সে আজ দেড়শো দুশো বছর আগের কথা। আদি গঙ্গার স্রোতে তখনও ভাটা পড়েনি। যাত্রী আর মাল বোঝাই নৌকার তখন নিত্য আনাগোনা। সেই সময় দক্ষিণের এই জলপথের পাশের বিভিন্ন জনবসতিগুলো ধনে জনে বেশ জমজমাট ছিল। তারপর একসময় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দৌলতে এসেছিল নব্য জমিদার শ্রেণী। তৈরী হয়েছিল নানা মাপের জমিদারি আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন মাপের জমিদার বাড়ি আর বাড়ির লাগোয়া বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির। ভালোমন্দ মিশিয়ে মোটামুটি একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীন সমাজ। নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র তাঁর বিখ্যাত সুরধনী কাব্যে (১৮৭১) গঙ্গার যে গতিপথের বর্ণনা দিয়েছেন তাতে দেখা যায় গঙ্গার আদি বা মূল স্রোত কলকাতা, কালীঘাট হয়ে গড়িয়া বৈষ্ণবঘাটা, বোড়াল পার হয়ে রাজপুর, কোদালিয়া, মালঞ্চ গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। তবে তিনি যখন এই কাব্য রচনা করেছেন তখন গঙ্গার স্রোতের চিহ্ন মাত্র নেই। তিনি দেখেছেন “রাজপুর, কোদালিয়া, মালঞ্চ নগরে গঙ্গার নয়ন নীরে গঙ্গা ঘরে ঘরে।”

শিবনাথ শাস্ত্রীর আত্মকথায় আছে, — কলেজের ছাত্র শিবনাথ-ভবানীপুর থেকে আদিগঙ্গার খাল দিয়ে ডিঙি করে পৈতৃক গ্রাম মজিলপুরে আসতেন ১৮৬৪ সাল নাগাদ। রাজপুরের গিরিশ বিদ্যারত্নের আত্মজীবনীতে আছে তাঁর পিতা আদিগঙ্গার খাল দিয়ে আসা শালতি থেকে সুন্দরবনের কাঠ কিনতেন-এটা ঊনবিংশ শতকের একেবারে গোড়ার কথা। তারও ৭০/৮০ বছর আগে নবাব আলিবর্দি বাণিজ্য জাহাজের চলাচলের অসুবিধা দেখে খাল কেটে সরস্বতী নদীর পুরাতন খাতে ভাগীরথীর স্রোতকে বইয়ে দেন, ফলে আদিগঙ্গার স্রোত দ্রুত মজতে থাকে। তারপর মেজর টালি বলে একজন ব্যবসায়ী ১৭৮৫ সালে গড়িয়ার কাছে আদিগঙ্গার স্রোতকে আড়াআড়ি একটা নালা কেট বিদ্যাধরী নদীর সঙ্গে মিলিয়ে দেন; ফলে গড়িয়ার দক্ষিণে আদিগঙ্গার অস্তিত্ব একেবারে বিলুপ্ত হয়। মজা আদিগঙ্গার খাতে ধানের চাষ শুরু হয়। লোকে ঘরবাড়ি তৈরি করে বাসও করতে থাকে। লোকে ভুলেই যায় যে একদিন দক্ষিণ-চব্বিশ পরগণায় বুক দিয়ে আদিগঙ্গা প্রবাহিত হত। তবে লোকমুখে, কিংবদন্তীতে আর প্রাচীন লোকসাহিত্যে, আদিগঙ্গার স্মৃতি বেঁচে আছে আজও। রয়ে গিয়েছে সেই সব জনপদ আর মানুষের ইতিহাস। এরপর প্রায় একশো বছর পার হয়ে গিয়েছে। আমুল পরিবর্তন এসেছে জনজীবন আর বাস্তুতন্ত্রে।

আজকের ঝা চকচকে আদি গঙ্গার পাড় ধরে বিশ্ববাংলা সরণি থেকে যে রাস্তা গড়িয়া বারুইপুর হয়ে হরিনাভি পেরিয়ে সোনারপুরের দিকে গিয়েছে সেই পথের দুপাশে এরকম বেশকিছু প্রাচীন জনপদ ও মন্দির আজও রয়েছে। সেইরকম একটি জনপদ নিয়েই আজকের গল্প। সোনারপুরের কিছু আগেই পঞ্চবটী আর মালঞ্চ। ফ্লাট, দোকান বাজার, অটো আর টোটো স্ট্যান্ড নিয়ে আজ এক জমজমাট যায়গা। এই পুরো এলাকায় একসময় ছিল মৈত্রদের জমিদারি। সেই সময় এই পরিবারের তৈরি কয়েকটি মন্দির ও পুরাকীর্তি আজও রয়ে গিয়েছে। শোনা যায় মালঞ্চ গ্রামের রূপকার কালীপ্রসাদ মৈত্র ও তাঁর পুত্র গৌরীপ্রসাদ মৈত্রের (১৮২৭-১৮৯৬) আদি পুরুষ প্রায় আড়াইশো বছর আগে একটি ছোট কামান ও কিছু অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে বরেন্দ্রভূমি রাজসাহী থেকে প্রথমে মুর্শিদাবাদ ও পরে মালঞ্চে আসেন। এরকম ভাগ্য অন্বেষণে বেড়িয়ে পড়া তখন হামেশাই ঘটতো। মৈত্র বাড়িতে সেই ছোট লোহার কামানটি অনেকদিন ছিল। সে যুগের অনেক উদ্দোগী পুরুষের মতন এই পরিবারও নৌ বানিজ্যে অংশ নেয়। জাহাজে মাল ওঠানো নামানো আর নানা টুকিটাকি জিনিস সাপ্লায়ের ব্যবসার সাফল্য থেকে পরিবারের লক্ষীলাভ।

তারপর সেই টাকায় মাহিনগরের বসুদের কাছ থেকে তালুক কিনে মালঞ্চ গ্রামের অধিকারী হন এই মৈত্র পরিবার। দক্ষিন চব্বিশ পরগনা জেলার পুরাকীর্তির লেখক সাগর চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন “১২৪৭ সাল অর্থাৎ ১৮৪০-এ স্লেটপাথরে উৎকীর্ণ মৈত্র পরিবারের তৎকালীন কুলপঞ্জিকাটিও পুরাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে উল্লেখ্য।” প্রায় পঁচিশ বছর আগে ক্ষেত্র সমীক্ষার সময় উনি সেটি মৈত্র বাড়িতে সংরক্ষিত দেখেছিলেন। উনি আরও জনিয়েছেন মৈত্রবাটিটি কালীপ্রসাদের তৈরি। ১২৪৪-এর আগে। আদিতে এটি ছিল দ্বিতল, দো মহলা, ছিল নাট মন্দির, ছিল পিতলের ছোট রথ যা আজ নিশ্চিহ্ন। নাটমন্দিরের দুটো পরিত্যক্ত স্তম্ভে আয়নিক ক্যাপিটালের প্রয়োগ ওনার বেশ ব্যতিক্রমী মনে হয়েছিল। বাড়িটির সামনের অংশ ছাড়া বিশেষ কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নেই।

তবে যেটি নজর কাড়ে তা শতবর্ষ প্রাচীন গৌরীপ্রসাদ মৈত্রের (১৮২৭-১৮৯৬) তৈলচিত্রটি। লোহার গজাল আঁটা বিশাল সদর দরজাটিও কম আকর্ষণীয় নয়। সদরের উপরে সিদ্ধিদাতা গনেশের মূর্তিটি আজ আর চেনা যায় না। বারবার রঙের প্রলেপ তার ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। “এই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে পুরুষ সদস্যের সংখ্যা এতটাই কম হয়ে যায় যে রক্ষণাবেক্ষণ ভার কন্যা বংশের সদস্যাদের উপরই বর্তেছে” জানালেন ময়না মৈত্র। যিনি আবার মহিলা উদ্দোগপতিও বটে।

মৈত্র পরিবারের পুরাকীর্তির মধ্যে প্রথমেই আসি মৈত্র বাড়ির পাশে বারান্দা যুক্ত দক্ষিণমুখী আটচালা পঞ্চ শিবের মন্দিরটি। শ্বেতপাথরের প্রতিষ্ঠালিপিটি এইভাবে লেখা-‘শ্রীকালীপ্রসাদ মৈত্র/সকাবদা ১৭৫৯/সন ১২৪৪ শাল’। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দের প্রতিষ্ঠালিপিতে লিপিকরের প্রমাদটি লক্ষ্যণীয়। আরও লক্ষ্যণীয় মন্দিরটিতে কৃত্রিম ভেনিশীয় দরজা, ফ্যান-লাইট ও টাস্কান স্তম্ভের প্রয়োগ। প্রায় চল্লিশ ফুট উঁচু এই গম্বুজাকৃতি সৌধের ছাদ দুপাশে আর্চের উপর স্থাপিত। মন্দিরটি সংস্কার হলেও আবার আগাছা গজিয়েছে। মৈত্র পরিবারের পুরাকীর্তির আরেক লক্ষনীয় বিষয় হল একক নয়, পঞ্চ শিবের মন্দির স্থাপন। ওনাদের স্থাপিত দুটি পঞ্চ শিবের মন্দিরের অন্যটি পঞ্চবটি মোড়ের কিছুটা দক্ষিণে কালীপ্রসাদের পুত্র গৌরীপ্রসাদ মৈত্র ১২৫৮ সাল অর্থাৎ ১৮৫১-তে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পঞ্চশিবের একরত্ন দালান মন্দিরটির চারপাশে ত্রিখিলান অলিন্দ রয়েছে। প্রতিষ্ঠালিপিটি এখনও পড়া যায়।

সাগরবাবু আরও জানিয়েছেন দালান মন্দিরের ওপর রত্নের সংযোজনও ব্যতিক্রমী স্থাপত্যের নিদর্শন। একইভাবে গর্ভগৃহ ও অলিন্দের ছাদ তৈরিতে ভল্টের প্রয়োগ একটা মিশ্র রীতির উদাহরণ। কালের নিয়মে আজ এটি জরাজীর্ণ। অন্য মন্দিরটির সংস্কার হলেও রাস্তার পাশের এই অনিত্যসুন্দর মন্দিরটি এখনও অবহেলিতই রয়েছে। এছাড়াও মৈত্র পরিবারের আর একটি কীর্তি ১২৭৮ সালে গৌরীপ্রসাদ মৈত্র প্রতিষ্ঠিত অন্নপূর্ণার এক রত্ন দালান মন্দির। সাগরবাবু মন্দিরের শ্বেতপাথরের প্রতিষ্ঠা লিপিটি খুলে মৈত্রবাটিতে রাখা আছে দেখেছিলেন। তাছাড়াও মৈত্র পরিবারের আর একটি আটচালা জীর্ণ ও আগাছা পরিবৃত শিব মন্দির গ্রামের দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তে আদিগঙ্গার পাড়ে দেখতে পাওয়া যায়। “প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের প্রবীণ ও গ্রামবৃদ্ধদের শ্রুতি অনুযায়ী এটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি দক্ষিণেশ্বরের নবরত্ন মন্দির প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে এটি তৈরি” জানিয়েছেন সাগরবাবু। পঞ্চবটীত আর এক প্রাচীন পরিবার ব্রহ্মচারী পরিবার। তাদের গল্প আগামী পর্বে।
কতো অজানা জনপদ, না জানা ইতিহাস তুলে আনছেন কমলবাবু
অনেক অজানা কথা জানলাম। অনেক ধন্যবাদ। আরো অনেক অজানা কথা জানার অপেক্ষায় রইলাম।