এই রোগটা আমার দীর্ঘদিনের। অতি কাছের জিনিসের মূল্য বড্ড দেরিতে বুঝতে পারি!
প্রায় ২৫-৩০ বছর ধরেই এই এলাকায় আমার আসা যাওয়া। গঙ্গা সংলগ্ন পরিবেশটা বেশ ভালোই লাগে। এখনও সময় সুযোগ পেলেই চলেও আসি, এলোমেলো ঘুরে বেড়াই।
সেই সময় স্থানীয়দের কাছে পানিহাটির এই দণ্ড মহোৎসব বা ‘দই-চিঁড়ে’ উৎসবের কথা শুনেছি। কেউ কেউ আবার দেখতে আসার জন্যও বলতেন।
সত্যি বলতে কি, সেইভাবে কখনো গুরুত্ব দিইনি। মনে মনে ভাবতাম ধুস, এখানে আবার কি আর মেলা — উৎসব হবে! — ততদিনে আমি আবার ‘কালচারের গোলা’ খেয়ে একাধিক স্যাঙ্গাত জুটিয়ে রাজ্যের নানা প্রান্তের বিখ্যাত সব মেলা, আখড়া কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছি। — ধারণা ছিল, ওইসব মেলা, পার্বণে সঠিক সময়ে আমরা পৌঁছতে না পারলে কেন্দুলী, পৌষমেলা আবার বন্ধই না হয়ে যায়! — সে যে কি দায়িত্ব ছিল, বলে বোঝাতে পারবো না!

হ্যাঁ, পানিহাটির উল্লেখিত এই মেলায় আমি এসেছিলাম, কিন্তু বড্ড দেরি করে। প্রায় বছর ১৫ আগে একদিন পানিহাটি গঙ্গার ঘাটে বসে মুখচেনা দু-চারজনের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখন একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বেশ দৃঢভাবেই এই দই-চিঁড়ের উৎসব দেখতে আসার জন্য অনুরোধ করলেন। — ‘ভালো না লাগলে আপনি চলে যাবেন, অসুবিধে কোথায়!’
ওঁনার বলাতে একটা অদৃশ্য জোর ছিল- যা এড়িয়ে যেতে পারিনি।
পরের মাসেই ছিল সেই ‘দই চিঁড়ে’ উৎসব। গেলাম। এর মধ্যে অবশ্য আমার রক্তের সেই তেজে ঝিম ধরে গেছে এবং কালচারের ভূত তো ঘাড় থেকে সুড় সুড় করে অনেক আগেই নেমে এসেছে — ঘরণী ওঝা’র সৌজন্যে!

উৎসবের দিন ভোর বেলায় রওনা দিলাম। আমাদের বাড়ি থেকে সময় লাগে মাত্র ৪০ মিনিটের মতো।
প্রথমে সাইকেল চালিয়ে কোন্নগরের বাটা’র মোড়ের কাছে ফেরিঘাট। স্ট্যান্ডে সাইকেল জমা রেখে লঞ্চে গঙ্গা পার করেই পানিহাটির মহোৎসবতলা ফেরি ঘাটে পৌঁছে গেলাম। সোদপুর স্টেশন থেকেও এখানে অতি সহজেই আসা যায়।
পৌঁছে কিছুটা তাজ্জবই হলাম। — এই ভোরবেলায় থেকেই দেখি এলাকাটি লোকে লোকারণ্য। বিভিন্ন রাস্তা অলিগলি দিয়ে পিলপিল করে লোকজন ঢুকছেন। সবার সঙ্গেই হাতে ধরা ভিন্ন আকারের একাধিক বোচকা, ব্যাগপত্র। নৌকায় আসার সময়ও দেখলাম প্রচন্ড ভীড়। শুনলাম, আগের দিন রাত থেকেই অনেক লোকজন এখানে আসা শুরু করে দিয়েছে। চারিদিকে ধর্মপ্রাণ লোকজনের নানা কর্মকান্ডে এলাকাটি ক্রমশ মুখরিত হয়ে উঠছে।

বিভিন্ন অস্থায়ী আখড়ায় তুমুল নাম-সংকীর্তন চলছে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে। কেউ বা আবার মগ্ন ইষ্টদেবতা গোপাল ঠাকুরের বিগ্রহ সাজিয়ে — পুজোর প্রস্তুতিতে। বিশেষ করে চোখে পড়ে, বিভিন্ন আখড়ায় শ’য়ে শ’য়ে একই সাইজের মাটির মালসায় ভরে, দই-চিঁড়ে, কলা, কাঁঠাল, বাতাসা দিয়ে নৈবেদ্য সাজানো চলছে — সে কি যত্ন, দেখবার মতো সেই দৃশ্য! — সেই সময় ভক্তরা পবিত্রতা রক্ষার জন্য মুখে সাদা কাপড়ের মাস্কও ব্যবহার করছিলেন।
তখনো বুঝতে পারিনি, ভবিষ্যতে এই মাস্কই হয়ে উঠতে চলেছে আমাদের ভবিষ্যতের সঙ্গী!
এই দই-চিঁড়ে উৎসবের সঙ্গে শ্রী শ্রী মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের সংযোগ থাকায়, বৈষ্ণবধর্মালম্বী কাছে এই উৎসবের গুরুত্ব অসীম।
রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও ভক্তবৃন্দ এখানে এসে থাকেন। আগত লোকজন ও পরিবেশের মধ্যে গ্রাম্যজীবনের সাদাসিধে ভাব লক্ষ্য করা যায়। এই বিষয়টি আমাকে সব থেকে বেশি আকর্ষণ করে। যা কিনা, আজকের দিনে তথাকথিত ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলো থেকে ক্রমশ বিলীন হতে চলেছে। কিছু গ্রাম্য মেলাতে দেখেছি, গাড়ির অস্থায়ী শোরুম পর্যন্ত বসিয়ে দিয়েছিল। — যাদের জন্য এই মেলা, সেই গ্রাম্য ব্যাপারীরা সেখানে প্রায় ব্রাত্য।
নিজের সত্যিই খুবই আফশোস হচ্ছিল, ঘরের এতো কাছে — তবুও এতো বিলম্ব করে এলাম! — এর পর যখনই সময় সুযোগ পেয়েছি, চলে এসেছি। আর ছাড়িনি।

এই বিশেষ উৎসব ছাড়াও এই পানিহাটি, সোদপুর অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে একাধিক গুণীজনের আগমন হয়েছে। সেই দিক থেকেও এই এলাকার গুরুত্ব কম নয়। — মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মতো লোকজন এই এলাকায় পদধূলি দিয়েছিলেন।
কলকাতার কালাজ্বর প্রভাবের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটবেলায় এই পানিহাটির গঙ্গাতীরবর্তী একটি বাগান বাড়িতে কিছুদিন কাটিয়েছিলেন। সেই বাড়িটি এখনও অক্ষতই আছে। —- আজকের দিনে, যা খুবই আশ্চর্যজনকও বটে!
এই বছর পানিহাটির দণ্ড মহোৎসব বা দই-চিঁড়ে উৎসব অনুষ্ঠিত হবে আগামী জুন মাসের ২ তারিখ এবং এবারে ৫০৭ বৎসরে পদার্পণ করবে। সেই দিক থেকে এই উৎসবের গুরুত্ব অসীম। — ইতিহাসও তাই বলে।
অতীতের দিকে ফিরে তাকালে ও একাধিক জায়গায় কথিত আছে, ৯২১ বঙ্গাব্দে (১৫১৪ খ্রীস্টাব্দ) জলপথে পুরী তীর্থযাত্রার সময় চৈতন্য মহাপ্রভু এই পানিহাটিতে পদধূলি দিয়েছিলেন। সেই সময় এই অঞ্চলের গণ্যমান্য ভক্ত রাঘব পন্ডিতের বাড়িতে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। এই এলাকার পরিবেশ ও ভক্তদের নিষ্ঠা দেখে চৈতন্যদেব ভীষণ আপ্লুত হন।
এখনো পানিহাটির ওই বাড়ির মহাপ্রভুর শ্রী মন্দিরে, চৈতন্যদেবের পদচিহ্ন সংরক্ষণ করা আছে এবং নিত্য পুজো করা হয়ে থাকে।

ওই যাত্রার বছর দু’য়েক বাদে চৈতন্যদেব ওঁনার ঘনিষ্ট শিষ্য নিত্যানন্দ মহাপ্রভুকে এই পানিহাটিতে পাঠিয়েছিলেন বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে।
নিত্যানন্দ মহাপ্রভু রাঘব পণ্ডিতের আখড়ায় থাকাকালীন সপ্তগ্রামের জমিদার পুত্র ও বৈষ্ণবভক্ত রঘুনাথ গোস্বামী ওঁনার দর্শন লাভের জন্য পানিহাটিতে আসেন। যদিও আসার পথে খানিকটা বিলম্ব হয়ে যায়।
সেই সময় ভক্ত রঘুনাথকে দেখে, নিত্যানন্দ মহাপ্রভু বলেন, বিলম্ব করে আসার জন্য রঘুনাথকে ‘দণ্ড’ দেবেন!
সেই দণ্ড ছিল — বৈষ্ণবদের ধর্মীয় আখড়ায় আগত ভক্তবৃন্দ ও গ্রামবাসীদের পেট ভরে দই-চিঁড়ে খাওয়ানোর নির্দেশ। অবস্থাপন্ন জমিদার পুত্র রঘুনাথ সেই দণ্ড আনন্দের সঙ্গেই মাথা পেতে গ্রহণ করেন এবং দই-চিঁড়ে খাওয়ানোর নির্দেশ সুচারুভাবে সম্পন্ন করেন।
স্বাভাবিকভাবেই ভক্ত বৃন্দের মাধ্যমে এলাকাবাসীর মধ্যে এই ঘটনার স্তুতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। — সেই দিন থেকে প্রতিবছর এই অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে পালিত হয়ে আসছে। যা আজকের দিনে ‘পানিহাটির দণ্ড মহোৎসব বা দই-চিঁড়ে মেলা’ নামে বিখ্যাত। অতীতে ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবও এই দণ্ড মহোৎসবে এসেছিলেন।

করোনা কালে দু-বছর এই অনুষ্ঠান ব্যাহত হয়। গত বছর থেকে আবার চালু হয়েছে। দেখে ভালো লাগলো, পানিহাটির ঘাটের কাছে সেই ছোট দোকানটিতে অতি সুস্বাদু ‘টক আলুর দম’ আবার পাওয়া যাচ্ছে। আমচুর দিয়ে তৈরি করে হয়, এর স্বাদেরও কোন তুলনা নেই! আমার জানা নেই আর কোথাও পাওয়া যায় কিনা।
বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই মেলার খবর নানা ভাবে প্রচারিত হয়ে চলেছে। সেই কারণেই ভীড়ও ক্রমশ পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে। গত বছর প্রচণ্ড গরম ও ভীড়ের চাপে পদপৃষ্ঠ হয়ে একাধিক লোকের মৃত্যু পযর্ন্ত হয়েছে।
এটাও ঠিক, প্রায় বছর ১৫ আগে দেখা এই উৎসবরেও চরিত্রগত দিক থেকে ধীরে ধীরে অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে চলেছে। এখানেও ‘অনুপ্রেরণায়’র ফলে তস্য গলিপথেও আকাশ অতি দ্রুত বেগে ঢাকা পরে যাচ্ছে।

এর মধ্যেই আবার এক কর্পোরেট ধাঁচের ধর্মীয় সংগঠন এই অঞ্চলে নিজেদের অধিপত্যে বিস্তার করতে শুরু করে দিয়েছে। এই নিয়ে দেখলাম, স্থানীয় লোকজনদের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভেরও উদ্রেক হয়েছে। আশপাশের জমি বাড়িও বেশি দাম দিয়ে বিক্রি করার জন্য নানা প্রলোভন দেওয়া শুরু হয়েছে। জনবিন্যাসেও এর যথেষ্ট প্রভাব পড়ছে। গত সপ্তাহে গিয়ে দেখলাম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন দামী মডেলের গাড়ির আনাগোনা শুরু হয়েছে।
জানিনা কতদিন আর এই মেলার নিজস্ব চরিত্র বজায় রাখা সম্ভব হবে। লোকজনের মুখে শুনতে পাই, বারাণসীও “বিকাশ”-এর গুঁতোয় নিজের শাশ্বত চরিত্র অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। এই কারণেই হয়তো পুরনো নবদ্বীপ আমার কাছে এখনো অনেক বেশি পছন্দের জায়গা।
এখনো, এই দই-চিঁড়ে উৎসব সাধারণ আলোকচিত্রী হিসেবে আমার কাছে এক অকল্পনীয় অনুশীলনের উৎসব প্রাঙ্গণ বলে মনে করি। প্রতি মূহুর্তে চারধারে নানা রকমের অকল্পনীয় দৃশ্য কাব্যের সৃষ্টি হয়ে চলেছে। চোখ ফেরানো যায় না। শুধু অবাক হতে হয়।

বছর চারেক আগে এই দই-চিঁড়ের উৎসবেই চাক্ষুস করা বিশেষ একটি ঘটনা বলে শেষ করছি — যা আমি আজও ভুলতে পারিনি।
সেদিন প্রায় ৭০ বছর বয়স্কা একজন জটাধারী সাধিকার সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। আমার দেখা এই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জটাধারী নাগা সাধুসন্তদের কথা মাথায় রেখেই বলছি — এই ধরনের বৃহৎ জটা আমি অন্তত দেখতে পাইনি। শুধু তাই নয়, এই বৃহৎ জটাসমেত এই বয়স্কা সাধিকার সেকি অসাধারণ নৃত্য, গানবাজনার তালে তালে! — যা কল্পনাও করা যায় না। পুরো আখড়াটি যেন একাই মাতিয়ে রাখলেন। ভাবছিলাম, এই গরমেও কোথা থেকে এই প্রাণশক্তি পান! শুধু অবাক হয়ে দেখছিলাম। বিরতির সময় যখন একটা গাছের নিচে বসেছিলেন কথা বলেছিলাম ওঁনার সঙ্গে। — বিগত প্রায় ৪০ বছর আগে ঠাকুরের কাছে মানত করে চুলের এই জটা রাখতে শুরু করেছিলেন। যা আজকের দিনে এই আকার ধারণ করেছে।

— কি মানত করেছিলেন?
হেসে বলে ওঠেন, ‘আরে অতো দিন আগের কথা, আর মনে আছে নাকি! এই জটা’টাই শুধু আছে এখন।’
জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আগামী বছর আসছেন তো?’
— ‘ধুর পাগল, কালকে আমি কোথায় থাকবো তাই জানিনা, আবার বলে কিনা সামনের বছর! — মরণ আমার!’
পরবর্তী কালে পানিহাটির এই ‘দই-চিঁড়ে’ উৎসব যখনই গিয়েছি ওঁনাকে খুঁজেছি — কিন্তু আর দেখা পাইনি।
ছবি : বিজয় চৌধুরী।
২৮-৫-২০২৩
কয়েক বছর আগে বিভিন্ন সময়ে এই ‘দই-চিঁড়ে’ উৎসবে তোলা কিছু ছবি এখানে শেয়ার করলাম।