে। আমিও তার ভাগ পেলাম।

মারাঠি বান্ধবীরা ডাকবে তাদের হলদি কুঙ্কুমের উৎসবে। কপালে ফোঁটা পরে আবার আমাদের একপ্রস্থ খাওয়াদাওয়া, উপহার প্রাপ্তি। এবাড়ি ওবাড়ি থেকে আসবে তিলের নাড়ু। তাতে খানিকটা দাঁতের জোরের পরীক্ষা হয়ে যাবে। নিজের ছোটবেলাটা ছেলেমেয়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে মেহতা বা দেবাঙ্গন আকাশে ওড়াবে রঙিন পতঙ্গ।

উৎসবের এই প্রাঙ্গনে কেরালাবাসীদের মন্ডলপূজা, স্থানীয় আয়াপ্পা মন্দিরে। দক্ষিণভারতের ধর্মপ্রাণ মানুষ একমাস সন্ন্যাস ব্রত ধারণ করে আয়প্পাস্বামীর পুজো করেন। মকর সংক্রান্তির দিন তার পরিসমাপ্তি। মন্দিরের দেবতা সেদিন নিজের আসন থেকে নেমে ভক্তদের মাঝে আসেন। সাদা জমি, সোনালি পাড়ের কাসাভু শাড়ি পরে, মাথায় ফুলের বেণীতে সেজে, হাতে প্রদীপ নিয়ে দক্ষিণী মহিলারা দেবতাকে বরণ করে। সঙ্গে বাজে তালবাদ্য আর সানাই। সুদূর কেরল থেকে ছত্তীশগঢ়ে আসে পুরুষ-মহিলা বাদকের দল। আকাশে আতসবাজির রোশনাই। সুন্দর সুচারুভাবে ভাবে কলা আর নারকেল গাছের বিভিন্ন অংশ দিয়ে সাজানো মন্দির প্রাঙ্গণ। ছত্তীশগঢ়ের কোরবা শহর যেন সে রাতে বদলে যায় দক্ষিণী সুষমায়।

আমরাই বা পিছিয়ে থাকি কেন? বাড়ির মত খড় দিয়ে নাই বা হোলো বাউনি বাঁধা। বাজারে অমিল সরেস নলেন গুড়, পাটালি।তবু কলোনীর বাঙালি হেঁসেলে তৈরি হবে পাটিসাপটা, দুধপুলি, গোকুলপিঠে। বচ্ছরকার দিনে পৌষপার্বণে এসব না বানালে পরের প্রজন্ম জানবে কি করে! পিঠেপুলির সুঘ্রাণ বাঙালির রান্নাঘর থেকে ভেসে বেড়াবে বাতাসে। জয়শলমীরের প্রেমলতা, হায়দ্রাবাদের গায়ত্রী জিজ্ঞেস করবে, “কেয়া বনা রহী হ্যায় ভাবী? বহোত খুশবু আ রহী হ্যায়!” তারাও বঞ্চিত হবেনা বাংলার এই অতুলনীয় মিষ্টির স্বাদ থেকে। দুবেজী বা মিস্টার ভার্মা পাটিসাপটা, ভাজাপিঠে চেখে বলবে, “বহোত বড়িয়াঁ”। সূর্যের পরিক্রমণকে কেন্দ্র করে চলবে এই দেয়ানেয়ার পর্ব। যার অন্য নাম ভারতবর্ষ।