সমুদ্র থেকে ঢুকে আসা জলীয় বাষ্পে ভরা পুবালী হাওয়া দৌলতে দক্ষিণবঙ্গের যখন সব জেলা থরহরিকম্প, সেই সময়ে ঘুরে আসতে পারেন কাশ্মীর। অবাক হচ্ছেন তো! আমি কিন্তু হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত জম্বু কাশ্মীরের কথা বলছি না, এটি মধ্যপ্রদেশের কাশ্মীর। হ্যাঁ এই নামেই ডাকা হয়ে থাকে ১১০০ মিটার উঁচুতে সাতপুরা পর্বতমালার পাঁচটি পাহাড়ে ঘেরা এই শৈল শহরটিকে। ভালো নাম পাঁচমাড়ি আর ডাক নাম ‘সাতপুরা কি রানি’।

সবুজ মোড়কে মোড়া প্রকৃতিদত্ত লালবেলে পাথরের পাহাড়, মনোরম জলপ্রপাত, জঙ্গল, গুহা, বণ্যপ্রানী, ঐতিহাসিক স্থান এবং রহস্যে ঘেরা সুড়ঙ্গ… সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে সমৃদ্ধ ঘেরা শৈলবাসটি সপ্তাহান্তে ছুটির জন্য এক চমত্কার পরিবেশ। ১৮৫৭-য় সিপাহী বিদ্রোহ দমনকালে ক্যাপ্টেন ফোরসাইথ জঙ্গলের মধ্যে প্রথম খুজেঁ পান এই শান্তিনীড়টিকে।
‘পাঁচ-মাধি’ অর্থাৎ পাঁচটি গুহা যা সময়ের চাকায় পিস্টে হয়ে উঠেছে পাঁচমারি। ভূমিকম্পের কারণে ওপর থেকে নেমে এসেছে পাহাড়ি ঝোরা, খাতে নুড়ি দিলেই আওয়াজ ফিরে আসে ৭ সেকেন্ড পর। এমন নানান রহস্যে ঘেরা স্থান রয়েছে এখানে। পাঁচমাড়ি অঞ্চলটি তার অনন্য শাল বন, বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগত, ভূ-সংস্থান এবং ঔষধি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত উদ্ভিদের ১৫০টিরও বেশি প্রজাতির জন্য বিখ্যাত।

বছরের যেকোনো সময়ে মধ্যপ্রদেশের পাঁচমাড়িতে যেতে পারেন, কারণ বছরের বেশিরভাগ সময়েই মেঘে ঢাকা থাকে পাঁচমারির আনন্দময় আকাশ। তবে এটি দেখার জন্য সবচেয়ে আদর্শ সময় হল অক্টোবর থেকে জুন, যদিও প্রচণ্ড শীতে আর ভরা বর্ষায় আরও রঙিন হয়ে ওঠে পাঁচমাড়ি।
পাঁচমাড়ির নিকটতম প্রধান বিমানবন্দরগুলি হল ভোপাল এবং জবলপুর। বিমানবন্দর থেকে পাঁচমারিতে পৌঁছতে বাস বা ট্যাক্সি নিতে পারেন। ট্রেনে পাঁচমাড়ির নিকটতম রেলপথটি শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দূরে পিপারিয়ায় অবস্থিত।
পাঁচমারিতে আমাদের প্রথম দর্শনীয় স্থান ছিল বাইসন মিউজিয়াম। টিকিট কেটে মিউজিয়াম দেখার পর গাড়ি বুকিং, বনবিভাগের কাছে অনুমতি নেওয়া, গাইড নেওয়া ইত্যাদি কাজগুলো সেরে নিয়ে আমরা চললাম পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা এ্যাডভেঞ্চারে। চাইলে আপনি একদিনের জন্য স্কুটি ভাড়াও নিতে পারেন। হাতে দু-তিন দিন সময় নিয়ে এখানে আসুন তাহলে ভালোভাবে ঘোরে যাবে।
জটা শঙ্কর গুহা : নামটি শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটি শিবের মন্দির।গভীর গিরিখাত এর মধ্যে অবস্থিত এই শিবলিঙ্গ প্রকৃতির হাতে গড়া। এখানে স্ট্যালাগমাইট পাথর ক্ষয় হয়ে বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করেছে, যেমন শত-মাথাযুক্ত সর্প শেষনাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা গ্রানাইট কাঠামো ভগবান শিবের জটার মতো দেখায়। প্রায় ১৫০টি পাথরের সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে যাবেন মহাদেবের দর্শনে। এখানে অতি মনোরম ঝরনার জলে পুষ্ট জলাশয় রয়েছে। গুহার মাথাটি ভালোভাবে লক্ষ্য করেলে একটি ব্যাঘ্রমূর্তি বুঝতে পারবেন।

পাণ্ডব গুহা : পাহাড়ের মাথায় তৈরি পাঁচটি গুহা। কথিত আছে অজ্ঞাতবাসে এই পাঁচটি গুহা ছিলো পঞ্চ পাণ্ডবদের। গুহা ঘিরে রয়েছে নানান গল্প তবে ভূতত্ত্ববিদরা বলেন এগুলো নাকি বৌদ্ধ বা জৈন গুহা যা নবম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল এবং তাদের অভ্যন্তর জুড়ে কিছু অত্যাশ্চর্য শিল্পকর্ম এবং অলঙ্করণ ছিল তবে সময়ের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গেছে। বর্তমানে আরো তিনটি নতুন গুহা আবিষ্কৃত হয়েছে।

বি-ফলস : ঘুরতে ঘুরতে এবার এলাম এক জঙ্গলের সামনে। এখান থেকেই জিপসি যায় পাহাড়ি পথে বি-ফলস বা বিপ্রপাত দেখিয়ে আনার জন্য, তবে পায়ে হেঁটেও যাওয়া যায়। বি-ফলস বা মৌমাছি জলপ্রপাত শুধুমাত্র তার দৃশ্য সৌন্দর্যের জন্যই নয় বরং এটি পাঁচমাড়ির পুরো শহরের জন্য জলের উৎস। একটি খাড়া উপত্যকায় গড়িয়ে পড়া একটি জলপ্রপাত যেটি নেমে আসার পথে পাথরে ধাক্কা খেয়ে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হচ্ছে যা সত্যি মৌমাছির মতো দেখতে লাগছে। বি-ফলস পৌঁছানোর জন্য প্রায় ২০০-২৫০ খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নামতে হবে। সতর্কতা অবলম্বন করা খুব দরকার যেহেতু সিঁড়িগুলি পাথরের বিশেষ করে বর্ষাকালে। তাই ছোট শিশুদের বা বয়স্ক ব্যক্তিদের না নিয়ে যাওয়াই ভালো।
এখান থেকে যাওয়া হলো রক পেইন্টিংয়ে। পাহাড়ের গুহায় প্রাচীন মানুষের আঁকা ছবি। অসাধারণ কারুকার্যময় আঁকি-বুকি প্রায় দশ হাজার বছরের প্রাচীন। এখান থেকে এলাম আমরা পাঁচমারির লেকে। এখানে বোটিং করার সুবন্দোবস্ত আছে।

এখানে একটি ভিউ পয়েন্টের নাম হলো ‘হান্ডি খো’। প্রকৃতির অদ্ভুত সৃষ্টি একদিকে খাঁড়াপাহাড় অন্যদিকে গভীর গিরিখাত। দুটি বিশাল পাহাড় যা প্রায় ৩০০ ফুট গভীরে একটি V আকারে একটি উপত্যকা তৈরি করেছে। স্থানীয়রা দাবি করে যে এখানে এক সময় একটি হ্রদ ছিল, কিন্তু একটি বিশাল সাপের ক্রোধের কারণে এটি শুকিয়ে গেছে। ভ্রমণকারীদের জন্য এই স্থানে হাইকিং, ঘোড়ায় চড়া এবং অন্যান্য বহিরঙ্গন ক্রিয়াকলাপ উপলব্ধ। আপনি লোকাল বাসে করে হান্ডি খো’তে পৌঁছাতে পারেন এবং সেখানে পৌঁছাতে আপনার প্রায় ১০ মিনিট সময় লাগবে কারণ পাঁচমাড়ি বাস স্টেশন এবং হান্ডি খোহের মধ্যে দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিমি।
পাহাড়ের মাথায় আছে প্রিয়দর্শনী পয়েন্ট, অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে সমৃদ্ধ যা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। প্রিয়দর্শনী পয়েন্ট থেকে ২ মিনিট ধরে ইকো পয়েন্ট যেখানে আপনার বলা প্রতিটি শব্দ ইকো হয়, এখান থেকে নেমে এলেই গ্রিন ভ্যালি পয়েন্ট দেখতে পাবেন। এই পয়েন্ট গুলো দেখে আসার পর নিচে প্রচুর ম্যাগী তৈরি হচ্ছে, এখানে এটি বিখ্যাত খাবার।

রিচগড় : এটি একটি বিশাল গুহা যা পাঁচমাড়ি পাহাড়ের ফাটলের নীচে পাওয়া যায় এবং স্থানীয় লোককাহিনীর সাথে জড়িত। কিংবদন্তি অনুসারে, এই গুহাটি পূর্বে একটি বিশাল ভাল্লুকের বাসস্থান ছিল, যাকে হিন্দিতে রিচ বলা হয়। যে পথটি গুহা পর্যন্ত নিয়ে যায় সেটি সবুজ গাছপালা দিয়ে আবৃত। তবে সাবধান, এখানে সাপ থাকতে পারে। পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রিচগড় থেকে পাঁচমাড়ি বাস স্টেশনে পৌঁছানো যেতে পারে।
রয়েছে পাঁচমাড়ির বড় মহাদেব গুহা। এটি একটি ভগবান শিবের মন্দির এবং এতে বিষ্ণু, ব্রহ্মা এবং গণেশের মূর্তি রয়েছে। গুহাটি পাঁচমাড়ির অদম্য প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত। কথিত আছে যে ভগবান বিষ্ণু প্রায় ৬০ ফুট লম্বা গুহার মধ্যে দানব ভস্মাসুরকে বধ করেছিলেন। গুহার মধ্যে রয়েছে মিষ্টি জলের স্রোত, বিশ্বাস করা হয় যে এই জলে ভিজলে পাপক্ষয় হবে।

খ্রিস্ট চার্চ : ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শৈলীর একটি প্রধান উদাহরণ। চারপাশে লতাপাতা এবং সুউচ্চ বৃক্ষ দ্বারা বেষ্টিত হওয়া প্রটেস্ট্যান্ট চার্চের সুউচ্চ চূড়া, পাথরের বিল্ডিং এবং বেলজিয়ান কাঁচের জানালা দেখলেই আপনার মনে হবে আপনি বৃটিশ আমলে পৌঁছে গেছেন। মাটিতে একটি ছোট কবরস্থান রয়েছে, যেখানে আঠারো দশক থেকে বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত শিলালিপি রয়েছে। পাচমাড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে এক কিলোমিটার হাঁটা দূরত্বে আপনি এই গির্জাটি পাবেন।

ধূপগড় : এটি ১৩৫২ মিটারে দাঁড়িয়ে থাকা সাতপুরা রেঞ্জের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। ভোর এবং সূর্যাস্ত উভয়েরই শ্বাসরুদ্ধকর সুন্দর দৃশ্যের জন্য এই স্থানটি ভ্রমণকারী এবং স্থানীয়দের মধ্যে বিখ্যাত। এটি ছাড়াও, এখান থেকে রাতের বেলায় আলোকিত শহর দেখতে পারেন।
নেটওয়ার্ক কভারেজের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচমাড়িতে Jio দ্বারা সর্বোত্তম পরিষেবা পরিবেশিত হয়, তারপরে ভোডাফোন, এয়ারটেল এবং আইডিয়া রয়েছে৷
পাঁচমড়ির মৃদু জলবায়ু এবং শ্বাসরুদ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য এটিকে সারা বছর ধরে একটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য করে তোলে। বর্ষা ও শীতকালে পাহাড়ি স্থানটি হাজার গুণ বেশি অত্যাশ্চর্য। তাই ছুটি গুনে ঘুরে আসুন মধ্যপ্রদেশের একমাত্র শৈল শহর পাঁচমারিতে।