মানিকপুরের চন্ডীমন্ডপে সেদিন গোটা গ্রাম এসে জড়ো হয়েছে। অখিলমাস্টার চিঠি পড়ছেন। গাঁয়ের ছেলে বিনয় ওরফে বিনুর চিঠি। সে গেছে গাঁয়ের মাকালতলা, পদ্মপুকুরের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে। জামশেদপুরের কারখানায় কাজ করতে। গোটা গোটা অক্ষরে চিঠির ঠিকানায় লেখা নিস্তারিণী দেবী। উদলাবাড়ি, গ্রাম মানিকপুর, জিলা নদিয়া। কালী ডাকহরকরার সময় নেই চিঠি পড়ে শোনানোর। তাকে যেতে হবে আরো দূর গাঁয়ে চিঠি বিলোতে। বিনুর মা নিস্তারিণী প্রায় দৌড়তে দৌড়তে সে চিঠি নিয়ে এল অখিলমাস্টারের কাছে। তার চোখ ভরা জল। সঙ্গে মনার মা, কাজলের মা আর তাদের ছানাপানারা। নিস্তারিণীকে ওভাবে ছুটতে দেখে হাতের কাজ ফেলে জুটল আরো মানুষ। দেখতে দেখতে গোটা গ্রাম ভেঙে পড়ল চন্ডীমন্ডপে। গাঁয়ের ছেলে বিনু চিঠিতে কি লিখেছে!? তার কি মনে পড়ছে আলপথে হেঁটে যাওয়া। পদ্মপুকুরে নৌকা বাওয়া। গাঁয়ের পাঠশালা। মায়ের হাতের পায়েস। খেলুড়ে সাথীদের কথা… এমন নানা প্রশ্ন, অজস্র কৌতুহল একটা সামান্য চিঠিকে ঘিরে।
চিঠির সেইদিন কবেই গ্রামের রাঙা ধুলোয় মিলিয়ে গেছে। পুরনো চিঠি এখন চন্দন কাঠের হাতবাক্সে রাখা ‘ভুলে যাওয়া গীতি’। অথচ চিঠিই একসময় ছিল আমাদের ভাবনার দূত। আটকে পড়া জীবনের কথকতা। পদ্মপাতায় রাজা দুষ্মন্তকে লেখা শকুন্তলার ‘মনের কথা’। চিঠি মানে কেজোকথারও বিজ্ঞপ্তি। রাজায়-রাজায় শান্তি ও যুদ্ধঘোষণার দলিল।
সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁর মুনশী ইনায়েতুল্লাকে দিয়ে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁকে চিঠি লিখছেন। মূল রচনা ফারসিতে। অধ্যাপক যদুনাথ সরকার তার তর্জমা করেছেন।
“আপনি বাদশাহী রাজস্ব সংগ্রহে পরিশ্রম করিতেছেন এবং প্রার্থনা করিয়াছেন যে বাদশাহের স্বহস্তে লিখিত কয়েক ছত্র-সহ এক ফর্মান আপনার নিকট প্রেরিত হউক। তাহা সব বাদশাহ অবগত হইলেন। সম্রাট অনুগ্রহপূর্বক এক উজ্জ্বল সম্মানসূচক পরিচ্ছদ (খেলাত) এবং স্বহস্তাক্ষরে ভূষিত ফর্মান প্রদান করিলেন। নিশ্চয়ই এইসব অনুগ্রহ প্রকাশ করিতে ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য ও হুজুরে প্রেরণ সম্বন্ধে অত্যন্ত পরিশ্রম করিবেন। অতি শীঘ্রই খেলাৎ ও ফর্মান আপনার নিকট প্রেরিত হইবে।”
এ চিঠি এক অমূল্য ইতিহাসের সাক্ষী। চিঠির বক্তব্যে সেই সময়কার সুবে বাংলার রাজস্বের প্রাচুর্য (প্রায় ন-লক্ষ টাকা), মুঘল কোষাগারের রিক্ততা, মুর্শিদকুলি খাঁয়ের পদপ্রতিষ্ঠার ছবি অনেকটা পরিষ্কার।
সুদূর দিল্লী থেকে মুর্শিদাবাদে অশ্ববাহী এ চিঠি পৌঁছতে নিশ্চয়ই বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল। জানতে ইচ্ছে করে, কবে থেকে প্রবাসী ভাইবন্ধু, স্বামীর কুশল সংবাদ চিঠি হয়ে হাতে এল।
কেউ কি এমন করে লিখতে পারত?
“এই একটি দাবী রেখো,
এই বসন্তের যেকোনো দিন একটি চিঠি দিও,
কেমন তোমার একলা বিকেল কাটে
সেই গল্প না হয় কিছুটা লিখো।
যদি কিছু না লেখার থাকে তবে শুধু লিখো কেমন আছো এই বেলা,
অথবা এই বসন্তে ফাগুন না হোক,
লিখে দিও তোমার প্রিয় বর্ষার মেঘমালা।”
ফাগুনের রঙে রাঙানো, বর্ষার জলভেজা চিঠি প্রেমিকার কাছে পৌঁছতে অনেককাল লেগে গেছে। সাধারণ মানুষের কাছে একটা সময় কাগজ কলম সহজলভ্য ছিল না। চিঠি লেখার জন্যে রাজার মত লিপিকার ও ছিল না। ডাকহরকরা বা পোস্টম্যানের প্রতীক্ষাও ছিল কল্পনাতীত।
তাই কালিদাসের বিরহী যক্ষের প্রেমিকার কাছে প্রেরিত বার্তার দূত ছিল মেঘ। নল-দময়ন্তীর প্রেমের বার্তাবাহক হাঁস। রামায়ণের পত্রবাহক হনুমান। মহাভারতে বাহক বিদুর এবং আনারকলিতে হরিণ দূতিয়ালির কাজ করত।
চিঠি কবে কাজের গন্ডি ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের খতিয়ান হয়ে উঠল, তার ইতিহাস জানা নেই। তবে চিঠি ছিল বলেই রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রাবলী সাহিত্য হয়ে উঠেছে। রাজা রামমোহন, মধু কবি, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, নেতাজির মত মানুষের চিঠিপত্রে রয়ে গেছে তাঁদের সুদূরপ্রসারী ভাবনাচিন্তার টুকরো কথা। ব্যক্তিগত চিঠির পাতায় প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এই মানুষগুলিই কোথাও অভিমানী। কখনো হতাশাগ্রস্ত, দুশ্চিন্তা, আক্ষেপ, নিঃসঙ্গতায় ঘেরা।
মধুসূদন ও বিদ্যাসাগরের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব, ভরসার নিদর্শন তাঁদের অমূল্য চিঠিপত্র। ভার্সাই, ফ্রান্স থেকে ৩রা নভেম্বর, ১৮৬৪ সালে কবি লিখছেন —
প্রিয় বন্ধু,
আমার আগের একটি চিঠিতে আমি পরিষ্কার করেই জানাতে পেরেছি আমি একাকি কেন লন্ডন যেতে চাই। একা যাওয়ার কারণ যখন জানিয়েছি, তখন আমার বিশ্বাস আপনি আমার হয়ে বিষয় আশয় তত্ত্বাবধান করবেন। যে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জলরাশি থেকে আপনি আমাদের উদ্ধার করেছেন আবার গিয়ে সেই বিপদে না পড়ি, আপনি তা দেখবেন।”
চিঠির ঝাঁপি এমন বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, উদ্বেগ, কাজের কথায় ভরে উঠতে লাগলো। পাশাপাশি রইল গুপ্ত চিঠি। যেখানে ছিল ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা, হুমকি এমনকি বিয়ের ভাংচিও। চিঠির দুনিয়া সাবালক হচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথ একটা গোটা গল্প ‘স্ত্রীরপত্র’ লিখলেন চিঠির আঙ্গিকে। মেয়েদের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর শোনা গেল চিঠির ভাষায়।

চিঠি দিয়ে তৈরি হল গান। মনে আছে রেডিওতে বাজত তখন অনুরোধের আসর। ছাদের গোধূলি আলোয় ট্রানজিস্টারে ঠাকুমা আর তাঁর জায়েরা জগন্ময় মিত্রের ‘চিঠি’র গান শুনে আঁচলে চোখ মুছতেন। বনশ্রী সেনগুপ্তের কন্ঠে বিকেলের ডাকের চিঠি শুকনো-মরা ডালে ফুল ফোটানোর কথা বলেছিল। গুলজারের শ্যয়রীতে আশা ভোঁসলে গাইলেন, “যে রাতের কথা চিঠির ভাঁজে রয়ে গেল, সে রাতের আলো এবার নিভিয়ে দাও। ঐ রাতের স্মৃতিটুকু শুধু আমার জন্যে রেখে দিও।”
চিঠি এল সিনেমার ভাষাতেও। সাড়ে চুয়াত্তর কথাটির অর্থই হল প্রাপক ছাড়া অন্য কেউ তার চিঠি পড়লে সাড়ে চুয়াত্তর মণের পাপ হবে। এ সিনেমায় সুচিত্রা সেন অর্থাৎ রমলার প্রেমপত্র অন্যের হাতে পড়ে হয়ে উঠল সার্থক কমেডি।
‘লাঞ্চবক্সে’র সঙ্গে টুকরো চিঠির গল্প আমাদের উপহার দিল এক অপূর্ব সংবেদনশীল, প্রেমের সিনেমা।
চিঠির গল্পের নটেগাছ মুড়িয়ে যাবার আগেই খুব দ্রুত আমাদের চোখের সামনে খুলে গেল মেইল, ফ্যাক্স, টেক্সটের জগত। হাতের লেখা, সুগন্ধি কাগজ না থাকলেও সেও আধুনিক চিঠি। ইস্কুলের গ্রামার বইয়ের সিলেবাস থেকে উঠে যায় নি পত্রলিখন। কল্পনাবিলাসী মন এখনো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখে। অমলের মত আমাদের জন্যেও রাজার শেষ চিঠি আলোর পথ ধরে একদিন নিশ্চয়ই আসে। সেই যে বৃষ্টি হয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলে অনেক দূরে দেখা যায়, সেই অনন্ত, অপার পথে।