‘উত্তরবঙ্গ চেরাপুঞ্জী আর দক্ষিণবঙ্গ এখন ভেজা গেঞ্জি’র বদনাম ঘুচিয়ে বাংলার দক্ষিণ প্রান্তে বৃষ্টি নামাতে শুরু করেছে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু। তাতেও ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল অবস্থা বঙ্গবাসীর। এই মুহূর্তের গরমে দরদর করে ঘামতে ঘামতে হাতে যদি একগ্লাস চিল্ড সফট ড্রিংকস পাওয়া যায় তবে শরীর ও মন সতেজতায় ভরে ওঠে। সফট ড্রিংকসের কথা শুনেই ফিটনেস পুষ্টি নিয়ে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিরা বলতেই পারেন গাদাখানেক ক্যালোরির গল্প।
উপকারের চেয়ে অপকারের কথাই যখন উঠছে তবে ‘জল-রুটি’ খাওয়াই ভালো। অবাক হলেন তো? এই গরমে লস্যি কিম্বা দইয়ের ঘোলের কথা না বলে বলছি কিনা ‘জল রুটি’র কথা! আসলে প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলতেন জল-রুটি খাওয়ার কথা। এবং এটি বলতেন নীহাররঞ্জন মজুমদারকে। কে ছিলেন এই নীহাররঞ্জন মজুমদার?

বরিশালের বিপ্লবী, অনুশীলন সমিতির সদস্য, বিপ্লবী দলের কাজ করতেন নীহাররঞ্জন মজুমদার। তরুণ সতীন সেনের সঙ্গে পকেটে চারটি পয়সা নিয়ে শিয়ালদহে চলে আসেন নীহাররঞ্জন। ১৯১৮ সালে জীবিকার তাগিদে কলেজ স্কোয়ারের কাছে একটি শরবতের দোকান খোলেন। নাম দিয়েছিলেন প্যারাডাইস। দিঘির পিছনের বাড়িটা আসলে ছিল তাবড় তাবড় বিপ্লবীদের গুপ্ত আড্ডা। স্বদেশী আদর্শে উদ্ভূত হয়ে নীহাররঞ্জন শরীরচর্চা, লাঠি খেলা এমনকি হামিদা পালোয়ানের আখড়ায় কুস্তি অবদি শিখেছিলেন।
গুপ্ত নির্দেশ হাত বদলে হতো এখানেই। আসতেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, জগদীশচন্দ্র বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, পুলিন বিহারী দাস, মেঘনাথ সাহা প্রমুখ। নেতাজির জন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠের চেয়ার ছিলো। সেটাতেই বসতেন তিনি। ক্রমে স্বদেশী প্রেমের মূল্যবোধের সঙ্গে পুষ্টিকর সরবতের আরেক নাম হয়ে উঠলো প্যারাডাইস।

দোকানের আড়ালে বিপ্লবী কাজকর্ম চলতো পুরোদমে। ইংরেজ সরকারের নজরে পড়ায় ১৯৩৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় দোকান৷ পড়ে অবশ্য মামলার ভয়ে নাম পাল্টে ফেলে ১৯৩৭ সালে ‘প্যারামাউন্ট’ নামে ফের দোকান চালু হয়৷
সেই সময় আম বাঙালির মধ্যে দোকানে গিয়ে শরবত খাওয়ার চল খুব একটা ছিল না। গৃহস্থের কুঁজো-কলসির ঠাণ্ডা জলের মধ্যে চিনি বা গুড় মিশিয়ে তাতে এক চিলতে পাতিলেবু কচলিয়ে, সামান্য নুন দিয়ে তৈরি হতে শরবত। খুব বেশি হলে আমপোড়া বা দইয়ের ঘোল। উত্তর কলকাতার বাবুরাই ছিলেন দোকানে গিয়ে শরবত খাওয়ার ক্রেতা। তারাই ভিড় করতেন প্যারাডাইসে গিয়ে। মেসের কিংবা কলেজের ছাত্ররাও আসতো কিন্তু তাদের পকেটে সেরকম বেশি পয়সা থাকত না। তাই ছাত্রদের জন্য প্রফুল্লচন্দ্র কম দামে পুষ্টিকর এক শরবতের রেসিপি বানিয়ে দিয়ে যান নীহাররঞ্জনকে। সেটাই ওই ‘জল-রুটি’। সেই রেসিপিতেই মজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, কলেজ স্ট্রিটের মেসবাসী গরিব ছাত্রকূল রাজপরিবারের অভিজাতদের এক ছাদের তলায় নিয়ে আসে।

‘জল-রুটি’ মানে কিন্তু মোটেই জলের মধ্যে ভেজানো রুটি নয়। ওটা আসলে ডাবের জল আর শাঁস দিয়ে তৈরি সব শরবত। ডাবের শাঁসটাকে আচার্য বলতেন রুটি। পরাধীন ভারতের ছেলেপুলেদের পেট আর মন ভরাতে ‘ফুড ভ্যালু’ ঠাসা শরবতকে আরো স্বাদু বানতে বিদেশি এসেন্সের তুকতাক আচার্য শিখিয়েছিলেন নীহাররঞ্জন মজুমদারকে। আচার্যের সেই রেসিপি দিয়ে তৈরি পাতলা শাঁসের ডাবের মিষ্টি জলের শরবত এখনো সুপারহিট আইটেম এই দোকানের।
সেই সময় শরবত ছাড়াও স্পেন্সার্স কোম্পানির ‘ভিমটো’ নামে একটি সফট ড্রিংকস আর আইসক্রিম বিক্রি হতো এই দোকানে। এখন ডাবের শরবত ছাড়াও রোজ-স্ট্রবেরি-ভ্যানিলা-মালাই সহযোগে ‘পাইনাপেল’, রাবড়ি-আমন্ড-কাজু-কিশমিশ সহযোগে ‘প্যাশন ফ্রুট’, দুধ-ক্ষীর-ক্যাডবেরি-আমন্ড-কাজু-কিশমিশ সহযোগে ‘কোকো মালাই’, রাবড়ি-দুধ-ক্ষীর-কাজু-কিশমিশ সহযোগে ‘কেশর মালাই’, পাকা আমের ‘ম্যাঙ্গো ম্যানিয়া’-এর মতো হরেক রকমের আইটেম পাওয়া যায় এখানে। নানান রকমের সুগন্ধি ব্যবহার করা হয় শরবতে। একটি মজার ঘটনা বলি। ষাটের দশকে সন্ধ্যা রায়ের বিয়ের নেমন্তন্নতে নীহাররঞ্জন মজুমদারের পুত্র মৃগেন মজুমদার সরবতের ‘চন্দন এসেন্স’ একটু জামায় ছিটিয়ে গেছিলেন। তাতেই সুগন্ধ ভুরভুর করছিলো গোটা বিয়ে বাড়ি জুড়ে।

প্রতিদিন সকালে বসিরহাট থেকে ডাব আসে এই দোকানে। দোকানের ইটালিয়ান মার্বেলের তৈরি সাদা পাথরের টেবিলগুলি ১২ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন নীহাররঞ্জন। এই টেবিলেই বসে উত্তমকুমার খেতেন ‘গ্রিন ম্যাঙ্গো’, ‘ভ্যানিলা মালাই’, সুচিত্রা সেন খেতেন ‘রোজ মালাই’। বিশ্বের প্রায় সব বাঙালি সেলিব্রেটি এসেছেন এই দোকানে। বিধানচন্দ্র রায় থেকে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন থেকে শুরু করে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় সকলের আনাগোনা ছিল এই দোকানে! সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রিয় শরবত ‘জল-রুটি’ অর্থাৎ ডাবের শরবত।

আগে তো বাঙালি মনে করত যে শরবত গ্রীষ্মকালেই খেতে হয়। এখন মানুষ অনেক এ্যাডভান্স। তারা জানে যে শীতকালেও শরবত খেতে হয়। তাই গোটা বছর ধরেই দোকানে ভিড় লেগেই থাকে। সরবতের দামও আমআদমির নাগালের মধ্যে। কোয়ালিটি আর মূল্যের সঠিক কম্বিনেশন থাকায় ডাক পরে বিয়ে, পৈতে, অন্নপ্রাশনের মত পারিবারিক অনুষ্ঠানে।

কোন শাখা বা ফ্রাঞ্চাইজি সিস্টেমে বিশ্বাসী নন দোকানের কর্তারা। তারা মনে করেন এতে শরবতের কোয়ালিটি নষ্ট হবে। এমনকি বিজ্ঞাপনেও বিশ্বাসী নন মৃগেনবাবু। শরবত প্রেমীদের ভালোবাসাই তাদের ব্যবসার মূলধন। বর্তমানে তৃতীয় প্রজন্ম এই ব্যবসার হাল ধরেছেন। শোনা যায় মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস লতায়-পাতায় এই পরিবারে আত্মীয়। এই দোকান এবং বাড়িটাকে সরকার পক্ষ থেকে হেরিটেজ তকমা দিয়েছে। আজও দোকানের দেওয়াল জুড়ে নানা মনিষীদের ছবি টাঙানো রয়েছে। বাঙালির ঐতিহ্যের আরেক নাম প্যারামাউন্ট শরবত।
আটের নিয়ের দশকে নিয়মিত খেয়েছি। তারপর অনেকদিন আর খাওয়া হয়নি। মনে করিয়ে দিলেন। যেতে হবে আবার!
অনেক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????
যাইনি কখনো। নাম শুনেছি বহুবার। তোমার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে যেতে হবে একবার।
সুযোগ পেলে অবশ্যই ঘুরে এসো।
থ্যাঙ্ক ইউ।
বাঃ! চমৎকার প্রতিবেদন।
পরম প্রাপ্তি।
ঘরে আর বাইরে,যেখানেই যাইরে,মিঠা স্বাদ গন্ধে
কিছু খাওয়া চাইরে* সকালে বা সন্ধ্যায় অথবা
দুপুর রোদে সরবত হলে ভাই* বড় মজা জীবনের
মিঠা রসে খুঁজে পাই* কোলকাতার রাস্তায় ছুটির
দিনে কতদিন কতবার কোকোকোলা,নিম্বু পানি,
ঘোল,আম পোড়া সরবত খেয়েছি কিন্তু বইপাড়ায়
ঘন্টার পর ঘন্টা বই খুঁজে ক্লান্ত হয়ে “প্যারামাউন্ট
যাওয়া খাওয়া হয়নি আপনার প্রতিবেদন পাঠের
পর আফসোস হচ্ছে।খুব ভালোলাগলো তৃষ্ণার্ত
হলাম।ভালোলাগা ভালোবাসা।
আগে ওই অঞ্চলে অনেক গেছি, কিন্তু ওই দোকানে গেছি কিনা এখন বলতে পারবো না, খেলেও মনে নেই,
এবার সুযোগ পেলে যাবো।
এতো কিছু জানতাম না, পরে ভালো লাগলো,