পঞ্জিকা কি বাঙালির উত্তরাধিকার! পঞ্জিকার অনুশাসন অনেকেই মানেন না। সামাজিক অনুষ্ঠান ও ক্রিয়াকর্মেই পঞ্জিকার খোঁজ পড়ে। বাড়ির বয়স্করাই এর খোঁজ রাখেন। কিন্তু নবীন প্রজন্ম একে পুরোপুরি অস্বীকার করে — এমনটাও কিন্তু নয়। সে ঘটক মশাইয়ের মাধ্যমে হোক কিংবা পুরুত ঠাকুরের সাহচর্যে — পঞ্জিকা এই একুশ শতকেও স্বমহিমায়। পঞ্জিকার প্রাসঙ্গিকতা আজও বাঙালি জীবনের অঙ্গ। বৈশাখ মাসের অনেক আগে থেকেই বইয়ের দোকান থেকে মল এমনকি পাড়ার মুদির দোকানেও পঞ্জিকা চোখে পড়ে। কেউ হাঁক দিয়ে কেনেন, কেউ চুপিসারে। কিন্তু অনেকেই কেনেন। বিদ্যাসাগর মশাইয়ের বর্ণ পরিচয় সরিয়ে রাখলে একমাত্র পঞ্জিকাই এখনও বেস্ট সেলার।
আমাদের দেশে দুধরণের পঞ্জিকা চলে — দৃকসিদ্ধ ও অদৃকসিদ্ধ। ভারত সরকারের ‘রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ’ আর বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা হল দৃকসিদ্ধ। আর বাজার চলতি অন্যান্য পঞ্জিকা সবই অদৃকসিদ্ধ। প্রথমটির ক্ষেত্রে গণনার ভিত্তি সর্বাধুনিক জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সূত্রাবলী। অপরদিকে দ্বিতীয়টির গণনার পদ্ধতি ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থ। এই দ্বিতীয় ক্ষেত্রটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা মত থাকলেও জীবনের শুভ অশুভ জানায় কেউ কারো থেকে কম যায়না।
দৃক্ বা অদৃক্ নিয়ে মতান্তরকে সঙ্গী করেই বাঙালি জীবনে পঞ্জিকা আছে। বিবরণ, অঙ্গসজ্জা, লাল মলাট, নিম্নমানের কাগজ, ছাপা তথৈবচ – তাও পঞ্জিকা ছাড়া বাঙালির কোন শুভ কাজ হয়না। কারণ পঞ্জিকায় আছে বিশ্বাস, আস্থা আর অকপট আত্মসমর্পণ।
পঞ্জিকা শুধু বর্ষফল, গ্রহশান্তি, তিথি নক্ষত্র, পুজো, রাশি-লগ্ন, অমাবস্যা-পূর্ণিমা-অশ্লেষা-মঘা নিয়েই ক্ষান্ত থাকেনা। পঞ্জিকা একধরণের ডিরেক্টরিও বটে। এখানে থাকে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বছরভর ছুটির তালিকা, মহাপুরুষদের জন্মতিথি আবার অতিকায় লাল মুলোর বিজ্ঞাপন, চাষের প্রয়োজনীয় সার, বীজের বিজ্ঞাপন। গৃহনির্মাণ থেকে গৃহপ্রবেশের শুভ যোগ, জ্যোতিষীর নিদান থেকে সঠিক গ্রহরত্নের হদিশ — কি নেই হেথায়! পঞ্জিকায় পেয়ে যাবেন বর্তমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর এমনকি কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলের পিন কোড।

আর আছে বাঙালির ছেলেবেলার মোহিনী আকর্ষণ। পাঁজি এক মায়া জানে। বশীকরণ রুমালের কথা কে ভুলিতে পারে। “এই রুমালের অধিকারী যে কোন লোককে হাতের মুঠোয় আনিতে, প্রণয়ে বিজয়ী হইতে… যাহাকে আপনি পছন্দ করেন, তাহাকে এই রুমাল দেখাইলেই সে আপনার বশীভূত হইবে।” সংস্কৃত আর অঙ্কের মাষ্টারমশাইকে বশীভূত করার কী দুর্নিবার আগ্রহই না ছিল ছেলেবেলায়! কিন্তু রুমালের দাম যে অনেক। আর পোষ্ট অফিসের পিওন জেঠু বাবা—কাকার বড্ড চেনা যে। তাই মনের কথা মনেই থাকতো। পাশেই মেয়েদের স্কুলের দীপালিকে নিজের করে পেতে কে না চাইতো? বড়লোকের ব্যাটা ওই স্নিগ্ধেন্দুকে হারানোর ওষুধ, সন্মোহনী রুমাল অধরা থাকার আক্ষেপ প্রৌঢ়ত্বে এসেও বহু মানুষের মনকে কী ধ্বস্ত করেনা? আর রতি বিষয়ক নানা গোপনীয় কথা, কে ভুলে যাবে? আশি ফোঁটা রক্তে কত প্রোটিন ক্ষয় হয় — সেই নৈতিক বিধান, ভয় সেও তো ওই হেলাফেলা পঞ্জিকার থেকে শিখে নেওয়া। বাবা-মা তো তখন এখনকার মত বন্ধু ছিলেন না। বাবার বন্ধ আলমারি থেকে চুরি করে ভরদুপুরে ছাদের ঘরে চার ইয়ারের গোপন পাঠ ছিল পঞ্জিকা বা পাঁজি।
পঞ্জিকা দেখতে দেখতে এখনও মনে হয় আমাদের জীবনেও ছিল এক নক্ষত্র জীবন। পঞ্জিকা যেন এইসব আশ্চর্য গণনা কথায় ভরা। নাহলে নক্ষত্রের গতিবিধি মেনে মানুষের জীবন চলে কেন? এমন রহস্য কোন মহার্ঘ যুক্তি দিয়ে ভেদ করা যায়না। জীবনানন্দের কথায় — পায়ের ভঙ্গীর নিচে বৃশ্চিক-কর্কট-তুলা-মীন। জানে বাঙালি, বাঙালির উত্তরাধিকার।
পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৪-এ প্রকাশিত।