“নিরুপম মহাশয়তান। রোজ রাতে মাল খেয়ে বাড়িতে এসে মাঝরাতে বউটাকে ধরে পেটায়। বেদম মার। মেয়েটা কেঁউ কেঁউ করে কাঁদে। আর ভোর রাতে নিরুপম কাঁদে ভেউ ভেউ করে, বলতে থাকে আমাকে তুমি ক্ষমা করলে কিনা! ক্ষমা, ক্ষমা, ক্ষমা! তারপর কাপ, ডিশ, গেলাস যা হাতের কাছে পায়, দুদ্দাড় ভাঙতে থাকে।
শেষে ছুটে আসে দোতলার বারান্দায় — আমি আত্মহত্যা করবো — আই উইল কমিট সুসাইড। নাচের পুতুলের মতো ঝলঝলে নিরূপম রেলিং এ ঝুলছে, পা দুটো ধরে আছে নিরুপমের বউ প্রাণপণে।
পাশের বাড়ির তিনতলার ছাদে জ্ঞানবাবু ব্যায়াম করেন। তিনি দাবড়াচ্ছেন — তুই যদি লাফ মারিস নিরুপম, আর তুই যদি না মরিস, তাহলে তোকে আমি হাজতে পাঠাবো হতচ্ছাড়া!”
এটা একটা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা মজার নীতি গল্প। এমন একটা ঘটনা না বলে থাকা যায়। এবার গল্পটির বিশ্লেষণ করা যাক।
শেখা গেলো মদ্যপান অত্যন্ত খারাপ একটি কাজ। মদ মানুষকে অমানুষ করে তোলে। অনুশোচনায় আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে। আর স্ত্রীর চেয়ে আপনজন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কেউ নেই। পরিশেষে নিজের থেকে মরতে গিয়ে না মরলে পুলিশে ধরে। তাহলে দেখা গেলো, পরের চর্চা হলো বটে কিন্তু এ চর্চা স্বাস্থ্যকর। এমনকি যারা এই গল্প পড়ছেন, তারাও সচেতন হওয়ার সুযোগ পেলেন।
আসলে পরনিন্দা ও পরচর্চার ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরোনো। বিশেষ করে বাঙালি মননের এই পরচরিতচর্চা খুবই আকর্ষণীয়। সেই রামায়ণ ও মহাভারতের আমল থেকে চলে আসছে। রাজা দশরথের রানীদের অন্দরমহল ছিলো পরনিন্দা ও পরচর্চার আঁতুড়ঘর। যজ্ঞসভায় সতীকে দেখে দক্ষরাজ জামাই শিবের নিন্দায় মুখর হয়েছিলো সে কথা সর্বজন বিদিত।
পরচর্চা হলো ছোট গল্পের মতো। এক নির্দিষ্ট জায়গায় আলো ফেলে। পরচর্চার অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হলো পরকীয়া। ব্যাপারটা অনেকটা “কিছু কিছু বস্তু আছে মধ্যিখানে মজা /যেমন দাম্পত্যের মাঝামাঝি অন্য জিভে গজা….”।
যতই মুখে বলুক না কেন পরকীয়া ছিছি, ওসব আলোচনা করাও গদ্দারের কাজ — অথচ সত্য মিথ্যার ধার না ধরে এই বাংলায় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায় কাদম্বরীর সুইসাইড নোটবুক, সেই আমলে বিবাহিত নজরুলের ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে সম্পর্কের কথা।
সিনেমা সিরিয়ালগুলো এ ব্যাপারে কোন অংশে কম যায় না। যে যে সিরিয়ালের চরিত্রগুলো এই চর্চার ব্যাপারে বেশি ধুরন্ধর, সেই সিরিজের টিআরপি তত বেশি। এ বিষয়ে নেট দুনিয়া, সংবাদ মাধ্যমও পিছিয়ে পরার নয়।

নেট-মহলের বেশির ভাগই একসঙ্গে রংমিলনন্তি পোষাক, অমুক দেবীর দ্বৈরথ বা তারা কেন তমুক বাবুর ভাগ্য নিয়ে জন্মালেন না ইত্যাদি চটুল চর্চায় ব্যস্ত থাকেন যে ভূভারতের নানা গুরুত্বপূর্ন খবর ছেড়ে প্রায় অর্ধ-বার্ষিক খবরের শিরোনামে থাকে এমন প্রসঙ্গ।
বেশিরভাগ এই সব ঘটনায় একজন নারীকে তোলা হয় কাঠগোড়ায়। সে নাকি পুরুষটিকে ফুঁসলিয়ে অন্যের সুখের সংসার থেকে নিয়ে গেছে। পুরুষটি যেন খুঁটিতে বাঁধা ভেড়া, ঘরের মহিলাটি ঠিক করে খুঁটে বেঁধে রাখতে পারেননি, আগল আলগা হতেই অন্য রাখাল নিয়ে ধাঁ। এ যেন নিন্দার কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে দুই মহিলাকে আর পুরুষটি উল্টে খাওয়া তো দুরস্ত, মাছ ভাজতেই জানে না।
চারপাশে হরেক চরিত্রের লোক গিজগিজ করছে। তাদের নিয়েই নিত্য ওঠা বসা, ঠোকাঠুকি। সবচেয়ে বড়ো কথা, পাঁচ জনকে তাদের কথা বলা, সমালোচনা করার মধ্যেই বেচেঁ থাকার আনন্দ লুকিয়ে আছে। আসলে, চর্চা শব্দটাই শ্রদ্ধেয়, পরের চর্চাতেও চর্চা আছে। আমরা যেমন মহাপুরুষদের জীবন চর্চা করি, তবে কালপুরুষদের কান্ড কারখানা আলোচনা দোষের হবে কেন!!!
শুধু বাঙালি কেন, সব জাতির মধ্যেই অল্পবিস্তর এই চর্চা বহমান। ট্রেনে, ট্রামে, বাসে, চায়ের দোকানে, অফিস চত্বরে… বাঙালির আড্ডা মানেই পরনিন্দা ও পরচর্চার সুখবোধ। এ ব্যাপারে মেয়েদের বদনামই বেশি। কিন্তু এই কনসেপ্ট ভুল প্রমাণ করেছে University of California। ইউনিভার্সিটির একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, কমপক্ষে ৫২ মিনিট পরচর্চা না করতে পারলে ভালো ঘুম হয় না মানুষের। সমীক্ষা আরো বলছে মহিলাদের তুলনায় পুরুষরা পরনিন্দা পরচর্চা করতে বেশি পছন্দ করে।
পরনিন্দা-পরচর্চা বা পিএনপিসি বা গসিপ যাই নামে ডাকুন না কেন শরীর, মন চাঙ্গা রাখতে, মন হালকা করতে এর জুড়ি মেলা ভার। যদি তা অন্য কারুর জন্য ক্ষতিকারক না হয় তবে বিন্দাস হয়ে পিএনপিসি করুন। তবে লক্ষ্য রাখবেন গসিপ করার ব্যক্তিটি যেন বিশ্বাসী হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অন্যের সমালোচনা করার সময় সেই ভুলগুলো থেকে নিজেদের অনেকাংশেই বিরত রাখা যায়। তবে অবশ্যই গসিপ করার সময় সচেতনভাবে শব্দ প্রয়োগ করুন।
আধ্যাত্মিক মার্গে একটি উপদেশ আছে — পরচর্চা গর্হিত কাজ। মন ছোট হয়ে যায়। আত্মা নিরেট হয়ে যায়। মনের পতন হয়। মা সারদাদেবী বলতেন, ‘‘যদি শান্তি পেতে চাও, কারো দোষ দেখো না। জগৎকে আপনার করতে শেখ। কেউ পর নয়; এ জগতের সবাই তোমার নিজের।’’
অপরের দোষ দেখতে দেখতে কখন যে নিজেই ওই দোষের কবলে পড়ে যাবেন, তা বোঝা যায় না। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দের সংস্কাররাশি এবং প্রবণতা জমা হয়ে রয়েছে। একজনের কোন নির্দিষ্ট দোষের নিন্দা বারংবার বললে নিজের অবচেতন মনের সেই সুপ্ত প্রবণতাগুলি জেগে উঠবে। আর ভালো জিনিষ দেখার অভ্যাস করলে ভিতরের শুভ সংস্কাররাশি প্রকটিত হবে এবং চরিত্রকে দৃঢ় করবে। তাই, সাধু সাবধান।
যা বলেছিস!
একদম ????
বাহ! বেশ। ভালো লাগল।
ধন্যবাদ মহাশয় ????
খুব সুন্দর লেখা
থ্যাংক ইউ ????