আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী শয়নী একাদশী তিথি নামে শাস্ত্রে অভিহিত। জাগতিক যত তমবিকার আছে এই দেবী তা নাশ করে বা দূর করে ওই ভক্তকে মুক্তি দান করেন। সেই জন্য এই দেবী শ্রীশ্রী শয়নী একাদশী দেবী নামে খ্যাতি লাভ করেছেন। এই শয়নী একাদশী তিথি থেকে কার্তিক মাসের শুক্লা একাদশী পর্যন্ত ক্ষীর সমুদ্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরোহন করেন শেষনাগ রচিত শয্যায়। সেই জন্য এই একাদশী তিথিকে শয়নী একাদশী বলে।
এছাড়াও এই দেবীর আরও নামের মধ্যে আছে দেবশয়নী, বিষ্ণুশয়নী, পদ্মনাভ, শ্রীহরিশয়নী ইত্যাদি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন, রাজা এই একাদশী ব্রত পালন করলে পালনকারী মানুষের মুক্তি লাভের সহায়ক হবে।
ভবিষ্যত্তোর পুরাণে এই একাদশীর মাহাত্ম্য বর্ণিত রয়েছে। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণের প্রতি বললেন, হে দয়াময়! আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম ও মাহাত্ম্য আমার কাছে বলুন।
ভগবান বললেন, এই একাদশীর নাম শ্রীবিষ্ণুশয়নী একাদশী। একদা দেবর্ষি নারদ ব্রহ্মার নিকটে গিয়ে তাকে প্রণাম করে বললেন, হে পিতামহ! আপনি শাস্ত্র বিশারদ তাই জিজ্ঞাসা করছি, আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম ও মাহাত্ম্য কি আমাকে বলুন।
ব্রহ্মা বললেন, সূর্যবংশের পরম ধার্মিক চক্রবর্তী সম্রাট ছিলেন মান্ধাতা। তিনি পুত্রের সমান প্রজা পালন করতেন। তাঁর রাজ্যে প্রজারাও খুব খুশি ছিলেন।
কিন্তু সেই রাজ্যে এক অঘটন উপস্থিত হল।
তিন বছর ধরে রাজ্যে বৃষ্টি হলো না। অন্নাভাবে প্রজাগণ হাহাকার করতে শুরু করে। তাঁরা প্রপীড়িত হয়ে রাজার কাছে দুঃখের কথা জানালে মান্ধাতা চিন্তা করলেন, রাজার দোষেই দেবতারা রুষ্ট হন আর প্রজাগণ কষ্ট পান। কিন্তু রাজা ভাবলেন, তিনি জ্ঞানত কোন পাপ করেননি।
কিন্তু প্রজাদের কল্যাণ করতেই হবে এমনই চিন্তা করে কিছু প্রধান ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে রাজা অঙ্গিরা ঋষির আশ্রমে গিয়ে ভক্তি ভরে মুনির চরণ বন্দনা করে বললেন, ‘ধর্ম অনুসারে আমি পৃথিবী পালন করি। তথাপি তিন বৎসর রাজ্যে বৃষ্টি হচ্ছে না অন্নাভাবে প্রজাগণ ক্ষয় পাচ্ছে। যে উপায়ে দুঃখ মুছে যাবে সেই উপদেশ আমাকে দিন।’
তখন ধ্যানযোগে মহর্ষি অঙ্গিরা অনাবৃষ্টির কারণ জ্ঞাত হয়ে বললেন, ‘হে রাজন! এখন সত্যযুগ চলছে।এই যুগে ছোট পাপেরও ভয়ঙ্কর দণ্ড হয়। বিপ্রব্যতীত অন্যের তপস্যা সিদ্ধ হবে না। কিন্তু বর্তমানে এক শূদ্র তপস্যা করছে। সেই অপরাধেই এমন অবস্থা হলো। কাজেই তাকে বিনাশ করলে রাজ্যে বৃষ্টিপাত হবে’।
কিন্তু রাজার হৃদয় এক নিরপরাধ শূদ্র তপস্বীকে হত্যার জন্য রাজি হয় না। তিনি বলেন, ‘হে দেব! সেই নিরপরাধের হত্যা করতে আমার মন সায় দিচ্ছে না। আপনি অন্য কোনও উপায় জানান। মহর্ষি অঙ্গিরা বলেন, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী ব্রত করো। এই ব্রতর প্রভাবে অবশ্যই বৃষ্টি হবে’।
মহর্ষির এই উপদেশ পেয়ে রাজা খুব খুশি হয়ে তিনি নিজের রাজ্যে ফিরে আসেন। রাজা চার বর্ণের জনগণের সঙ্গে মিলে দেবশয়নী একাদশীর ব্রত পালন করেন। এর পুণ্য প্রভাবে তাঁর রাজ্যে প্রবল বৃষ্টি হয় ও রাজ্য পুনরায় শস্য শ্যামলা হয়ে ওঠে।
এই একাদশী হতে ভক্তগণ চতুর্মাস্য ব্রত পালন করেন এবং দেব দেওয়ালী অর্থাৎ কার্তিক একাদশীতে ওই ব্রতের পূর্ণাহুতি হয়। এই ব্রত কালে ভক্তগণ জন্মাষ্টমী রাধাষ্টমী বামন দ্বাদশী ব্যতীত অন্যান্য দিবসে হবিষ্যান্ন গ্রহণ করে, শ্রী হরির কীর্ত্তন নৃত্য করেন। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, ত্রিসন্ধ্যায় হরিমন্দিরে যেই ব্যক্তি ১০৮ বার গায়ত্রী মন্ত্র জপ করেন তার কোটি জন্মের পাপ বিদুরিত হয়, তিনি অন্তিমে গোলকধামে গমন করেন।
বৈদিক পঞ্জিকা অনুসারে, আষাঢ় শুক্লা একাদশী তিথি ৫ জুলাই সন্ধ্যা ৬:৫৮ টা থেকে শুরু হবে এবং ৬ জুলাই রাত ৯:১৪ টা পর্যন্ত চলবে। এমন পরিস্থিতিতে, উদয় তিথি অনুসারে, উপবাস রাখার সর্বোত্তম দিন হল ৬ জুলাই। এই দিনে ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণু এবং মা লক্ষ্মীর পূজা করলে বিশেষ পুণ্য লাভ হয়। জীবনে আসন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
কথিত আছে অনেক চেষ্টা করেও যাদের বৈবাহিক জীবন ভাল না চলে, দেবশয়নী একাদশীর দিন তুলসী গাছে ১৬ শৃঙ্গারের উপাদান নিবেদন করলে সুফল পাওয়া যায়। অখণ্ড সৌভাগ্যের আশীর্বাদ পেতে এই একাদশী ব্রত পালন করা হয়।
একাদশীর দিন সন্ধ্যাবেলায় তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালাবেন। পারলে গুড় এবং মিছরি দিয়ে তুলসী গাছকে পুজো করবেন। একাদশীর দিন দরিদ্র নারায়ণ সেবা করা খুব শুভ। অভাবী মানুষদের সাধ্যমত হলুদ কাপড়, ফল, শস্য, ঘি, গুড়, দান করুন।
এই একাদশীর দিন হতে চার মাসের জন্য প্রভু শয়ন করেন। ‘যথা দেহে তথা দেবে’, এই কথাটি ভাবুক ভক্তগণের ভাবের প্রতীক। ‘আমার যা ভালো লাগে তা আমার প্রভুরও ভালো লাগে’, এমন ভাবনার বশবর্তী হয়েই ভক্ত প্রভুকে ফুল, সুগন্ধি, প্রসাদ ইত্যাদি নিবেদন করেন। ভক্তের স্নান করতে ভালো লাগে তাই প্রভুকেও স্নান করান। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হলে বিশ্রাম করার জন্য শয়ন করেন। সেইভাবে আমার প্রভু বিশ্ব পরিচালনা করতে করতে হয়তো ক্লান্ত হয়েছেন, তার বিশ্রামের প্রয়োজন তাই তারও চার মাস শয়ন করা উচিত। ভক্তগণ এমন ভক্তিপূর্ণ ভাবের প্রকাশ করেছেন এই চতুর্মাস ব্রত পালনের মাধ্যমে। ভক্তদের এই জেদের ফলে কল্পনার সৌন্দর্য ও মাধুর্য অনেক বেড়ে গেছে।
এই কল্পনাগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ কল্পনা এই যে কর্মযোগীকে পথপ্রদর্শন করার জন্যই ভগবান শয়ন করেন। প্রভু যে চার মাস শয়ন করেন সেই চার মাসে আমাদের দেশে বর্ষাকাল। সাধারণ অবস্থায় ভগবান শয়ন করলে সৃষ্টি অচল হয়ে পড়ে। এই বর্ষা ঋতুর মতো অমূল্য সময়ে যখন সৃষ্টিতে জল এবং অন্যের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন, তখন ভগবান শয়ন করলে চলবে কি করে? তাই ভগবানের এই শয়ন কল্পনা পুরাণের এক আজগুবি গল্প বলে অনেকেই মনে করেন, কিন্তু তা সত্য নয়।
বর্ষা ঋতুতে সৃষ্টির সৌন্দর্য পূর্ণরূপে বিকশিত হয়ে ওঠে। নবজীবন লাভ করেন কৃষকগণ। প্রচুর ফসলের লাভের আশা করেন কৃষকগণ। ফলে চতুর্দিকে আনন্দের ঢেউ বইতে থাকে। ভগবানের এই কৃপাভাবে কৃতজ্ঞ মানব দেবালায়ে গিয়ে ভগবানের গুনগানে মুখর হয়ে ওঠেন। তারা বলেন, ‘আমার এই বৈভব তোমারই কৃপার ফল’।
মানবগণ যখন ভগবানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করেন তখন ভগবান বলেন, ‘আমি তো এই চার মাস শয়নে ছিলাম। এই সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। এই বৈভব, সমৃদ্ধি সবই তোমাদের পুরুষার্থ ও পরিশ্রমের ফল। কর্মের সময় সর্বদা সচেষ্ট থাকা আর ফল লাভের সময় না জানার ভান করে শুয়ে থাকা,এর চেয়ে বিশাল মনের পরিচয় আর কি হতে পারে! প্রকৃত কর্মযোগীর পক্ষে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ পথ আর কিছুই নেই।
এই কল্পনা ভাবের দৃষ্টিতে যতখানি ভাবপূর্ণ, বিচারের দৃষ্টিতেও ঠিক ততখানি মাধুর্যপূর্ণ। আজকের দিনে এই প্রতিজ্ঞা করা উচিত ভগবানের নিদ্রাকে নিশ্চিন্ত করার জন্য আমরা যেন শক্তি ও বৃত্তির অধিকারী হতে পারি।