সদ্য সমাপ্ত সপ্তদশ লোকসভার বাদল অধিবেশন বিরোধীরা ভণ্ডুল করেছেন, এই অভিযোগে এখনও সরব বিজেপি। এবারের বাদল অধিবেশনে লোকসভার জন্য বরাদ্দ ছিল ৯৬ ঘণ্টা। লোকসভা চলেছে ২১ ঘণ্টা ১৪ মিনিট। রাজ্যসভার জন্য বরাদ্দ ছিল ৯৭.৫ ঘণ্টা। রাজ্যসভা চলেছে ২৮ ঘণ্টা।
বিজেপির পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে সংসদ চালাতে শত শত কোটি টাকা খরচ হয়, যা আসে জনগণের করের টাকা থেকে। ফলে সংসদ চলতে না দেওয়া মানে হল, জনসাধারণের করের টাকার অপচয়। এবারের বাদল আধিবেশনে, সংবিধানের ১২৭ তম সংশোধী বিলটি (power of the states and the union territories to identify and notify their own list of OBC) নিয়ে যদিও আলোচনা হয়েছে, তবে কোনও রকম আলোচনা ছাড়াই সংখ্যার জোরে একের পর এক পাশ করিয়ে নেওয়া বিলের সংখ্যা বহু। যা নিয়ে বিরোধীদের মন্তব্য পাপড়িচাট তৈরির মতো করে বিল পাশ করানো হয়েছে। বিরোধীদের সামলাতে বেশ কয়েক জন সদস্যকে মার্শাল দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। ধাক্কাধাক্কিতে সংসদ ভবনের দরজার কাচ ভেঙেছে। বিরোধীরা সংসদের রিপোর্টারদের টেবিলে উঠে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, অধ্যক্ষের দিকে কাগজ ছুড়েছেন, অধ্যক্ষের হাত থেকে নথি কেড়ে নিয়েছেন এমন অভিযোগও উঠেছে। বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত শাহের কাছে জবাব চেয়েছিলেন তাঁদের সরকার ইজরায়েলের সংস্থা থেকে ফোনে আড়ি পাতার সফটওয়্যার ‘পেগাসাস’ কিনেছে কি না? সাংবাদিক এবং বিরোধীদলের নেতা সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকের ফোনে পেগাসাসের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে, তা নিয়ে সরকারের অবস্থান কী, তাও ছিল বিরোধীদের প্রশ্ন। সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেওয়া হয়নি। যা বলা হয়েছে তাতে হ্যাঁ, না, দু’রকম মানেই হতে পারে। ফলে বিরোধীরা উত্তরের দাবিতে সংসদ অচল করে দেন। পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চের তথ্য বলছে, এখনও পর্যন্ত ইউপিএ-২, অর্থাৎ পঞ্চদশ লোকসভার বিভিন্ন অধিবেশন যে ভাবে পণ্ড হয়েছিল, ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে সেটাই ঘণ্টা হিসেবে অধিবেশন ভণ্ডুলের রেকর্ড। সেটা করেছিলেন মূলত বিজেপি সাংসদরা। সে সময় সংসদের দুই কক্ষের দায়িত্বে থাকা বিজেপি সাংসদ অরুণ জেঠলি এবং সুষমা স্বরাজ বলেছিলেন, সংসদ ভণ্ডুল (ডিসরাপশন) করে দেওয়াটাও গণতন্ত্রের অংশ। তবে কক্ষের ভিতরে সাংসদদের আচরণ নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠলে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু বিজেপি এখন যতই মুখে সংসদ চলতে না দেওয়ার জন্য বিরোধীদের দোষ দিক না কেন, অরুণ জেঠলি, সুষমা স্বরাজের কথাই ঠিক। গণতন্ত্রের স্বার্থেই কখনও বিরোধীদের এই পথ নিতে হয়। সংসদ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলা মানেই গণতন্ত্র খুব শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে, এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। ভারতের সংসদের ইতিহাসে দেখা যায় সব থেকে বেশি নির্বিঘ্নে সংসদ চালু থেকেছে জরুরি অবস্থার সময়, ইন্দিরা যখন প্রধানমন্ত্রী। সেটাই এখনও রেকর্ড।
প্রশ্নটা আসলে আন্য জায়গায়। এর শেষ কোথায়? এই ভাবেই কি চলতে থাকবে? সংসদে একটা বৃহৎ দল থাকবে, সেই দল সংখ্যার জোরে আলোচনা ছাড়া বিল পাশ করাবে। বিরোধীদের প্রশ্নের জবাব দেবে না, বিরোধীরা কখনও গান্ধমূর্তির কাছে কখনও যন্তর-মন্তরে প্রতিবাদ দেখাবে। এমন চলতেই থাকলে একদিন এই ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে। যা আসলে ইতিমধ্যেই অনেকটা গিয়েছে। এডিআর-এর রিপোর্ট বলছে বর্তমান লোকসভায় মোট ২৩৩ জন সাংসদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এর ভিতর বিজেপির সাংসদ ১১৬ জন। বহু আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করা সংসদ নিয়ে এখনই বহু মানুষ হাসাহাসি করে। এই মানসিকতা বাড়তে থাকলে স্বৈরাচারীদের সুবিধা হয়।
একটা প্রবণতা কংগ্রেস আমলে শুরু, এখন তা বেড়েছে। সংখ্যার জোর থাকায় ২০১৪-র পর থেকে রাজ্যের মানুষের কাছে সরাসরি কেন্দ্রের সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার মতো প্রকল্প বাড়ছে। কৃষিবিল, শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়, এনআইএ থেকে শুরু করে বেশ কিছু কেন্দ্রীয় আইনে দেখা যাচ্ছে রাজ্যের গুরুত্ব কমছে, কমছে রাজ্যের ক্ষমতার সীমা। লম্বা হয়েই চলেছে কেন্দ্রের হাত। পিএম কেয়ার ফান্ড তৈরি করে টাকা নেওয়া হচ্ছে সব রাজ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের থেকে। কিন্তু রাজ্য জানতে পারবে না ওই ফান্ড সংক্রান্ত কোনও তথ্য। এসব কোনওটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নতুন আইন এনে দিল্লির কেজরিওয়াল সরকারের প্রায় সব স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, এই প্রক্রিয়ারই অংশ। বলা যায় ভারতের যে বৈশিষ্ট্য, নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের আঞ্চলিকতা, তার বিকাশের পথগুলো বন্ধ করে, হিন্দু, হিন্দি, হিন্দুস্তানের সরলরেখায় বাঁধার চেষ্টা চলছে বৈচিত্রকে। বেশ কিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল সমস্যাটা বুঝতে পারলেও, একটা বড়ো অংশ এটা বুঝতে পারছে না। যেমন মায়াবতীর বিএসপি, নবীন পট্টনায়কের বিজেডি, ওয়াই এস আর কংগ্রেস, টিআরএস, অকালি, নীতিশকুমারের দল এই এই ফেডারালিজম বিরোধী রাজনীতকে বাড়তে সাহায্য করছে। তারা বুঝতেই পারছেন না, বিপদটা তাদেরও। বিজেপির যেহেতু এখনই একক সংখ্য গরিষ্ঠতা রয়েছে, কৃষিবিল ইস্যুতে দেখা গেল এনডিএ সঙ্গী অকালি দলের মতকে তারা সরাসরি অগ্রাহ্য করল। অথচ বিজেপির ৩০৩ আসনের মধ্যে ৪২টি আসন এসেছে মহারাষ্ট্র, পঞ্জাব, বিহার থেকে। যে ৪২ আসন আঞ্চলিক দলের সহায়তায় জেতা। এই ৪২ আসন না থাকলে বিজেপির সংখ্যা গরিষ্ঠতা থাকে না। কিন্তু ওই সব দল যখন সিএএ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, কৃষিবিল নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, একক সংখ্যা গরিষ্ঠতার শক্তিতে বিজেপি সেসব নাকচ করে দিচ্ছে।
আসন তো ৩০০-র বেশি, কিন্তু কত ভোট পায় বিজেপি? ২০১৪-তে ৩১ শতাংশ, ২০১৯-এ ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ বিজেপিকে ভোট দিচ্ছে না এমন ভোটারের সংখ্য ৬০ শতাংশের বেশি। কিন্তু এত কম শতাংশ ভোট পেয়েও, আসন সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কারণ বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীরা একজোট নয়। এই কৌশলের সুবিধা কয়েক দশক কংগ্রেস পেয়ে এসেছে। এখন বিজেপি পাচ্ছে। এর ফলে যেটা হচ্ছে সেটা হল দেশের ৬০ শতাংশের বেশি ভোটারের প্রতিনিধিদের কথা সংসদে গুরুত্ব পাচ্ছে না। বা কম গুরুত্ব পাচ্ছে। তারা সংসদ অচল করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, কিন্তু একজোট হতে পারছেন না। এখান থেকেই মাঝে মাঝে বিরোধী জোটের প্রক্রিয়া শুরু হয়। যা ফের নতুন করে শুরু হয়েছে। সঙ্গে আরেকটা প্রশ্নও উঠছে। সেটা হল, সিম্পল মেজরিটির ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন যা, ফার্সট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত, এই পদ্ধতিই কি ভারতের মতো বৈচিত্রময়, নানা আঞ্চলিক চরিত্রে ঠাসা একটা দেশের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা? না কি, প্রপরশনাল রিপ্র্রেজেন্টেশন বা আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার সময় এসেছে।