এককালে কোন ভুল, ব্যর্থতা বা দুর্ঘটনার দায়িত্ব নিয়ে দলের নেতা বা মন্ত্রীরা পদত্যাগ করতেন। এখন সেসব দূর অতীত। মনে পড়ছে একটা বড় রেল দুর্ঘটনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী। এখন আর তেমন কোন মন্ত্রীবাহাদুরকে দেখিনা। কোভিড মোকাবিলায় অক্সিজেন সঙ্কটের সময় সেই কথাটা আবার মনে পড়ে গেল। সত্যি সঙ্কট না এলে মোকাবিলা ব্যবস্থার কথা আমরা ভাবিনা। কিন্তু দেশ যারা চালান তাদের কাজই তো আগেভাগে ব্যবস্থা নেওয়া, পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য তৈরি থাকা! কাজেই অক্সিজেন সঙ্কটের দায় কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলি এড়াতে পারেননা। কেন্দ্র তৈরি থাকলে অক্সিজেন সঙ্কট এত ভয়াবহ হতো না।
দেশের অক্সিজেন প্ল্যান্টগুলির অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশায়। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরেও দেশের সর্বত্র এই প্ল্যান্ট গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা যায়নি। দেশের সব প্রান্তের মানুষদেরই এখনও বাংলা এবং ওড়িশার ওপর নির্ভর করতে হয়। কোভিড সময়ে এবার কেন্দ্র একটু নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে।
সমস্যাটা একটু বিশদ করা যাক। আর পাঁচটা জিনিসের মত অক্সিজেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়া যায়না। যেমন লিকুইড অক্সিজেন প্লেনে নেওয়া যায়না। কাজেই সমস্যা মোকাবিলার জন্য দ্রুত তা আকাশপথে পাঠানো বস্তুত অসম্ভব। পরিবহণ ব্যবস্থা বলতে বাকি থাকে সড়ক ও রেলপথ। রেলে সময় বেশি লাগে। আবার সড়কপথে অক্সিজেন আনতে গেলে দরকার ক্রায়োজেনিক ট্যাঙ্কার। তাও আমাদের দেশে লজ্জাজনকভাবে কম। অক্সিজেন নিয়ে যাওয়ার সমস্যাটা তাই বরাবরের। কোভিডের দাপটে সমস্যাটা এবার প্রবলভাবে সামনে এল।
অথচ এই সমস্যাটার কথা দেশের দন্ডমুন্ডের কর্তারা জানতেন না এমন নয়। তাহলে কোভিডের প্রথম ঢেউয়ের সময় থেকে সমস্যা সমাধানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি কেন? কেন্দ্রীয় সরকারেরই কিছু বিচক্ষণ আমলা ও বিশেষজ্ঞরা অনেক আগেই সরকারকে এব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তবুও সরকার তৎপর হয়নি। ইউরোপ সহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলি কীভাবে কোভিডের মোকাবিলা করছে তা দেখে শিখিনি আমরা। বিভিন্ন রাজ্য ও দেশের বড় হাসপাতালগুলিতে দেড়শোটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলিকে জানানো হয়েছিল সে কথা। কিন্তু নিশ্চয়ই আরও জরুরি রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা কেন্দ্রীয় সরকারের এব্যাপারে নজরদারি জারি রাখার ফুরসৎ হয়নি।
ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। সিদ্ধান্তটি শুধু কাগজেকলমেই থেকে গেছে। এখনও অবধি দেশে বসেছে মাত্র ৩৩টি প্ল্যান্ট। খোদ রাজধানীতে মাত্র ১টি। দিল্লির কোভিড পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার এটাও একটা বড় কারণ। কেন্দ্রীয় সরকার তো বটেই সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারও এব্যাপারে তৎপর হয়নি। এখনও অবধি দিল্লি সরকারের একটিও ক্রায়োজেনিক ট্যাঙ্কার নেই।
অবশ্য সমস্যাটা আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছিল সুপ্রিম কোর্ট। তারা এই সমস্যা সমাধানের জন্য জাতীয় পর্যায়ের একটা অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিল। এই নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিটি বড় হাসপাতালে একটা অক্সিজেন প্ল্যান থাকার কথা। তারা পাশের ছোট হাসপাতালগুলিতে প্রয়োজনে অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারবে। ঐ নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল শুধু নির্দিষ্ট কিছু জায়গাতেই নয়, দেশের প্রতিটি প্রান্তেই অক্সিজেন প্ল্যান্ট করা উচিৎ। প্রতিটি রাজ্যেরই থাকা উচিৎ পর্যাপ্ত ক্রায়োজেনিক ট্যাঙ্কার। তাহলেই সমস্যা মিটবে। ঐ নির্দেশ রূপায়িত হলে আজ এই সঙ্কটই থাকতো না।
মনে রাখতে হবে, শুধু কোভিডই নয়, বায়ুদূষণ আক্রান্ত পৃথিবীতে মানুষের জীবনদায়ী অক্সিজেনের প্রয়োজন আরও বাড়বে। তাই এই সঙ্কট মোকাবিলায় যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে কাজ শুরু করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কিন্তু সমস্যা হল, রাজনৈতিক নেতাদের দূরদর্শীতা, পরিকল্পনার অভাব। বুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞানের অভাবে খাবি খাওয়া রাজনীতিরই আজ অক্সিজেনের প্রয়োজন।