হুগলি জেলা জুড়ে কয়েকটি বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ। আহত ১০ জন। এই জেলার মোট ২০৭টি পঞ্চায়েতের ৩৮৮০টি আসনে ভোট গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ভোটের আগেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ১১টি পঞ্চায়েতে তৃণমূল। ১৮টি পঞ্চায়েত সমিতির ৬১৯টি আসনে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন ভোটাররা। ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ধনেখালি পঞ্চায়েত সমিতি। হুগলি জেলা পরিষদের ৫৩টি আসনেই ভোট হয়েছে শান্তিপূর্ণ। জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৩৪ লক্ষ ৭২ হাজার ২৫৫ জন।
প্রসঙ্গত, আরামবাগ, গোঘাট, খানাকুল, পুরশুড়া, তারকেশ্বর, হরিপাল, সিঙ্গুর, পোলবা, মগরা, শ্রীরামপুর, চন্দননগর, চুঁচুড়া ইত্যাদি ব্লকের পঞ্চায়েত নির্বাচনে কয়েকটি বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে আরামবাগ, খানাকুল ও মগরা এলাকায় গুলি ও বোমা ছোড়া হয়।
প্রসঙ্গত, আরামবাগ মহকুমায় শান্তিপূর্ণ হল না ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন। দিকে দিকে অশান্তির আগুনে পুড়েছে সাধারণ মানুষ। অভিযোগ কোথাও সরকার পক্ষের বিরুদ্ধে আবার কোথাও বিরোধীদের বিরুদ্ধেও। একেবারে সাত-সকালে বোমা ও গুলি দিয়ে শুরু হয়েছে দিন। ঘটনাটি আরামবাগের আরন্ডি-১ পঞ্চায়েতের সাতমাসা এলাকার। বোমার আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছে সেখানকার বিদায়ী প্রধান সেখ সোহরাব হোসেনের পুত্র জামির হোসেন। আবার অপর দিকে নির্দল প্রার্থীর এজেন্ট কাইনুদ্দিন মল্লিকের পায়ে গুলি লেগেছে। অভিযোগের তীর সোহরাব হোসেনের ভাইপোর দিকে। গুরুতর আহত অবস্থায় দুজনকেই আরামবাগ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে স্থানীয় কর্মী সেখ আনিসুর অভিযোগ করেন, ‘সকাল থেকেই নির্দল প্রার্থীদের পক্ষের দুষ্কৃতিরা এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। চিৎকার চেঁচামেচি দেখে জামির হোসেন রাস্তায় বেরোতেই তার উপর একটি বোমা এসে পড়ে। তাতেই সে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়ে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অপর দিকে নির্দল প্রার্থীর পক্ষ থেকে অভিযোগ, ‘সোহরাবের ভাইপো আরাফত কাইনুদ্দিনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।’ অভিযোগ অস্বীকার করে তৃণমূলের আরামবাগ সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি স্বপন নন্দী। তাঁর বক্তব্য, ‘নির্দলরাই এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছে, ওরাই বোম-বন্দুক নিয়ে ঘুরছিল। নিজেদের গুলিই হয়তো নিজেদের লোকের পায়ে লেগেছে’। ঘটনাকে ঘিরে তুমুল উত্তেজনা আরান্ডি এলাকায়।

এদিকে আরামবাগ মহকুমার খানাকুল-২ ব্লকের নতিবপুর এলাকায় ভোটের লাইনে তিন জন ভোটারের গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন মহিলাও আছেন। শনিবার দুপুরের পর ঘটনাটি ঘটেছে নতিবপুরের বিহারীলাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অভিযোগ, ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাধারণ ভোটার। হঠাৎ কয়েকজন দুস্কৃতি মুখে কালো কাপড় বেঁধে সেখানে এসে উপস্থিত হয় এবং ভোটারদের লক্ষ্য করে এলোপাথারি গুলি চালাতে শুরু করে। গুলি বিদ্ধ হয়েছেন কাজল পাঁজা, সৌমেন লালা ও আশোক বারই। সৌমেন লালা বলেন, ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ হয়। আমার নাক ভেদ করে একটা গুলি বেরিয়ে যায়। আমি মাটিতে পড়ে যাই।’
তীর ধনুক ও লাঠিসোটা নিয়ে বুথ দখলের অভিযোগ উঠল সিপিএমের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে আরামবাগের তিরোল পঞ্চায়েতের কীর্তিচন্দ্রপুরের ৪ নং বুথে। তৃণমূলের মীর চঞ্চল অভিযোগ করেছেন, ‘সকাল থেকে নির্বিঘ্নে ভোট চলছিল কিছু পরেই সিপিএম নেতা মোজাম্মেল হোসেন পুরানো কায়দায় তীর-ধনুক, লাঠি ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বুথ দখল করে, আমাদের এজেন্ট ও প্রার্থীদের বুথ থেকে বাইরে বের করে দেয়।’ মোজাম্মেল হোসেনের বক্তব্য, ‘তৃণমূলের প্রাক্তন প্রধান তার লেঠেল বাহিনী নিয়ে বুথ দখল করে রেখেছিল। বার বার অভিযোগ জানানোর পরেও এখানে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ বা কেন্দ্রীয় বাহিনীর কোনো ভূমিকা ছিল না। শেষ পর্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষ নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। খবর পেয়ে পুলিশ বাহিনী নিয়ে আরামবাগের আইসি বরুণ ঘোষ সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
আবার বুথ থেকে ব্যালট বাক্স তুলে নিয়ে পুকুরে ফেলে দিল বিক্ষোভকারিরা। এ বিষয়ে তৃণমূল ও বিজেপি শিবির পরস্পরের দিকে অভিযোগ করছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে আরামবাগের ধামসা এলাকায়। সকাল থেকেই লাঠি হাতে দুই দলের সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়েছিল এলাকা। বিজেপির অভিযোগ, সকাল থেকেই বাইরে থেকে কিছু লোক নিয়ে এসে তৃণমূল গণ্ডগোল পাকাচ্ছিল, সাধারণ মানুষকে ভোটদানে বাধা দিচ্ছিল। বিজেপির বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ করছিল তৃণমূল কর্মীরাও। শেষে একদল লোক বুথের ভিতর থেকে দুটি ব্যালট বাক্স তুলে নিয়ে, পুকুরে ফেলে দেয়। এই ঘটনায় হতবাক হয়ে যান ভোটার থেকে শুরু করে ভোটগ্রহন কর্মীরাও। কারা ভোটবাক্স ফেলে দিল সেই নিয়েও পরস্পর দোষারোপ করতে থাকে তৃণমূল-বিজেপি। ডুবুরি এসে ভোটবাক্সগুলি উদ্ধার করে। দীর্ঘক্ষণ ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকার পর পুনরায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।

উল্লেখ্য, এদিন গোঘাটের বিজেপি বিধায়ক বিশ্বনাথ কারক সেখানকার থানার ওসি শৈলেন্দ্র উপাধ্যায়ের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের কথা কাটাকাটিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। বিধায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে সেক্টর অফিসারের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। অভিযোগ, খুব সুন্দর ভাবে ভোট হচ্ছিল এই এলাকায়। বিধায়ক বিশ্বনাথ কারক নির্বাচনী বিধিভঙ্গ করে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষীবাহিনী নিয়ে বুথে বুথে ঘুরতে শুরু করেন। তিনি ভোটারদের প্রভাবিত করতে শুরু করেন এবং প্ররোচনা দিতে থাকেন। আমরা সেক্টর অফিসে জানিয়ে কোনো ফল হয়নি। তাই আমরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছি। অপর দিকে বিশ্বনাথ কারকের কথায়, ‘আমি বিধায়ক হিসাবে নয়, পঞ্চায়েত সমিতির প্রার্থীর এজেন্ট হিসাবে বুথগুলিতে যাচ্ছিলাম। এটা কী আমার অপরাধ? ভোটের নামে প্রহসন হচ্ছে। বলা হয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকবে। তারা কোথায়, আমি জানতে চাই।’ ওসি অবশ্য তাঁকে নিজের বুথের বাইরে যেতে নিষেধ করেন এবং দৃঢ়ভাবে তাঁকে বাধা দেন। মগরা ব্লকেও অশান্তির খবর মেলে। গুলিতে আহত হন কয়েক জন। তাছাড়া অনান্য ব্লকগুলোতেও ছোটখাটো অশান্তির খবর এলেও ভোট ছিল শান্তিপূর্ণ। সারা আরামবাগ মহকুমার নিরিখে বেশিরভাগ জায়গায় ভোট শান্তিপূর্ণই হয়েছে বলা যায়। তবে চারিদিকে পুলিশ বা নিরাপত্তাবাহিনীর চরম অভাব লক্ষ্য করা গেছে। ভোট কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন, একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। বর্তমান বছরে বিরোধী দলগুলি কিছুটা শক্তি অর্জন করেছে পাশাপাশি তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তাদের অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সেটাই মূলত অশান্তি বাড়ার কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।