গভীর রহস্যের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হলো। তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু আয়েন্দের মৃত্যুই নেরুদার অন্তিম কি এসেছিল আততায়ীর হস্তধৃত কারবাইনের ছদ্মবেশ গ্রহণ করে, না পরাবাস্তববাদী স্বপ্নের মতো অপরূপ, পরাণপ্রিয় সমাজব্যবস্থার সহসা রক্তাপ্লুত অবসানে প্রাচীন সন্তদের মরমি নেতিবোধে উত্ত্যক্ত হয়ে দেহ রক্ষা করলেন স্বেচ্ছায়? আমরা জানি যে দীর্ঘকাল ধরে এই ক্যানসার-ক্লান্ত কবি শয্যাশায়ী ছিলেন যদিও, কিন্তু স্বদেশের নব্য সমাজাদর্শের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা তিনি দেখে যেতে চেয়েছিলেন সমাজতন্ত্রে প্রতিশ্রুত একজন কোবিদ মানুষ হিসেবে। নেরুদার জীবন উত্থান-পতনে বর্ণিল হওয়া সত্ত্বেও আয়েন্দের জীবনাবসান মার্ক্স অনুপ্রেরিত সামাজিক বিপ্লবের রক্তাক্ত অবলোপ, প্রিয় বন্ধুদের মৃত্যু, একদল অন্ধ সামরিক আততায়ীর দখলে ট্যাঙ্ক আর আরমার্ডকারে পিষ্ট স্বদেশের চিৎকার পাবলো নেরুদাকে জীবনের প্রতি বিমুখ করে দিয়েছিল বলেই আমার বিশ্বাস। জীবনের প্রিয়তম স্তম্ভগুলো যখন একের পর এক ধসে পড়ে, নিজ বাসভূমে যখন পরবাস হয়ে ওঠে নিয়তি, তখন কোনো কোনো অসাধারণ পুরুষ আত্মহত্যা না করলেও অন্যান্য ইচ্ছাশক্তির তীব্র চাপে ডেকে আনেন স্বেচ্ছামৃত্যু। ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয় মোটেই। তবে আমরা যারা নেরুদার কবিতার অনুরাগী, আমরা কোনো দিনও জানব না—চিলির রাজনৈতিক মহলের অনুকম্পা ছাড়া—কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। পাবলো নেরুদার মৃত্যু আমাদের জন্য রহস্যাবৃতই হয়ে থাকবে। তবুও আমরা জানি, আন্তেনিও মাচাদো, হুয়ান র্যামন হিমেনেথ, ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা—স্প্যানিশ ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের সঙ্গেই নেরুদার নাম চিরদিন উচ্চারিত হবে।
২.
চিতা স্পর্শ করে পাতা
তার গরহাজিরার দীপ্তি দিয়ে,
ডালপালার মধ্য দিয়ে
দৌড়ে যায় বেড়াল,
এক ডুবন্ত আগুন;
তার ভেতরে অ্যালকোহলের মতো
জ্বলে ওঠে অরণ্যের চোখ
#
আমের ঝোপের
চূড়া
ঘিরে
ছিল ঝুলবারান্দাঅলা
ছড়ানো শহর
পাখিতে জনমুখর…
(‘ম্যাগনোলিয়াগাথা’)
উদ্ধৃত কবিতাংশ দুটি বলাবাহুল্য পাবলো নেরুদার। প্রথমটি ১৯৫০ সালে রচিত ‘ক্যান্টো জেনারেল’ এবং দ্বিতীয়টি ‘এলিমেন্টাল ওডস’ নামক প্রাথমিক পর্যায়ের কাব্যধারা থেকে গৃহীত। দুটো কবিতাংশের রচনারীতিতেই যে পরাবাস্তববাদী ছায়া পড়েছে তা অভিজ্ঞ কাব্যপাঠকের কাছে সহজেই ধরা পড়ে। স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে পরাবাস্তববাদ বিশেষ ফলপ্রসূ হয়েছে ইতিপূর্বেও। আমরা জানি যে আটলান্টিকের পরাপারে ফরাসি সুররিয়ালিস্ট আন্দোলন পুরোপুরিভাবে আদৃত হয়নি কোনো দিন। কিন্তু প্রথম মহাযুদ্ধের পর স্পেনসহ সমগ্র স্প্যানিশভাষী লাতিন আমেরিকায় বিভিন্ন ইউরোপীয় শিল্পাদর্শসমূহ নব প্রাণতরঙ্গ সঞ্চার করেছিল। লোরকা তাঁর ক্রোধ, হতাশা এবং দুঃখের রূপকল্পসমূহ সুরলিয়ালিস্ট রীতির পথেই খুঁজে পেয়েছিলেন। আরেকজন স্প্যানিশভাষী কবি আলিক্সান্দার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশালতার সঙ্গে যুযুধান, অসহায় মানুষের বিস্ময়, ক্ষোভ ও কান্নার যোগ্য চিত্রাঙ্কনের জন্য দ্বারস্থ হয়েছিলেন পরাবাস্তববাদী রূপকল্প নির্মাণপদ্ধতির। এবং হার্নান্দেজ সনেটের মতো নিটোল, নিশ্ছিদ্র ও যৌক্তিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত কাব্য-আঙ্গিকের ভেতরেও প্রেমের ভেতর আন্দোলনসমূহের আভাস ফোটাতে গিয়ে চেতন-অবচেতনের স্বপ্নলীলা সঞ্চার করেছিলেন। উইলস বার্নস্টোনের ভাষায়, ‘পরাবাস্তবাদ বাস্তবতার যে দৃশ্যকল্প তৈরি করে সেটা স্পেনের পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে উঠেছে, বিশেষভাবে। পরাবাস্তবাদ কুয়েভেদোর ‘স্বপ্ন’ ও প্রয়াত গয়ার দুঃস্বপ্নের মূর্তির স্বপ্নাবিষ্ট জগৎ তৈরি করে।’ তা ছাড়া যাঁরা স্প্যানিশ ভাষায় সাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত সেই ইউরোপীয় পণ্ডিতেরাও মনে করেন, পরাবাস্তববাদী শিল্পরীতির বা কাব্যরীতির অন্তর্লীন সম্ভাবনাসমূহ স্প্যানিশভাষী কবিদের হাতে যতটা বিশদভাবে ও সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে তা ওই শিল্পদর্শনের জনক অর্থাৎ ফরাসিদের হাতেও সম্ভব হয়নি।
এখানে উল্লেখ্য যে লোরকার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাবলো নেরুদাও এই একই সাহিত্যিক উত্তরাধিকারে সমৃদ্ধ। বরং বলা চলে যে স্প্যানিশ-আমেরিকান কবিরা ইউরোপীয় কবিদের মতো বোদলেয়ার, র্যাঁবো, পো প্রভৃতি মহাজন কবিদের মধ্যে আধুনিকতার বীজ সন্ধানের পরিবর্তে হুইটমানীয় বিস্তার ও পরাবাস্তববাদী শৃঙ্খলমুক্ত স্বাধীনতার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রবলভাবে। পাবলো নেরুদার ক্ষেত্রে এটা সবিশেষভাবে প্রযোজ্য। চিলির সামাজিক জীবনের অন্তর্নিহিত নিপীড়ন, দুঃস্বপ্ন ও উত্তরণের বিশাল আকাঙ্ক্ষাকে শব্দের মানচিত্রে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে রূপায়িত করতে গিয়ে হুইটমানের শেকলছাড়া, কবিতার প্রথাসিদ্ধ কানুন অস্বীকার করা ব্যাপ্তি ও পরাবাস্তব স্বপ্ন নেরুদা তাঁর কবিতায় মিলিয়েছিলেন অত্যন্ত সমর্থ হাতে এবং এ কারণেই নোবেল পুরস্কার কমিটি (১৯৭১) থেকে বলা হয়েছিল যে নেরুদার কবিতায় একটি ‘মহাদেশের স্বপ্ন’ উচ্চারিত হয়েছে। পারির রাস্তার কিংবা মাদ্রিদে কাফের জটলায় বসে শব্দ ও চিত্রকল্পের যে অযৌক্তিক সন্নিপাতন সচেতনভাবে করতে হতো তাই যেন বাস্তবে রূপপরিগ্রহ করে অপেক্ষা করছিল লাতিন আমেরিকার বিশাল ভূখণ্ডে, যেখানে ‘বৃক্ষরাজি ঘরবাড়ি গিলে ফেলে আর দুঃস্বপ্নের মধ্যে ইভ তোঙ্গির ভূ–দৃশ্যাবলির যে শূন্যতা রয়েছে, মরুভূমি যেন তাকে অনুকরণ করে। লাতিন আমেরিকার ভূ–দৃশ্যাবিল যেন নিজেই পরাবাস্তব।’ বলা বাহুল্য, এই পরাবাস্তব ভূখণ্ডেরই কবি হচ্ছেন পাবলো নেরুদা।
ড. মযহারুল ইসলাম সম্পাদিত বাংলা একাডেমির সাহিত্য পত্রিকা উত্তরাধিকার-এর প্রথম বর্ষ নবম-দশম সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৭৩) বর্তমান লেখাটি প্রকাশিত হয়।