কোনো দিন কোনো মুখ্যমন্ত্রীকে দেখেছেন প্রাণের ভয় তুচ্ছে ক’রে রাজ্যের সংকটে পথে নেমে মানুয়ের পাশে দাঁড়াতে? এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়াতে? আমি তো দেখিনি।
২৪ মার্চ স্তম্ভিত হয়ে দেখছিলাম তিনি হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ছুটে বেড়াচ্ছেন, কথা বলছেন চিকিৎসকদের সঙ্গে, চিকিৎসা পরিষেবায় যুক্ত মানুষদের সঙ্গে। কোথায় কিসের ঘাটতি, কোথায় সাফল্য, কোথায় আরো কী কী করণীয়, সবই জেনে বুঝে নিয়ে আগামীর দিকে এগোচ্ছেন। মুখে মাস্ক। কপালে উদ্বেগ। দু-চোখে সংকল্প। প্রতি পদক্ষেপে অঙ্গীকার। অঙ্গীকার রাজ্যবাসীদের সুস্থতার। অঙ্গীকার দু-হাত দিয়ে বিপন্ন মানুষকে আগলে রাখার। অঙ্গীকার ডাক্তার-নার্স-হাসপাতাল কর্মীদের মনোবল যোগানো। অঙ্গীকার ভীত-আতঙ্কিত সাধারণ মানুষের পাশে থাকা। অঙ্গীকার করোনা মহামারী মোকাবিলায়।
তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি পশ্চিমবঙ্গবাসীর ‘দিদি’ ভারতবাসীর ‘দিদি’। তিনি চোখের সামনে থাকলে জননেত্রী শব্দটির অর্থ অনুধাবন করতে অভিধান খোলার প্রয়োজন পড়ে না।
তারপর তাঁকে যত দেখছি, ততই মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্ণিশ করছি। কখনও তিনি ছুটে যাচ্ছেন পোস্তায়, যাতে বাজারের খাদ্য সামগ্রী যোগান কোথাও থমকে না যায়, কখনও রাস্তায় ইঁট ভেঙে ‘গোল্লা’ আঁকছেন আর সস্নেহে বোঝাচ্ছেন কীভাবে ভিড় না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বাজার করতে হবে নাগরিকদের, কখনও বাজারে ঢুকে তদারকি করছেন সবজি এবং ফল বিক্রেতাদের ক্রিয়া কলাপ। তারপরেই হয়তো তাঁকে দেখছি হতদরিদ্র রিক্সাওয়ালা আর নৈশ-আশ্রয়ে ভবঘুরে নিঃস্ব মানুষদের খাদ্য বিলি করছেন। কখনও সর্বদল বৈঠকে দক্ষ হাতে সামলাচ্ছেন প্রশাসন আর কাঁটায় কাঁটায় নির্ভুল তথ্যে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন বিরোধী দলের বাঘা-বাঘা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে। আবার আজই দেখলাম, কত নৈপুণ্যে সারা পশ্চিমবঙ্গের জেলা প্রশাসনের সঙ্গে রূপায়িত করে তুলছেন চিকিৎসা পরিষেবার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তারই সঙ্গে নির্দেশ দিচ্ছেন, কোনও গরিব সহায় সম্বলহীন মানুষ যেন নিরন্ন না থাকে। মমতায় কোনও কার্পণ্য তিনি করবেন না।
তিনি আমাদের মুখ্যমন্ত্রী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে দেখলে ‘জন-নেত্রী’ শব্দটির অর্থ বুঝতে অভিধান খুলতে হয় না।

‘করোনা’ তখন সদ্য থাবা বসিয়েছে এ দেশে। সারা বিশ্ব কাঁপছে সেই মারণ ব্যাধির দাপটে। তথ্য আসছে অল্প। ভাঙাচোরা। স্পষ্ট কিছু বোঝা যাচ্ছে না, জানা যাচ্ছে না এ অসুখ সম্পর্কে। এক অবিমিশ্র আতঙ্ক আর মৃত্যু বিভীষিকার করাল ছায়া গ্রাস করছে দেশ-কাল। তিনি কিন্তু ভয়ার্ত হননি। মানুষের হাতে থালা-বাসন ধরিয়ে টিভির দূরত্বে রঙিন বাণীর রংমশাল জ্বালাননি। নেমে পড়েছেন পথে। নিম্নবর্গের নৈকট্যে। সবার সাথে সবার পাশে। যেখানে কোনওদিন কোনও মুখ্যমন্ত্রীর পা পড়েনি। পা পড়ে না। স্বদেশি বিদেশি ইশ্তেহারে যা-ই লেখা থাকুক।
যেখানে হাহাকার। সেখানে মমতা। যেখানে আর্তনাদ, সেখানে মমতা। যেখানে উৎপীড়িতদের ক্রন্দন রোল সেখানে মমতা। যেখানে যন্ত্রণা কাতর মানুষের দীর্ঘশ্বাস সেখানে মমতা। এ অবশ্য তাঁর বহুদিনের পরিচয়। তবে, আজ বিশ্ব সংকটের এই মুহূর্তে যখন মৃত্যু আর বিপন্নতা আছড়ে পড়েছে এই দেশে, যখন রাজ্যে ঢুকে পড়েছে মারণলীলার তুফান—তখন তাঁকে নতুন ভূমিকায় দীপ্ত হয়ে, দৃপ্ত হয়ে দেখতে পেলাম আমরা। বাম-দক্ষিণ সব পন্থার বিরোধীরা অবশ্য বসে থাকলেন না। ওই সব বড়ো-মেজো-সেজো-ন’-রাঙা নেতারা তাঁদের কাজ করে গেলেন, কামড় দেওয়ার চেষ্টা করলেন পায়ে। তিনি অকুতোভয়। অপ্রতিরোধ্য। অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
আবেগপ্রবণ যে হয়ে পড়েছি সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কেননা লকডাউনে আমরা সারাদিন বাড়ির নিশ্চিন্ত ঘেরা টোপে ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপে সতেজ রেখেছি অখন্ড অবসর, কপচেছি দেশি-বিলিতী ‘বিপ্লব’ বাণী, নিরন্তর ‘সংস্কৃতি’ চর্চা করেছি কেউ, কেউ আত্মগরিমায় ফুলে ফেঁপে উঠেছি, কেউ বা আত্মীয়-পরিজন বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে খোশগল্পে লিপ্ত হয়েছি মোবাইলে ‘ভিডিও কল’-এ। কেউ দেখেছি ‘হইচই’ কেউ ল্যপটপে দেখেছি ইরানি- ফরাসি সিনেমা। নিদেন উত্তমকুমার বা নাসিরুদ্দিন শাহ। ভেবেছি, এভাবেই মানুষের ক্রমমুক্তি হবে। এছাড়া অনর্গল, অনিঃশেষ টিভি চ্যানেল তো আছেই। কিন্তু এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কোনও নিরাপদ নিশ্ছিদ্র গজদন্ত মিনারে নিজেকে সরিয়ে রাখেননি। রাস্তায়, হাসপাতালে, বাজারে, নবান্নে, পাখিরালয়ে, ঘিঞ্জি গলিতে তিনি প্রকৃত অভিভাবিকার মতো ছুটে বেড়িয়েছেন ব্যক্তিগত সংক্রমণ সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে, নিজের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দিয়ে।
একদিকে উদ্বেগে এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত ছুটে বেড়ানো, অন্যদিকে ঠাণ্ডা মাথায় এক বৃহৎ স্বাস্থ্য পরিকল্পনার কথা করোনা মোকাবিলার নীল নক্শা বানানো—এ দুইয়ের উল্লেখযোগ্য, স্মরণযোগ্য, চমকপ্রদ সম্মিলন তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করলাম আমরা। তাঁকে প্রণাম, সেলাম, কৃতজ্ঞতা।
তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গান্ধীজি-কে দেখিনি, হো চি মিন-কে দেখিনি, মুজিবর রহমান-কে দেখিনি, নেলসন ম্যান্ডেলা-কে দেখিনি—আমার সৌভাগ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মোটামুটি কাছ থেকে দেখেছি। বিশেষত, এমন এক মহা সংকটে। দুনিয়া যখন মৃত্যু ভয়ে কাঁপছে।
তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে দেখলে ‘জন-নেত্রী’ শব্দটিকে উপলব্ধি করতে অভিধান উল্টোবার প্রয়োজন পড়ে না।