| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পুরাণের পঞ্চকন্যা (প্রথম পর্ব) : বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নবরূপায়ণ লিখেছেন পূরবী বসু

Reporter
পূরবী বসু / ৭৫৭ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যালি সাদারল্যান্ড ২০০৫ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে এক হাজার তরুণ ছেলেমেয়ের ওপর একটি সমীক্ষা চালান। তাদের সবচেয়ে প্রিয় নারীচরিত্র কে, সেটা যাচাই করে নেবার জন্যে প্রাচ্য মিথোলজির কয়েকটি প্রখ্যাত চরিত্রের সঙ্গে তাদের পছন্দ করার জন্যে দেওয়া হয়েছিল সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের বিখ্যাত সব নায়িকা, স্বনামধন্য কয়েকজন লেখক (জনপ্রিয়-জীবিত লেখকসহ) ও শিল্পীসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী বেশ কয়েকজন উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম – সব মিলিয়ে মোট ২৪ জন, যাঁরা সকলেই নারী। ফলাফলে দেখা যায়, অধিকাংশ ভোট পেয়ে অনেক ব্যবধানে প্রথম হয়েছে দুহাজার বছরের পুরনো পৌরাণিক ও কল্পিত চরিত্র সীতা। কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, এমনকি পৌরাণিক নারী দ্রৌপদী বা তার মতো কেউও নয়। অত্যন্ত দুর্বল প্রকৃতির, নির্বিরোধী, সর্বংসহা, নির্জীব এক নারী সীতা। সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে না, পারে না কোনো প্রতিবাদ করতে। নিজের বা অন্য কোনো নারীর প্রতি অন্যায়, দুর্ব্যবহার অথবা কটূক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সে অসমর্থ। অথচ এই রকম একটি জড় পদার্থই ভারত উপমহাদেশের আদর্শ নারীর উদাহরণ, সেই আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত। মুখ বুজে সকল অত্যাচার সইবার ভূমিকায় লোকে (পুরুষ-নারী উভয়েই) বরাবর দেখতে চায় নারীকে। আর সেটা দেখেই অভ্যস্ত তারা। আত্মসচেতন, প্রতিবাদী, অবিচারের প্রতিশোধ নিতে আগ্রহী, তেমন তেজি কাউকে পছন্দ নয় তাদের। অন্তত একজন নারী হিসেবে এই শেষোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো একেবারেই গ্রহণীয় বা বাঞ্ছনীয় নয়। ফলে সীতা-সাবিত্রী যেমন জনপ্রিয়, দ্রৌপদী, কুন্তি কিংবা গান্ধারী তেমন নয়।

‘প্রাচ্য পুরাণ’ থেকে আমার নিজের পছন্দের পঞ্চকন্যাকে শনাক্ত করার আগে ‘প্রাচ্য পুরাণ’ বলতে আসলে এখানে কী বুঝিয়েছি সেটা বলা প্রয়োজন। ‘প্রাচ্য পুরাণ’ বলতে কেবল ১৮টি মহাপুরাণ ও ১৮টি উপপুরাণই বোঝানো হয়নি, এই অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকে পুরুষানুক্রমে প্রবহমান সকল কাহিনি বা ‘মিথ’কেই বুঝিয়েছি। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ থেকে শুরু করে খ্রিষ্টের জন্মের পর কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির দ্বারা লিখিত, রোমন্থিত, পরিবেশিত, পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত ও সংকলিত নানান আদি গ্রন্থ, মূলত ধর্মগ্রন্থ, যেমন – ক) বেদ ও উপনিযদ, খ) উপবেদ, গ) বেদান্ত, ঘ) স্মৃতি সংহিতা, ঙ) গীতা, চ) পুরাণ, ছ) আগমশাস্ত্র, জ) রামায়ণ ও মহাভারত, ঝ) চন্ডী এবং ঞ) ষড়্দর্শন (ছয় দর্শন) প্রাচ্য পুরাণের অন্তর্গত। বেদের আরেক নাম শ্রুতি। এর কারণ, লিপিবদ্ধ হওয়ার আগে দীর্ঘকাল ধরে বেদ মূলত মানুষের স্মৃতিতেই বিধৃত ছিল। একের কাছ থেকে অন্যে, বিশেষ করে গুরুর কাছে শিষ্য, শুনে শুনে শিখত ও মনে রাখত সেসব। এইসব আদি ধর্মগ্রন্থ ও পুরাণে নানান দেবদেবীর কর্মকান্ড এবং তাদের বন্দনা ও উপাসনার পদ্ধতি লিপিবদ্ধ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে অতিপ্রাকৃতিক সব ঘটনা ও চরিত্রের সমন্বয়ে গড়া বহু কাহিনির বিবরণ।

শান্তনু কায়সারের মতে, ‘মিথ এমন সময়ের কথা যখন পৃথিবী ছিল তরুণ আর কল্পনা ছিল তরুণী, যুক্তির চেয়ে উপলব্ধি দিয়ে জগৎকে চেনা যেত বেশি।’ মিথোলজিই কোনো জাতির সর্বপ্রথম এবং সর্বপুরনো বিস্তৃত কাহিনি বা উপাখ্যান। ফয়েজুন্নেছা বেগম লিখেছেন, ‘পুরাণ সাহিত্য প্রাচীন ভারতবর্ষের একটি জীবন্ত ইতিহাস।’ অন্যভাবে বলা চলে, মিথোলজি কোনো জাতির এক ধরনের অতিরঞ্জিত প্রাচীন ইতিহাস যা সাধারণত বিভিন্ন বয়ানে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ব্যক্তি দ্বারা গ্রন্থিত, যার মাধ্যমে আমরা সেই অঞ্চলের আদিম জনগোষ্ঠীর জীবনের স্বরূপ বুঝতে চেষ্টা করতে পারি। যদিও সেই জীবনাচরণ বা জীবনবোধে থেকে যায়, এমনকি জায়গায় জায়গায় একরকম শক্তভাবেই গেঁথে থাকে, অতিলৌকিক বহু কল্পনার মিশেল। আর সেই কল্পবাস্তবে ঘেরা আবছা জগতেও আমরা প্রত্যক্ষ করি নরনারীর (অথবা দেবদেবীর) চিরন্তন প্রেম ও উন্মাদনা এবং তাদের অবস্থানগত বৈষম্য। এসব পৌরাণিক কাহিনিতে নারীকে আমরা খুঁজে পাই কখনো দেবীরূপে, কখনো ক্ষমতাধর শাসকরূপে, কখনো ব্যাকুল প্রেমিকা হিসেবে, কখনো স্নেহান্ধ জননীরূপে, কখনো কুটিল ষড়যন্ত্রকারী রূপে, এমনকি কখনো মায়াজাল বিস্তারকারিণী ঐন্দ্রজালিক মোহিনীরূপেও; যদিও এই সমস্ত রূপ ভেদ করে শেষ পর্যন্ত নারীকে পুরুষের আনন্দ জোগানোর উৎস ও তাদের ভোগ্যবস্ত্ত হিসেবেই মূলত দেখতে পাওয়া যায়। বড়জোর দেখা যায় আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্যে গুটিকয়েক ব্যতিক্রমী নারীকে অবিরাম সংগ্রাম করে যেতে।

পুরাণের প্রায় সব কাহিনিতেই রয়েছে ধর্ম এবং রাষ্ট্রশাসনের মধ্য দিয়ে সমাজজীবনে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা। রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নিয়মকানুন এবং বিধিনিষেধের মধ্যে অনেকদিক দিয়েই বহু সাদৃশ্য রয়েছে। পারলৌকিকতা কিংবা আধ্যাত্মিকতা বাদ দিয়ে শুধু এই জীবন এবং ইহজাগতিক সমাজ নিয়ে যদি আমরা কথা বলি, তাহলে দেখা যাবে, রাষ্ট্র ও ধর্ম উভয়েরই মূল উদ্দেশ্য সমাজ নিয়ন্ত্রণ করা – রাষ্ট্র পরিচালনা করা। বদরুদ্দীন উমরের ভাষায়, ‘ইতিহাসের এক পর্যায়ে, বলা চলে প্রাচীন ও মধ্যযুগ পর্যন্ত, রাষ্ট্রনীতি ও ধর্মনীতি অবিচ্ছেদ্য ছিল। এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক যে মানবজাতির জন্য কল্যাণকর ছিল, এমন নয়।’ পুরাণের বিভিন্ন কাহিনির ছত্রে ছত্রে – সকল উল্লেখযোগ্য পাত্রপাত্রীর মধ্যেই প্রচন্ডভাবে উপস্থিত রয়েছে ক্ষমতার দাপট, দ্বন্দ্ব ও প্রতিহিংসা। পদ, সিংহাসন অথবা অধিকারের জন্যে রেষারেষি-হানাহানি-যুদ্ধ। কখনো তা প্রচ্ছন্ন – কখনো উচ্চকিত। কখনো এই শক্তিপ্রদর্শন বা দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে রাজ্যশাসনে বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার প্রাণপণ প্রচেষ্টা, কখনো কেবল সিংহাসন বা কোনো বিশেষ নারীকে ছিনিয়ে নেওয়া বা দখল করার অভিলাষ, কখনো বা উঁচু-নিচু বর্ণের মধ্যে, আর্য-অনার্যের মধ্যে, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপড়েন ইত্যাদি।

পুরাণের মূলকথা হলো, ভালোর সঙ্গে মন্দের, ধর্মের সঙ্গে অধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ, এবং পরিশেষে অবধারিতভাবেই মন্দের বা দুষ্টের দমন ও ভালোর, মানে শিষ্টের, অর্থাৎ ন্যায়ের জয়। দেবতার সঙ্গে অসুরের, মানুষের সঙ্গে দানবের চিরকালীন বিরোধ একটা প্রধান বিষয় পুরাণে। এছাড়া রয়েছে নরনারীর চিরন্তন প্রেম-উপাখ্যান, যেমন : কচ ও দেবযানী, রাধা-কৃষ্ণ, সীতা-রাম, দ্রৌপদী ও পঞ্চপান্ডব, দুষ্মন্ত-শকুন্তলা, শিব-পার্বতী, অর্জুন-চিত্রাঙ্গদা, আম্রপালী-বিম্বিসার, সাবিত্রী-সত্যবান, বেহুলা-লখিন্দর, দময়ন্তী ও নল, সত্যবতী ও শান্তনু, অনসূয়া ও অত্রির সম্পর্ক, প্রেম, বিরহ। এরই মাঝে পরিস্থিতি-অনুযায়ী এবং সম্ভবত সুবিধেমতো, ঘটে যায় কোনো কোনো পুরুষের মধ্যে আংশিক স্মৃতিশক্তি বিলোপের ঘটনা, অতিজ্ঞান দর্শনে পুনরায় স্মৃতি ফিরে পাওয়া, নারীর প্রতি মুনি-ঋষি থেকে শুরু করে প্রায় সকল পুরুষের কামার্ত দৃষ্টি, সুন্দরী তরুণী-নারী অপহরণ, বিবাহবহির্ভূত যৌনক্রিয়া, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে যৌন সম্পর্ক, কোনো ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য সাধনে কঠিন ও দীর্ঘ তপস্যা, ভয়ংকর সব অভিশাপ, অলৌকিক বরলাভ, ইচ্ছাশক্তির জয়, ধ্যান বা শাস্তির কারণে কথায় কথায় লোকালয় ছেড়ে বনবাসে গমন ইত্যাদি। সেই সময়ের নৈতিকতার সংজ্ঞা বা ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, অন্যান্য মানবিক মূল্যবোধের বেলায়, যেমন – সত্য কথা বলা, অন্যের ক্ষতি না করা, চুরি না করা, যুদ্ধকালীন সময়ে ন্যায়-নীতি-ধর্মের অনুশাসন-অনুযায়ী শত্রুবিনাশ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর যতটা জোর দেওয়া হয়েছে, নরনারীর প্রেম ও যৌনতাবিষয়ক আচরণের ব্যাপারটিতে ততটা নিয়মতান্ত্রিকতা বা স্পর্শকাতরতা দেখা যায়নি। বিশেষ করে পুরুষদের বেলায়। তবে নারীর কৌমার্য ও সতীত্বকে তখনো যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হতো।

আজো কোনো কোনো মানুষ বিশ্বাস করে, পৌরাণিক পঞ্চবতী বা পঞ্চকন্যার নাম উচ্চারণ করলে সকল পাপ দূর হয়ে যায়। জীবদ্দশায় তাদের মহত্ত্ব ও নানাবিধ গুণাবলির জন্যে প্রাচ্যের ‘পঞ্চকন্যা’ বলে প্রসিদ্ধ যে-পাঁচজন পুরাণের নারীর কথা লোকে এখনো স্মরণ করে, তারা হলেন – সীতা, সাবিত্রী, অহল্যা, দ্রৌপদী ও অরুন্ধতী। এছাড়া অন্য এক দলের মতে, পৌরাণিক ‘পঞ্চকন্যা’ হলেন অহল্যা, কুন্তি, দ্রৌপদী, তারা ও মন্দোদরী। এই দুই অভিমতের পঞ্চকন্যার ভেতরেই যে দুজন নারীর উপস্থিতি দেখা যায়, তারা সীতা-সাবিত্রীও নয়, কুন্তি-মন্দোদরীও নয়। তাঁরা হলেন দ্রৌপদী ও অহল্যা। এই পঞ্চকন্যা-নির্বাচনে কারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন আমার জানা নেই, তবে দ্বিতীয় মনোনয়নটি যে অপেক্ষাকৃত বেশি নারীবাদীদের দিয়ে সম্পন্ন, সে-সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও এই দুই ধরনের পঞ্চকন্যার মধ্যেই সীতা-সাবিত্রীর বদলে দ্রৌপদী-অহল্যার উপস্থিতি দেখতে পেয়ে উল্লসিত। কেননা, সীতা-সাবিত্রী ভালো মানুষ হয়তো ছিলেন; কিন্তু তাঁরা যা করেছেন, তা মূলত নিজের জন্যে, নিজের স্বামীর কল্যাণের জন্যে। সংসারের বাইরে বৃহত্তর সমাজের জন্যে মঙ্গলকর কোনো দায়িত্ব তারা পালন করেননি। কোনোপ্রকার অন্যায়ে, অবিচারে, নারীর প্রতি ঘৃণ্য ব্যবহারে তাঁরা মুখ খোলেননি, প্রতিবাদ করেননি, যেমনটি করেছেন দ্রৌপদী, গান্ধারী, কুন্তি। আর অহল্যা? তিনিই একমাত্র গৃহবধূ, শুধু রামায়ণে নয়, সার্বিক প্রাচ্য পুরাণেই, যিনি নিজের শরীরের ওপর, নিজের যৌনতার ওপর নিজের ইচ্ছাপূরণ এবং কর্তৃত্বগ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সার্বিক বিচারে আমার নিজের পছন্দের পুরাণের পঞ্চকন্যা হলেন : দ্রৌপদী, দেবযানী, তারা, গান্ধারী ও কুন্তি। দ্রৌপদী নিজের ইচ্ছায় পাঁচ স্বামীর সঙ্গে বিবাহিত না হলেও পরিস্থিতির কারণে সেটা যখন ঘটে গেল, তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন তাঁদের সকলকে সুখী ও তৃপ্ত করার জন্যে, সংসারে শান্তি বজায় রাখার জন্যে। কারো প্রতি অবিচার না করে পঞ্চস্বামীকে তুষ্ট করার এক অনন্য গুরুভার গ্রহণ করেছিলেন দ্রৌপদী। অর্জুনকে স্বয়ংবর সভায় নিজে পছন্দ করে মাল্যদান করার পরেও কেন তাঁর মতো এক তেজস্বিনী নারী অন্যের চাপিয়ে দেওয়া পঞ্চপান্ডবের স্ত্রী হতে অস্বীকৃতি জানালেন না, এটার ব্যাখ্যা একটাই যে, সে-সময়ে নারীর মতামতের কোনো মূল্য ছিল না – কেউ তা গ্রাহ্য করতো না। তবে বিয়ের পরে পদে পদে পরপুরুষের বাড়িয়ে দেওয়া কামার্ত হাত সদর্পে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন দ্রৌপদী। তাঁকে পণ রেখে স্বামী যুধিষ্ঠিরের পাশা খেলায় হেরে যাওয়ার পরিণামে প্রকাশ্য জনসভায় দুর্যোধনের আদেশে দুঃশাসন যখন দ্রৌপদীর পরিহিত বস্ত্র খুলে নেওয়ার প্রচেষ্টায় রত, দ্রৌপদীর প্রতি এমন অবিচার-অপমানের সময়েও ভীম ব্যতীত তার অন্য স্বামীরা ছিলেন নিষ্ক্রিয়, নীরব। এমনকি বয়স্ক, গুরুজন ভীষ্ম থেকে শুরু করে ধৃতরাষ্ট্র, কর্ণ সকলেই সেখানে দর্শকের ভূমিকায় উপস্থিত ছিলেন। বিব্রত, উত্তেজিত, অপমানিত দ্রৌপদী যখন এই অন্যায়ের মুখর প্রতিবাদ জানান, গান্ধারী ব্যতীত আর কেউ তাঁর পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন না। তখন দ্রৌপদী নিতান্ত অনুপায় হয়ে সুহৃদ কৃষ্ণের সাহায্য কামনা করেন। দ্রৌপদী তাঁর প্রতি এই অসম্মান ও অপমানের প্রতিশোধ নিতে বরাবর আগ্রহী ছিলেন। আর ওদিকে দেবযানীই বোধহয় মহাভারতের একমাত্র সুন্দরী, বিদুষী নারী যে শুধু পুনঃপুন প্রেমিকের জীবনই বাঁচাননি, দু-দুবার তাঁর পছন্দের পুরুষকে স্বতঃপ্রণোদিত ও অগ্রণী হয়ে প্রেম নিবেদন করেছেন, যা আজকের যুগেও বিরল ঘটনা, এবং দু-দুবার অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি নিষ্ঠুরভাবে প্রত্যাখ্যাত হন। এরপরও ব্রাহ্মণ-কন্যা দেবযানী তাঁর দ্বিতীয় প্রেম ক্ষত্রিয়-পুত্র রাজা যযাতির মন জয় করে তাঁকে বিবাহের মাধ্যমে এই মহাকাব্যের একমাত্র অসবর্ণ বিয়ের নজির রাখার সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। অন্যদিকে নারীবাদী তারা তাঁর স্বামীর কাছে গর্ভের সন্তানের পিতৃত্বের পরিচয় জানাতে অস্বীকার করেছিলেন সম্ভবত এই কারণে যে, তাঁর নিজের শরীরের অভ্যন্তরে ধারণকৃত সন্তানটি তাঁর একান্তই নিজস্ব। তাছাড়া যে-স্বামী তার অপহরণ ও বন্দিত্বের দশা থেকে এত দিনেও তাঁকে মুক্ত করতে অসমর্থ হয়েছেন, অনাগত সন্তানের পিতৃপরিচয় জানার অধিকার তাঁর কতটুকুই বা থাকতে পারে! গান্ধারী তাঁর সততা, নিরপেক্ষতা, প্রজ্ঞা, ন্যায়-নীতিবোধে এবং ধর্মে এত অবিচল ছিলেন যে, আপন পুত্র যখন প্রকাশ্য রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে চাইল, গান্ধারী শুধু প্রতিবাদ করেননি, তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন অধর্মের কারণে পুত্রকে পরিত্যাগ করার জন্যে। অথচ জননী তিনি সেই পুত্রদের যুদ্ধে হারিয়ে আবার অত্যন্ত বিমর্ষ ও শোকাতুরা হয়ে পড়েন, অনবরত বিলাপ করতে থাকেন। গান্ধারী অন্ধ স্বামীর প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনে সব সময়ে নিজের সুস্থ চোখ দুটো বেঁধে রাখতেন কাপড় দিয়ে। এই আলোকময় বর্ণিল পৃথিবীর রূপ-রস ভোগ করার সম্পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্বামীর অন্ধত্বের প্রতি সহানুভূতিতে নিজের দৃষ্টিশক্তিকে স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়েছিলেন নিকষ অন্ধকারে। আর কুন্তির মতো কৌশলী, বুদ্ধিমতী ও রাজনৈতিক নারী প্রায় বিরল, কেবল মহাভারতে নয়, সমগ্র পুরাণশাস্ত্রেই। পান্ডবদের দ্বারা হস্তিনাপুরের রাজত্ব রক্ষা করা ও তার শাসনভার গ্রহণ করার প্রচেষ্টায় তাঁর ভূমিকা অদ্বিতীয়। সত্যবতীর মতোই তিনি শক্তি ও ক্ষমতার যুদ্ধে অপ্রতিহত ছিলেন। বিবাহপূর্বকালে জন্ম নেওয়া এবং জন্মলগ্নে তাৎক্ষণিকভাবে পরিত্যাগ করা নিজের প্রথম পুত্র কর্ণের কাছে পর্যন্ত তিনি অবশেষে যেতে দ্বিধা করেননি এবং এত বছর পর কর্ণের কাছে নিজের আসল পরিচয় উন্মুক্ত করে অনুরোধ করেছিলেন পান্ডবদের যুদ্ধে সাহায্য করার জন্যে। কুন্তির ক্ষমতার প্রতি স্পৃহা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা যুধিষ্ঠির ও কৃষ্ণের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ বন্ধ করে সন্ধি স্থাপনের সিদ্ধান্তকে পালটাতে বাধ্য করে। কুন্তির মতো সাহসী, শক্তিশালী, রাজনীতি-সচেতন ও দৃঢ়চেতা নারীর অস্তিত্ব দুর্লভ সর্বকালেই।

আজকের এই নিবন্ধে আমার নির্বাচিত পঞ্চকন্যার জীবন ও কর্মের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করে, প্রয়োজনমতো আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিখ্যাত সব পৌরাণিক নারী ও পুরুষ চরিত্রের ত্বরিত ও সাধারণ অবতারণার মাধ্যমে নির্ণয় করার চেষ্টা করবো, আদি ও মধ্যযুগের সমাজব্যবস্থায় ও মূল্যবোধে নারীর অবস্থা ও অবস্থানের চিত্র। এছাড়া দেখার চেষ্টা করবো, বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কবি ও গদ্যকারের কল্পনায় এসব নারীচরিত্র কেমন করে পুরাণের মূল চরিত্র থেকে রূপান্তরিত হয়ে নবরূপ লাভ করেছে। মানবতার খাতিরে এই পঞ্চকন্যা বাছাইপর্বে যতটা সম্ভব স্বর্গের দেবী বা অপেক্ষাকৃত নিকট অতীতের (১২-২০ শতকের) কোনো লোকগাথার নায়িকা কিংবা বিশেষভাবে আদৃত ঐতিহাসিক লেজেন্ডারি কোনো চরিত্রকে, প্রায়শই যা অলৌকিক কিছু গুণাবলি দিয়ে সমৃদ্ধ বা কুয়াশাচ্ছন্ন, বাদ দেওয়া হয়েছে। আগেই বলেছি, বৈচিত্র্যময় অজস্র প্রাচ্য-পৌরাণিক নারী চরিত্রের মধ্য থেকে আমি যে পঞ্চকন্যাকে বেছে নিয়েছি, অতিসংক্ষেপে নিচে যাদের জীবন ও কর্ম বর্ণিত হলো, তাঁরা হলেন : তারা, দ্রৌপদী, কুন্তি, গান্ধারী ও দেবযানী।

আগামীকাল দ্বিতীয় পর্ব তারা, দ্রৌপদী

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev