কথায় আছে ‘কারও পৌষমাস, কারও সর্বনাশ’। অক্সফ্যাম ইন্টারন্যাশনালের ‘প্রফিটিং ফ্রম পেইন’ রিপোর্টটা পড়ে একথাটাই মনে হল। অতিমারি ধনী দরিদ্র সবাইকে একাকার করে দিয়েছে বলে যতই মরাকান্না জুড়ে দেওয়া হোক না কেন, এতে আসলে লাভ হয়েছে ধনীদের। আরও ফুলে ফেঁপে উঠেছে তারা। অতিমারির সময়ে খাদ্য, বিদ্যুৎ ইত্যাদির দাম যেভাবে বেড়েছে তা ধনীদের কাছে একটা আশীর্বাদ। এটা শুধু ক্ষোভের কথা নয়, পরিসংখ্যান তার প্রমাণ দিচ্ছে। গত দু’বছর ধরে বিশ্বের কোটিপতিদের আর্থিক বাড়বাড়ন্ত যে হারে হয়েছে তা তাদের আগের দু’বছরের মোট বৃদ্ধির হারকে ছাপিয়ে গেছে। মানুষের ব্যাথাকে তারা করে ফেলেছেন ব্যবসা। অক্সফ্যামের হিসেব বলছে, প্রতি ৩০ ঘণ্টায় বিশ্বে তৈরি হচ্ছে একজন করে কোটিপতি। প্রতি ৩৩ ঘণ্টায় এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে গ্রাস করছে দারিদ্র।

সাফল্যের পিরামিডের শিখরে রয়েছেন কোটিপতিরা। মাঝে আর কিছু নেই, পিরামিডের একেবারে তলায় দলা পাকিয়ে রয়েছেন গরিব আর নতুন গরিবরা। সম্পদ সৃষ্টি ও তার বিতরণ সংক্রান্ত এই রিপোর্ট পৃথিবীর এমন ছবি তুলে ধরেছে। অক্সফ্যামের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এটা কোন নতুন ঘটনা নয়। অতি সত্যি কথা, আমাদের বাংলাতেও প্রতিটি মারী ও মন্বন্তরে এমনটাই ঘটেছে। পরবর্তীকালে এ তল্লাটে যারা ধনী হিসেবে পরিচিত হয়েছেন তাদের বাড়বাড়ন্ত এই সময়েই। হিসেব বলছে, গত দু’বছরে তৈরি হয়েছে প্রায় ৫৭৩জন নতুন কোটিপতি। শক্তি, খাদ্য, ওষুধ ক্ষেত্রের ব্যবসায়ীদের লাভ এই দুঃসময়ে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। শক্তি বা এনার্জি সেক্টরের ৫টি সংস্থা – বিপি, শেল, টোটাল এনার্জিস, এক্সন, চেভ্রন লকডাউনের সময়ে প্রতি সেকেন্ডে ২, ৬০০ ডলার ব্যবসা করেছে।

অতিমারিই ওষুধ ব্যবসার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করেছে ৪০ জন নতুন কোটিপতি মালিক। কোভিড -১৯ ভ্যাকসিন হয়ে উঠেছে টাকা বানানোর একটা মেশিন। ভ্যাকসিন বিতর্কের সূত্রে এই সেদিনও গণমাধ্যমে রোজ ভেসে উঠতো মডার্না, ফাইজার এর মত ওষুধ কোম্পানিগুলির নাম। অক্সফ্যামের হিসেবে কোভিডকালে তারা লাভ করেছে প্রতি সেকেন্ডে ১ হাজার ডলার। হবে নাই বা কেন, কোভিড টিকার একচেটিয়াত্ব তো এইসব সংস্থারই। ঠিক এই কালপর্বেই খাদ্য ও স্বাস্থ্য বাবদ মানুষের ব্যয় বেড়েছে লাগামছাড়া, ২৬৩ মিলিয়ন মানুষ ঢুকে গেছেন দারিদ্রের গহ্বরে।

কেউ বলতেই পারেন, তাহলে এই ক্ষেত্রগুলিতে যারা কাজ করেন তারা ভালভাবে আছেন। মোটেই নয়, কারণ কোভিড দেখিয়েই মজুরদের বিদায় করেছেন মালিকরা। তাদের মজুরি বাড়েনি। ‘খাওয়া না খাওয়ার’ এই খেলাতে শীর্ষস্থানে থাকা পৃথিবীর ১০ জন ধনীর হাতে পিরামিডের তলার দিকে থাকা মানুষদের মোট আয়ের ৪০ শতাংশরও বেশি অর্থ জমা হয়েছে। রাষ্ট্রের মদতে মানুষের যন্ত্রণা ও দুঃখকে তারা পরিণত করেছেন একটা লাভজনক শিল্পে। দারিদ্র যেন হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের একটা ঐতিহ্য। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এদের দারিদ্র থেকে মুক্ত হওয়া অসম্ভব। এনিয়েই এরা বাঁচবেন। কারণ জনসংখ্যার ৫০ শতাংশর হাতে কোন মূলধনই নেই যে তা দিয়ে তারা দারিদ্রমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করবেন।