বঙ্গদেশের বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ অন্য ধরনের মানুষ। মাটির মানুষই বলা যায় তাঁকে। খুল্লামখুল্লা কথা বলেন তিনি। অযথা ন্যাকামি করেন না। মাঝে মাঝে তাঁর দলের লোক বিড়ম্বনায় পড়েন। কিন্তু থামানো যায় না তাঁকে। কথার ফাঁকে হুল থাকে তো থাকুক, এমনই চুলবুলে বাক্যস্রোত। এই যেমন সেদিনকার কথা। বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দরবারে। দিলীপ ঘোষ বুঝলেন সি.বি.আই আর ই.ডি-র গুঁতোর চোটে ছুতো খুঁজতে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘোষমশায় অবলীলায় বলে বসলেন, ‘দিদি বুঝতে পেরেছেন, ইডি যদি এসে ধরে, তাহলে কে বাঁচাবে? তাই দিল্লি গিয়েছিলেন ওই দাড়িওয়ালা লোকটার কাছে। বাঁচাও সাধুবাবা, বাঁচাও সাধুবাবা বলেছেন।’’
দাড়িওয়ালা সাধুবাবা কে? জলের মতো স্পষ্ট। তিনি আমাদের দিল্লিশ্বরো বা জগদীশ্বর। এ সব কথায় ঘোষমশায়ের দলের লোকেরা একটু অস্বস্তি বোধ করেন। তা করুন, তাতে ঘোষমশায়ের এসে যায় না কিছু। সরল-সিধে মানুষ তিনি। আদি থেকেই সংঘ পরিবারের সঙ্গে গাঁটছড়া তাঁর। দাড়ি তো রেখেছেন দিল্লিশ্বর। আর পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে ‘তপস্যা’ করে চলেছেন যিনি, ধর্ম মানেন বলে যিনি ধর্মপত্নীর সংসর্গ ত্যাগ করেছেন, তাঁকে সাধুবাবা ছাড়া কি বলা যায়?
দাড়ির কথা যখন উঠল, তখন ঘোষমশায়কে একটু মনে করিয়ে দিই। বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঢাক বাজতেই দেখা গিয়েছিল সাধুবাবার দাড়ি ক্রমশ লম্বা হচ্ছে। কার মতো লাগছে যেন? কেন, রবি ঠাকুরের মতো। বঙ্গের আইকন রবীন্দ্র। সেই আইকনের মতো দেখতে লাগলে বঙ্গের মানুষের মনে ধরবে তাঁকে। তাই রবীন্দ্রনাথ সাজতে হয়েছিল দিল্লিশ্বরকে। কিন্তু অবুঝ বঙ্গবাসী সেই ফাঁকে টুক করে ছাপ মেরে দিল দিদি-অ-দিদির দলের প্রতীকে। তারপর সাধুবাবার দাড়ি ছোট হতে শুরু করল। সপ্তাহে একবার দাড়ি আর চুল ছাঁটেন তিনি। সে সব ছাঁটার আলাদা লোক আছে।
ছোট হোক আর বড় হোক, দাড়ি তো সাধুবাবারাই রাখেন। তবে দেশের অকৃত্রিম সাধুদের সঙ্গে আমাদের দিল্লিশ্বরের একটু পার্থক্য আছে। অকৃত্রিম সাধুরা ত্যাগের মাধ্যমে ভোগ করেন। কিন্তু আমাদের দিল্লিশ্বর ভোগের মাধ্যমে ত্যাগ করেন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শাস্ত্রবাণীকে একটু বদলে নিয়েছেন তিনি। ঘোষমশায়ের মতো ভক্তদের বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। তাঁরা গদগদস্বরে বলছেন, তোমায় চিনি গো চিনি। ভক্তরা চিনলেও তাঁকে চেনে না পুঁথিপড়া এলিটরা, চেনে না ছিদ্রান্বেষী বিরোধীরা। বড় আক্ষেপ করে সাধুবাবা বলেন যে লুটিয়ান দিল্লি আপন করে নিতে পারল না তাঁকে। খান মার্কেট গ্যাঁ-এর সদস্যরা তাঁর বিরুদ্ধে কুকথায় পঞ্চমুখ। এই দেখুন, লুটিয়েন আর খান মার্কেট — শব্দদুটি উচ্চরণ করে আমাদের দিল্লিশ্বর প্রমাণ করলেন তাঁর ইতিহাস ভূগোল জ্ঞান। স্যর এডওয়ার্ড লুটিয়েন ছিলেন এক ব্রিটিশ স্থপতি। কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে উঠিয়ে নেবার পরে ইংরেজ কর্তারা দিল্লিতে নতুন বাংলো বাড়ি তৈরির ভার দেন এডওয়ার্ড লুটিয়েনকে। একদল স্থপতিকে নিয়ে লুটিয়েন নেমে পড়েন কাজে। খান মার্কেটও বাস্তব। তৈরি হয় ১৯৫১ সালে। দিল্লির রবীন্দ্রনগরের ৬১/১ খান মার্কেট। এখানে জড়ো হন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী। আলাপ-আলোচনা করেন, মারেন আড্ডা। কিন্তু সাধুবাবা নিছক আড্ডা মেরে গাড্ডায় পড়তে চান না। তাই তো তিনি বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিদ্রুপ করেন ‘খান মার্কেট গ্যাং’ বলে। বেশ করেন। করাই উচিত। তাঁরা কি জানেন, সাধুবাবা সারা দিনে মাত্র তিন ঘন্টা বিশ্রাম নেন, বাকি একুশ ঘন্টা কাজ আর কাজ। ডিগ্রি–ডিপ্লোমা তাঁর না থাকতে পারে, কিন্তু সহজাত ‘উইশডাম’ তো আছে। জপ-তপের মাধ্যমে অর্জিত সে পরম জ্ঞান। তাই সাধুবাবা বলে দেন, ‘হার্ড ওয়ার্ক ইজ মোর ডিজায়ারাবল দ্যান হারভার্ড’।
তাঁর আহার-বিহার, চাল-চলন নিয়ে মাঝে মাঝে মুখর হন নিন্দুকেরা। ১২ একর জাগায় তাঁর পেল্লাই বাসভবন নিয়ে, সেন্ট্রাল ভিস্টা নিয়ে, ঘন ঘন পোশাক বদল নিয়ে, দশ লক্ষ টাকা দামের নিজের নামলেখা স্যুট নিয়ে, স্টাইল আইকন হিসেবে প্রতিভাত হওয়া নিয়ে বিরোধী নিন্দুকের দল বড় চিৎকার করে। আরে, ওরা যে টুকরা টুকরা গ্যাং-এর সদস্য। গত চার বছরে সাধুবাবার বিজ্ঞাপন ব্যয় ৪,৪০০ কোটি টাকা মাত্র। এতে বলার কি আছে! কি বা বলার আছে তাঁর রেঞ্জ রোভার, পাঁচটা বুলেট-প্রুফ বিএমডব্লু সেডান, বোয়িং ৭৪৭ জাম্বো জেট নিয়ে। ভারতেশ্বর তিনি, তাঁকে ঘন ঘন যেতে হয় দেশে-বিদেশে। দেশে দেশে তাঁর ঘর আছে যে। তাই তাঁর বিদেশ যাত্রার ব্যয় এমন আকাশচুম্বী। ভারতের আধ্যাত্মিক মহিমা এর আগে কে, কোন ভারতেশ্বর প্রচার করেছেন বিদেশে। কে এমন করে বলেছেন যে ‘আমাদের ব্যাদে সব আশে’। ডারুইন, নিউটন, আইনস্টাইনের বহুকাল আগে থেকেই তাঁদের আবিষ্কারগুলি আবিষ্কার করে বসে আছেন আমাদের মুনি-ঋষিরা। আমাদের এই সাধুবাবাই তো রামলালাকে তাঁর নিজের জায়গা ফিরিয়ে দিয়েছেন, রাম মন্দির তৈরি হয়ে গেলে দেখবেন সে অপূর্ববস্তুনির্মাণক্ষমপ্রজ্ঞা। রাম নারায়ণ রাম। এবার হাত পড়বে মহাভারতে। কৃষ্ণকেও তাঁর নিজের ঘর দেবেন সাধুবাবা।
আপনি বলবেন, সাধুবাবাই যদি হন, কোথায় তাঁর সহিষ্ণুতা, কোথায় তাঁর অমেয় উদারতা? বোঝাই যাচ্ছে আপনি হয় গীতা পড়েন নি, অথবা পড়লেও বুঝতে পারেন নি সম্ভবামি যুগে যুগের তত্ত্বকথা। কৃষ্ণ তো বলেই দিয়েছিলেন অর্জুনকে যে পাপীর বিনাশের জন্য, সাধুদের পরিত্রাণের জন্য তিনি যুগে যুগে অবতাররূপে জন্মগ্রহণ করবেন। ঘোষমশায়ের মতো ভক্তরা সে কথাই শিরোধার্য করেছেন। যাঁকে তিনি সাধুবাবা বলে সম্বোধন করেছেন, তিনি অধর্ম ও বিধর্মকে বিনাশ করতে চান। তাই দেশের বিধর্মীরা তাঁর বিরুদ্ধে সরব, আর তাঁদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনৈতিক বিরোধীরা ‘গেল গেল’ রব তুলছেন। অর্থনীতি গেল, সংখ্যালঘুরা গেল, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য গেল, গণতন্ত্র গেল, মানবাধিকার গেল, সব গেল।
ভারতকে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন দান করার সাধনা যাঁর, তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা দেশদ্রোহেরই নামান্তর। যাঁরা করবেন, শাস্তি পেতে হবে তাঁদের। স্ট্যান স্বামী শাস্তি পেয়েছেন, সুধা ভরদ্বাজ শাস্তি পেয়েছেন, ভারভারা রাও শাস্তি পেয়েছেন, তিস্তা শেতলবাদ শাস্তি পেয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি বি.এন.কৃষ্ণ শাস্তি পাবেন এবার, কারণ বিলকিস বানোর গণধর্ষণকারীদের মুক্তির ব্যাপারে তিনি বলে ফেলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি খুব খারাপ। আমাকে স্বীকার করতেই হবে যদি জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে বলি প্রধানমন্ত্রীর মুখটা আমার পছন্দ নয়, তাহলে কোন কারণ না দেখিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হতে পারে।’ যে মুখ ভক্তদের ধ্যান-জ্ঞান, সে মুখ যে মূর্খের পছন্দ নয়, সে দেশদ্রোহী হতে বাধ্য। অধর্ম ও বিধর্মকে নাশ করার জন্য সাধুবাবা নিস্তব্ধ করিয়া দিবে মুখরা নগরী। তাই সাধুবাবার দলের বিপরীতে যাঁরা আছেন, সে মহারাষ্ট্র হোক— দিল্লি হোক— ঝাড়খন্ড হোক— পশ্চিমবঙ্গ হোক, তাদের উৎখাত না করলে নয়। এটা যে ধর্মের কাজ। বড় সূক্ষ্ম, বড় রহস্যময়। সেই যে বলে না, মিস্ট্রি অব রিলিজিয়ন ইজ হিডেন ইন দ্য কেভ!
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক।