পুরুলিয়ার সকালে শীতার্ত কুয়াশার চাদর সরিয়ে গগন প্রান্তের রবি হাসি মুখে জানান দিচ্ছে গাছের ডালে ঝুলে আছে মহার্ঘ শেষ ফলটি, শেষ দিনটি। একটি চেনা বছর ফুরিয়ে যাবার জন্য মায়া করতে মানুষ কখনও শেখেনি অচেনা নতুন বছর পবার আশায়। অচেনা অজানাকে, রহস্যময় কৌতূহলকে ভেদ করার জন্যই তো বাউলের পথ চলা; কবিদের অনায়াস ভঙ্গিতে হাজার বছরের পথ অতিক্রম করে বনলতাকে খোঁজা। আর কবির বনলতা যখন আপনাতেই হৃদমাঝারে মনলতা হয়ে ওঠে তখনই প্রয়োজন হয়ে পড়ে বেরিয়ে পড়ার। আমরাও পড়লাম বেরিয়ে। এমন বর্ষসন্ধি দিনে আমাদের যাত্রার মধ্যমণি আমাদের জীবনদেবতা বরেণ্য প্রাবন্ধিক স্বপন কুমার মণ্ডল। তাঁর সৃষ্টির উচ্চভূমিতে দাঁড়িয়ে যেমন মননে অপার দোলা অনুভূত হয় তেমনই তাঁর স্নেহ-পরম সঙ্গ যাত্রা পূর্বেই গেয়ে ওঠে আমাদের মাঝে জীবনদেবতার কন্ঠে —মেলাবেন তিনি মেলাবেন।
সত্যিই তো মেলার জন্যই এই যাত্রা; আমাদের জীবনদেবতার জীবনদর্শনের সাথে আমাদের অন্ধ জ্ঞানচক্ষুকে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য এই যাত্রা, প্রকৃতির সাথে আমাদের অন্তরের শিশুকে মিলিয়ে দেওয়ার জন্যই যাত্রা, ইতিহাসের সাথে আমাদের স্মৃতির বেহিসেবী কথনকে মিলিয়ে দেওয়ার জন্যই যাত্রা। মধ্যমণি স্যারসহ আমাদের যাত্রার সহচর ড. কার্তিক কুমার মণ্ডল, অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দত্ত ও বৈদ্যনাথ বাস্কে, সন্দীপ ঘোষ, আর আমাদের সারথি-চালক জিয়াউল আনসারী। স্যারের আবাস দীপালী অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আমরা সকলে জিয়াউল বাবুর গাড়িতে রওনা দিলাম সকাল ৮-টা নাগাদ পাঞ্চেত ড্যামের উদ্দেশ্য। প্রত্যেকের মুখে হাসির স্ফূরণ, বাঁধ ভাঙা আনন্দের সাথে স্যারের অনাবিল হৃদয়-সঙ্গতে গাড়িও আপনাতেই এগিয়ে চলল মাইলের পর মাইল।

পুরুলিয়ার রুক্ষ প্রকৃতি হেমন্তের কাটিয়ে শীতে গাছ গাছালি নিয়ে স্বতন্ত্র সুরে জেগে থাকে রাস্তার দুধারে, যেন স্বাগত জানায় আমাদের। আস্তে আস্তে আমরা এগোতে থাকি কচবেল, পাহাড়গোড়া ছাপিয়ে বাঘমারা গ্রামের দিকে; ভেসে আসে গ্রাম্য বলিষ্ঠতার ঘর্মমুখর গন্ধ। এরপর পুয়াপুর ও চালমারা গ্রাম। সভ্যতা-সংস্কৃতির পায়ের ছাপকে টপকে আমরা এসে পৌঁছাই পাঞ্চেত ড্যামে। এই স্থান ঝাড়খন্ড (ধানবাদ জেলা) এবং পশ্চিমবঙ্গের (পুরুলিয়া জেলা) প্রায় মধ্যবর্তী সীমানায়। এ যেন দুই জেলার বৈচিত্র্যর মাঝে ঐক্য হয়ে ধরা দিয়েছে। গোছানো পরিপূর্ণ পাঞ্চেত নিজেই যেন স্মৃতিকথার এক রাজ্য, শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক ছবি। আর এমন সৃজনশীল দৃষ্টিনন্দন স্থানে আর এক শিল্পী স্বপনকুমার মণ্ডল স্যারের সান্নিধ্যে আমাদের যাত্রা আপনাতেই মনের মনোরথপুরকে পূর্ণ করে।
পাঞ্চেতে উপস্থিত হয়ে গাড়ি থেকে পা নামিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম আমরা দামোদরের ধার ধরে। সবুজে মোড়া নগরালি রাস্তা স্নিগ্ধ দামোদর-গর্ভ ছিঁড়ে জন্ম দিয়েছে নবপথের। আর নদী-বক্ষের নৌকাবিহার যেন দামোদরের সৌন্দর্যময় ক্ষুদ্র পোশাক হয়ে উঠেছে। কোথাও আবার সাজানো পাথর জলে নেমে গেছে সারিবদ্ধ সূচিতায় আপন তালে। স্তুপীকৃত সুবর্ণরেণুর বুকে সমান্তরাল দণ্ডায়মান তালগাছ যেন রাজার দাসী ও রক্ষীর খেলায় মত্ত দামোদরের রাজত্বে। অবশেষে আমরা প্রবেশ করি নেহেরু পার্কে। কফির আমেজে জুড়িয়ে যায় ফেলে আসা দৃশ্যপটের ট্র্যাজিক মন। হু হু করে ওঠা মনকে বড়ো তৃপ্তি দেয় স্যারের প্রতিটি কথা।

কফির চুমুকে স্যারের কথায় আমাদের ঘেরাটোপ জীবনের সীমাবদ্ধ ভ্রমণ অসীমের হাতছানি হয়ে ওঠে। আমরা তো ছিলাম গ্লানিময় জীবনের দাস মাত্র। সেখান থেকে সেদিনই স্যারের কথামৃতে, স্যারের পরশে যেন ক্রমশ যাযাবরবৃত্তিকে সঙ্গী করে ফেললাম নিমেষেই। অদ্ভুত লাগে তুচ্ছ পড়ে থাকা শুকনো গাছের ডালও স্যারের বড়ো প্রিয়। সেটিই হয়তোবা সভ্যতার ইতিবৃত্ত তাঁর দৃষ্টিতে। তাইতো সেখানে বসেই তিনি রোমন্থন করেন পাঞ্চেত ইতিহাস। তাঁর এই রোমন্থনে হাতছানি দিয়ে ওঠে আগামী, আগামী ছুটে চলে প্রকৃতিতে, প্রকৃতি পৌঁছায় মানুষে। আসলে মানুষ, সভ্যতা এবং নগরায়ন যেন নদীকে প্রকৃতিকে সুন্দর করতে চেয়েছে, কিন্তু প্রকৃতি নিজেই আপন গুনে পাগলপারা। আমরাও সেই পাগলামির অংশ হয়ে এগিয়ে চলি, নদীর পাড় ধরে হাঁটা শুরু করি।

গাড়ি চলতে শুরু করলো পুনরায়। বেলা গড়িয়ে চলে। হাঁ-করা নদী-মনের গহ্বর তখন এক খাবলে গিলে নিতে প্রস্তুত একটা গোটা পাহাড়কে। গন্তব্য গড়পঞ্চকোট। জিয়াউল বাবুর গাড়ির গতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। রাস্তার দুপাশের দৃশ্যপট ততক্ষণে আপনাতেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ফেলে আসা স্মৃতির নকশিকাঁথা জড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের চোখের দুপাশে। পৌঁছালাম গড়পঞ্চকোট। কার্তিকদা, সিদ্ধার্থদা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ইতিহাসের সাথে মৈত্রীকে পুনঃসংস্থাপনে রত পঞ্চকোটের সন্মুখে। সন্দীপদা ব্যস্ত স্মৃতিমেদুর ইতিহাসকে ফোটোবন্দী করতে, আর আমাদের স্যার ব্যস্ত অনুভবে। এই সুযোগে আমি ও বন্ধু বৈদ্যনাথ ক্ষণিকের দলভ্রষ্টতায় গোটা পঞ্চকোটের আনাচে কানচে ছুটে বেড়ালাম। গেলাম রঘুনাথ মন্দির, যেখান থেকে দেখা যায় হাদার্ভি জলপ্রপাত। গেলাম পঞ্চরত্ন মন্দিরের সন্নিকটে, যেখানে অতীতে রাজবাড়ি থেকে আসতো নিত্যপুজো, পালিত হত আড়ম্বরে মল্লরাজদের সংস্কার। তারপর সকলে স্যারের সাথে বসে একত্রে ক্যমেরায় স্মৃতিবন্দী হলাম। আসলে স্যার আমাদের বরাবর বলেন যে ছবিও নীরবে কথা বলে চলে, যেমন বিষাদ জাগিয়ে তোলে, তেমনই আনন্দেরও শরিক করে। স্যরের সাথে আমাদের সকলের যাত্রা এভাবেই মূল্যবান চিত্রময়তায় সচল হয়ে ওঠে। কারন সচল চিত্রশালার জীবনের বাতিঘরের আলো আমরা কত ভাবেই না পেয়ে থাকি স্যারের কাছ থেকে।
এরপর দেখা হল লুপ্তপ্রায় সাতমহলা দরজা। কিন্তু সেই অতীত মহল আমাদের সিংহদুয়ার খুলে না দিলেও আমরা যে খিরকি থেকে সিংহদুয়ারে উত্তীর্ণ হতে পেরেছি স্যারের স্নেহার্দ্র হৃদয়কোলে। মুক্তিপিয়াসী মনের চলনে আমরা অভিযানে সামিল হয়েছি, কারণ স্যার প্রতিটি ক্ষণ আমাদের শিখিয়ে চলেছেন সীমাবদ্ধ বস্তুবিশ্বের সাগরে কিভাবে মননবিশ্বের কলম্বাস হওয়া যায়।

একটা ঘোর কাটিয়ে সকলে গাড়িতে উঠলাম। মনের ক্ষুধা নিরসন হলেও অন্নের ক্ষুধা ততক্ষণে থাবা বসিয়েছে পেটে। স্যারের কথা মতো জিয়াউল বাবু আমাদের নিয়ে হাজির হলেন রঘুনাথপুরের সুধামৃত হোটেলে। ‘ক্ষুধার মাঝে খাদ্য অমৃত’ স্যারের এই কথা সত্যি হয়ে ওঠে, যখন বাসমতী চালের সুভাষিত অন্ন-সহ সাত নিরামিষ পদের সপ্তপদী আহারে মন মজে ওঠে। পাতে পরে পমফ্রেট মাছের ম্যাজিক্যাল ফ্লেভার আর ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে রাঁধা খসীর মাংসের গরম সুস্বাদু ঝোল। এ যেন মহাভোজ! ক্ষনিকের বিশ্রাম, তারপর আবার বেরিয়ে পরি জয়চন্ডী পাহাড়ের উদ্দেশ্য।
পাঞ্চেতের প্রকৃতি আর পঞ্চকোটের ইতিহাস টপকে জয়চন্ডী পাহাড় যোগ করে দেয় সংস্কৃতির পালক। পাহাড়ের উচ্চাংশে স্থাপিত হওয়া মন্দির এখানের মূল আকর্ষন হলেও পর্যটন উৎসবকে ঘিরে যে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল তা পূর্ণতা দেয় পাহাড়কে। আসলে আমরা হয়তো অভ্যাসে ঘোরার মধ্যেই সার্থকতা খুঁজে চলি, কিন্তু স্যার এই গোটা ভ্রমণপথে শিখিয়ে গেলেন— পোষমানা পাখি থেকে কীভাবে খাঁচার তারকে কেটে আকাশে মেলে ধরতে হয় নিজেকে। সেই মেলে ধরার জন্যই আমাদের যাত্রা। গন্তব্য সেখানে তুচ্ছ, কারন সে আজও আছে, কালও থাকবে। কিন্তু আমরা নিজেদের আবিষ্কারের এই সুযোগ স্যার ভিন্ন অন্যত্র আর কখনও কোনদিন পাবোনা কারও কাছেই। স্যার বলেন তিনি আমাদের মধ্যেই নিজেকে খুঁজে চলেন নিরন্তর, তাই হয়তো আমাদের এই স্থানিক ভ্রমনেও তাঁর জীবনদর্শন আত্মিক গন্তব্য হয়ে ওঠে।

ঘোরার তালে এভাবে গড়িয়ে যায় বিকেল, সন্ধ্যা নামে। বর্ষবরণের সুর এবার যাবার ইঙ্গিত দেয়। গাড়িতে উঠে আমরা ফেরবার পথ ধরি। সন্ধ্যার ঘোমটার আড়ালে গৃহস্থবধূর শঙ্খধ্বনির ক্ষীণ সুর জয়চন্ডীকে ক্রমে ছোট করতে করতে মিলিয়ে দেয় চোখের সামনে থেকে। কালো চাদর ঘেরা প্রকৃতিকে ট্রেনের হর্ন বলতে বলতে ছোটে বিদায়! বিদায় এ বছর! সন্ধ্যা বাড়তে থাকে। উদ্দাম গতিতে চলে গাড়ি। সিয়াকুল গাছের ঝোপে ঝিঁঝির ডাক হয়ে ওঠে আমাদের মন খারাপের রিংটোন। সামনে বাকি অনন্ত পথ আর পথ… বাকি গোটা জীবনের পথ…