| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পাপড়ি রহমান-এর ছোটগল্প ‘দূর্বাঘাস, টিনের ঘের এবং অলকানন্দা’

Reporter
পাপড়ি রহমান / ৬৫৭ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২২

হেমন্ত বা শরতের ফারাক আমরা তখনো বুঝতে শিখি নাই অথচ ঘাসের ফারাক বুঝতাম ঠিকই। কোনটা দূর্বা, কোনটা মুথা, কোনটা চাপড়া, কোনটা ফুলকা বা কোনটা শ্যামা আমরা ঠিকঠিক ধরে ফেলতাম। দূর্বাঘাস হলো বেজায় সরু- একেবারে পরবের সেমাইয়ের মতো। আবার চাপড়া ঘাসের পাতা বেশ মোটা ও চ্যাপটা ধরনের। দূর্বার পাতা সরু বলে তাতে শিশির জমতো প্রচুর। সরু সরু পাতার ওপর জমা জল একেবারে টলমল করে তাকিয়ে থাকত। ইশকুলে যাওয়ার পথে এই শিশিরে আমাদের পা ভিজে চপচপা দেখাত। এই শিশির-জলের সঙ্গে ঈষৎ হলদেটে মরা-ধরা ঘাস লেগে অদ্ভুত অস্বস্তি হতো। কারণ তখনো দিন শুরু হয় নাই। সকাল সবে ফুটতে শুরু করেছে। এই ভোর-ভোরেই স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ভেতর আমাদের ভিজা পা। তার তাতে প্রায় মরে যাওয়া ঘাসের হলদেটে দৃশ্য। অথচ এই পা নিয়েই আমাদের ইশকুলে যেতে হবে। ইশকুলও তখনো জেগে উঠেছে কি ওঠে নাই। দফতরি সানাউল্লাহর পিতলের গোল চাকতিটা কাঠের হাতুড়ির বাড়ি খেয়ে ঢং করে বেজে ওঠে নাই। অথচ দূর্বাঘাসের মাঠ পেরিয়ে আমরা তখন বাঁধানো মোটা সড়কের ওপর উঠে পড়েছি। হাঁটতে হাঁটতে ভেজা ও মরা ঘাসে আমাদের পায়ে চুলকানি শুরু হলে স্যান্ডেলও খুলে ফেলেছি। পা দুইটা ঝাড়াঝাড়ি করে আমরা শিশির ঘাসে অস্বস্তি তাড়াতে চাইতাম। কিন্তু কি সে কি- এই ঘাস যেন আমাদের পায়ের ত্বকে ছবি হয়ে লেগে থাকত। ছবি হয়ে ফটফট করে থাকিয়ে থাকত।

ঘন-দূর্বাঘাসের মাঠ পেরুবার আগে আমাদের পেরুতে হতো জমিদার বাড়ি। ফুল-ফল-পাতা আর গাছ-লতায় ছাওয়া জমিদার বাড়ি। এসবের সঙ্গে এক দঙ্গল রাজহাঁস। রাজহাঁস দেখে আমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম। আমাদের মনে হতো মাটি ফুঁড়ে গোটা দশেক সাদা জাহাজ বুঝি তইতই করে এগিয়ে আসছে। কিন্তু আমাদের এই রাজহাঁস বিহ্বলতা ছিল ক্ষণিকের। মুহূর্তে সাদা জাহাজের দঙ্গল আমাদের কামড়াতে আসত। আর আমরা ভয়ে আধমরা হয়ে দৌড় লাগাতাম। রাজহাঁসের এমন মারমুখী আচরণ আমাদের কাছে অচেনা। কেন-বা তারা আমাদের কামড়াতে আসে? আর কেনই-বা আমাদের দেখে ককর্শ ক্ক ক্ক শব্দ করে। রাজহাঁসের তাড়া খেয়ে আমরা হুড়মুড়িয়ে পড়তাম ল্যান্টেন-ঝোপের ওপরে। ল্যান্টেনার ঝোপ মানে অঢেল বুনো গন্ধ। আর বহু বর্ণিল ফুলে ফুলময়। তারা ভয়ানক লাজুক। কিন্তু তাদের শাখা কাঁটাময়।

কাঁটার ঘা গায়ে-না-মেখে আমরা ফুলময় ঝোপেই বসে থাকতাম। আমরা ততদিনে শিখেছি বে-নী-আ-স-হ-ক-লা ল্যান্টেনার ফুল ঝোপে বসে আমরা বেগুনি-নীল-আসমানি করতাম। ততক্ষণে ল্যান্টেনার গাছের সব ফুল দল ঝরে গেছে। ঝরে একেবারে ন্যাংটা হয়ে গেছে। এই ফুল আমরা কোনোদিন হাতে নিতে পারিনি। হয়তো ছিঁড়ে ফেলার দুঃখেই তারা আত্মনাশ করত। আমরা রাজহাঁসের তাড়া খেয়ে ল্যান্টেনার ঝোপে এদিকে স্যান্ডেল থেকে আমাদের পা পিছলাতে শুরু করেছে। শিশুভোরের শিশির ও ভেজাঘাস আমাদের পা পিচ্ছিল করে দিয়েছে। আমরা যাচ্ছি আবেদা খাতুন বালিকা বিদ্যালয়ে। কিন্তু জমিদার বাড়িতে তখন কোনো জন্য মনিষ্যি নাই। যেন কোনো মৃতপুরি। সবাই যেখানে পাষাণ। শুধু জমিদারদের গাছ-ফুল-ফলের মরণ নাই। কমতি নাই। তাদের বাড়ির সামনের বিস্তৃত লনের দুই পার্শ্বে এন্তার ফুল-পাতা-গাছ। লতা-ফল-বৃক্ষ। আর বৃক্ষেরা এত বিশাল। এসবের মাঝে লাল বর্ণের থোকা থোকা ফুল। এই ফুল ছিল আমাদের পরম আরাধ্য। এই ফুলে ছিল মধুর ভাণ্ডার। এক একটা ফুলের পাছায় ঠোঁট ডুবিয়ে চোঁ করে টান দিলেই মধু জমা হতো জিভে। ফলে এই ফুলের জন্য আমাদের আকুলি-বিকুলি। আমাদের হাত চলে যেত ফুলের ঝোপে। আমাদের হাত পৌঁছেছে কি পৌঁছায়নি দুই-চারটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ঝাঁপিয়ে পড়ত। ফুল দূরে থাকা আমাদের প্রাণ নিয়ে বাঁচা তখন মুশকিল।

কি চতুর জমিদার রে বাপ। নিজেরা ঘুমিয়ে আছে অথচ তাদের পাহারাদারের কমতি নাই। এই মধুভরা-রঙ্গনের চাইতেও আরেকটা বৃক্ষ আমাদের প্রায় অনড় করে রাখত- আমাদের ইশকুলের ঘণ্টার মতো ফুল। উজ্জ্বল রোদের মতো হলদে রং তার। এই ফুল গাছের বাহার দেখতে দেখতে আমরা ইশকুলের প্রথম ঘণ্টার কথা ভুলে যেতাম। মুগ্ধ হয়ে এই গাছের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতাম। তখন হঠাৎ হয়তো কানে আসত- মালই আইসক্রিম-এক পয়সা। দুই পয়সা। এক-আনা, চার-আনা। চারকোনা কাঠের বাক্সের ভেতর পলিথিনে মোড়ানো আইসক্রিম। লাল-সবুজ-সাদা তাদের রং। ওই উজ্জ্বল হলদে ফুল আর আইসক্রিম আমাদের ইশকুল ভুলিয়ে দিত। সানাউল্লাহ ভাইয়ের প্রথম ঘণ্টা তখন বেজে গেছে। এই মালাই আইসক্রিম আমাদের চোখের সামনে অথচ ইশকুল তখন ঢের দূর। মালাই আইসক্রিম যে কিনব আমাদের হাতে পয়সা নাই। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে দাদাজান তার বটুয়া খুলে আমাকে দুই পয়সা দিত। দাদাজানের বটুয়ায় রং ছিল খাকি। দাদাজানের বটুয়া চেনার পরপরই আমরা মিলিটারির খাকি চিনেছিলাম। মিলিটারিরাও কি দাদাজানের মতো টাকা-পয়সা বটুয়ায় ভরে রাখে? খাকি বটুয়ার লম্বা ফিতা দাদাজান কোমরে পেচিয়ে রাখত। এই ফিতা ধীরে-সুস্থে খুলেই না দুই-পয়সা, এক-আনা বের করে সে। মালাই-মালাই-মালাই আইসক্রিম। আমাদের মাথার ভেতর মালাইয়ের ঘূর্ণি। দুই পয়সায় একটা মালাই পাওয়া যায়। কিন্তু কিনলেই কি? আমি তো আর একা একা মালাই খেতে পারব না। কাঁকন, যুঁথি বা কনাকে একবার হলেও চাটতে দিতে হবে। শুধু চাটবে না এক কামড় করে মালাইও ওরা খাবে। দাদাজানের বটুয়া না মিলিটারি আমাদের দেশে আগে ঢুকেছে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। তবে এই মিলিটারিরা না-কি আমাদের মেরে ফেলবে। মেরে এই দেশের দখল নেবে। আমরা ভেবে পাই না এই যে দূর্বাঘাস, রঙ্গনের থোপ এই সব কি ওদের? তাহলে আমাদের ওরা কেন মারবে? বড়রা বলাবলি করে মিলিটারি মানুষ মারতে মারতে গ্রামে আসছে। ইসকুল-কলেজ সব বন্ধ হলো বলে! বড়দের কথা শুনে আতঙ্কে আমরা নাই হয়ে যাই। ইশকুল বন্ধ হলে আমাদের পা আর ভিজবে না শিশিরে। ল্যান্টেনার ঝোপেও আমরা আর পড়তে পারব না। আর মানুষ মারছে ওরা-বাচ্চারাও কি মানুষ?

তবে তো আমাদেরও ওরা মেরে ফেলবে। আর ওই যে রোদের মতো হলদে ফুলের গাছটাÑ তার নাম আমরা জেনেছি- অলকানন্দা। অলকানন্দার কি হবে তবে?

জমিদার বাড়ি শেষ হলেই বড় সড়ক। আমরা ওই সড়ক ধরে না হেঁটে মাঠের সরু পথ ধরে ইশকুলে যাই।

মাঠে পা দিতেই ইশকুলের টিনের ঘের দেখা যায়। সকালের রোদ্দুরে এই ঘের চকচক করে ওঠে। এই ঘেরের ভেতর আমাদের ইশকুল ঘর। একটা সাদা দালান আর অন্যটা হলুদ। এই হলুদ-দালানটা আমাদের অলকানন্দা ফুলগাছ মনে হয়। সানাউল্লাহ পিতলের ঘণ্টা এই দালানেই বাঁধা থাকে। সাদা-দালানে আপামণি আর স্যারেরা বসে। হলুদ-দালানে অফিস ঘর আর আমাদের বড় আপা। আমরা টিনের চালা ঘের দেয়া ক্লাসে বসি। জোরে বৃষ্টি নামলে আপামণিদের কথা প্রায় কিচ্ছু শোনা যায় না। আপামণিদের দুইজন আবার আমার ফুপু। ফুপুরা ক্লাসে ঢুকলে বলি।

স্মালামালাইকুম আপা।

তখনো আমাদের মন মালাই আইসক্রিমের দিকে। আমার আপা শুনে ফুপুরা কটমট করে তাকায়। পরে রেজিস্টার খাতা খুলে বসে।

রোল ১ ফাতেমা ফেরদৌসী :

রোল ২ জিন্নাত ফেরদৌসী :

রোল কলের ফাঁকে ফুপু ফের আমার দিকে তাকায়, চোখে রাগ।

আপা বলবি তো বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে রাখব।

ফুপুদের কটমটানি তাকানোর মাঝেই ইশকুল ছুটি হয়ে যায়।

আর আমরা ঘরবন্দি থাকি। অলকানন্দা ফুলের বাহার আমরা ভুলি না। কি যে সুন্দর এই ফুল! সানাউল্লাহর হাতের ঘণ্টার মতো। কাঠের হাতুড়ির বাড়ি পড়লেই ঢং ঢং করে বেজে উঠবে। এবং ফাস্ট পিরিয়ড ধরার জন্য আমরা জোর দৌড় দেব। আমরা ইশকুলের উদ্দেশে দৌড়াই না কিন্তু ট্র্যাঞ্চের উদ্দেশে দৌড়াই। আমাদের বাড়ির পেছনের বিস্তৃত জায়গাটা জলাজংলা- সেখানে দাদাজান কবরের চাইতে বড় গর্ত করে উপরটা টিন দিয়ে ঢেকে দেয়। গোলাগুলি শুরু হলেই আমাদের ওই ট্র্যাঞ্চের ভেতর ঠেলে দেওয়া হয়। এভাবেই ঘর আর ট্র্যাঞ্চ করতে করতে আমাদের স্পঞ্জের ফিতার বুটকুলি ছিড়ে যায়। কি বিপদ! জলাজংলায় ভাঙা কাঁচ, শুকনা খড়ি, মাটির ঢেলা, আমরা খালি পায়ে হাঁটব কি করে? ফলে আমরা বুটকুলি আর প্লাস্টিকের ফিতা জ্বলন্ত কুপিতে গরম করে ফের লাগিয়ে নেই। ওই বুটকুলি জোড়া দেওয়া স্যান্ডেল পড়ে ট্রাঞ্চের দিকে দৌড়াই। ইতোমধ্যে দাদাজানের বটুয়া খালি হতে শুরু করেছে আর পাকিস্তানি মিলিটারি বন্দুক নিয়ে জমিদার বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। দাদাজান বটুয়ায় হাত দেয় না। আমরাও আর ইশকুলে যাই না। আমাদের মালাই আইসক্রিমওয়ালা, দফতরি সানাউল্লাহ ভাই, বাদামওয়ালা জব্বরের কি অবস্থা তাও জানতে পারি না। বড়দের ফিসফিসানিতে বুঝি অবস্থা সঙ্গীন। আমাদের ইশকুলে যাওয়া বন্ধ, বাড়ির বাইরে যাওয়া বন্ধ। আমাদের মা-ফুপুরা, বড় বোনেরা বোরখার ভেতরে নিজেদের লুকাতে শুরু করে।

কি হলো? আমাদের এমন অবস্থা কেন হলো?

মুখ কালো করে দাদাজান দাঁড়িতে হাত বুলায়। সংসার খরচের জন্য দাদীজান টাকা চাইলে দাদাজান বটুয়া হাতায়। আমি দেখি বটুয়ার রংটা কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়া। ফ্যাকাশে। রংটা ঠিক খাকি কি না ধরা যায় না। দাদাজানের বটুয়ার খাকি রং কি মিলিটারিরা নিয়ে গেছে? নইলে তা এমন রংহীন সাদাটে দেখায় কেন?

বুইন ইশকুল তো আর খুলব না।

কি বলে এই বুইড়া? আমি যেন হঠাৎ লাটিমের মতো টিনের ঘেরের ভেতর ঘুরতে থাকি। ইশকুল না খুললে কীভাবে কি? ওই টিনের ঘেরের ভেতর যে কত কি? শ্লেট-পেন্সিল-বই।

সাদা আর হলুদ দালান। সানাউল্লাহর ঘণ্টা।

যা ঢনঢন করে বাজালেই আমাদের ছুটি। আমরা তখন ফড়িংয়ের মতো উড়তে উড়তে অলকানন্দা গাছের কাছে। তেড়ে আসা রাজহাঁসের দঙ্গল দেখব। ল্যান্টেনার ঝোপে হুমড়ি খেয়ে পড়লে সব ফুল তার ঝরে যাবে। বড়রা বলে সানাউল্লাহর বউটাকে মিলিটারিরা বেইজ্জত করে ইশকুলের সামনে ফেলে রেখে গেছে।

বেইজ্জত কি?

আমরা ভালো বুঝি না।

তবে যাই হোক ইশকুলের সামনে এইসব কি?

জমিদারবাড়িতে মিলিটারিদের ক্যাম্প। বাসাইলে ক্যাম্প। আমাদের ইসকুলে না-কি ওরা বোমার মেরেছে।

বোমা কি? আর আমাদের ইশকুলের দোষ কি?

ইশকুলের আগুন দেখে আমরা বড়দের সাথে গই-গেরামে পালাতে শুরু করি। বড়রা আমাদের নিরাপদে রাখতে চায়। আড়ালে রাখতে চায়।

আমরা কাঁদতে কাঁদতে পথ হাঁটি।

সানাউল্লাহর বউটা না-কি আর হাঁটতে পারে না। তার দুই পা অবশ হয়ে গেছে।

গই-গেরামের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা শুনি সানাউল্লাহকে ওরা মেরে ফেলেছে। আমার মাথার ওপর দিয়ে সাঁ সাঁ করে গুলি ছুটে যায়।

বড়রা বলে-

জোরে হাঁটো সোনারা।

কীভাবে জোরে হাঁটবো আমরা? আমাদের ইশকুলে আগুন। ঘরে আগুন। বাজারে আগুন।

আগুন, আগুন আর আগুন।

আগুনের আঁচ আমাদের গায়ে লাগে। আমরা তখন ভোরের ইসকুল দেখি। শিশির ভেজা ঘাস, ল্যান্টেনার ঝোপ, অলকানন্দা ফুল।

আমরা হঠাৎ সান্ত্বনা পেয়ে যাই- পাকিস্তানিরা আমাদের সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে, দিক। গাছপালা সব ধ্বংস করে দিক। আমাদের দেশের মাটিকে ওরা কিচ্ছু করতে পারবে না।

এই মাটি বড় কোমল। বড় মায়াময়। সব পুড়িয়ে ছারখার করে দিলেও এখানে জীবন গড়ে উঠবে।

কত মানুষ মারবে ওরা? মারুক।

কেউ না কেউ তো বেঁচে থাকবে, থাকবেই। ফের বৃক্ষ, ফুল, লতা-পাতা জন্মাবে। সানাউল্লাহর হাতের ঘণ্টা না বাজলেও আমরা সময় বুঝতে পারব।

অলকানন্দা ফুল ফুটে উঠলেই আমরা ইশকুলের পথে হাঁটতে পারব। আমরা এতদিনে আরও জানি অলকানন্দার আরেকটি নাম আছে-ঘণ্টাফুল!

প্রথম প্রকাশ ১২ মার্চ ২০২০

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev