| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

এবারের পঞ্চায়েত : অমাত্য রাক্ষস

Reporter
অমাত্য রাক্ষস / ৪৭৭ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০২৩

সদ্য শেষ হওয়া পঞ্চায়েত নির্বাচনে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটো বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ১। ভোটে জিতে গ্রামমনোরঞ্জন প্রকল্পের আরও বড় বৈধতা তৈরি করা; ২। ২০২১-এর নির্বাচনে কুড়মি, মতুয়া আর পাহাড়ে হারানো ভোট ফিরিয়ে আনা। দুটো চ্যালেঞ্জেই তিনি সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

ডিজিটাল পুঁজির তাত্ত্বিক মঞ্চ, ডাভোসের ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের শীর্ষ বৈঠকে ইওরোপিয় রাষ্ট্রগুলো ডিজিটাল অর্থনীতি জোরদার করার উদ্দেশ্যে কয়েকটা অর্থনৈতিক নির্দেশাবলী তৈরি করে বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রনায়কদের আহ্বান জানায় অর্থনৈতিক নিদানগুলি বাস্তবায়িত করতে। মমতা ব্যানার্জী ডাভোসে না গেলেও পশ্চিমবঙ্গে ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর ভাবে চালু করেন। দাভোসের অর্থনৈতিক নিদানগুলো পাখির চোখ করে বাংলায় রূপায়ন করেছেন ব্যবসায়ীদের ক্লাব, ফিকির প্রাক্তন নির্দেশক, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র। তাঁর উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ সরকার করোনার বহু আগে থেকেই বাংলা জুড়ে ডিজিটাল অর্থনীতি কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর ছিল — তার একটা হল ওয়েবসাইট নির্ভর করে বিভিন্ন প্রকল্প আবেদন করা, অর্থাৎ যে নাগরিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় নেই সে সরকারি প্রকল্পের বাইরে থাকবে। তাছাড়াও করোনার সময় মধ্যবিত্তের তীব্র প্রতিবাদ দুরছাই করে ইস্কুল, কলেজ, বাজার হাট বন্ধ রেখে পশ্চিমবঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি গড়তে নব্য ডিজিটাল পুঁজিপতিদের সরাসরি মদত দেওয়া, ডেউচা পাঁচামি খনি থেকে কয়লা তোলা, তাজপুর গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ার অধিকার ভারতের ১ নম্বর পুঁজিপতি আদানি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া, চাষীদের উচ্ছেদ করে বামফ্রন্ট যে রাজারহাট-নিউটাউন শহর তৈরি করেছিল উচ্চবিত্তের মনোরঞ্জনের জন্যে, সেই অঞ্চলকে আরও বড়ভাবে সাজানো হল বাম আমলের থেকেও বেশিমাত্রায় কর্পোরেটদের মনঃতুষ্টির জন্যে, কৃষি বাণিজ্য যাতে কর্পোরেটদের নিয়ন্ত্রণে আসে, তার জন্যে এপিএমসি আইন বদল ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি জানেন কর্পোরেট যেমন রাষ্ট্র নির্ভর করে বেঁচে থেকে একই সঙ্গে তারা রাষ্ট্রকে নানান কাজ করতে নিদানও দেয়। কর্পোরেট স্বার্থ চটিয়ে কোনও সরকারই বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারে নি।

একই সঙ্গে তিনি জানেন গত কয়েক দশকের ডিজিটাল ব্যবস্থায় চাকরি সংকোচনের যুগে মধ্যবিত্তর ক্ষমতা ক্রমশ কমছে। ব্যাঙ্কগুলো মার্জার হয়েছে, চাকরি প্রায় নেই বললেই চলে, করোনার বাহানায় ৮ ঘন্টা কাজের দাবি ছুটিতে গেছে। একদা ‘রাষ্ট্রের ব্লু আইড বয়’, ৫০ বছর আগে রাষ্ট্র যাদের ডেকে ডেকে চাকরি দেন বেসরকারি কোম্পানি রাষ্ট্রীয়করণ করে, সেই ভদ্রবিত্ত সমাজ রাষ্ট্র আর কর্পোরেটের পৃষ্ঠপোষণা হারিয়ে প্রায় সহায় সম্বলহীন। মমতা ব্যানার্জী জানেন তাঁর কাজকর্মে শহুরে মধ্যবিত্ত বিরোধ করলে খুব বেশি হলে টিভি স্টুডিওর ঠাণ্ডাঘরে আর খবর কাগজের সম্পাদকীয় পাতায় তাকে বাছা বাছা গালি দেবে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীন জনগপণ খেপলে তাঁর মুখ্যমন্ত্রীত্বের চেয়ার নিয়ে টানাটানি নিশ্চিত। রাস্তায় নানান দাবিতে বেশ কয়েক বছর ধরে ইস্কুল শিক্ষকেরা, ডিএ বাড়ানোর দাবিতে সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘকাল বসে আছেন; কিন্তু তাদের নিয়ে তাঁর বা তাঁর দলের খুব একটা হেলদোল নেই। ঠিক একইভাবে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি সরকার বলেছে মধ্যবিত্তকে চাকরি দেওয়ার দায় তার সরকারের নয়। সেই পথ বেয়ে মমতা ব্যানার্জী বাংলায় অধিকাংশ চাকরি আর সেবা বেসরকারিকরণ করেছেন। মধ্যবিত্তের পিঠ দেওয়ালে ঠেকেছে।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জানেন, নিজের কুর্সি সুরক্ষিত করতে তাঁকে গ্রামের জনগণকে সন্তুষ্ট করতে হবে। এর জন্যে কর্পোরেটদের সঙ্গে তিনি সমঝোতার রাস্তা তৈরি করলেন। এক হাতে কর্পোরেটদের ঝুলিতে বিপুল প্রকল্প আর ছাড় ভরে দিলেন অন্য হাতে বিশাল গ্রাম সমাজকে তুষ্ট করার জন্যে নানান গ্রামতুষ্টী প্রকল্প পরিকল্পনা করলেন। তিনি জানেন, বিশ্বপুঁজির এশিয় আইকন, জি-২০-র নায়ক নরেন্দ্র মোদির সংঘ নির্দেশিত গ্রাম বিকাশ কিন্তু তার রাস্তা হতে পারে না।

তিনি বেছে নিলেন অহিন্দি দক্ষিণের দ্রাবিড় রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক আইকনদের রাস্তা। সচেতনভাবে কীনা জানি না, এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে তাঁর সাফল্য প্রমান, মমতা স্পষ্টত আন্নাদুরাই, এম জি রামচন্দ্রন, জয়ললিতার গ্রামতুষ্টি রাজনীতির সফল উত্তরসূরী হয়ে উঠেছেন। পেরিয়ারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্যে নতুন দল তৈরি করে ক্ষমতায় এসে আন্নাদুরাই চালু করেন মিড ডে মিল — আজ প্রায় বাধ্যতামূলক প্রকল্প হিসেবে সারা বিশ্বে স্বীকৃত। ২০১৮-য় প্রকাশিত গবেষক এস নারায়ণের দ্য দ্রাবিডিয়ান ইয়ার্স পলিটিক্স এন্ড ওয়েলফেয়ার ইন তামিলনাড়ু (S. Narayan’s The Dravidian Years Politics and Welfare in Tamil Nadu) বইতে বলছেন আন্নাদুরাই প্রতিষ্ঠিত দ্রাবিড়িয় পরিচয়বাদের রাজনৈতিক দল দ্রাবিড় মুনেত্রা কাঝাঘাম বা ডিএমকে নেতারা অনুমান করেছিলেন গ্রাম নির্ভর ডোলের কয়েকটা সুফলতা পাবে, প্রথমটা দলের বেঁচে থাকার একমাত্র উপাদান সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীন ভোট নিশ্চিতকরণ, দ্বিতীয়ত পেরিয়ারের সঙ্গে ভিন্নমত হয়ে ডিএমকে দ্রাবিড় জাতিসত্ত্বার প্রকল্প জোরদার করবে গ্রামের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে জোরদার হলে। তৃতীয়ত গ্রামে টাকা ঢুকলে স্থানীয় অর্থনীতি জেগে উঠবে, যার সুফল দিনের শেষে পাবে স্থানীয় কারিগর অর্থনীতি, গ্রামের অর্থনীতি জোরদার হবে।

ইওরোপিয় নবজাগরণের সময় থেকেই পশ্চিম ইওরোপে দেশজ কারিগর-পশুপালক-চাষী নির্ভর পাগান অর্থনীতির চাকা বসিয়ে দিয়ে, এককেন্দ্রিক কর্পোরেট ভদ্রলোকেরা কারিগর-পশুপালক-চাষীদের ওপর উপনিবেশ চাপিয়ে দিয়ে চটলোক ভদ্রলোকে সমাজ ভাগ করে নেয়। গ্রাম হল অনুন্নয়নের সমার্থক শব্দ। শহর হল প্রগতিশীলতার চালিকাশক্তি। শহুরে কৃষ্টি ধ্রুপদী — পালনযোগ্য আর গ্রামের কৃষ্টি ফোক — বধযোগ্য। ফলে উপনিবেশের সময় উইলিয়াম জোনসের হাত ধরে ইওরোপিয় তাত্ত্বিকতা অবলম্বন করে মেকলিয় মধ্যবিত্ত ক্ষমতাকেন্দ্রে বসা ভদ্রবিত্ত গ্রামীনদের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সিঁদুরে মেঘ দেখল। প্রগতিশীল ইংরেজি শিক্ষিত কায়স্থ বৈদ্য ব্রাহ্মণ (কাবাব), হিন্দু লেফট লিবারাল (হিসেলে) চাকুরিজীবি ভদ্রলোকের ভাষায় গ্রাম সমাজকে তুষ্ট করার প্রকল্প খুব বেশি হলে গ্রামমনোরঞ্জন, ভিক্ষে দেওয়া, অপচয়। তাদের মুখে ছাই দিয়ে ডিএমকের শুরু করা আর এআইএডিএমকের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গ্রামীন নির্ভর প্রকল্পগুলো তুমুল জনপ্রিয়তা পেল, একের পর এক দক্ষিণী রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামমনোরঞ্জন প্রকল্প। দ্রাবিড় সরকারগুলোর গ্রামমনোরঞ্জন প্রকল্পগুলো চালাবার অভিজ্ঞতা বাড়ায়, ডোল ব্যবস্থা আরও প্রভাবশালী করতে চলে এল মহিলাকেন্দ্রিক প্রকল্প বা প্রকল্পে মহিলার ভূমিকা গুরুত্ব দেওয়ার ভাবনা।

মমতা ক্ষমতায় এসে দক্ষিণের আন্নাদুরাই, রামচন্দ্রন আর জয়ললিতার দেখানো রাস্তা ধরেছেন চোখের পলক না ফেলে — সচেতনভাবে বাদ দিলেন জাতিসত্ত্বা চাঙ্গাকরার বিষয়টা, যদিও পরে ভাজপার চাপে, জয় শ্রীরামের টোটকা হিসেবে কিছু দিন জয় বাংলা স্লোগান চালু করেছিলেন। যাই হোক, তিনি ক্ষমতায় এসেই অসামান্য উদ্ভাবনীশক্তি দেখিয়ে চালু করলেন অভিকর শিল্পীদের জন্যে ‘লোক প্রসার প্রকল্প’। প্রকল্পে গান গাওয়া, বাদ্য বাজানো ইত্যাদি শিল্পীরা, যারা কারিগরদের মত পণ্য বিক্রি করে না, তাদের জন্যে মাসে সরকার ১০০০ টাকা ভাতা বরাদ্দ করল তেমনি তারা বিভিন্ন দপ্তরের বক্তব্য, তথ্য প্রচারের জন্যে ৪ জনের একটি সেলফহেলপ দল গঠোন করলে, মাসে চারটে অনুষ্ঠান পাবেন স্থানীয় অঞ্চলগুলো থেকে এটাও ঠিক হল। প্রতিটা অভিকর শিল্পীদের সেলফহেলপ দলের অনুষ্ঠানের জন্যে বরাদ্দ ৫০০০ টাকা। চার জন শিল্পীর জপ্ন্যে ১০০০ টাকা করে ভাতা, বাকি ১০০০ টাকা যাতায়াত ইত্যাদির খরচ-খরচা বাবদ। অর্থাৎ বাংলাজোড়া ২ লক্ষ অভিকর শিল্পীর নিজের রোজগার ছাড়াও রাষ্ট্র তাকে মোট ৫ হাজার টাকা ভাতা দিল। প্রতিমাসে অভদ্রলোকেরদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে ১০০,০০,০০,০০০ টাকা। গ্রাম অর্থনীতিতে সাড়াপড়ল। লোক প্রসার প্রকল্প ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ায়, সার দিয়ে একের পর এক ‘গ্রামমনোরঞ্জন’ প্রকল্প আসতে থাকল বাংলার গ্রামগুলোয়।

বাম-প্রগতিশীল ভদ্রবিত্তের দাবি এই ভাতা গ্রামের পেশাদারেরা বা সাধারণ জনগণ পাবে কেন? তাদের চোখ টাটাল। শিক্ষিত-বাম-প্রগতিশীলদের চোখের বালি হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রামমনোরঞ্জন প্রকল্প। তৃণমূল ক্ষমতায় আসা ইস্তক মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে যাওয়া মধবিত্ত সরকারি কর্মচারীরা এই প্রকল্পগুলোকে বললেন ভিক্ষে, বাঁহাতে ছুঁড়ে দেওয়া দান, বাজে খরচ। বাম-প্রগতিশীলদের সঙ্গে গলা মেলাল বাম-মধ্য-প্রগতিশীলদের উল্টো পথে রাজনীতি করা সংঘ নির্দেশিত ভারতীয় জনতা পার্টিও। তারাও একই অস্ত্রে মমতা ব্যানার্জী সরকারকে উৎখাত করতে কোমর বাঁধে। ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনের পরে উচ্চগ্রামে প্রচার চলল সামগ্রিক বিরোধী শিবির থেকে। ২০১৬-য় দিনাজপুরে ভোটের খবর করতে গিয়ে এক গ্রাম পঞ্চায়েতের মিটিংএ কংগ্রেসের স্ট্রিট কর্নারে এই প্রতিবেদক শুনেছিল ক্ষমতায় এলে তারা মমতা ব্যনার্জীর মনোরঞ্জনী লোক প্রসার প্রকল্প’র মত প্রত্যেকটা প্রকল্প বন্ধ করবে। এটা তারা জোটসঙ্গীদের নিয়ে সারা দিনাজপুর জেলায় প্রচার করেছে। ভোটের ফল বেরোতেই, লোক প্রসার প্রকল্প বন্ধ করার প্রচারের উত্তর পেয়েছিল কংগ্রেস আর তার জোটসঙ্গী।

গ্রামে টাকা যাওয়া আদলে ভিক্ষে পাওয়া, গ্রামীনদের জন্যে এটা পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা, এই ‘তাত্ত্বিক’ বক্তব্য জোর পায় মধ্যবিত্তের দীর্ঘকালধরে চলা রাস্তার আন্দোলনে — অপেক্ষার তালিকায় থাকা হবু শিক্ষকদের চাকরির দাবিতে আন্দোলন, শিক্ষদের চাকরি দেওয়ায় দুর্ণীতি বিরোধী আন্দোলন এবং সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বাড়াবার আন্দোলন। তাদের উচ্চগ্রাম বক্তব্য ছিল তাদের হকের পাওনাগণ্ডা কেড়ে নিচ্ছে গ্রামের চাষাভূষোরা। মধ্যবিত্তের মাইনে হকের দাবি, ন্যায্য অধিকার আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে অর্থ গ্রামমনোরঞ্জনে খরচ করে করে সে সব খুব বেশি হলে ভিক্ষে, অপব্যয়।

হিন্দিভূমের সংবাদমাধ্যম, বাংলা ভাষী সংবাদমাধ্যম মধ্যবিত্তের এই চটুল দাবি নিরন্তর প্রচার দিতে থাকায় তৃণমূল দলের প্রশাসনিক থাকবন্দীর মাঝের স্তরের বেশ কিছু নেতার কপালের দুশ্চিন্তার ভাঁজ চওড়া হতে থাকে। প্রতিবেদককে এক জেলা পরিষদ প্রধান আশংকা প্রকাশ করে বলেছিলেন ভদ্রলোকদের সরকার বিরোধী আন্দোলন, তৃণমূল দল বিরোধী কুৎসার প্রভাব ভোটে না পড়ে। তাঁর ধারণা ছিল আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলকে এই অবিমৃষ্যকারিতার জন্যে ভুগতে হবে। তাছাড়া এই সরকারি কর্মচারীরাই প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে ভোট করায়, সেখানেও তারা বুথে বুথে সমস্যা তৈরি করতে পারে। মমতা ব্যানার্জীর উচিৎ এ বিষয়ে আশুপদক্ষেপ নেওয়া।

কিন্তু মমতা এই আশংকা, প্রতিবাদে কান দেন নি। সরকারি কর্মচারীরা বর্ধিত ডিএ চাইলে তিনি কখনও তাদের গালি দিয়েছেন, ৩% ডিএ দিয়ে বলেছেন বাকী টাকা ভিক্ষে করে দেব? কিন্তু তাঁর ওপরে কি চাপ ছিল না? ছিল তো বটেই, কিন্তু তিনি দক্ষিণের পূর্বজ রাজনীতিকদের অভিজ্ঞতা সূত্রে জানতেন যে তিনি অঙ্ক করে নিশ্চিত সাফল্যের রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছেন যা তার সহকর্মীরা বুঝতে পারছে না।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই গ্রামীন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত এবং সফল হওয়া প্রসঙ্গে, কন্যাশ্রীর মত বেশ কয়েকটা প্রকল্প নিয়ে উপনিবেশবিরোধী কর্পোরেট বিরোধী চর্চা মঞ্চের সঙ্গে যৌথভাবে মাঠস্তরে বাংলাজুড়ে গবেষণা করা হাবড়া শ্রীকৃষ্ণ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক দেবত্র দে অন্যরকম কথা বললেন। তিনি জানালেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী জানেন কী ধরণের প্রকল্প তৈরি করেছেন এবং সেই সব প্রকল্পের লক্ষ্যই বা কী। মুখ্যমন্ত্রী জানেন শহরের কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম, চাকুরি নির্ভর আমমধ্যবিত্তদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে গ্রামীন প্রকল্পগুলো বানচাল করতে চাইবে। এর বিরূপ প্রভাব শহুরে মধ্যবিত্ত জগতে পড়লেও গ্রামীনেরা নিঃসন্দেহে মুখ্যমন্ত্রীর পাশে যেমন অতীতে দাঁড়িয়েছেন, এই পঞ্চায়েতের ফলেও তার সেই দৃঢ়তাকে আবার প্রমান করছে। দেবত্র বললেন, গ্রামস্তরে দলের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে প্রকল্পগুলোর মহিমা, গ্রাম বিকাশে এবং মহিলাদের সশক্তিকরণে প্রকল্পগুলোর গুরুত্ব তৃণমূল নেত্রী জানেন বলেই মিডিয়ার প্রচারে বিভ্রান্ত তৃণমূলস্তরের দলীয় সহকর্মী-নেতাদের ভোট কমার আশংকা তিনি স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছেন।

দেবত্র দূরাভাষেই আলাপ করালেন ঝাড়গ্রাম জেলার বেলপাহাড়ি অঞ্চলের মহুলবনী গ্রামের স্নাতোকোত্তর শ্রেণীতে পড়া ছাত্র সোনালী মুর্মুর সঙ্গে। সোনালী এই প্রতিবেদককে বললেন, বাবার পক্ষে আমার কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব ছিল না। সরকারি প্রকল্প না হলে আমি এমএ পড়তে পারতাম না। আমার গ্রামের তিনজন মেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রকল্পে পড়াশোনা করেছি। সরকারের দেওয়া সাইকেলে আমি শুধু চড়ে বাসে উঠতে যাই না, আমার পরিবারের প্রত্যেকেই সেটা ব্যবহার করেন।

দেবত্র বললেন সেই জওহরলাল নেহরুর আমল থেকেই ‘গরীব’দের জন্যে লক্ষ্য করে তৈরি প্রকল্প বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে দুর্নীতির জন্যে। নাতি রাজীব গান্ধী হাহুতাশ করতেন মাত্র ১৫ পয়সা গ্রামে পৌঁছয়। যে বিফলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকল্পগুলো শুধু ‘গরীব’দের জন্যে টার্গেট করলেন না, খুলে দিলেন আমপাবলিকের জন্যে। ফলে এই প্রকল্পের লিকেজ প্রায় শূন্য। মুখ্যমন্ত্রী জানেন তিনি নিষ্কাম কর্ম করছেন না। পঞ্চায়েত ভোট প্রমান তিনি যেমন গ্রামের মেয়েদের সম্মান দিয়েছেন তেমনি গ্রামের ধর্ম বর্ণ থাকবন্দী নির্বিশেষে মহিলারা তার দলকে ঝুলি ভরে ভোট দিয়েছেন। ‘শ্রী’ প্রকল্প নিয়ে কুৎসা করা বিরোধীরা বাংলার ভোট রাজত্বে মহিলাদের গুরুত্ব বুঝে হঠাতই হাত খুলে ২০০০ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেও সেই ঘোষণা বিন্দুমাত্র দাগ কাটতে পারে নি — কারন তাতে যেমন আন্তরিকতার অভাব ছিল, তেমনি ছিল মুখোশপরা ভালবাসার অভিনয়। হয়ত এই অভিনয় মুখ্যমন্ত্রীও করছেন, কিন্তু তিনি বছরের পর বছর মাসের পর মাস বাংলার মহিলাদের হাতে যেমন নগদ টাকা তুলে দিয়েছেন তেমনি স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের কার্ড দিয়েছেন পরিবারের মহিলা প্রধানের নামে। যে সম্মান তাকে কেউ কোনও দিন দেয় নি।

দেবত্র বললেন, মহিলাকেন্দ্রিক প্রকল্পগুলোকে ভোট চাওয়ার ফন্দিই বলুন বা স্বেচ্ছাব্রতীদের খটমট ভাষায় মহিলাদের ক্ষমতায়নই বলুন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাজটা করে দেখিয়েছেন। তারে ফলও পাচ্ছেন। মমতা তার সামাজিক প্রকল্পগুলোকে আরেকবার ভোটিং করিয়ে নিলেন জনতার দরবারে পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিপুলভাবে জিতে।

বাংলার সদ্য শেষ হওয়া পঞ্চায়েত ভোট নতুন করে রাজ্য রাজনীতি আর অর্থনীতিতে আন্নাদুরাই, এম জি রামচন্দ্রন এবং জয়ললিতার পরিকল্পিত গ্রামতুষ্টি প্রকল্পগুলোর গুরুত্ব প্রমান করল। স্বর্গ যদি কোথাও থাকে, সেখানে গ্রামতুষ্টি প্রকল্পকে প্রথম বাস্তবায়িত করা দুই নায়ক আন্নাদুরাই আর এম জি রামচন্দ্রন এবং তাদের প্রকল্পকে বাস্তবায়িত করা জয়ললিতা নিশ্চই সন্তুষ্টির হাসি হেসে তাঁদের দেখানো পথ সফলভাবে ধরার জন্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুহাত তুলে আশীর্বাদ করছেন।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev