ডাকঘরের সেই পাঁচমুডা় পাহাড়ের তলায় শ্যামলী নদীর ধারের গ্রামটির হদিশ এখনো মেলেনি। তবে ইচ্ছে করলেই পৌঁছনো যায় বাঁকুড়ার পাঁচমুড়া গ্রামে। বিষ্ণুপুর থেকে মাত্র সাতাশ কিলোমিটার তার দূরত্ব। সেখানে ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে রূপকথা। বোঙা হাতি, সোনামুখী ঘোড়া, গয়না, বাসনপত্র, মনসার চালি, ঘর সাজানোর জিনিস, খেলনা, পুতুল, শৌখিন প্রদীপ, শাঁখ আরো কত কি!

পাঁচমুড়া গ্রামের প্রায় একশ পরিবার এই পোড়ামাটির কাজের সঙ্গে যুক্ত। এঁটেল মাটির সঙ্গে গোবর এবং পাট মিশিয়ে প্রথমে কাঁচামালকে কয়েকদিন ফেলে রাখা হয়। তারপর হাঁড়ি, কলসি তৈরির চাকে নলের মত গলা, চারটি পা এবং ধড় তৈরি হয় প্রয়োজনমত ব্যাস বাড়িয়ে-কমিয়ে। চার পা আর ধড় জুড়ে ফেলা হয় নরম মাটি দিয়ে। লেজের কাছে একটি ছিদ্র রাখা হয়। গলার কাছে লাগানো হয় অপেক্ষাকৃত সরু একটি নলের মত অংশ। এর পরের অংশ হল, মাথা তৈরি করে গলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। কানের কাছেও রাখা হয় দু’টি ছিদ্র। প্রাণীগুলির চোখ বা সামান্য অলংকরণ ছোট ছোট বাঁশের খণ্ড দিয়ে ভিজে মাটির ওপরে অঙ্কিত করা হয়। এর পরে মূর্তিগুলিকে দু-একদিন রোদ্দুরে শুকিয়ে নেওয়া হয়। মাটি একটু শক্ত হলে রঙের একটা প্রলেপ মাখানো হয়। এ কাজটা সাধারণত পরিবারের মেয়েরাই করে থাকেন। এর পর আগুনের ভাঁটিতে একটির পর একটি মূর্তি সাজিয়ে নিচে থেকে শুকনো খড়, পাতা জ্বালানো হয়। প্রথমদফা পোড়ানোর পর সব জিনিসেরই সাধারণ পোড়ামাটির মত মেটে রং হয়। যেগুলিকে কালো রং করা প্রয়োজন সেগুলিকে ভাঁটিতে দেওয়া হয় আরও একবার। এইভাবেই তৈরি হয়ে যায় হাতি, ঘোড়ারা।

মানুষের অগ্রগতির চাকা কোথা থেকে গড়িয়ে কোথায় পৌঁছে গেল কিন্তু কুমোরের চাক আবিষ্কারের পর থেকে ঘুরছে তো ঘুরছেই। প্রথমে তারা নদীর ধার থেকে এঁটেলমাটি তুলে এনে তা দিয়ে জল রাখার কলসি, কুঁজো বানাল। তারপর রান্নাকরার বাসনপত্র। কাঁচা মাটির বাসনপত্র সহজে ভেঙে যায়, তাই তাকে রোদে শুকিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে শক্তপোক্ত করা হল। বাচ্চাদের বায়নায় খেলনা, পুতুল আর বৌয়ের আবদারে গয়না বানানো হল।

জলে-জঙ্গলে সাপখোপের বড় ভয়, উৎপাত। সেই ভয়েভাবনায় মনসাদেবীর উৎপত্তি হল। দেবীর বাহনদের প্রকোপ থেকে বাঁচতে তাঁর পুজো শুরু। সারি সারি সাপ দিয়ে অর্ধচন্দ্রাকার ভাবে সাজানো হল তাঁর চালি বা চালচিত্র। তৈরি হল মনসার ঘট। এ এক অপূর্ব শিল্পকর্ম। রাঢ়ভূমির পথে যেতে দেখা রায় গাছের তলায় ছোটোবড়ো মাটির ঘোড়া আর হাতিরা ভীড় করে আছে। গ্রামের লোককে জিজ্ঞেস করলে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলবে ধম্মোঠাকুরের থান।

আদতে এই ধর্মঠাকুর কে, সে নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যেই মতভেদ আছে। তিনি বরুণ, যম, শিব হতে পারেন আবার সূর্যও। এমনকি বৌদ্ধধর্মের সঙ্গেও ধর্মঠাকুরকে মিলিয়ে দেওয়া হয়। সে তিনি যে ঠাকুরই হোন না কেন, আসলে তিনি গ্রামদেবতা। গাছের তলায় অথবা কোনো ফাঁকা জায়গায় বসে তিনি গ্রামের মানুষের সুখদুঃখের কথা শোনেন। তাদের ভালো মন্দের বিচার করেন। গ্রামের মানুষ পরিবারের মঙ্গল চেয়ে মানত করে। পোড়ামাটির হাতি ঘোড়ার মাথায় সিঁদুর লেপে ঠাকুরের থানে রেখে আসে। গ্রামদেবতা হয়তো সবার অলক্ষ্যে হাতি বা ঘোড়ার পিঠে চেপে গ্রাম পরিদর্শন করেন।

ঘোড়ার নাম সোনামুখী কারণ বাঁকুড়ার সোনামুখী নামের আর একটি গ্রামে এই লম্বা গলা ঘোড়া তৈরি হয়। বোঙা হাতি মূলতঃ উৎসর্গ করা হত সাঁওতালদের দেবতা সিঙবোঙাকে। পীরের দরগা বা মাজারেও থাকে মাটির ঘোড়া। আমার ঠাকুমার মা পরিবারের কারোর পায়ে চোট লাগলে বা পা ভাঙলে মাটির ঘোড়া মানত করতেন।

একটা সময় পীরেরা সুফিবাদের সঙ্গে এদেশের লৌকিক আচারকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ও শান্তির বার্তা খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। সেক্ষেত্রে পীর বা পয়গম্বরের ঘোড়ায়-চড়া অবয়ব সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছিল সহজেই। তাই অশ্বথ তলার ধর্মঠাকুরের ঘোড়া যে কখন পয়গম্বরের ঘোড়া হয়ে যায়, কেউ তা বলতে পারে না। বাঁকুড়ার কুমোরপাড়ার হাতি, ঘোড়া এমনি করেই ধর্মঠাকুরের থান থেকে পৌঁছে যায় সুসজ্জিত ড্রয়িংরুমে। গোটা ভারতের কুটির শিল্পের প্রতীক হয়ে গর্বিত গ্রীবা উঁচু করে সে দাঁড়িয়ে থাকে।
কত তথ্যসমৃদ্ধ, গবেষনালব্ধ, মননশীল দৃষ্টিভঙ্গীর এক লেখা…!! ছবিগুলো অতি চমতকার… কি অপূর্ব কাজ…
পাঠক হিসাবে সমৃদ্ধ হলাম… ধন্যবাদ!!
ভালোবাসা রইল। তোমাদের ভালোলাগায় আরো ভালো কিছু করার জন্যে দায়বদ্ধ হয়ে তাই।
এমন বর্ণনা পশ্চিমবঙ্গ ট্যুরিসম্ দপ্তরের জন্যেও যেন বড় মূল্যবান সম্পদ!!