খুব সন্তর্পণে মোবাইলটা নিয়ে উঠে এসেছি এই ঘরে।
এটা ম্যাজেনাইন ফ্লোর। এখানে আমার মেয়ে পড়াশোনা করে। এখন আমি এই মধ্যরাতে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। আমার হাতে মোবাইল। আমি একটা সেলফি তুলব। কেন? আমার মনে হয়, মাঝে মাঝে নিজের ছবি তুলে দেখা উচিত। নিজেকে দেখা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা। এই চোখের তলায় কালি, কপালে কুঞ্চন, কপালে রগের পাশে গুচ্ছ সাদা চুল, সকালের কামানো গালে হালকা তুষার পাত, থুতনির নীচে মৌমাছির চাকের মতো নেমে আসা মাংস—এগুলো সব দেখে রাখা ভালো। তাহলে নিজেকে নিয়ে কোনও ভুল হয় না। নইলে ভুল হয়, বড়ো ভুল হয়।
কেউ কেউ শুনেছি মধ্যরাতে গোপন ডায়েরি খুলে কোন ব্যাঙ্কে কত ফিক্সড ডিপোজিট, মিউচুয়াল ফান্ড, পোস্ট অফিসে কত হলো, লকারে রাখা সোনা ও কাগজের হিসেব কষে। আবার কেউ কেউ রাতগুলো ঠিক ঠিক পার করিয়ে দিতে খুব মাউল্ড ডোজের ঘুমের ওষুধ খায়। কেউ আবার লুকোনো বোতল থেকে মেপে ঢেলে মদ্যপান করে। আবার কেউ কেউ শুনেছি মধ্যরাতে হাতের কর গোনে, সারা জীবনে কত কত মেয়ের সঙ্গে সে শুয়েছে। এটাও কেউ কেউ হিসেব রাখে।
এসব আমি করিনি কখনও। তবে ইদানীং আমি মধ্যরাতে সেলফি তুলতে আসি।
সেলফি তুলে হালকা চোখে নিজেকে দেখি। তারপর নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাই। নিজেকে স্পষ্ট করে দেখব কাল। সকালে উঠে। মর্নিওয়াক সেরে এসে। চায়ের কাপে মেরি বিস্কুট ডুবিয়ে।
এখন মধ্যরাত।
ক্রিসমাসের জন্য আশেপাশের বাড়িগুলো আলো দিয়ে সাজানো। বাইরে ঠান্ডা নেই। কলকাতায় আর শীত আসবে না। আসলে আমাদের বুঝি শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা বলে আর হাহাকার নেই। ওপরের পাশাপাশি দুই ঘরে স্ত্রী আর কন্যা ঘুমাচ্ছে। জানলার কাচে গাল চেপে দেখলাম ঠান্ডা হয়েছে কি না? বাইরের আলোতে দেখলাম জড়ানো কুয়াশা।
কুয়াশা থাকলে স্পষ্ট করে কিছুই দেখা যায় না। স্পষ্ট করে দেখতে হলে সেলফি তুলতে হয়। তারপর সেটা পরদিন দেখো, দেখো আর নিজেকে বলো—
বলো মানে নিজেকে সাবধান করো। মর্নিংওয়াকে হাঁটো, কিন্তু ছুটো না। চা লিকার, চিনি নেই। গিজারের উষ্ণ জলে স্নান সেরো। ঠিক সময়ে প্রেশারের ওষুধ। মাপা ভাত। মাপা জল। মেট্রোর সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় রেলিং ছুঁয়ে থেকো। দৌড়ে বাস ধরা নয়। খুব মেপে পা ফেলো রাস্তায়। দেখে পার হও—। দু-চোখ শান্ত রাখো। মন অবাধ্য করো না।
কেননা এই সময়ই ফোন আসবে তার। আমার মুঠোর ভেতর সে বাজবে। সে মানে একটি মেয়ে। তার ডাক নাম মুনিয়া। ছদ্মনামও হতে পারে।
—বাস পেয়েছেন?
আমার উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’।
‘না’ হলে বলবে, ঠিক আছে বাসে উঠুন, সিট পেয়ে বসুন, তারপর ফোন করছি—।
যদি ‘হ্যাঁ’ বলি। মানে আমি বাসে উঠেছি। আমি সিট পেয়েছি। তাহলে সে একটু থামবে। যেন নিজেকে গুছিয়ে নেবে। বলবে, ‘আজ কতক্ষণ হাঁটলেন?’
‘আমি তো—’। গলা খাকারি দেবো। ‘আমার বাঁধা চল্লিশ মিনিট।’
‘বাজে কথা। মাঝে তো স্বপনবাবুর বিদেশে থাকা ছেলের গল্প শুনলেন।’
‘না, না স্বপনবাবু আজ আসেননি।’
‘তাহলে কে—নরেন সামন্ত। নিশ্চয়ই জোর করে আপনাকে দুধ চা খাওয়ালো?’
আমি হাসলাম। ‘আগে তো সকালবেলা দুধ দেওয়া চা-ই খেতাম।’
‘তার মানে খেয়েছেন? অথচ আপনি বলছেন চল্লিশ মিনিট হেঁটেছেন। আজকাল খুব ফাঁকি দিচ্ছেন।’
‘সত্যিই ইদানীং মর্নিওয়াকে খুব আড্ডা হচ্ছে।’
‘বাজার গিয়েছিলেন?’
‘না। আজ যাইনি।’
‘বাজারে আজ কিন্তু ছোটো ছোটো কালো ডোরা কাটা সাদা ট্যাংরা মাছ উঠেছে। আজ গেলেই পেতেন। উনি তো কদিন ধরেই আপনাকে বলছেন। আপনি ভালো করে খুঁজছেন না। রোজ একবার কোরে বাজারে যান, ঠিক পেয়ে যাবেন।’
‘হ্যাঁ, আজ আর হয়ে উঠল না। বাড়িতে প্রচুর সব্জি আছে, তাই—।’
‘ইস আমাদের বাজারে ওই ট্যাংরাগুলো জলে চরে বেড়াচ্ছে। দেখেই মনে হলো, ইস উনি ক-দিন ধরেই বলছেন। আমার বাড়িটা যদি কাছে হতো, আমি ঠিক আজ কিনে ওনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আসতাম।’
‘তুমি কি বাজার করো।’
‘না, রোজ করি না। তবে বাজারের খবর রাখি।’
‘আজ করেছো?’
‘হ্যাঁ!’
‘তোমার বাড়িটা কত দূর?’
ফোনের ওপার থমকে থাকে।
‘এত কথা বলো, বাড়িটা কোথায় বলো না কেন?’
‘বলব, বলব। বলব না শুধু, একদিন গিয়ে নিয়ে আসব। তারপর খুব যত্ন করে বসিয়ে আপনাকে খাওয়াবো। আজ আমি কুঁচো চিংড়ি কিনেছি। টক করব। আর দেশি পারশে মাছ। হালকা সরষে দিয়ে ঝাল করেছি। আপনি আর লুকিয়ে লুকিয়ে মাটন খাচ্ছেন না তো? মাটনটা খাবেন না।’
‘না, না, খাই না।’
‘আপনার মেয়ে টিনা ভালোবাসে ঠিক আছে। তারজন্যে কিনবেন। কিন্তু তার নাম করে কিনে প্রতি রবিবারই তো শুনি মাটন আর ভাত খেয়ে দুপুরে ঘুমিয়েছেন। এটা ঠিক নয়। আমার সঙ্গে ওনার দেখা হলে আমি ওনাকে ঠিক বলব। উনি অল্প বয়েসে কান্নাকাটি করে আপনার ড্রিংক করাটা যেমন বন্ধ করিয়েছে, তেমন এখন মাটন খাওয়াটাও বন্ধ করাতে বলব।’
‘ওফ তুমি আর ওকে উসকিও না। একে মা মনসা ধুনোর গন্ধ দিও না। আরে আমি কি নিয়মিত ড্রিংক করতাম? বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ন-মাসে ছ-মাসে একটু-আধটু খেলে এমন করত—যেন পৃথিবী রসাতলে গেল।’
‘ঠিক, ঠিক করতেন। আমার সঙ্গে যেদিন ওনার দেখা হবে এটার জন্য ওনাকে প্রথমেই ধন্যবাদ দেব।’
আমি হাসি, ‘কী ভাবে দেখা হবে।’
‘হবে হবে, যে কোনও দিন দেখা হয়ে যাবে। যে কোনও শপিং মলে। ওনার সঙ্গে আপনাকে দেখলে আমি ঠিক চিনতে পেরে যাব।’
‘তুমি তো আমাকেই চেনো না।’
‘কে বলল চিনি না? আমি আপনার অনেক অনেক ছবি দেখেছি। আপনার অফিস দেখেছি। আপনার স্ত্রী-মেয়ের ছবি দেখেছি। সবগুলোতে দেখবেন আমার লাইক আছে।’
‘তোমার ছবি দাও না কেন?’
‘কে বলল—দিইনি। ওই তো একটা পদ্মলতা আর তাকে জড়িয়ে একটা সাপ!’
‘পদ্ম এবং সাপ! বাহ এই তোমার ছবি হলো? পদ্মের সৌরভ, সাপের বিষ!’
ফোনের অপরপ্রান্ত হাসে। ‘খুব সাবধান, পদ্মবনে কেউটে থাকে—।’
আমি মধ্যরাতে উঠে এসেছি ম্যাজেনাইন ফ্লোরে। আমি সেলফি তুলব। আমার চোখের তলায় কালি। সারা দিনের ক্লান্তি। কপালে বলিরেখা। রগের পাশে গুচ্ছ পাকা চুল। বয়েসের ধর্ম! আমার বুকের ভেতর ভয়। মান, সম্মান, স্ত্রী, সন্তান। এই আমি। আঠেরো নই। পঁচিশ নই। এই আমি, এককন্যের পিতা। আমার সুখে থাকা স্ত্রী পারমিতার স্বামী।
ঘরের রং গাঢ় নীল। এতদিন নীল রংটাকে আকাশ ভাবতাম। এখন এই মধ্যরাতে ঘরের আকাশ নীল রং জল, জল শুধু জল হয়ে গেছে। এই জলেই কি পদ্ম ফোটে? সেই মৃণাল কাণ্ডে কি পাকে পাকে সর্প বিরাজ করে!
আমার মিউট থাকা ফোনটা ডাকল।
‘কী করছ?’
সূর্য ডুবলে সে আর আমাকে আপনি আজ্ঞে করে না। রাত হলে সে বদলে যায় দ্রুত।
আমি বলতে পারতাম, আমি সেলফি তুলছি। আমি নিজেকে সামলাচ্ছি। বলতে পারতাম, নিজেকে শাসন করছি। কিন্তু আমি সে কথা বললাম না। বললাম, ‘এই তো, বই পড়ছি।’
‘উঁহু মিথ্যে কথা! তুমি আমার অপেক্ষা করছ? আমার ফোনের অপেক্ষা, সত্যি করে বলো আমার গা ছুঁয়ে।’
‘সত্যি বলছি!’
‘না, তুমি মিথ্যে বলছ! বলো, বলো, আমার গা ছুঁয়ে।’
আমি শান্ত গলায় বলি, ‘তোমার গা কই?’
‘হাত বাড়াও, এই তো, এই তো আমার গা, এই আমার চোখ, এই আমার ঠোঁট, আমার স্তন, স্তনবৃন্ত, ছুঁয়ে বলো।’
‘হ্যাঁ, আমি মিথ্যে বলেছি।’
‘আমি জানতাম। রাত হলে তুমি মিথ্যে বলো। সকালের মানুষ আর রাতের মানুষ তুমি আলাদা। পালটে যাও।’
আমি স্বর চেপেও হেসে উঠলাম। এই প্রথম আমাকে কেউ বলল, দিনের আমি আর রাতের আমি আলাদা। আমি পালটে যাই।
মেয়েটা বলল, ‘তোমার সামনে আয়না আছে?’
‘না। এই ঘরে একটাও আয়না নেই।’
মেয়েটা আলতো করে হাসল, বলল, ‘আমার মনে হয় প্রতিটা ঘরে একটা করে আয়না রাখা উচিত। যে কোনও সময় মানুষের নিজেকে দেখার দরকার পড়ে। নিজেকে চিনে নিতে হয়।’
ঠিক বলেছে, নিজেকে দেখতে পেলে মানুষ অনেক শান্ত আর সংযত হতে পারে। একটা আয়নার জন্য আমি ঘরের চার চারটে দেওয়াল দেখলাম। এই ঘরের দেওয়ালে কাল একটা আয়না লাগাবো।
‘কী হলো আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?’
আমি চুপ করে আছি। সব কথার উত্তর হয় না। বললাম, ‘তোমার ঘরে আয়না আছে?’
‘আছে। আমি আয়নার সামনে বসে তোমার সঙ্গে কথা বলছি।’
‘নিজেকে দেখতে পাচ্ছো?’
‘পাচ্ছি বলেই তো কথাগুলো বলতে পারছি। তুমি নিজেকে দেখতে পাও না! আমি জানি। আয়নায় দেখবে নিজেকে। যাও ছাদে যাও! ছাদটাকে আয়না বানাও।’
‘ছাদে!’
‘ছাদের দরজায় তালা মারা। চাবি খুলতে হবে। অনেক হ্যাপা!’
‘আসলে তুমি ভীতু!’
‘ভীতু মানে তুমি কী বলতে চাইছো, আমি বউয়ের ভয়ে—।’
‘না, এত ছোটো কথা আমি বলব না, তুমি অত বড়ো আকাশের নীচে দাঁড়াতে ভয় পাও!’
সত্যি অত বড়ো আকাশের নীচে আমার ভয় করে। তবে আমি আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারব। কেননা আয়না আমাকে খুব বেশিদূর দেখাবে না। আমি ঘরের নীল দেওয়ালের দিকে মুখ করে।
‘কী হলো কথা বলছ না?’
‘কুঁচো চিংড়ির টক কেমন হলো?’
‘ওফ রান্না বাজার এসব কথা রাখো।’
‘কাল মর্নিংওয়াকে গিয়ে টানা হাঁটব।’
‘আমি হাঁটার কথা শুনতে চাই না। তুমি আমাকে শোয়ার কথা বলো।’
‘কী বলব? যাব, একটু পরে গিয়ে শুয়ে পড়ব।’
‘একা শোবে? একা! কেন?’
‘কেন আবার আমি তো একাই শুই। টিনা কিছুতেই ওর মাকে ছাড়া শোবে না। আর পারমিতাও টিনাকে ছাড়া—।’
‘বাজে কথা, তুমি চেষ্টা করেছো কখনও। পারমিতাকে বলেছ—টিনাকে অন্য ঘরে পাঠাও—আমি তোমার কাছে শোব!’
‘যা, এ কথা বলা যায় নাকি!’
মুনিয়া হাসে। অদ্ভুত ব্যঙ্গের হাসি। ব্যঙ্গের হাসির সঙ্গে ভাঙা কথা থাকে। সে হাসিমাখা কথা গায়ে জলবিচুটি দেয়। ‘ন্যাকা!‘
‘তুমি কি আমাকে ন্যাকা বললে—।’
‘হ্যাঁ, আরও কিছু বলার ইচ্ছে ছিল, বললাম না। তোমরা স্বামী-স্ত্রী আর তোমাদের মেয়ে তিনজনেই ন্যাকা। তুমি ভাবছ—মেয়ের কাছে তুমি ছোটো হয়ে যাবে। তোমার স্ত্রী ভাবছে, তোমার নাইনে পড়া মেয়ে যদি কিছু মনে করে। আর তোমাদের মেয়ে ভাবছে তার বাবা-মা আর পাঁচজনের মতো না। তারা ওসব করে না।’
এসব কথায় আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। বললাম, ‘ছেড়ে দাও মুনিয়া ওসব কথা।’
‘আমি মুনিয়া নই। আমি কাজল। এখন দিন নয়। এখন রাত।’
‘ঠিক ঠিক। তুমি তো এখন কাজল। দিন থেকে রাত হলেই তোমার নাম বদলে যায়।’
‘আমিও বদলে যাই।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমিও বদলে যাও। শুধু আমি এক থাকি।’
‘তুমি এক থাকো কারণ তুমি নিজেকে দেখতে পাও না। নিজেকে নিজের আড়ালে লুকিয়ে রাখো। তুমি আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারো না। আকাশের বিশালতাকে ভয় পাও।’
‘না, না, আমি এমন নই।’
‘তুমি কেমন তুমি নিজে জানো?’
‘কেন জানব না?’
‘তোমার ইচ্ছে করে না পারমিতাকে আদর করতে?’
‘করে। সেটাই স্বাভাবিক।’
‘তবে স্বাভাবিক কাজটা করো না কেন? কারণ শুধুমাত্র তোমার মেয়ে টিনার জন্য ওই কাজটা আর স্বাভাবিক থাকে না, হয়ে যায় অস্বাভাবিক। এখন পারমিতার কাছে এগোতে গেলে তোমার একটা আড়ষ্টতা গ্রাস করছে। আর পারমিতাও লজ্জা পায় তোমার কাছে!’
‘উফ বাদ দাও। অন্য কথা বলো।’
‘কী কথা বলব? একজন বর্ণান্ধকে কি আমি রং চেনাবো?’
‘আমি তোমার রঙে নিজেকে রাঙাবো!’
‘রাতের আমি মানে তো তোমার কাছে শরীর! শরীর চিনেছ! এসো তাহলে আমরা শরীর দিয়ে চিনি।’
কী উত্তর দেব। আমার গলার স্বর ডুবে গেল!
কাজল বলল, ‘আমার ঠোঁটে ঠোঁট রাখো। চুমু খাও। আমার জিব চোষো।’
আমি দু-চোখ বন্ধ করে ফেলেছি। ওর ঠোঁটের ওপর আমার ঠোঁট চেপে ধরেছি। কাজল বলল, ‘ভালো লাগছে?’
‘উঁহু!’
‘আমার বুকে হাত দাও।’
ও বলার আগেই আমি মনে মনে হাত রেখেছি কাজলের বুকে। কী উত্তাপ!
‘আ! হাত রাখো মানে, হাতটা কি পাথরের মতো ফেলে রেখে দিতে হয়? আমার বুকের ভেতর খেলা করো। এই পৃথিবী তোমার!’ কাজল থামল, ‘এই তো গুড বয়!’
কাজল আবার জিগ্যেস করল, ‘ভালো লাগছে?’
‘লাগছে।’
‘খুব!’
‘খুউব! কাজল একদিন আমি তোমার কাছে যাব?’
‘একদিন কেন? আজই এসো।’
‘আজই?’
‘হ্যাঁ, আজই। ম্যাজেনাইন ফ্লোর থেকে ঘরে যাও। তোমার ঘরে নয়। পাশের ঘরে। যেখানে পারমিতা শুয়ে আছে। আস্তে করে দরজা ঠেলে ঢোকো।’
‘ওই দরজার পাল্লায় বিশ্রী একটা আওয়াজ হয়।’
‘ওই আওয়াজের অপেক্ষায় পারমিতা জেগে আছে।’
‘কী হবে গিয়ে?’
‘আমি বলছি তো—পারমিতা জেগে আছে। তুমি গিয়ে ওর পায়ের পাতায় হাত রাখো। ওকে ডাকো।’
‘ও ঘুমোচ্ছে।’
‘ও জেগে আছে। পারমিতা জানে তুমি ঘর ছেড়ে ওপরে গেছো। ম্যাজেনাইন ফ্লোরে। যতক্ষণ না তুমি ফিরছো ততক্ষণ ও জেগে আছে। যাও গিয়ে ওকে ডাকো।’
‘টিনা জেগে যাবে।’
‘জাগবে না।’
‘যদি জাগে? ঘুম ভেঙে যদি দেখে বাবা এসে মাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে?’
‘দেখবে, ওকে দেখতে দাও।’
‘যদি ঘুম ভেঙে দেখে ওর পাশে মা নেই।’
‘ওকে সেটা বুঝতে দাও, ও বুঝে নিক।’
‘যদি খোঁজে?’
‘খুঁজে নিক, প্রয়োজন হলে ও এসে তোমার ঘরের বন্ধ দরজার পাশে এসে দাঁড়াবে। অজানা অচেনা আওয়াজ শুনে ফিরে যাবে—।’
‘আমি পারব না। মেয়ের কাছে ছোটো হয়ে যাব।’
‘তুমি এটা পারবে না, অথচ তুমি অচেনা অজানা একটা মেয়ের কাছে আসবে। তোমার ছোটো হওয়ার এত ভয়? ঠিক আছে তাহলে বউয়ের কাছে ছোটো হও। আমি যদি পারমিতাকে জানাই তোমার স্বামী রোজ রাতে আমার সঙ্গে গল্প করে। আমি কাজল। আমাকে চুমু খায়। আমার জিব চোষে। আমার বুকে হাত দেয়। আমার সঙ্গে খেলা করে—।’
‘প্লিজ। এটা করো না। ও ইদানীং আমাকে সন্দেহ করছে। আমি বুঝি আমি ওপরে গেলে ও জেগে থাকে। এখন কিছু শুনলে ও পাগল হয়ে যাবে।’
‘তাহলে আমার ফোন রাখো। নীচে যাও। পারমিতাকে ডাকো। ও জেগে আছে। তোমার অপেক্ষায়। হাত রাখো পায়ের পাতায়।’
ঘরের রং গাঢ় নীল। নীল রং আকাশ নয়। এখন এই মধ্যরাতে ঘরের আকাশ নীল রং জল, জল শুধু জল হয়ে গেছে। এই জলেই কি পদ্ম ফোটে? সেই মৃণাল কাণ্ডে কি পাকে পাকে সর্প বিরাজ করে! সে ফিসফিস করে, ‘যাও, পারমিতার পায়ের পাতা তোমার ছোঁয়ার অপেক্ষায় আছে। যাও!’ সে গুনগুন করে, পারমিতার পায়ের পাতা—লজ্জাবতী লতা! ঘাসের নীচে লুকিয়ে থাকে নরম জলের সোঁতা!