ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতির মধ্যে দেশজুড়ে ব্যাপক অক্সিজেন সংকট। কিন্তু কেন? দেশে কি সত্যি অক্সিজেনের অভাব! দেশের মোট অক্সিজেন উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র এক শতাংশ সাধারণ সময়ে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। আর করোনা পরিস্থিতিতে মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অক্সিজেন ব্যবহার হচ্ছে। দেশে প্রতিদিন ১ লক্ষ টন অক্সিজেন উৎপন্ন হয়। মূলত দেশের ইস্পাত সংস্থাগুলি এর ৮০ শতাংশ উৎপাদন করে। যেমন, জামনগরে রিলায়েন্স কারখানার দৈনিক অক্সিজেন উৎপাদনের পরিমাণ ২২ হাজার টন। দেশের বেশিরভাগ অক্সিজেন কারখানা অবস্থিত মুম্বাই, গুজরাট এবং কর্ণাটকে। এরা সাধারণত ৫ থেকে ১০ শতাংশ তরল অক্সিজেন উৎপাদন এবং সংরক্ষণ করে। তবুও কেন অক্সিজেনের এই হাহাকার?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর পিছনে রয়েছে স্টোরেজ ডিভাইসের অভাব। কারণ দেশে অক্সিজেন ট্যাঙ্কার ও সিলিন্ডারের যথেষ্ট অভাব। সেই অভাবেরও কারণ আছে। একটি অক্সিজেন ট্যাঙ্কারের দাম প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকা। আর একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম প্রায় ১০ হাজার টাকা। কিন্তু একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম ৩০০ টাকা। তার মানে অক্সিজেন ব্যাবসা যে খুব একটা লাভজনক তা নয়।
এই যে সঙ্কট তার কারণও উৎপাদন নয়, অভাব পরিবহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর। দেশের বেশিরভাগ অক্সিজেন কারখানাগুলি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখান থেকে ট্যাঙ্কারে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছতে পেরতে হয় ২০০ থেকে ১,০০০ কিমি রাস্তা। রাস্তা খারাপ থাকলে ট্যাঙ্কার পৌঁছতেই ৭ থেকে ১০ দিন। তারপর বেশিরভাগ গ্যাস সংস্থা চাহিদা না বাড়লে অক্সিজেন উৎপাদন বাড়াবে না।
কিন্তু আজ গোটা দেশজুড়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে অক্সিজেনের যে বিরাট সংকট, তার জন্য অধিকাংশ রাজনীতিকরাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারকে দায়ী করছেন। তাদের বক্তব্য, পাশের রাষ্ট্র পাকিস্তান, বাংলাদেশে যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ছে তখনও বাণিজ্যিক লবির চাপে বিদেশি বিমান চলাচল বন্ধ করা হয়নি। কুম্ভ মেলার জমায়েতে থেকে যে ব্যাপক হারে করোনা ছড়িয়েছে তা কারও জানতে বাকি নেই। অথচ দেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার অনেক আগে দিল্লির নিজামুদ্দিনের তবলিগ জামাতে ঘিরে বিজেপি আর আরএসএস চরম সাম্প্রদায়িক প্রচার চালায়।
বিশেষজ্ঞরা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সতর্ক করলেও মোদির কাছে তখন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে ‘সুনার বাংলা জয়’। তখন তিনি ও তাঁর দলের লোকজন দিল্লি থেকে বাংলার আনাচে কানাচে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করছেন। অথচ জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেন উৎপাদন নিয়ে কোনও হেলদোল ছিল না কেন্দ্রের। কোনও উদ্যোগ ছিল না আপদকালীন অবস্থায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেনকে কিভাবে পিউরিফায়েড করে মানবশরীরের উপযোগী অক্সিজেনে পরিণত করা যায় তা নিয়ে।
করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো মাথা ব্যথাই ছিল না ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেন পিউরিফিকেশন না করেই সরবরাহের জন্যে উন্নত পরিকাঠামো তৈরি করতে। শেষ পর্যন্ত অক্সিজেন ব্যবসায়ী আর ট্রাক মালিকদের একটা অংশের অশুভ আঁতাতে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল পরিস্থিতি। অক্সিজেনের সংকটের থেকে পরিবহন ব্যবস্থার তৈরি করা সমস্যা অনেক বড় আকার নিল। কিন্তু সেটা সামাল দিতে সরকার কি উদ্যোগ নিল? অক্সিজেন সংকট নিয়ে মোদি একদম নিশ্চুপ থাকলেন। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী মানুষকে কম অক্সিজেন নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।
এই ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতির পরেও কেন্দ্রীয় সরকার চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নতির জন্যে একটি টাকাও বেশি বরাদ্দ করেনি। বাজেটে যেটুকু বেশি টাকা বরাদ্দ হয়েছে সেটা ভ্যাকসিন কেনার জন্য। বেশি টাকা বরাদ্দ না হওয়ায় পর্যাপ্ত সিলিন্ডারের অভাবে বহু অক্সিজেন প্ল্যান্টই অক্সিজেন বটলিং করতে পারছে না। সিলিন্ডারের অভাবেও তীব্র অক্সিজেন সংকট ঘটেছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং অক্সিজেনের উৎপাদন না বাড়লে বিদেশ থেকে আমদানির টোটকায় সংকট সামাল দেওয়া যাবে না।
পৃথিবীর বহু জায়গায় যখন করোনা মহামারিতে পরিণত হচ্ছে তখন বিজেপি মধ্যপ্রদেশে বিরোধী কংগ্রেসের নির্বাচিত সরকারকে ভেঙে নিজেদের সরকার তৈরি করতে ব্যস্ত। তারপর মধ্যপ্রদেশে বিজেপির সরকার গড়ে লকডাউন ঘোষণা করে পরিযায়ী শ্রমিক থেকে খেটে খাওয়া মানুষকে চরম দুর্দশায় ফেলে দিল।
ইউরোপ, আমেরিকা সহ বহু দেশে যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ছে, সেখানেও অক্সিজেনের সংকট হয়েছিল। এ দেশেও দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পরবে বলে আগাম জানিয়েছিল বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু কেন্দ্র পরিবহনের ট্রাক আর অক্সিজেন সিলিন্ডারের অভাব নিয়ে মাথা ঘামায় নি। তাদের গাফিলতির কারণেই আজ অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংকট আর ব্যাপক কালোবাজারি।
করোনা পরিস্থিতিতে কেন্দ্র ঘোষণা করেছিল দেশের ১৬২টি হাসপাতালে নিজস্ব অক্সিজেন উৎপাদনের ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো তৈরি করা হবে। এখন পর্যন্ত মাত্র ৩২টি হাসপাতালে কোথাও আংশিক, কোথাও অর্ধেক অক্সিজেন উৎপাদন ব্যবস্থা হয়েছে। তার মধ্যেও পরিকাঠামোজনিত ত্রুটি ঘিরে ক্ষোভ দেখা দিচ্ছে।
যখন অন্যান্য দেশ থেকে করোনার ভয়াবহতার নানা খবর আসতে শুরু করেছে তখনও মোদি সরকার ধনী দেশগুলিতে ৯,৩০০টন অক্সিজেন রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশ, মিয়ানমারের মতো দেশে নয়, ইউরোপ, আমেরিকায়। হিসাব বলছে, ২০১৯-২০ সালে ভারত যে পরিমাণ অক্সিজেন বিদেশে রপ্তানি করেছে, দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে তার পরিমাণ দ্বিগুণ। এর থেকে সহজে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, ভারতে এই ভয়াবহ অক্সিজেন সংকটের রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংকটের স্বরূপটি কোন পর্যায়ের। অক্সিজেন উৎপাদন এবং সঠিক সরবরাহতে কেন্দ্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।
মোদি সরকার কালোবাজারিদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় অক্সিজেন সিলিন্ডার ১০ থেকে ১৫ হাজার
টাকায় বিক্রি হয়েছে।
১০০ভাগ সঠিক বিশ্লেষণ করেছেন। তথ্যগুলি তো ঠিক।
খুবই ভাল লেখা, তথ্য দিয়ে, যুক্তি দিয়ে বোঝানো গিয়েছে যে কি কি কারণে আজ অক্সিজেনের হাহাকার।