বাংলায় একুশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি-বিরোধী শক্তিকে আরও মজবুত করার জন্য কৃষক নেতারা কলকাতায় এসে বিজেপি-কে ভোট না দেওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন। তখন তারা দিল্লি সীমান্তে নতুন কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। ভারতীয় কিসান ইউনিয়নের নেতা রাকেশ টিকায়েত কলকাতায় গাঁধী মূর্তির পাদদেশে সংযুক্ত কিসান মোর্চা আয়োজিত কিসান-মজদুর মহাপঞ্চায়েতে রাকেশ বলেছিলেন, ‘‘আর যাকে খুশি ভোট দিন, বিজেপি-কে একটিও ভোট দেবেন না। কারণ, দিল্লিতে কোনও প্রশাসন চলছে না, চলছে একটি ঠগের সরকার।’’ দিল্লির বিজেপি নেতারা তখন বাংলায় ভোটের প্রচারে নিয়মিত যাতায়াত করছেন। রাজ্যজুড়ে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ প্রচার চলছে পুরোদমে। বিজেপি বিরোধীরা কলকাতা ছাড়িয়ে জেলায় জেলায় সেই প্রচার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চালান। কৃষক নেতাদের সুরও সেই প্রচারের সুরেই বাঁধা ছিল।
কেবলমাত্র বাংলার ভোট নয়, কৃষক নেতারা উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোটের আগে থেকেও রাজ্যজুড়ে বিজেপি বিরোধী ওই আন্দোলনকে আরও জোরদার করতে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। কৃষক নেতারা বিজেপিকে প্যাঁচে ফেলতেই ভোটের আগে থেকে ময়দানে নেমেছিলেন। মুজফ্ফরনগরে কৃষি আইন বিরোধী যে জনসভা হয় সেখানে কৃষক নেতা রাকেশ টিকায়েত-সহ অন্যরা যে কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে আওয়াজ তোলেন তা গোবলয়ের যোগী-রাজ্যের বিধানসভা ভোটে যাতে বেশ খানিকটা প্রভাব ফেলতে পারে সে কারণেই। তখন থেকেই কৃষক নেতারা উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে রুখতে জোরদার প্রয়াস চালায়।
এবার সেই কৃষক নেতারা পাঞ্জাবের ভোটের লড়াইতে সামিল। পাঞ্জাবের ভোটে লড়বে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ২৫টি কৃষক সংগঠন। অবশ্য একক ভাবে নয়, আম আদমি পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে তাঁরা ভোটে লড়বে। কিষাণ মোর্চা তৈরি হয়েছিল ৩২টি কৃষক সংগঠন নিয়ে, সব সংগঠন ভোটে অংশ নিচ্ছে না, ২৫টি কৃষক সংগঠন ভোট ময়দানে নামছে আর বাকি ৭টি কৃষক সংগঠন ভোট থেকে বিরত থাকছে। কীর্তি কিষাণ ইউনিয়ন, ক্রান্তিকারী কিষাণ ইউনিয়ন, বি.কে.ইউ ক্রান্তিকারী, দোয়াবা সংঘর্ষ কমিটি, বি.কে.ইউ সিধুপুর, কিষাণ সংঘর্ষ কমিটি এবং জয় কিষাণ আন্দোলন। এই সাতটি কৃষক সংগঠন সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ব্যানারেই কৃষি আন্দোলনে সামিল হয়েছিল। তারা ভোটে না লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাকি ২৫টি সংগঠন এই ভোটে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

কিছুদিন আগে থেকেই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল যে কৃষক আন্দোলনের বেশ কয়েকজন নেতা পাঞ্জাবের আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। কয়েকজনের নামও আলোচনায় উঠে আসছিল। এদের মধ্যে বলবীর সিং রাজেওয়াল এবং হরমিত সিং কাড়িয়ান আপ দলের টিকিটেই ভোটে লড়বেন বলে শোনা যাচ্ছিল। জল্পনায় কথাও শোনা যাচ্ছিল যে আপ তাদের মুখ্যমন্ত্রী মুখ হিসাবে বলবীর সিং রাজেওয়ালকে তুলে ধরতে পারে। যদিও এই জল্পনা দুই কৃষক নেতাই উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে যে ২৫টি সংগঠন সংসদীয় রাজনীতিতে নামতে চলেছে তাঁরা কিন্তু সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ব্যানারে নির্বাচনে লড়াই করতে পারবে না। যে সাতটি সংগঠন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না তাদেরই অনুরোধ নির্বাচনে এস.কে.এম-এর ব্যানার ব্যবহার না করা।
তবে বাকি ২৫টি ইউনিয়নই আপ দলের সঙ্গে জোট করে আনুষ্ঠানিকভাবে পঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপ-কে সমর্থনের পক্ষে কৃষক নেতাদের যুক্তি, দিল্লি সীমান্তে কৃষকরা যখন আন্দোলন চালাচ্ছিলেন তখন আপ নেতারা আন্দোলনের মঞ্চে এসে তাদের সমর্থন জানিয়েছিলেন। তখন থেকেই আপ নেতাদের সঙ্গে কৃষকদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। আপ দিল্লিতে ক্ষমতায় থাকলেও এখনও পর্যন্ত পাঞ্জাবে ক্ষমতা দখল করার সুযোগ পায়নি। এদিক থেকেও কৃষকেরা আপ-কে রাজনৈতিক সমর্থনের ক্ষিত্রে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যদিও কয়েকদিন আগেও কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী কৃষি আইন ফের কার্যকর হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর এই মন্তব্যের জেরে দেশ জুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে৷ প্রসঙ্গত; কৃষি আইন নিয়ে দেশজুড়ে কৃষকদের লাগাতার বিক্ষোভ আন্দোলনের চাপে গত মাসে কেন্দ্র তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহার করে৷ তারপর ফের বিতর্কিত আইন বাতিলের জন্য কিছু মানুষকে দোষারোপ করে কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক।
অন্যদিকে পাঞ্জাবে ভোটের আগেই দফায় দফায় অশান্তি বাড়তে শুরু করেছে। পরপর কয়কটি ঘটনায় পাঞ্জাবের পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। কয়েকদিন আগে গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে দু’জনের। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই লুধিয়ানা কোর্টে আর.ডি.এক্স বিস্ফোরণ। তাতেও পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে। গোয়েন্দারা ভোটের মুখে আরও নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন। রাজনৈতিক ভাবেও পাঞ্জাবের পরিস্থিতিত বেশ কিছুদিন ধরেই স্থিতিশীল নয়। এই অবস্থায় আপ-এর সঙ্গে জোট বেঁধে কৃষক সংগঠনগুলির ভোটে অংশগ্রহণ রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যময়।