ইতিমধ্যে করোনার আগমন তার অদৃশ্য অভূতপূর্ব বিধ্বংসী আক্রমণে আবির্ভাবে আভিজাত্য লাভ করেছে। ধ্বংসলীলায় প্রলয় নাচনে তার পাগল পারা প্রকৃতি সবুজ হয়ে মানুষের মনে পাতাঝরার শব্দ বয়ে এনেছে। জাগিয়েছে অভূতপূর্ব জাতীয় সংহতি, মাতিয়েছে দেশপ্রেমের আলোকোজ্জ্বল সরব উন্মাদনা। সেখানে মৃত্যুর মৌনমুখরতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য জীবনের গানই আবিশ্ব ঐক্যের বন্ধনে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে। অথচ সেখানেই আবার দৃষ্টিভঙ্গির অভিনব চেতনার বিস্তার সুধীজনে ভাবিয়ে তুলেছে। সেদিক থেকে করোনার করুণায় মূল্যবোধের ট্রাজিক পরিণতি দেখে কথ্যভাষাতেই সাধুর বেশ উঠে এল, ‘কী হইতে কী হইয়া গেল!’ আসলে যা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, তাই যদি দীনহীনের পরিচয়বাহী হয়ে ওঠে, তাও অবস্থান্তরে মেনে নেয় মানুষ। আগে সাইকেলও বিয়ের পণে রথ হয়ে উঠত, এখন মোটরসাইকেলও পথ খুঁজে পায় না। তাতে সাইকেল বা মোটরসাইকেলের আভিজাত্য চলে গেলেও তা নিয়ে কারও মনে কোনো আক্ষেপ নেই, বরং দুচাকা থেকে চার চাকায় চক্ষু স্থির হওয়ায় মনে তার আভিজাত্য লাভ করে।
অন্যদিকে ছোটবেলায় দূর দেশের কথায় যখন মন আনমনা হয়ে যেত, তখন কল্পনার ডানায় ভর করে সাত সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন কথা বলে উঠত। বাল্যশিক্ষায় মদনমোহন তর্কলঙ্কারের চেতাবনিতেও তার হাতছানি। তাতে ঘোড়া তো ছিলই, সঙ্গে গাড়িও এল, ‘লেখাপড়া করে যে,/ গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে।’ বাস্, ‘চলতি কি নাম গাড়ি’ চলতে শুরু করে দিল। রবি ঠাকুরের কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি সময়ান্তরে রেলগাড়ি ছুটতে শুরু করে, ‘বক উড়ে সারি সারি/ জোরে ছোটে রেলগাড়ি।’ শুধু কি তাই, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পাল্কীর সঙ্গে নৌকার কথাও জায়গা করে নেয়। ছোটবেলার কাগজের নৌকাই জলে ভাসাতে গিয়ে সমুদ্রের জাহাজ হয়ে ওঠে, গল্পের ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজ মিশে যায়। তখন চল মন নিজ নিকেতনে বলেই গুপী গাইন বাঘা বাইনের মতো হাতে তালি দেওয়ার জন্য মন-মুখ এক যেতে শুরু করে। সেখানে শুধু সময়ের তীব্র প্রতীক্ষা। তখন যে অজানা দেশ, অচেনা মানুষের সান্নিধ্যে ছুটে চলার আভিজাত্যে বিদ্যাশিক্ষার আড়ম্বর দেশ জয় করার আনন্দ বয়ে আনতে শুরু করে। এজন্য সময়ান্তরে রক্ষণশীল মানসিকতাকে অতিক্রম করে কালাপানি পার করেই মানুষের স্বপ্ন বর্ণরঙিন হয়ে ওঠে।
শুধু তাই নয়, ক্রমে তা বিদেশে যাওয়া মানেই জীবন সার্থক। আর বিদেশ ফেরত মানেই দৃষ্টিশক্তিতে বহুমুখী বিস্তার। সেখানে দূরদৃষ্টি থেকে দিব্যদৃষ্টি সহজলভ্য হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, তখন বিদেশের মুগ্ধতা প্রকাশের ভাষা পথ খুঁজে পায় না। অন্যদিকে দেশের দীনহীন অবস্থার হদিশ দেখিয়ে তাই আবার বাচাল হয়ে ওঠে। যেন দেশের সৌভাগ্য যে, তিনি এদেশে জন্মেছেন। শুধু তাই নয়, বিদেশের অপার মহিমায় দেশের দৈন্যদশা যতই প্রকট হোক, বক্তার মুখে আলো জ্বলে উঠলেই শ্রোতার মনে সিনেমা শুরু হয়। বেশকিছুদিন এলাকার বাইরে থাকলেই যেখানে স্থানীয় লোকের কাছে সমাদর মেলে, কথায় তুবড়ি ছোটে, সেখানে দেশান্তরে প্রবাসী হলে তো কথাই নেই। সমীহ তখন অদৃশ্য ভাবেই ব্যক্ত হয়, কথা তখন অপার মহিমার বাণী হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে শ্রেষ্ঠত্বের মহিমার আলোয় আমাদের বনেদি চেতনায় বিদেশের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতি সবেতেই আভিজাত্যের পরশ নানাভাবেই ঊর্মিমুখর। সেই বিদেশ ফেরত মানুষের রাজকীয় আগমন আজ শুধু অনাহূত অতিথির অবজ্ঞাই লাভ করে না, শত্রুর মতো বিধ্বংসী আবির্ভাবে সামিল হয়েছে।
এতদিনের গড়ে তোলা আভিজাত্যবোধে যেখানে বিদেশ থেকে ফেরার মধ্যে দেখনদারিও দৃষ্টি আকর্ষণ করত, সেখানে সেই শুভদৃষ্টি এড়িয়ে আত্মগোপন করার মরীয়া প্রয়াস লক্ষণীয়। এজন্য শুধু কি অতিমারীরই প্রভাব বর্তমান, নাকি আমাদের বৈষম্যপীড়িত সামাজিক জীবনে বহুদিনের সঞ্চিত সংগুপ্ত হীনমন্যতাও এর সঙ্গে মিশে আছে? প্রবাসীদের প্রতি আমাদের এই বিমুখতায় মনটি কি ভয় পেয়ে শেষে স্বদেশ ছেড়ে ভিনদেশে বেড়াতে যায়নি তো? কিংবা, মৃত্যুচেতনায় বাস্তবমুখী মনটি আর বিদেশি রঙিন চশমায় স্বপ্ন দেখতে না-পসন্দ? তবে কি বিদেশের পরশ এরপরে আর সেভাবে হাতছানি দেবে না? প্রশ্নের এই নানা কিসিমের রকমারি বর্ণবাহারই বলে দেয়, ‘কী হইতে কী হইয়া গেল!’
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।